প্রস্তুতি নেই, নেই স্বচ্ছতাও

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৬:১২, এপ্রিল ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৫, এপ্রিল ২৬, ২০২০

রুমিন ফারহানাআমরা সময় পেয়েছিলাম। আমরা সময় পেয়েছিলাম বিশ্বের আরও ১০২টি দেশের চেয়ে বেশি। আমরা সময় পেয়েছিলাম দুই মাসেরও কিছু বেশি। বিশ্বায়নের এই যুগে আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম কী হচ্ছে করোনা আক্রান্ত দেশগুলোতে, কী করছে তারা। ৩১ ডিসেম্বর চীনে করোনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ঠিক ৯ সপ্তাহ পর ৮ মার্চ বাংলাদেশ সরকার প্রথমবারের মতো আইইডিসিআরের মাধ্যমে আমাদের জানায় দেশে করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। যেহেতু রোগটির কোনও প্রতিষেধক বা ওষুধ এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি, তাই প্রতিরোধই ছিল একমাত্র উপায়। প্রতিরোধের জন্য বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা খুব পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছিল দুটি উপায়ের কথা। এক টেস্ট বা পরীক্ষা, আর দুই হলো সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা।
করোনায় টেস্ট বা পরীক্ষার গুরুত্ব কতটা তা অনেকটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা। চীনে এই ভাইরাস মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর যে গুটিকয় দেশ অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে করোনা মোকাবিলা করেছে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের একটি। সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তারা প্রথমেই টেস্টিংয়ের ওপর জোর দেন। এজন্য জানুয়ারি মাসেই সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় রি-এজেন্ট ও যন্ত্রপাতি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০ হাজার থেকে শুরু করে মার্চের শেষ সপ্তাহের মধ্যেই টেস্টের সংখ্যা দৈনিক ৩ লাখে উন্নীত করা হয়। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত আলাদা করে তাদের চিকিৎসা প্রদান সম্ভব হয়েছে। মজার বিষয় হলো, দক্ষিণ কোরিয়া এটি করেছে তাদের অর্থনীতির চাকা সচল রেখে এবং কোনও ধরনের লকডাউন ছাড়াই।

গত ৩১ মার্চ প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাজ্যের ফ্লোরিডায় কর্মরত মেডিসিনের (রেস্পিরেটরি ও আইসিইউ) সহযোগী অধ্যাপক রুমি আহমেদ খান জানান, বাংলাদেশে মার্চ পর্যন্ত যে হারে পরীক্ষা চলেছে, তাকে অপ্রতুল বললেও কম বলা হবে। এটা সিন্ধুতে এক বিন্দু পানি ফেলার চেয়েও কম। তিনি স্পষ্ট বলেন, প্রতিদিন কমপক্ষে গড়ে ১ লাখ ব্যক্তির টেস্ট করাতে হবে। আর এটি করতে হলে বিভিন্ন বেসরকারি খাতের ল্যাব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরকারকে বসতে হবে, তাদের সব রকম সাহায্য দিতে হবে। বড় বড় দেশ যেমন যুক্তরাষ্ট্র, চীন তারা সবাই বেসরকারি খাতের সহায়তায় পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে।

শুরুতে করোনাভাইরাস পরীক্ষার একক কর্তৃত্ব ছিল আইইডিসিআরের হাতে এবং পরীক্ষা করা হতো মূলত দুই শ্রেণির মানুষের। এক যারা সম্প্রতি বিদেশ থেকে এসেছেন অথবা যারা বিদেশ থেকে আসা কারও সংস্পর্শে এসেছেন। পরীক্ষার জন্য অত্যাবশ্যক কিটের পরিমাণও ছিল অপ্রতুল। ১৭ মার্চ পর্যন্ত প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুযায়ী সরকারের হাতে করোনাভাইরাস পরীক্ষার কিট ছিল মাত্র ১৭৩২টি। অর্থাৎ প্রতি ৯৮ হাজার মানুষের জন্য ১টি কিট। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। দেশে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে মহামারি আকারে। আজকে পর্যন্ত ৬০টি জেলায় করোনা আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। সরকার পুরো দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। তবে এর মধ্যে বাড়ানো হয়েছে পরীক্ষাগার। আইইডিসিআর ছাড়াও বর্তমানে আরও ২০টি কেন্দ্রে করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের পরীক্ষা হচ্ছে। তবে কেবলমাত্র পরীক্ষাগার বাড়িয়ে কোনও লাভ হবে না যদি না পরীক্ষা করার কিট পর্যাপ্ত পরিমাণে না থাকে। যে কারণে পরীক্ষার কেন্দ্র বাড়লেও পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো যায়নি সেই অনুপাতে। দেশে এখন পর্যন্ত প্রতিদিন পরীক্ষার সংখ্যা ৩৫০০-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে দেশে বর্তমানে কিটের সংখ্যা কত? এ বিষয়ে কোনও স্পষ্ট উত্তর দিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। স্বাস্থ্য অধিদফতর গত ৩১ মার্চ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, তাদের মোট শনাক্তকরণ কিটের সংখ্যা ৯২ হাজার। এর মধ্যে ২১ হাজার কিট পরীক্ষার জন্য বিতরণ করা হয়েছে, ফলে কিট মজুত আছে ৭১ হাজার। এরপর আর কিটের মজুতের বিষয়ে কিছু জানা যায়নি স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে।

করোনা মোকাবিলায় পরীক্ষার সঙ্গে সঙ্গে আর যে বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তা হলো স্বচ্ছতা, উন্মুক্ততা এবং জনগণকে সম্পূর্ণরূপে অবহিত ও সম্পৃক্ত করা। অথচ শুরু থেকেই সরকারের দেওয়া তথ্যের প্রতি মানুষের আস্থা কম। সরকার এতটাই জবাবদিহিতাহীন যে, এই ভয়াবহ মহামারি কালেও মানুষ আর সরকারের দেওয়া জীবন মৃত্যুর সংখ্যার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারছে না। আর শুরু থেকেই প্রতি ক্ষেত্রে কাজের চেয়ে বাগাড়ম্বর আর কথার ফুলঝুরি দিয়ে নিজের আস্থার সংকট নিজেই তৈরি করেছে সরকার। যেখানে প্রতিদিন সর্দি, কাশি, জ্বরে (যা কিনা একই সঙ্গে করোনারও লক্ষণ) অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে, সেখানে সরকারের পরিসংখ্যান মানুষের মনে প্রশ্ন জাগাবে সেটাই স্বাভাবিক। সরকারের তরফে অস্বচ্ছতার সর্বশেষ নমুনা হলো কিটের সংখ্যা জানতে চাওয়া হলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এক বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিককে বলেন, ‘কিটের মজুতের তথ্য দিয়ে আপনার কোনও কাজ আছে বলে আমি মনে করি না।’ এই ধরনের উক্তি নিঃসন্দেহে মানুষের মনে হাজারও প্রশ্নের জন্ম দেবে। যেখানে বিশ্বের গড় পরীক্ষার হার প্রতি ১০ লাখে ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার পর্যন্ত, সেখানে বর্তমানে দেশে প্রতি ১০ লাখে গড়ে ১৯৮ জনের পরীক্ষা হচ্ছে। আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, দেশে বর্তমানে ২১টি ল্যাবে যে পরিমাণ পরীক্ষা করার সক্ষমতা আছে, তার অর্ধেকই থেকে যাচ্ছে অব্যবহৃত।

তবে আশার কথা হলো, কিটের এই ভয়াবহ সংকটের সময় এই কিট উদ্ভাবন করেছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, আর একই সঙ্গে কষ্টের বিষয় হলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ওষুধ প্রশাসন, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) সহ এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারের সকল প্রতিষ্ঠানকে কিট গ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হলেও কোনও প্রতিষ্ঠানই উপস্থিত ছিল না। বিশ্বের এক দেশ যখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে অন্য দেশের প্রতি, যার যেটুকু সাধ্য তাই দিয়ে পাশে দাঁড়াচ্ছে অন্য দেশের, সেখানে নিজের দেশের সরকারের এই ধরনের আচরণ জনগণের মনে কেবল তীব্র ক্ষোভেরই জন্ম দেয় না বরং সরকারের আন্তরিকতা, সদিচ্ছা, স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতাকেও ভীষণভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে কিট নিয়ে রাজনীতি আর আমলানীতির নোংরা উদাহরণ হয়ে থাকবে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের উক্তি। তারা বলেছেন, ‘আমরা কেন যাবো? এটা তো অ্যাপ্রুভড কোনও প্রডাক্ট না। তারা আবেদন করবে। তারপর নিবন্ধনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।’ এটা যে একটা জরুরি পরিস্থিতি, সেটা একজন শিশুও বোঝে। যেখানে কোটি কোটি মানুষের জীবন মৃত্যুর প্রশ্ন সেখানে এই ‘নিবন্ধনের প্রক্রিয়া অনুসরণ’ ধরনের উক্তি কেবল আমলাতান্ত্রিক তালবাহানাই নয়, এটি ক্রাইম, মানুষের জীবন নিয়ে খেলা।

প্রস্তুতির অভাব আর অবহেলার ছাপ সর্বত্র। এটা সত্য, করোনা আক্রান্ত রোগীদের ৮০ শতাংশেরই কোনও হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু ২০ শতাংশকে যেতে হয় হাসপাতালে। তাদের থাকতে হয় আইসোলেশন ইউনিটে। সেই ইউনিটগুলোর মান নিয়ে আছে প্রশ্ন। এই ২০ ভাগের মধ্যে ৫-১০ শতাংশের প্রয়োজন হয় কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যবস্থা বা ভেন্টিলেশনের। দেশে ভেন্টিলেটরের সংখ্যা অপ্রতুল। গত এক মাসে (২৩ মার্চ থেকে ২৩ এপ্রিল) কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৭০০ গুণ। নির্ধারিত কিছু হাসপাতাল ছাড়া এদের অন্য কোথাও চিকিৎসা সম্ভব না। অথচ কোভিডের জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোর বেশির ভাগেই সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট নেই। যে দুয়েকটি হাসপাতালে সেন্ট্রাল প্ল্যান্ট আছে, সেগুলোতে আবার ওয়ার্ডের বেডে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। রোগীর অবস্থা নাজুক হলে শুধু অক্সিজেনের জন্য হলেও তাকে নিতে হবে আইসিইউ বা সিসিইউতে। স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে এসব হাসপাতালে ১৯২টি ভেন্টিলেটর দেওয়া হলেও তাতে আইসিইউ শয্যা আছে মাত্র ১৩৩টি। আইসিইউতে রোগীর হার কমানো সম্ভব যদি প্রতিটি বেডের সঙ্গে অক্সিজেন সরবরাহ থাকে। কারণ অক্সিজেন সরবরাহ ফেল করলেই প্রয়োজন হয় ভেন্টিলেটরের।

হাসপাতাল থেকে যারা চিকিৎসা নিয়ে ফিরেছেন, তারা বলেছেন তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। অনেক হাসপাতালেই কয়েক দিনে একবারের বেশি দেখা মেলেনি ডাক্তার আর নার্সদের। কারও বা আবার স্বজনরাই ঠেলেছেন অক্সিজেন সিলিন্ডার। কারও ক্ষেত্রে ১১ দিনেও মহাখালী থেকে নমুনা সংগ্রহের জন্য কাউকে পাওয়া যায়নি। সর্বত্র অবহেলা, অব্যবস্থাপনা, সর্বত্র প্রস্তুতির অভাব।  

করোনাভাইরাস যেন দেশের স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক চিত্রটি উদোম করে মেলে ধরেছে আমাদের সামনে। এ দেশে মন্ত্রী, এমপি, আমলা থেকে শুরু করে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে যারা আছেন, তারা সকলেই তুচ্ছ সমস্যায় চিকিৎসা নিতে পাড়ি জমান ব্যাংকক, সিঙ্গাপুরের মতো দেশে। তাদের পরিবার থাকেন বেগমপাড়া বা মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোমে। সুতরাং দেশে থাকা প্রভাব প্রতিপত্তি আর সামর্থ্যহীন অতি সাধারণ মানুষগুলোর জন্য স্বাস্থ্য খাতে জিডিপি’র .৮৯ শতাংশ বরাদ্দই তো ছিল অনেক বেশি। ডাক্তার, নার্স, চিকিৎসা সরঞ্জাম, উন্নত ব্যবস্থা এই সবকিছুর অপ্রতুলতা নিয়েও তো দিব্যি বেঁচে আছে মানুষগুলো, যেমন বেঁচে ছিল। করোনার মতো সাম্যবাদী রোগ আসার আগে কে ভেবেছিল সবাইকে এক ঘাটে জল খেতে হবে?

 

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।  জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ