বিএনপি নিয়ে অহেতুক কথাবার্তা

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:২১, নভেম্বর ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৭, নভেম্বর ২১, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীবিএনপিকে নিয়ে সরকারি দলের নেতা এবং মন্ত্রীদের বয়ান থামছে না। বিএনপি বিরোধী দল হিসেবে কিছুই করতে পারছে না, মাঠেও তাদের অস্তিত্ব নেই। দলের প্রধান খালেদা জিয়া কারাগারে আছেন দুই বছর হতে চললো। তারপরও তাদের নিয়ে বয়ান, নানা ব্যর্থতায় তাদের টেনে সরকারি দলের লোকেরা সুখ পাচ্ছেন। আমি লক্ষ করেছি, এর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন সরকারি সমর্থক টকশোওয়ালা এবং কলামিস্টরাও। আমার ভয় হয়, এসব দেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবার বিভ্রান্তিতে পড়েন কিনা।
প্রধানমন্ত্রী এর আগে ১৯৯৬ সালেও একবার ক্ষমতায় ছিলেন। সে পাঁচ বছরের কথা বাদ দিলেও এখন ২০০৯ সাল থেকে তিনি একটানা ক্ষমতায় আছেন। একটানা ক্ষমতায় থাকলে জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়। সুতরাং আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিকে তার ওপর এমনভাবে নির্ভরশীল করে ফেলেছেন যে, জাতি তার ওপর রাখা নির্ভরশীলতা পরিত্যাগ করাকে নিরাপদ মনে করছে না। তাই আওয়ামী লীগ এখনও ক্ষমতায় আছে। না হয় ক্ষমতায় থাকার কথা নয়।

প্রধানমন্ত্রী এসব বুঝেই তার দলে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করছেন। আওয়ামী লীগের অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস করছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি মানুষ আস্থাশীল বলে তারা মনে করছে তার নতুন উদ্যোগ ফলপ্রসূ হলে দেশের কল্যাণ হবে। হয়তো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের প্রতি মানুষ আস্থাশীল হতে পারে, কিন্তু তার কিছু অঙ্গসংগঠন পরিপূর্ণ আস্থাহীনতায় ভুগছে। পিটিয়ে ছাত্র হত্যা করা, ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে জড়িত হয়ে অবৈধভাবে মানুষের সম্পদ দখল করে আস্থা ধরে রাখা সম্ভব নয়।

কিছু কিছু নেতা বিএনপি ত্যাগ করে যাচ্ছেন বলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ খুশিতে বগল বাজাচ্ছেন। তাদের বোঝা উচিত জেনারেল মাহবুব কখনও জনগণের নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন সামরিক বাহিনীর নেতা। তিনি সারা জীবন সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার কাছে অবস্থার চাপে স্কাইপে নেতৃত্ব দেওয়াকে হয়তো কঠিন অবস্থা বলে মনে হবে, কিন্তু রাজনীতি এমন যে, দীর্ঘকাল নির্বাসনে থাকা নেতাকেও টেনে এনে রাষ্ট্রক্ষমতা প্রদান করে।

মোরশেদ খানও ব্যবসায়ীদের নেতা। তিনি কখনও জনগণের মাঝ থেকে উঠে আসা নেতা ছিলেন না। সুতরাং জেনারেল মাহবুব ও মোরশেদ খানের মতো নেতাদের আসা-যাওয়ার সঙ্গে বিএনপির কিছু যায় আসে না। আমি যাচাই বাছাই করে দেখেছি তৃণমূলে বিএনপি’র অবস্থান পূর্বের মতোই রয়েছে। বরং আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াতের কর্মীদের জন্য তাদের দ্বার রুদ্ধ করে দেওয়ায় বিএনপি-জামায়াতের তৃণমূলের কর্মীদের মাইগ্রেশনকে হতাশ করে ফেলেছে। তাতে বিএনপি-জামায়াত উপকৃত হয়েছে।

বিএনপি’র দুই নেতা—খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান। তারা একজন জেলে আর আরেকজন প্রবাসে। ক্ষমতায় থাকতে তারা গ্রেনেড নিক্ষেপ করে আওয়ামী লীগকে সমূলে বিনাশ করতে চেয়েছিল। যদি সেই গ্রেনেড মঞ্চে পড়তো, তবে শেখ হাসিনাসহ সব নেতাই নিহত হতেন। নিচে পড়ে আইভি রহমান মরেছেন। অন্যরা ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছেন। সুতরাং এখন তার ফল তো খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়াকে ভোগ করতে হবে। রাজনীতি তো তীর্থযাত্রা নয়, ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা।

বিএনপিকে অনেকে প্রত্যেকদিন হেদায়েত প্রদান করে জামায়াতকে ছাড়ার জন্য। বিএনপি এদেশের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের একটি। দীর্ঘ ১৮ বছর তারা দেশ পরিচালনা করেছে। তারা তাদের ভালো-মন্দ নিশ্চয়ই জানে। লন্ডন প্রবাসী এক প্রবীণ কলামিস্ট সম্প্রতি তার এক কলামে লিখেছেন, ‘বিএনপি যদি জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাহলে বাংলাদেশের মানুষ খুশি হবে। তারা দেশে একটি শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক বিরোধী দল দেখতে চায়। এই বিরোধী দল আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করবে। স্বাধীনতার বিরোধিতা করবে না। যা এখন তারা করছে।’

বিএনপি জামায়াতের সঙ্গ ছাড়লে বাংলাদেশের মানুষ খুশি হবে, তা কী করে বুঝলেন ওই কলামিস্ট জানি না। যদি তাই হয়, তবে জামায়াতকে তো নিষিদ্ধ করা দরকার। সরকারকে নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দেন না কেন! জামায়াত সম্পর্কে তো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালও রায়ের অবজারভেশনে খুবই কঠিন কথাবার্তা বলেছেন। নির্বাচন কমিশন তার নিবন্ধনও বাতিল করেছে। সুতরাং তাকে বেআইনি ঘোষণা করা সরকারের জন্য কঠিন কিছু নয়।

আর বিএনপি স্বাধীনতার বিরোধিতা করছে বলে প্রবাসী কলামিস্ট উল্লেখ করেছেন। বিএনপি স্বাধীনতার বিরোধিতা কোথায় করছে! অহেতুক অভিযোগ তুলে অভিযুক্ত করা তো উচিত নয়। যে দল দেশ শাসন করছে, দীর্ঘ ১৭-১৮ বছর সেই দল স্বাধীনতার বিরোধিতা করে কেমন করে! স্বাধীনতাবিরোধীদের তারা আশকারা দিয়েছে, পুনর্বাসন করেছে বলতে পারি। আর বিএনপি শাসনামলে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপদে পড়েছে বা তারা হেফাজত করেনি, সেটাও তো বলতে পারি না।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি গত ৪৮ বছর ক্ষমতায়। ব্যর্থতা সফলতা সবারই কমবেশি রয়েছে। যারা দেশের কথা চিন্তা করে লেখালেখি করে, তাদের উচিত নিরপেক্ষ লেখা দিয়ে সরকারি দল, বিরোধী দল, উভয়কে পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করা। লেখকদের উসকানিমূলক লেখা, নেতাদের উসকানিমূলক বক্তৃতা দেশের কল্যাণ হয় না। কোনও রাজনৈতিক দলেরও কল্যাণে আসে না।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ