বইমেলায়, সুন্দরের সঙ্গে

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৫:৫৭, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৮, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০২০

তুষার আবদুল্লাহসুন্দরের সঙ্গে আছি। বিমোহিত হচ্ছি প্রতি মুহূর্তে। ৩৬০ ডিগ্রির যেদিকে তাকাই, দেখি সুন্দর। এই সুন্দরেরা প্রজাপতি হয়ে উড়ে এসেছে বইমেলায়। সকাল-বিকাল-সন্ধ্যা উড়ে বেড়াচ্ছে। আমি দৌড়ে যাচ্ছি, ছুটে যাচ্ছি তাদের দিকে। ধরা দেয়, দেয় না। বইমেলায় দ্বিতীয় দিন থেকেই পাঠকের ভিড় বাড়ছে। এবার সেই ভিড়ে খুদে পাঠকদের উপস্থিতি বেশি। তিন মাসের শিশু থেকে শুরু করে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা মেলা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আড়াই বছরের এক শিশুকে দেখলাম, ওর মা বাড়ি যাওয়ার তাড়া দিচ্ছে। কিন্তু ও মেলা ছেড়ে যেতে রাজি নয়। উল্টো মাকে বলছে বাড়ি চলে যেতে। ও মেলায় থেকে যাবে। সত্যিই একেক স্টলে গিয়ে ও পাতা উল্টে উল্টে বই দেখতে থাকলো। বইয়ের প্রচ্ছদ ও ভেতরের অলংকরণ দেখে ওর চোখেমুখে মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়তে দেখলাম। আরেকটি শিশু, বয়স কতো হবে আড়াই বা তিন বছর? ও ‘কৈশোর তারুণ্যের বই’-এর উদ্যোগে নালন্দার শিশুদের হাতে তৈরি বইয়ের প্রদর্শনীতে এসে গোঁ ধরে বসলো, একটি বই সে কিনবেই। কিন্তু ওই বই তো প্রদর্শনের জন্য, বিক্রির জন্য নয়। শনিবার বইমেলায় এলো সাভারের অ আ ক খ স্কুলের শিক্ষার্থীরা। কয়েকজন তরুণ চিকিৎসক এই স্কুল তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীরা সমাজের পিছিয়ে থাকা শ্রেণি থেকে এসেছে ঠিক, কিন্তু এখন আর ওরা পিছিয়ে নেই। নিজেদের স্কুল ইউনিফর্ম তৈরি করা থেকে শুরু করে ব্যাগ এবং অন্যান্য অনেক কিছু ওরা তৈরি করতে শিখে গেছে। দেখলাম আমাদের অনেকের চেয়ে মেধায় ওরা বেশ এগিয়ে। বই পড়ার ক্ষেত্রেও তাদের প্রবল আগ্রহ। আড়াইহাজার, রূপগঞ্জের একটি স্কুল ও কলেজের মেয়েরা বইমেলায় এসেছে বাড়ির সঙ্গে লড়াই করে। বাড়ি থেকে ওদের বইমেলায় আসতে দিতে চাচ্ছিল না। ওরা অনেকটা জোর করেই এসেছে। ওদের হাতভর্তি নতুন বই দেখে আনন্দে আত্মহারা আমি।

এই আনন্দের মাঝেও চোখ ভিজে যায় জলে। যখন দেখি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে শিশুদের জন্য নিম্নমানের ও নকল বই। আমাদের প্রকাশনা জগতে শিশুদের জন্য মানসম্মত বই তৈরির প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান একেবারে কম ছিল না। বাংলা একাডেমি, শিশু একাডেমি ছাড়াও বইঘর, মুক্তধারা, সাহিত্য প্রকাশ, আহমদ পাবলিশিং হাউজ, নওরোজ কিতাবিস্তান, আগামী, অনুপম শিশুদের জন্য বই তৈরি করেছে। এই বইগুলো লিখেছেন সেই সময়কার তরুণ ও প্রতিষ্ঠিত লেখকেরা। ওই লেখকদের কেউ কেউ শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখা অব্যাহত রাখেননি। এসেছে নতুন প্রকাশক এবং লেখকও। এই নতুনদের বড় অংশটিই বইয়ের মান নষ্ট করেছে। দেশি-বিদেশি বই নকল করে ছাপছে। ইন্টারনেট থেকে বই নামিয়ে ছেপে দিচ্ছে। যাকে বলা যায় ‘কাট অ্যান্ড পেস্ট’। বইয়ের প্রকাশনা মানও নিম্নস্তরের। কয়েকটি জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্রের নামে সস্তা বই প্রকাশের সুনামি চলছে। ছোটদের বর্ণমালা শেখান, ভূত ও কল্পবিজ্ঞান বইয়ের নামে যা প্রকাশ হচ্ছে, তাতে শিশুমনে বইয়ের প্রতি অরুচি তৈরি করছে। কয়েকটি পুরনো প্রকাশনা ঠিকই বজায় রেখেছে তাদের বইয়ের বিষয় ও মান। নতুনদের কেউ কেউ এসে অসম্ভব সুন্দর বই প্রকাশ করছে। কিন্তু নকল বইয়ের প্লাবনে শিশুরা সেই বইগুলো খুঁজে পাচ্ছে না।

অমর একুশের গ্রন্থমেলা এবার দর্শনার্থী বা পাঠক মাত্রই প্রশংসা কুড়িয়েছে। বেশ খোলামেলা। বসার জায়গা আছে। খাবারের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে পর্যাপ্ত জায়গা। শিশু চত্বর গেলোবারের চেয়ে এবার আরও আকর্ষণীয় হয়েছে। দুই দিক দিয়ে শিশু চত্বরে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে বৃত্তাকার নকশায়। কিন্তু এই সুন্দর আয়োজনের মাঝে অসুন্দর হয়ে আছে শিশুচত্বর ঘিরে থাকা অসুন্দর, নকল বইয়ের ভিড়। শিশু চত্বরে থাকা ৬/৭টি স্টলের বাইরে বাকি প্রকাশনীগুলো পাঠকের কাছে অপরিচিত। এমনকি প্রকাশকদের কাছেও। এদের দেখা মেলে কেবল একুশের বইমেলায়। এই প্রকাশনাগুলোর বিষয়ে সৃজনশীল ও রুচিবান প্রকাশকদের আপত্তি আছে। কিন্তু তাদের সাংগঠনিক ভোট রাজনীতির কারণে তাদের আপত্তি জোরালো হয় না। তাই বাংলা একাডেমিও এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পায় না। কিন্তু আমাদের শিশু-কিশোরদের বইয়ের রুচি তৈরি করতে হলে, বাংলা একাডেমিকে সুঅভিভাবকের দায়িত্বটি পালন করতেই হবে। তাহলে একুশের বইমেলায় আমাদের সুন্দরেরা এসে কোনও অসুন্দরের স্পর্শ পাবে না। আমরা সুন্দরের সঙ্গে বইমেলায় উড়ে বেড়াতে চাই।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

 

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ