সম্ভাব্য করোনা দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় যা করণীয়

Send
ড. শাখাওয়াৎ নয়ন
প্রকাশিত : ১৩:২৯, জুন ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩১, জুন ২০, ২০২০

ড. শাখাওয়াৎ নয়নভয়ংকর এক মহামারি করোনাভাইরাসের কবলে পড়েছে সমগ্র মানবজাতি। সাবেক এবং বর্তমান এমপি, মন্ত্রী মরে যাচ্ছে। লাখে লাখে মানুষ মরছে। সবাই দিশেহারা। এমতাবস্থায় প্রত্যেকে নিজ নিজ দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর মুখের দিকে চোখ খুলে, কান পেতে আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ, পরিসংখ্যান ক্ষণিকের জন্য আশ্বস্ত করলেও, দ্রুতই উবে যাচ্ছে। কারণ তথ্য-উপাত্ত খুব একটা ভরসা দিচ্ছে না। মানুষ হাসপাতালে গিয়ে সেবা পাচ্ছে না, বিভিন্ন দ্বারে দ্বারে ঘুরেও টেস্ট করাতে পারছে না। টেস্ট করাতে পারলেও মারা যাওয়ার পরে টেস্ট রিপোর্ট পাচ্ছে। সঙ্গত কারণেই হতাশার পারদ ঊর্ধ্বমুখী।   
সামগ্রিকভাবে শুধু স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই নয়, বাজার ব্যবস্থা এবং বিশ্বাস ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। লকডাউনের সরাসরি ফল হচ্ছে—বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং ক্ষুধা। একদিকে মানুষ বেকার হয়েছে এবং অন্যদিকে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তাই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয়ে গেছে ভয়ংকরভাবে। এখন আওয়াজ উঠেছে—‘না খেয়ে মরার চেয়ে করোনায় মরা ভালো’। কারণ সাধারণ মানুষের পক্ষে কর্মহীন হয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। প্রসঙ্গত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে— ‘কোটি কোটি মানুষ বেকার হয়ে যাচ্ছে। এশিয়া, আফ্রিকায় দুর্ভিক্ষ আসন্ন’। সমাধানের উপায়? সাধারণত দরিদ্র দেশগুলোর বিপদে ধনী দেশগুলো এগিয়ে আসে। কিন্তু করোনাভাইরাসের আক্রমণে ধনী দেশগুলোর অবস্থাও নাজুক। ইতোমধ্যে চীনসহ ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকায় অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়ে গেছে।  

প্রথম দিকে মনে করতাম, করোনাভাইরাস ধনী গরিব বিচার করে না। সকলের জন্য সমান বিপদ। কিন্তু আস্তে আস্তে বিষয়টি পরিষ্কার হচ্ছে—ধনী মানুষ মারা গেলে খবরের শিরোনাম হয়, গরিবরা শুধু সংখ্যা। প্রকৃতপক্ষে, গরিব মানুষই বেশি আক্রান্ত এবং মারা যাচ্ছে। ধনী দেশগুলোতেও অপেক্ষাকৃত দরিদ্ররাই মারা গেছে বেশি। তবে বয়স্ক মানুষের জন্য এই ভাইরাস একটা সাক্ষাৎ আজরাইল। কারণ বয়স্কদের এমনিতেই বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ থাকে। তাই করোনার হাত থেকে তারা নিস্তার পায় কম।   

অন্যদিকে এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশের দরিদ্র মানুষের পক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশ অনুযায়ী সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব। কারণ তাদের বাসস্থান, যানবাহন উক্ত নির্দেশ মানার উপযোগী নয়। তারা একটি মাত্র ঘরে/রুমে অনেকে বসবাস করে। তাদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি নেই, স্যানিটেশন ব্যবস্থা মানসম্মত নয়। যুক্তরাজ্যের মাথাপিছু স্বাস্থ্য বাজেট যেখানে বছরে চার হাজার ডলার, সেখানে আফ্রিকা মহাদেশে মাত্র ১২ ডলার। এই হতদরিদ্র মানুষদের বাঁচিয়ে রাখবে কে? কোনোরকম আশ্বাস-বিশ্বাস এখনও কি কেউ তাদের দিয়েছে?  

সমগ্র পৃথিবীর রাজনীতিতে করোনাভাইরাস নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড ব্যতীত পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের সরকার জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। সুতরাং এই মহা দুর্যোগে সঠিক নেতৃত্বের অভাবে শুধু মানুষই মারা যাবে না, অনেক ডাকসাইটে রাজনীতিবিদের ক্যারিয়ারও শেষ হয়ে যাবে। রাজনীতিবিদদের মধ্যে দলের প্রধান থেকে শুরু করে এমপি, মন্ত্রী, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র, এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার, চেয়ারম্যানও আছেন।   

অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড না হয় ধনী দেশ, লোকসংখ্যা কম। তাই ম্যানেজ করা গেছে। অন্যদের জন্য এই দুর্যোগ মোকাবিলার উপায় কী? দক্ষিণ আফ্রিকা সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোর সহায়তায় একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্য সাহায্য এবং অন্যান্য জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য ‘সলিডারিটি ফান্ড’ গঠন করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রাম্ফোসা’র এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে প্রশংসনীয় হয়েছে।

কিন্তু সেটাও কি যথেষ্ট? না, গ্লোবাল পারস্পেক্টিভে যথেষ্ট নয়। তাই কেউ কেউ হয়তো বলবেন, দাতা দেশ এবং সংস্থাগুলোর সাহায্য ব্যতীত কোনও উপায় নেই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বের হয়ে গেছে। চাঁদা দেবে না। তার মানে কী? বিশ্বব্যাপী দরিদ্র দেশগুলোতে বিনামূল্যে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে এবং এইচআইভি, এইডস, শিশু মৃত্যু, মাতৃ মৃত্যু, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, কলেরার মতো রোগ-ব্যাধির ক্ষেত্রে এটেনশন কমে যাবে। আর যেহেতু দাতা দেশগুলো নিজেরাই মন্দায় পড়ে গেছে, আগামী পাঁচ-সাত বছরের আগে তাদের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। সুতরাং আমাদের জন্য বিপদ প্রকট থেকে প্রকটতর হতে পারে।   

বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশগুলো কী কী অসুবিধায় পড়তে পারে? তার একটি ক্রমবর্ধমান সম্ভাব্য তালিকা—(১) বৈদেশিক সাহায্য হ্রাস পেতে পারে (২) বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধে অসামর্থ্য হতে পারে (৩) মুদ্রার অবমূল্যায়ন হতে পারে (৪) বৈদেশিক বিনিয়োগ কমে যেতে পারে (৫) রফতানি বাণিজ্য হ্রাস পেতে পারে এবং (৬) রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে।

সুতরাং বুঝতেই পারছেন, অবস্থা কোন দিকে যাচ্ছে। বর্তমানে স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণে ‘অতিমারি জরুরি অবস্থা’ চলছে, ভবিষ্যতে ‘অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা’ জারি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ রাজকোষ খালি হয়ে গেলে, কোথাও প্রাচুর্য থাকে না। সুতরাং একাধিক মহাদেশের দরিদ্র দেশগুলোতে দুর্ভিক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট। তাহলে উপায়? উপায় অবশ্যই আছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর মার্শাল প্ল্যানের মতো একটি গ্লোবাল প্ল্যান দরকার। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে তাদের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের জন্য ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ নিয়ে কাজ করছে। উক্ত পরিকল্পনাটি শুধুমাত্র ইউরোপ-আমেরিকার নিজেদের জন্য। কিন্তু এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে অন্যদের বাদ দিয়ে শুধু কি নিজেরা ভালো থাকা যায়? গরিব দেশগুলোকে কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ (২.৬৬ ট্রিলিয়ন ডলার) বৈদেশিক সাহায্য দিতে হবে। আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোর ৪৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ মওকুফের প্রস্তাবনা থাকা উচিত ছিল। বাংলাদেশ তার বৈদেশিক ঋণ (৩৭.৮০ বিলিয়ন ডলার) মওকুফ, আংশিক মওকুফ কিংবা পাঁচ বছরের জন্য কিস্তি প্রদান থেকে অব্যাহতি পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে, যা আল্টিমেটলি ইউরোপ এবং আমেরিকার অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করবে।

এছাড়া সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় কমিউনিটি অ্যাপ্রোচের কথা ভাবা যেতে পারে। কমিউনিটি অ্যাপ্রোচের কথা ভাবার আগে,  সামাজিক সংহতি পুনরুদ্ধার করতে হবে। কারণ সামাজিক দূরত্বের কুফল সামাজিক সংহতি ভেঙে পড়েছে। সামাজিক সংহতি, সম্প্রীতি ব্যতীত কমিউনিটি অ্যাপ্রোচ কাজ করবে না। বাংলাদেশে তিন কোটি ৪০ লাখ পরিবার/খানা আছে। এদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ পরিবার চরম সংকটে পড়বে। একটি পরিবার (অপেক্ষাকৃত ধনী পরিবারগুলো) যদি একটি করে দরিদ্র পরিবারের দায়িত্ব নেয়, তাহলে আমাদের দেশে দুর্ভিক্ষ হবে না। বাংলাদেশে অসংখ্য এনজিও আছে, তারা মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে আগামী ছয় মাস তাদের সদস্যদের ঋণ হিসেবে দিতে পারে। তাহলেও দরিদ্ররা এ যাত্রায় বেঁচে যাবে। প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। তারা চাকরি হারাবেন না, নিয়মিত বেতন পাবেন। এক কোটি প্রবাসী আছেন, তারা চাইলে মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীদের মধ্যে একটি পরিবারকে দিতেই পারেন। বাংলাদেশে বিভিন্ন পেশাজীবী, ব্যবসায়ী কোটিপতির সংখ্যাও অনেক। সুতরাং সামাজিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেও এই মহাসংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।    

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক হেলথ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।   

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ