নির্মল বায়ুর প্রত্যাশায়

Send
বিনয় দত্ত
প্রকাশিত : ১৬:১৫, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৬, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৯

বিনয় দত্ত‘ও গানওয়ালা আর একটা গান গাও
আমার আর কোথাও যাবার নেই
কিচ্ছু করার নেই
কৈশোর শেষ হওয়া,
রঙ চঙে স্বপ্নের দিন
চলে গেছে রঙ হারিয়ে, চলে গেছে মুখ ফিরিয়ে…’

কবীর সুমনের গাওয়া গানের মতো আমাদের জীবনেও সকল রঙ হারিয়ে গেছে। ফিকে হয়ে আসছে আমাদের সামনের দিনগুলো। ক্রমশ অন্ধকার সময়ে প্রবেশ করছি আমরা। বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু অক্সিজেন দরকার, সেই অক্সিজেনটুকুও ফুরিয়ে আসছে। চারিদিকে শুধু ধুলো। ধুলোময় এক ট্যাবুর মধ্যে বেড়ে উঠছি প্রতিনিয়ত। আপনাদের কি মনে হচ্ছে, আমি কোনও গল্প বলছি? একদমই না।

বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ার ভিজুয়ালের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ নভেম্বর ২০১৯, বেলা ১টায় ঢাকায় বায়ুমান সূচক (একিউআই) ছিল সর্বোচ্চ ২৬১। আর ওই সময় বাতাসে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম ২.৫-এর পরিমাণ ছিল প্রতি ঘনমিটারে ২১১ মাইক্রোগ্রাম। রাত ১১টা নাগাদ এটি কমে দাঁড়ায় ১৮৭-তে। এ সময় বায়ুদূষণ কবলিত শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল পঞ্চম।

এবার আশা করি মনে হচ্ছে না, আমি গল্প বলছি। আমাদের বেড়ে ওঠা ধুলোর সঙ্গে, আমাদের ভালোবাসাও ধুলোর সঙ্গে, ধুলোময় পরিবেশে আমি, আপনি, সবাই। যে শহরে আমরা বসবাস করছি, সেই শহর এখন দূষণের তালিকায় শীর্ষে। এই শীর্ষ অবস্থান আজকে থেকে নয়, বেশ কয়েক বছর ধরে। সেই অবস্থান থেকে আমাদের সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা কি আছে? সেই গল্প পরে শুনছি।

বাংলাদেশে বায়ুদূষণের উৎস নিয়ে চলতি বছরের মার্চে একটি গবেষণা প্রকাশ করে পরিবেশ অধিদফতর ও বিশ্বব্যাংক। তাতে দেখা যায়, দেশে বায়ুদূষণের প্রধান তিনটি উৎস হচ্ছে ‘ইটভাটা’, ‘যানবাহনের কালো ধোঁয়া’ ও ‘নির্মাণকাজ’। গত আট বছর ধরে এই তিন উৎস ক্রমেই বাড়ছে। ২০১৩ সালে পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে দেশের ইটভাটাগুলোর ওপরে একটি জরিপ করা হয়। তাতে দেখা যায়, দেশে ইটভাটার সংখ্যা ৪ হাজার ৯৫৯। পরে ২০১৮ সালে পরিবেশ অধিদফতর থেকে জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, ইটভাটার সংখ্যা বেড়ে ৭ হাজার ৯০২ হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৮৭টি ইটভাটা ঢাকা বিভাগের মধ্যে গড়ে উঠেছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে দেশে মোট যানবাহনের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৭৭। ২০১৮ সালে তা বেড়ে হয় ৬ লাখ ১৯ হাজার ৬৫৪। বায়ুদূষণের উৎস সংক্রান্ত পরিবেশ অধিদফতরের গত মার্চের প্রতিবেদন বলছে, সারাদেশে গত পাঁচ বছরে ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ৫৯ শতাংশ বেড়েছে।

পাঁচ বছরে যে পরিমাণ ইটভাটা বেড়েছে, তাতে মনে হচ্ছে আমরা বুঝি ইট রফতানি করি। অথবা আমাদের দেশে ইট রফতানির ওপর সরকার আলাদা করে অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিচ্ছে, তাই আনন্দের সঙ্গে ইটভাটা বেড়ে যাচ্ছে। বিষয়টা এরকম ভাবলে একদমই ভুল ভাবা হবে।
আমাদের দেশে এই পরিমাণে ইটভাটা বাড়ার একটাই কারণ, প্রচুর পরিমাণে বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে। বিল্ডিং তৈরিতে যে পরিমাণ ইট লাগে তা এই ইটভাটাগুলোই সরবরাহ করে। এখন প্রশ্ন হলো, প্রয়োজনে ইটভাটা বাড়তেই পারে, সেই ইটভাটা কি পরিবেশ উপযোগীভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল? এতোগুলো ইটভাটা নির্মিত হওয়ার পরে পরিবেশ অধিদফতর কি তা নজরদারি করেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর আমার আর নতুন করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। যদি সবকিছু সঠিকভাবে তদারকি করা হতো, তাহলে এইভাবে ঢাকার বায়ু দূষিত হতো না।

আমাদের দেশে যখন কোনও সমস্যা তৈরি হয়, তখন তা অনুসন্ধান করে দেখা যায় সমস্যাটা ভয়ানক আকার ধারণ করেছে। এর কারণ কী? এর কারণ হলো, দুই সিটি করপোরেশনের পানি ছিটিয়ে ধুলো নিয়ন্ত্রণে আনার কথা। উত্তর সিটি করপোরেশন পানি ছিটিয়ে কিছুটা কাজ করলেও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অবস্থা ভয়ানক। দক্ষিণের পানির নিজস্ব কোনও উৎসই নেই। ওয়াসার পাম্প থেকে পানি নিয়ে বিভিন্ন সড়কে ছিটায় ডিএসসিসির ১১টি গাড়ি। তাও নিয়মিত নয়।

পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা হলো পরিবেশ অধিদফতর। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সংস্থাটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে দুই দফায় ১২ বছর ধরে প্রকল্প চালাচ্ছে। এর সঙ্গে নিয়মিত কিছু তৎপরতাও রয়েছে। কিন্তু বায়ুর মান ধারাবাহিকভাবে খারাপ হচ্ছে।  কেন খারাপ হচ্ছে? কারণ যেহেতু বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কাজ হচ্ছে, তাই কাজ আগাচ্ছে ধীর গতিতে।

গত ২৭ নভেম্বর ২০১৯ রাজধানীতে বায়ুদূষণ করায় মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কর্তৃপক্ষকে মোট তিন লাখ টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদফতর। নির্মাণকাজের সময় নিয়ম মেনে ধুলা নিয়ন্ত্রণ না করায় তাদের ওই জরিমানা করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদফতর এই কাজটি কি সারা বছর করেছে? নিশ্চয় নয়, মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজের ফলে যে পরিমাণ ধুলা নির্গত হয় তার কারণে ঢাকায় চলাফেরা করায় কষ্ট হয়ে পড়েছে। তাই বলে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে না। ধুলা যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে, সেই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে হচ্ছে। পরিবেশ অধিদফতর এতদিন পরে তাদের তিন লাখ টাকা জরিমানা তো করেছে। আমাদের কাছে এইটা বড় পাওয়া!

রাজধানীতে ভবনের ধুলা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)। রাজউক এখন ব্যস্ত হলো নতুন প্রকল্প পাস করানোর পেছনে। ভবনের ধুলা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে কিনা, তা দেখবার মতো সময় এখন রাজউকের নেই।

তিনটি বড় বড় প্রতিষ্ঠানের চিত্র যদি এই হয়, তাহলে বায়ুদূষণ কমা তো দূরে থাক বরং আমরা বায়ুদূষণে দিল্লিকে ছাড়িয়ে যাবো। এসব কারণে দূষণের তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষে অবস্থান করছে। যদি দূষণ কমতো, তাহলে হয়তো শীর্ষ অবস্থান থেকে সরে আসতে পারতো। সেই ইচ্ছা এসব প্রতিষ্ঠানে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আছে কিনা, তা আমি সত্যিই জানি না।

২.

২০১৭ সালে ভারতে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। চলচ্চিত্রটির নাম ‘কার্বন: দ্য স্টোরি অব টুমোরো’। চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন মৈত্রেয়ী বাজপেয়ী ও রমিজ ইলহাম খান। এই চলচ্চিত্রের মূল বক্তব্য হলো—২০৬৭ সালে পৃথিবীতে ভয়ানক অক্সিজেন সংকট দেখা দেবে। দুধ, পেস্ট, শ্যাম্পুর মতো অক্সিজেনও একটি পণ্য হিসেবে বিক্রি হবে। এই অক্সিজেন পাওয়ার জন্য মানুষ সংঘর্ষে নেমে পড়বে। কারণ তখন সারা পৃথিবীতে শুধু কার্বনের আধিপত্য থাকবে।

চলচ্চিত্রে দেখানো হয়, সামনে যুদ্ধটা অর্থ, সম্পত্তি, অস্ত্র বা প্রভাব প্রতিপত্তির নয়। সামনের যুদ্ধটা হলো অক্সিজেনের জন্য। প্রাকৃতিক অক্সিজেনের মূল্য সবচেয়ে বেশি থাকবে। আর এই প্রাকৃতিক অক্সিজেন সরবরাহ করবে শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান। এর পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারবে। অর্থের বিনিময়ে এই অক্সিজেন সবাই কিনতে পারবে। অক্সিজেনের অভাবে মানুষ হিংস্র হয়ে উঠবে, খুন বাড়বে। অক্সিজেনের অভাবে মানুষকে বেঁচে থাকতে কষ্ট হবে এবং মানুষ বাসার বাইরে বের হলে দূষিত বায়ু বা কার্বন থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য মাস্ক পরে থাকবে। অসাধারণ একটি গল্প। ভবিষ্যতের সংকটের গল্প চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন পরিচালকদ্বয়।

মজার বিষয় হলো, এটি যতটা না চলচ্চিত্র, তার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবিক। দিল্লিতে ইতোমধ্যে অক্সিজেন বার বসেছে। বায়ুদূষণ বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভারতের মতো বাংলাদেশের বায়ুদূষণও আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। তাহলে সামনের দিনে আমাদের দেশেও অক্সিজেন বার স্থাপিত হবে, আর সবাই সেই অক্সিজেন বার থেকে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অক্সিজেন গ্রহণ করবে।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বহির্বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালে সেপ্টেম্বরের চেয়ে অক্টোবর মাসে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাজনিত রোগের চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে রোগী বেশি এসেছে। এর একমাত্র কারণ বায়ুদূষণ। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন ১২ হাজার ৫৬০ জন, ভর্তি হন ১ হাজার ২৮৭ জন, জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেন ৭৩৪ জন, মারা যান ৬৮ জন। আর অক্টোবর মাসে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন ১২ হাজার ৮০২ জন, ভর্তি হন ১ হাজার ৩৩০ জন, জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেন ৭৪৭ জন, মারা যান ৭০ জন।

৭০ জন মানুষ শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাজনিত রোগে শুধু একটি হাসপাতালে মারা যান! শুধু একটি হাসপাতালের যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে বাকিগুলোতে কী পরিমাণ মানুষ মারা গিয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। বায়ুদূষণের কারণে যে পরিস্থিতি এখন তৈরি হয়েছে, তা কি তৈরি হতো? যদি মানহীন ইটভাটা নির্মিত না হতো, যদি ফসলি জমি দখল করে ইটভাটা নির্মাণ করা না হতো, যদি সিটি করপোরেশনের মহান কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সঠিকভাবে পানি ছিটাতো, যদি রাজউক ভবন নির্মাণের ময়লা বা ধুলোবালি নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করতো, যদি পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সঠিকভাবে সবকিছু নজরদারি করতো, তবে কি এই হারে বায়ু দূষিত হতো?

৩.

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট ও দ্য ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন প্রতিবছর বৈশ্বিক বায়ুমান প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণে ২০১৭ সালে সারা বিশ্বে ৫০ লাখ মানুষ মারা গেছে। প্রতি ১০ জনে একজনের মৃত্যুর জন্য দায়ী বায়ুদূষণ। আর বায়ুদূষণে মৃত্যুর হারের দিক থেকে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম।

চিন্তা করা যায়, মানুষ মারা যাচ্ছে, এই দিক দিয়েও আমাদের অবস্থান এক থেকে দশের মধ্যে। সত্যিই অবাক করার বিষয়। উন্নয়ন প্রতিটি দেশের জন্য প্রয়োজন। কিন্তু সেই উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামোগত যে পরিবর্তন প্রয়োজন, উন্নয়নকে মহা সমারোহে দাঁড়ানোর জন্য ছোট ছোট কাজ করা প্রয়োজন, সেইদিকে আমাদের উদাসীনতা সবচেয়ে বেশি। এই উদাসীনতার কারণে আমাদের দেশের নির্মল বায়ু দূষিত হচ্ছে। দূষিত হচ্ছে জনপদ, সবুজ বনানী আর আগামী দিনের রঙিন শৈশব।

আগামী দিন যে শিশু জন্ম নেবে, সে যদি দূষিত বায়ুর মধ্যে জন্ম নেয়, তাহলে কীভাবে তার শৈশব রঙিন হবে? কীভাবে সে মুক্ত আকাশে বিশুদ্ধ বায়ু সঙ্গে নিয়ে বড় হবে? কীভাবে সে রোগ প্রতিরোধ করে নিজেকে বাংলাদেশি হিসেবে দাবি করবে?

আগামী দিনের সকল শিশুই আপনার, আমার, আমাদেরই। এদের কি এই পরিবেশে বড় করবো? প্রশ্নটা নিজেকে করুন।

লেখক:কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ