‘বুঝে না রে কিচ্ছু বুঝে না’

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:৩৩, এপ্রিল ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৫, এপ্রিল ১৯, ২০২০

রেজানুর রহমানকরোনার ভয়ে ঘরে আছি। কিন্তু আদৌ কি আমরা ঘরে আছি? ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন সম্মানিত ধর্মীয় বক্তার নামাজে জানাজায় জনতার ঢল দেখে মনে হচ্ছে এই দেশে করোনা নামক অদৃশ্য এক ভাইরাসের ভয়ে ভীত হওয়ার কোনও কারণ নাই। শুধু কি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এমন ঘটনা ঘটেছে? না, গাজীপুরেও একটি গার্মেন্টসের সামনে হাজার হাজার শ্রমিক বিক্ষোভ করেছে। ঢাকার কাওরানবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জমায়েত হচ্ছে। সঙ্গত কারণেই মনে প্রশ্ন জেগেছে, এই যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার কথা বলা হচ্ছে, তার কি কোনও যৌক্তিকতা আছে? করোনাভাইরাস অত্যন্ত ছোঁয়াচে। শারীরিক স্পর্শের মাধ্যমে মরণঘাতী এই ভাইরাস দ্রুত ছড়ায়। সেজন্যই রাষ্ট্রীয়ভাবে বারবার সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু আদৌ কি সরকারের এই পরামর্শ সর্বস্তরে কার্যকর হচ্ছে? তর্কের খাতিরে হয়তো বলা যাবে করোনা সংক্রান্ত সরকারি পরামর্শ একেবারেই যে মানা হচ্ছে না তা নয়। কেউ কেউ তো মানছেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সত্যিকার অর্থেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে জীবনযাপন করা হচ্ছে। ঢাকা শহরের অনেক এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মাধ্যমে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা হচ্ছে। দেশের অনেক গ্রামেও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার নজির সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতে আদৌ কি কোনও লাভ হবে? করোনা এমন একটি অদৃশ্য ভাইরাস, যা নিমেষেই একজনের শরীর থেকে দ্রুত হাজার জনের শরীরে ছড়িয়ে যেতে সক্ষম। ভয়টা কিন্তু সেখানেই। আর তাই দেশের সকল মানুষকে ঘরবন্দি জীবনযাপন করতে বলা হচ্ছে।

কিন্তু সবাই তো তা মানছে না। বিশেষ করে ধর্মীয় বক্তাদের অনেকেই করোনাভাইরাসকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ভেবে ভক্ত-আশেকানদের মাঝে নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ফলে কার্যত করোনা সংক্রান্ত সরকারের সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম অনেকটা হুমকির মুখে পড়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় লাখো মানুষের জমায়েত ধর্মীয় আবেগেরই অংশ। বিষয়টি বড়ই স্পর্শকাতর। ধর্মীয় নেতার মৃত্যুতে তার ভক্তরা এভাবে জমায়েত হতে চাইবেন। কিন্তু সময়ের বাস্তবতাকেও তো গুরুত্ব দিতে হবে? করোনা থেকে সতর্ক থাকতে যেখানে মসজিদে জমায়েতের ক্ষেত্রেও বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে, সেখানে লাখো মানুষের জমায়েত করে জানাজার আয়োজন কি ঠেকানো যেতো না? এই যে সরকারি নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জমায়েত করা হলো, এই জমায়েত থেকে যদি করোনাভাইরাস ছড়িয়ে যায়, তার দায়-দায়িত্ব কে নেবে? লাখো মানুষের গাদাগাদি ঠাসাঠাসি এই জমায়েতে একজনও যদি করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী থেকে থাকেন, তাহলে তো সেটাই হবে আশঙ্কার বিষয়। আবারও সবিনয়ে বলতে চাই, ধর্মীয় আবেগকে দমন করা সহজ কাজ নয়। তবে সময়কে বিবেচনায় নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সম্মানিত ধর্মীয় বক্তারা কি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারতেন না?

করোনার শুরু থেকেই ধর্মীয় শিক্ষাগুরু ও বক্তাদের অনেকেই একে পাত্তা দিতে চাননি। বরং ওয়াজ-মাহফিলে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন, বাংলাদেশে করোনার আক্রমণ হবে না। করোনা থেকে বাঁচতে সৌদি আরবসহ অন্যান্য ইসলামি দেশ মসজিদে জমায়েত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। অথচ আমাদের দেশে অনেক ধর্মীয় বক্তা, আলেম, ওলামা মসজিদ খুলে দেওয়ার দাবি করছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জমায়েত সরকারি আদেশকে উপেক্ষা করার একটি উদ্যোগ হতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ব্যাপারে প্রণিধানযোগ্য একটি মন্তব্য প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ তুহিন ওয়াদুদ। তিনি বলেছেন, আমার কেন যেন এমনতর বিষয় দেখলে মনে হয় এদের কোনও দোষ নাই। সংকট অন্যখানে। একশ’, দেড়শ’ বছরের শিক্ষিত জাতি আমরা। আমাদের ধার্মিক হওয়ার বদলে ধর্মভীরু বানানো হয়েছে। বুদ্ধির পরিবর্তে ধর্মকে সম্পূর্ণ আবেগ দিয়ে গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে ধর্মভীরু আবেগী বাঙালির পক্ষে এর চেয়ে আর কী-ইবা দেওয়ার আছে?

এ তো গেলো ধর্মীয় জমায়েতের কথা। বেতন-ভাতা পাওয়ার দাবিতে এই যে প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের সামনে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী বিক্ষোভ সমাবেশ করছে, এতে কি করোনার সংক্রমণ কমবে না বাড়বে? গাজীপুরের একটি গার্মেন্টসের সামনে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর বিক্ষুব্ধ সমাবেশের চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এই বিক্ষোভ-সমাবেশ দেখেও তো বোঝার উপায় নাই, বাংলাদেশ মরণঘাতী করোনাভাইরাসের সঙ্গে সামাজিক যুদ্ধে নেমেছে। বরং মনে হচ্ছে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সম্পর্কিত কোনও ভয়-আতঙ্ক নেই। যদি থাকতোই তাহলে গার্মেন্টসের সামনে এভাবে বিক্ষোভ-সমাবেশ হতো না। এ প্রসঙ্গে অনেকে হয়তো বলতে পারেন, ভাই পেটের ক্ষুধা থাকলে কোনও ভয়ই ভয় হিসেবে কাজ করে না। গার্মেন্টস শ্রমিকরা বেতন-ভাতা না পেলে ঘরে বসে থেকে খাবে কী? টাকা না থাকলে তো খাবার জোগাড় করা মুশকিল। ক্ষুধা পেটে কাউকেই আপনি ‘ঘরবন্দি’ রাখতে পারবেন না। কাজেই মানুষকে ঘরবন্দি রাখার ক্ষেত্রে পেটের ক্ষুধা নিবারণের পথটা সহজ করে দিন। এই কথায় যুক্তি আছে। করোনা সংক্রমণের এই দুঃসময়ে দেশের যে স্থানেই বিক্ষোভ-সমাবেশ হচ্ছে, সেখানেই ক্ষুধা নিবারণের অস্থিরতা প্রকাশ পেয়েছে। আবার ক্ষুধা-নিবারণের সংকটকে পুঁজি করে বিশেষ মহল পরিস্থিতি জটিল করে তোলারও চেষ্টা করছে। কাজেই পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট মহলের উচিত দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। যাতে কেউ ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার সুযোগ না পায়।

একথা সত্য, আপনি যদি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধর্মীয় জমায়েতের সমালোচনা করেন, তাহলে গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের সামনে বিক্ষোভ-সমাবেশেরও সমালোচনা করতে হবে। কাওরানবাজারের মাছের আড়তে উপচেপড়া ভিড়ের কি কোনও দায় নেই? দেশের একদল সচেতন মানুষ করোনা সতর্কতায় সামাজিক দূরত্ব মেনে চলছেন। পাশাপাশি অন্য একদল লোক করোনা সতর্কতাকে মোটেই গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কিন্তু আজ না হোক কাল এই দুই দলের মানুষকেই তো একসঙ্গে মিশে যেতে হবে। তখন করোনার প্রকোপ আদৌ কি কমবে? আবারও বলি, করোনা অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। একজনের শরীর থেকে হাজার জনের শরীরে মিশে যেতে এই ভাইরাসের বেশি সময় লাগে না। কাজেই একদল মানুষ অতি সতর্কতায় জীবন-যাপন করলো, অন্যদল ব্যাপারটাকে গুরুত্বই দিলো না, তাহলে তো কাজের কাজ কিছুই হবে না। তাহলে কি করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা এক পা হেঁটে দুই পা পিছিয়ে যাচ্ছি? যদি তাই হয়, তাহলে তা হবে বড়ই শঙ্কার বিষয়।

অনেক কষ্ট নিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে, বুঝে না রে...কেউ কিচ্ছু বুঝে না। যখন বুঝবে তখন হয়তো সময় শেষ হয়ে যাবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ