‘করোনা নিয়ে আতঙ্কিত হোক সরকার’

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৭:৩৮, মার্চ ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০৫, মার্চ ১২, ২০২০

ডা. জাহেদ উর রহমানকরোনা পরিবারের নবতম ভাইরাস কোভিড-১৯ এই পরিবারভুক্ত অন্য সদস্যদের তুলনায় অনেক কম বিপজ্জনক, এটা সত্য। এর উৎপত্তিস্থল চীনে। এই রোগে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার দেখা গেছে ২.৫ থেকে ৩ শতাংশ। একেবারে রুদ্ধ একটা রাষ্ট্র চীন, তাই এদের তথ্যের ওপর কেউ আস্থা রাখতে নাও চাইতে পারে। এই ক্ষেত্রে তাহলে ইতালির পরিসংখ্যান আমাদের সাহায্য করতে পারে। যখন এই লেখাটি লিখছি ঠিক সেই মুহূর্তের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সেখানে করোনা আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার ৫ শতাংশ। এই হার পূর্ববর্তী আলোচিত করোনা ভাইরাসগুলোর তুলনায় বেশ কম। সার্স এবং মার্স এর ক্ষেত্রে এই হার যথাক্রমে ১০ এবং ৩০ শতাংশ।
মৃত্যু কোনোভাবেই পরিসংখ্যানের বিষয় না, প্রতিটি মৃত্যু মর্মান্তিক, কিন্তু এটা খুব সত্য, করোনা বিশ্বব্যাপী যতটা না স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে সংকট তৈরি করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি তৈরি করেছে অর্থনৈতিক ঝুঁকি। এর মধ্যেই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের নানা রকম সংবাদ আমাদের সামনে এসেছে। যেমন, কয়েকদিন আগেই পৃথিবী দেখলো ২০১১ সালের পর সবচেয়ে ভয়াবহ শেয়ারবাজার পতন, এর আগে যদিও চীন, কোরিয়ার মতো করোনা আক্রান্ত দেশগুলোতে আলাদাভাবে শেয়ারবাজারের ধস হয়েছে। এবারকার এই বিপর্যয়ের সঙ্গে অবশ্য যুক্ত হয়েছে তেলের বিরাট মূল্য পতন, যেটা ঘটেছে উৎপাদন কমানো নিয়ে সৌদির নেতৃত্বে ওপেক এবং রাশিয়ার মতৈক্যে পৌঁছতে না পারা। তেলের চাহিদা কমে যাওয়াও করোনার সঙ্গে যুক্ত—বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে পড়ার কারণে এটা হচ্ছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা গেলেও সেটা টেকসই হবে না বলেই অনেক অর্থনীতিবিদ বলছেন।

করোনার ভয়াবহতা যতটা, তার তুলনায় সারা পৃথিবীতে প্রতিক্রিয়া অনেকটা বেশি হচ্ছে কিনা সেই বিতর্কও আছে। কিছুদিন আগেই বিখ্যাত কোম্পানি টেসলার সিইও ইলন মাস্ক এই ব্যাপারে কথা বলেছেন। শুরু থেকেই কথা বলে যাচ্ছেন অনেক বিশেষজ্ঞও। করোনা যখন চীনের উহানে ছড়িয়ে পড়ে, তখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া দেখে চীন বলেছিল এই রোগকে যেন তাদের বিরুদ্ধে কোনও ‘ভিন্ন উদ্দেশ্য’ সাধনের জন্য ব্যবহার করা না হয়। গত বেশ কিছুদিন থেকে আমেরিকার সঙ্গে চীনের বাণিজ্য যুদ্ধকে মাথায় রাখলে সেই প্রেক্ষাপটে করোনা নিয়ে প্রতিক্রিয়াকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যেতেও পারে।

বাস্তবতা যাই হোক না কেন, চীনের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ভীষণভাবে কমে যাওয়ার মাশুল চীন ভয়ঙ্করভাবে দিয়েছে। পরিস্থিতি এই দেশের জন্য এতটাই ভয়াবহ হয়েছে যে চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। গ্লোবালাইজেশনের যুগে প্রতিটা দেশ আরো অনেক দেশের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত থাকে যে একটা দেশের অর্থনীতির সমস্যা হওয়া মানে আরও অনেক দেশের অর্থনীতি তাতে প্রভাবিত হওয়া। এই কথা আরও অনেক বেশিভাবে প্রযোজ্য চীনের ক্ষেত্রে, কারণ ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাপ্লায়ারে পরিণত হয়েছে চীন। ফলে চীনের অর্থনীতির এই বিপর্যস্ত অবস্থা পৃথিবীর অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

গত বছর চীন থেকে বাংলাদেশ আমদানি করে ১৩ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য (১ লাখ ১৪ হাজার কোটি)। তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ শিল্প, মেডিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টস ও হসপিটাল ইকুইপমেন্ট, কসমেটিকস অ্যান্ড টয়লেট্রিজ এবং ইলেক্ট্রনিকসসহ মোট ১৪টি খাতের কাঁচামাল চীন থেকে আমদানিনির্ভর। শুধু তাই নয়, ভোগ্যপণ্যের মধ্যে ১৭টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন রসুন, আদা, লবণ, মসুর ডাল, ছোলা, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ আমদানি হয় চীন থেকে। এসব জিনিস এর বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করা খুব জটিল। শুধু তাই না, একই ধরনের পণ্য অন্য দেশ থেকে আনতে গেলে দাম অনেক বেশি হবে, যেটা আমাদের শিল্পোৎপাদনকে অনেক বেশি ব্যয়বহুল করে তুলবে। রফতানি পণ্যের ক্ষেত্রে আমরা এই কারণে অনেক বাজার হারিয়ে ফেলবো।

চীনের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যের কারণে যে সমস্যা আমাদের হচ্ছে সেটা এড়ানো সম্ভব ছিল না, এটা সত্য। কিন্তু আমরা আমাদের নিজের ভুলের কারণে যে মাসুল দেবো, সেটাকে নিয়ে আমার সবচেয়ে বড় ভয়।

বাংলাদেশে করোনা ধরা পড়েছে পৃথিবীর ১০২ নম্বর দেশ হিসেবে। এই রোগ বাংলাদেশে আসবে না এটা মনে করার কোনও কারণ কি আমাদের ছিল? অন্যসব দেশের কথা বাদই দেই। চীনের সঙ্গে আমদানি-রফতানি এমনকি মানুষের আসা-যাওয়া পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে বেশি; হাজার হাজার চীনা নাগরিক এই দেশের নানা প্রকল্পে কাজ করে।

একটার পর একটা পত্রিকায় আমরা দেখতে পেয়েছি বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানার শুধু একটা ঠিক আছে, বাকি সব নষ্ট। ৬ মার্চ বাংলা ট্রিবিউনই রিপোর্ট করেছে ‘একটি থার্মাল স্ক্যানার দিয়েই চলছে শাহজালাল বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম-সিলেটেরটি নষ্ট’ শিরোনামে। সার্বিক পরিস্থিতি দেখে স্বয়ং চীনা রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে করোনা স্ক্রিনিং পর্যাপ্ত নয়’। ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখলাম ৩ থেকে ৫ লাখ টাকায় একটা থার্মাল স্ক্যানার পাওয়া যায়। ১০ মার্চ খবর দেখেছি, দেশে নতুন করে কিছু থার্মাল স্ক্যানার লাগানো হচ্ছে। সেই স্ক্যানার কিনতে আমাদের এত সময় লাগছে কেন?

শুধু তাই নয়, ঢাকা বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য ফরম পূরণ, এমনকি একমাত্র থার্মাল স্ক্যানারটিও ব্যবহার করা নিয়ে কী অবিশ্বাস্য দায়সারা ভাব চলছে, সেটা নিয়ে বিবিসি বাংলা সরেজমিন রিপোর্ট করেছে ২ মার্চ।

করোনা পরীক্ষা শুধু ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরে করা যায়। সারা দেশের থানা-জেলা পর্যায় দূরেই থাকুক, বিভাগীয় শহরেও নেই এই ব্যবস্থা। করোনা চীনের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে, সেটাও বহুদিন আগের ঘটনা। এর মধ্যেও আমরা রোগ নির্ণয়ের জন্য আরও বেশকিছু সুবিধা তৈরি করিনি। করোনা ডায়াগনসিস হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই ক্ষেত্রে আক্রান্ত মানুষকে আইসোলেশন এবং তার সংস্পর্শে আসা মানুষকে কোয়ারেন্টাইন করার মতো পদক্ষেপ জরুরি ভিত্তিতে নিতে হয়। যেহেতু এই রোগের সব উপসর্গ আর সব ভাইরাল ফিভারের প্রায় কাছাকাছি, তাই পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা না গেলে মানুষ সতর্ক হবে না।

এবার একটু ভেবে নেওয়া যাক তো সারা দেশে নানা জায়গায় যখন এই রোগ ছড়িয়ে পড়বে, তখন একমাত্র পরীক্ষা কেন্দ্রটিতে কী পরিমাণ লাইন তৈরি হবে এবং ফল পাওয়ার জন্য কতটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। এর মধ্যেই নিশ্চিত ডায়াগনসিস না হওয়া মানুষগুলো এই রোগ ছড়িয়ে দিতেই থাকবে। করোনা চীনের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে, সেটাও বহুদিন আগের ঘটনা। এর মধ্যেও আমরা রোগ নির্ণয়ের জন্য আরও বেশ কিছু ব্যবস্থা তৈরি করিনি কেন? ‌

করোনার ক্ষেত্রে মানুষের মৃত্যু হয় মূলত শ্বাস-প্রশ্বাসের জটিলতা থেকে হয়ে থাকে। এমন ক্ষেত্রে সংকটাপন্ন রোগীর জন্য আইসিইউ এবং ভেন্টিলেশন যন্ত্র থাকা খুবই জরুরি; এর মাধ্যমে অনেক সংকটাপন্ন রোগীকে সরিয়ে তোলা যায়। আমাদের দেশে এই সুবিধা কত কম, এবং থাকলেও সেটা কতটা ব্যয়বহুল, সেটা খুব সাধারণ মানুষও জানেন। এমনকি জটিল না হওয়া রোগীদের আইসোলেশন রেখে চিকিৎসা করার মতো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি দেশের হাসপাতালগুলোতে এখনও নেওয়া হয়নি। এমনকি এই রোগের প্রচারণাও হয়নি ঠিকমতো। যদি সব মানুষের কাছে ভালোভাবে তথ্য পৌঁছানো যেত, তাহলে মাস্ক নিয়ে অন্তত তুঘলকি কাণ্ডটা হতো না। ১০ মার্চ বাংলা ট্রিবিউন এ ব্যাপারে একটি রিপোর্ট করেছে। এমনকি আমাদের হাইকোর্টও বলেছে ‘প্রস্তুতিতে মারাত্মক ঘাটতি আছে’।

মেডিক্যাল কলেজে যখন প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের ওপরে আমাদের পড়ানো হচ্ছিল, তখন একটা কথা খুব জোর দিয়ে বলা হতো, আমাদের মতো আর্থিকভাবে কম সামর্থ্যবান দেশগুলোর সবসময় উচিত রোগ হলে সেটার চিকিৎসা করার (কিউরেটিভ মেডিসিন) চেয়ে রোগ না হতে দেওয়ার প্রতি বেশি মনোযোগ দেওয়া। এটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থারই পরামর্শ। কারণ এতে অনেক কম খরচে অনেক ভালো স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হয়। করোনা ছড়িয়ে পড়লে সেটা কী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, সেটা বোঝার জন্য চীন, কোরিয়া এবং ইতালির মতো দেশগুলোর উদাহরণ আমাদের সামনে থাকার পরও অত্যন্ত গা-ছাড়া ভাবে চলেছে দীর্ঘদিন।

আগের অংশে বলছিলাম চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ার বিপদ সম্পর্কে। এবার অন্য আরেকটা দিক দেখা যাক। ইউরোপ এবং আমেরিকায় করোনা ছড়িয়ে পড়ছে, তাই তাদের ভোগ কমে যাচ্ছে, যেটা বাংলাদেশ থেকে রফতানি পণ্য বিশেষ করে গার্মেন্টসামগ্রীর রফতানি হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। ওদিকে মধ্যপ্রাচ্যে এই রোগ ছড়ানোর কারণে তেলের মূল্যের ব্যাপক পতন সেই দেশগুলোর অর্থনীতিকে যখন আরও বিপন্ন করে তুলবে, তখন সেইসব দেশ থেকে বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের দেশে ফিরে আসতে হবে দলে দলে, ফলে আমাদের রেমিট্যান্সও কমে যাবে আশঙ্কাজনকভাবে।

আর আমাদের দেশে যদি এই রোগ খুব সিরিয়াসলি ছড়িয়ে পড়ে (এটা পড়বে বলেই আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি) তাতে আমাদের দেশ থেকে বহু দেশে রফতানি বন্ধ হয়ে যাবে। আরও বড় বিপদ তৈরি হবে, তখন এই কারণে বহু মানুষকে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হতে পারে, অথবা মানুষ নিজে থেকেই ভয়ে নানা জায়গায় যাওয়া বন্ধ করে দেবে। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগ আশঙ্কাজনকভাবে কমবে, এটা দেশের মানুষের উপার্জনের ওপরে বিপর্যয় তৈরি করবে। এই ভয়ঙ্কর আর্থিক চাপটা এমন এক সময়ে দেশের মানুষের ওপরে আসছে, যখন দেশের শুধু রেমিট্যান্স ছাড়া সামষ্টিক অর্থনীতির আর সব সূচক নিম্নমুখী এবং ব্যাংক ব্যবস্থা খেলাপি ঋণের কারণে বিপর্যয়ের মুখোমুখি। করোনার আগে অর্থনীতির অবস্থা এবং এর সঙ্গে করোনাকে যুক্ত করে যে কেউ বুঝে নিতে পারেন আমাদের সামনে ঠিক কী অপেক্ষা করছে।

‘করোনা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই’—জনগণকে আশ্বস্ত করার জন্য এই ধরনের নানা কথা এখন বলা হচ্ছে চারদিক থেকে। মানি, জনগণের আসলেই আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক হওয়াটাই বেশি জরুরি এক্ষেত্রে। জনগণের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে করোনার শুধু স্বাস্থ্যগত দিকটি আছে। কিন্তু সরকারের ক্ষেত্রে এটা অনেক বড় ব্যাপার অর্থনৈতিক কারণে। তাই বহু আগেই এই ব্যাপারে সরকারের সতর্ক থাকা উচিত ছিল। এই মুহূর্তে সতর্ক থাকা আর মোটেও যথেষ্ট নয়। সরকারকে এখন আতঙ্কিত হতে হবে, তাতে যদি সরকার তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ নেয়।

লেখক: শিক্ষক, অ্যাকটিভিস্ট

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ