যদি বেঁচে যাই, তারপর...

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৫:১৪, এপ্রিল ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:১২, এপ্রিল ২৮, ২০২০

রেজানুর রহমানআজ না হোক কাল অথবা পরশু নিশ্চয়ই মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের করোনামুক্ত করবেন। তখন সত্যিকার অর্থে নতুন এক পৃথিবীর জন্ম হবে। যারা বেঁচে থাকবেন তারা কি নতুন পৃথিবীটাকে নিজের গতিতে চলতে দেবেন? নাকি আধিপত্য বিস্তারের আশায় আবার যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মেতে উঠবেন? পাহাড় কাটবেন? নদী ভরাট করবেন? বন উজাড় করবেন। মানুষ হয়ে মানুষকেই শোষণ করবেন? বিপদে পড়লে আমরা মানুষেরা চরম কিছু মিথ্যা কথা বলি। সৃষ্টিকর্তার কাছে আকুতি করতেই থাকি, এবারের মতো মাফ করে দাও মাবুদ, হে রাহমানুর রাহিম... হে পরওয়ারদিগার মাফ করো... জীবনে আর অন্যায় করবো না... কিন্তু বিপদ থেকে মুক্ত হওয়ার পরই সবকিছু ভুলে যাই। আবার অন্যায় করতেই থাকি। করোনার থাবা থেকে মুক্ত হওয়ার পর বেঁচে থাকা মানুষেরা কি আবারও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার অসম লড়াইয়ে লিপ্ত হবে? এই প্রশ্নগুলো কেন যেন বারবার মনের মাঝে উঁকি দিচ্ছে? অথচ এতবড় এক বৈশ্বিক বিপর্যয়ে এরকমের নেতিবাচক প্রশ্ন তো মাথায় ঢোকার কথা নয়। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে ওঠা মানুষেরা কি আবার দানব হয়ে উঠবে? আবার পাহাড় কাটবে, বন উজাড় করবে, নদী ভরাট করবে...? কেন যেন মানুষ হয়ে মানুষের ওপর আস্থা রাখতে পারছি না।

করোনার এই দুঃসময়ে যখন আমাদের উচিত বেঁচে থাকার লড়াইয়ে আন্তরিক থাকা, ‘প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ এই নীতিতে দূরত্ব মেনেও পাশে থাকা; অথচ আমরা কী করছি? দুস্থদের জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণের চাল আত্মসাৎ করছি। সুযোগ পেলেই অসহায় মানুষকে ঠকাচ্ছি। তবে চরম হতাশার মধ্যেও আশার আলো ফুটেছে। শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার ৭০ বছরের বৃদ্ধ ভিক্ষুক নাজিম উদ্দিন ৩ বছর ধরে ভিক্ষা করে জমানো ১০ হাজার টাকা উপজেলার ত্রাণ তহবিলে জমা দিয়ে এক যুগান্তকারী মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মানবিক এই দৃষ্টান্তের ঘটনা সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের অনুপ্রেরণা হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।

এই যে আমরা ঘরবন্দি জীবনযাপন করছি, কেন? একটি নিরাপদ সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় তো নাকি? একটি সুন্দর ভোরের অপেক্ষায় আছি এই জন্য যে, ওই ভোরে বেরিয়ে পড়বো মনের আনন্দে। আনন্দ উৎসবে আবার জমে উঠবে বটতলা, হাটখোলা, শহর বন্দর গ্রাম! কিন্তু এজন্য আমাদের আছে কি কোনও প্রস্তুতি? নাকি সরকারি ছুটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে যেভাবে পারি আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে নেমে পড়ব? আবার রাস্তায় ভয়াবহ যানজট হবে। অকারণে হর্ন বাজাবো। নদী ভরাট করে বাড়ি তুলবো। বন কেটে আলিশান বাড়ি না হয় ফ্যাক্টরি গড়ে তুলবো।

অথচ আমরা ইচ্ছা করলেই করোনার পরবর্তী সময়ে নিজের দেশটাকে, পাশাপাশি সমাজ ও পরিবারকে একটা সুন্দর পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যেতে পারি। পরিবর্তনটা শুরু হোক পরিবার থেকেই। ঘরবন্দি এই সময়ে আমরা নিশ্চয়ই নিজ নিজ পরিবারকে নতুনভাবে জেনেছি। নতুন উপলব্ধি হয়েছে। করোনা আমাদের একটা নিয়ম শিখিয়েছে। নিয়মিত হাত ধোয়া, সর্বদা পরিষ্কার থাকা। অর্থাৎ একটা নিয়মের মধ্যে জীবনযাপন করা। পরিবারের এই উপলব্ধিটা সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করাই হবে করোনাকালের উপযুক্ত শিক্ষা।

ঢাকা শহরের কথাই ধরা যাক। মারাত্মক দূষণে আক্রান্ত আমাদের এই প্রিয় শহরটা যেন এখন প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। রাস্তাঘাটে ধুলোবালি নেই। গাছ গাছে সবুজের সমারোহ। লেকের পানিতে দুর্গন্ধ দূর হয়েছে। গাছে গাছে চেনা-অচেনা পাখির আনাগোনা বেড়েছে। আমরা কি একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না, প্রকৃতিকে আর বিরক্ত করবো না। করোনা থেকে মুক্ত হয়ে আইন মেনেই চলাচল করবো। রাস্তার আইন মেনে চলবো। ফিটনেসবিহীন গাড়ি আর রাস্তায় নামবে না। নিয়ম মেনে যাত্রী গাড়িতে উঠবেন। নিয়ম মেনেই গাড়ি থেকে নামবেন। ট্রাফিক আইন অমান্য করে গাড়ি চালাবো না। নদীর আইন মেনে চলবো। নদী দূষণ করবো না। নদী ভরাট করবো না। অফিস আদালতে ঘুষ, দুর্নীতি বন্ধ হবে। দ্রব্যমূল্য বাড়াবো না। খাদ্যে ভেজাল দেবো না। একটা নিয়মের মধ্যে চলবে প্রিয় দেশ, প্রিয় মাতৃভূমি। আহা! বেশ বেশ...।

এজন্য অবশ্যই সরকারের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। করোনাকালীন এই সময়েই সরকার এ ব্যাপারে একটি গাইডলাইন তৈরি করতে পারে। পাশের দেশ ভারতে রাস্তায় প্রকাশ্যে থুতু ফেললে আর্থিক জরিমানার বিধান চালু হয়েছে। আমাদের দেশেও এ ধরনের কিছু নিয়ম চালু করতে এখন থেকেই ক্যাম্পেইন শুরু হতে পারে। একটি দেশের রাস্তা, নদীবন্দর, এয়ারপোর্ট, অফিস-আদালত ও কোর্ট কাচারির পরিবেশ দেখেই বোঝা যায় দেশটি কতটা সভ্য অথবা কতটা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। করোনার এই দুঃসময়কে ঘিরেই সরকার একটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজাতে পারে। ধরা যাক, সিদ্ধান্ত হলো করোনামুক্ত পরিবেশে সড়কপথে কোনও ধরনের লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা গাড়ি আর চলবে না। সবাইকে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে। বন উজাড় করে গাছ কাটা যাবে না। নদী ভরাট করে বসতি গড়ে তোলা যাবে না। এই নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের বিধানও থাকতে হবে। অনেকে হয়তো বলতে পারেন, সড়ক পথের জন্য এ ধরনের আইন তো আছে রে ভাই। বন উজাড় করলে কী শাস্তি হতে পারে, আইনে তাও বলা আছে। নদী ভরাটের শাস্তির কথাও কমবেশি সবাই জানে। কেউ তো আইন মানে না। এটাই হলো আসল কথা। অতীতকালে আইনগুলো যথাযথভাবে কার্যকর করা যায়নি। তাই বলে ভবিষ্যতেও যে কার্যকর করা যাবে না এমন দায়সারা কথা বলা কি ঠিক? এক্ষেত্রে ছোট্ট একটি উদাহরণ দিতে চাই। ধরা যাক, একটি বিরাট অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অডিটোরিয়ামে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। হঠাৎ শুরু হলো বিশৃঙ্খলা। তৃতীয় শ্রেণির আসনের লোকজন জোর করে প্রথম শ্রেণির আসনে বসে যাচ্ছে। চিৎকার, চেঁচামেচি হইচই শুরু হয়ে গেলো। হঠাৎ দেখা গেলো অডিটোরিয়ামে বিষাক্ত গ্যাস উৎপন্ন হচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতে পারছে না মানুষ। তখন যে-যেভাবে পারে অডিটোরিয়াম থেকে বাইরে বেরিয়ে গেলো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেলো অডিটোরিয়ামটি এমনভাবে বানানো হয়েছে যে, আপনি ইচ্ছে করলেই নিয়ম ভাঙতে পারবেন না। সিগারেট খেতে পারবেন না। অহেতুক জটলা করতে পারবেন না। তৃতীয় শ্রেণির আসনের লোক প্রথম শ্রেণিতে গিয়ে বসতে পারবেন না। তার মানে অডিটোরিয়ামে ঢুকতে হলে একটা নিয়মের মধ্যে থাকতে হবে। পরবর্তীতে নিয়ম মেনেই দর্শক ঢুকলেন অডিটোরিয়ামে এবং নিয়ম মেনেই অনুষ্ঠান দেখলেন। এরপর থেকে নিয়ম পালনের কথা আর বলতে হয়নি। মানুষের অভ্যাস হয়ে গেছে। এই অভ্যাসটাই জরুরি। বাসার বাইরে থেকে এসে হাত মুখ ধুয়ে ফেললে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি কমে। করোনার আগে একথা টিভিতে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচার করার পরও অনেকে তা গ্রাহ্যই করেনি। এখন করোনার ভয়ে নিয়মিত হাত ধুচ্ছে। আশা করি করোনা পরবর্তী সময়েও এই অভ্যাস বহাল থাকবে। তবে ভয় থেকে নয়, আমাদের উচিত মন থেকে পজিটিভ কিছু বিষয়ের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করা। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রকৃতিকে তার মতো থাকতে দেওয়া। কারণ প্রকৃতি বাঁচলেই মানুষও বাঁচবে।

করোনাকালীন এই দুর্যোগের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই নানারকম প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিশিষ্ট অভিনেতা টনি ডায়েস বিদেশে থাকেন। তিনি প্রবাসে থাকা দেশের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট অভিনেতা-অভিনেত্রীর সাক্ষাৎকার ভিত্তিক একটি ভিডিও নির্মাণ করেছেন। ভিডিওটিতে অভিনেত্রী ও মডেল তানিয়া আহমেদ বলেছেন, এ যাত্রায় বেঁচে গেলে ভীষণ করে বাঁচবো। মোনালিসা বলেছেন, সবাইকে জড়িয়ে ধরে অনেক করে কাঁদবো। রুমানা বলেছেন, এ যাত্রায় রেহাই যদি পাই অন্যের কথা ভাববো। জামাল উদ্দিন হোসেন বলেছেন, যার যেখানে অংশ আছে হিসাবগুলো চুকিয়ে দেবো। মিলা হোসেন বলেছেন, একাকী নীড়ের ছানা দু’মুঠো খেলো কিনা খবর নেবো। শামীম শাহেদ বলেছেন, এ যাত্রায় বেঁচে যদি যাই অন্যদের আগে বাঁচতে দেবো। শিরীন বকুল বলেছেন, ঘর থেকে বেরিয়ে প্রথম নদীর কাছে ক্ষমা চাইবো। শ্রাবন্তী বলেছেন, বন পাহাড় আর সাগরের দেশে বিনয় হেসে নত হবো। কাজী উৎপল বলেছেন, আমি ঋণ না হয়ে পরিশোধ হবো। তমালিকা কর্মকার বলেছেন, আর হবো না রাশভারী। থামিয়ে দিবো লোভ লালসার আহাজারি। ডলি জহুর বলেছেন, ধর্ম নিয়ে মহাজনে পবিত্র প্রাণে ইবাদত হবো। শামসুল আলম বকুল বলেছেন, এবার বেঁচে গেলে মানুষের তরে মানুষ হবো। প্রিয়া ডায়েস বলেছেন, নতুন করে স্কুলে যাবো, কলেজে যাবো-ফুচকা খাবো। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেবো। আর হাসিগুলো ছড়িয়ে দেবো। আদনান ফারুক হিল্লোল বলেছেন, হরিণ ঘাতক তীর হবো না। অসৎপথের যাত্রী হবো না। আফরোজা বানু বলেছেন, বেঁচে যদি যাই আমার শেকড় আমার সত্তায় রাখবো। খায়রুল ইসলাম পাখি বলেছেন, বেঁচে যদি যাই মায়ের শাড়ির আঁচল হবো। বোনের চোখের কাজল হবো...

মাহমুদুজ্জামান বাবুর একটি গানের কিছু কথা দিয়ে আজকের লেখাটি শেষ করি। ‘ভোর হয়নি, আজ হলো না। কাল হবে কিনা তাও জানি না। পরশু ভোর ঠিক আসবেই। এই আশাবাদ তুমি ভুলো না।’ আজ না হয় কাল অথবা পরশু কাঙ্ক্ষিত ভোর আসবেই। আতঙ্ক আর ভয়ের ছুটি ফুরোবে। তখন যেন প্রতিশ্রুতির কথাগুলো ভুলে না যাই।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো। 

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ