করোনা টেস্টে হয়রানির ঈদ!

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৫:৩৩, জুলাই ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৬, জুলাই ২৯, ২০২০

প্রভাষ আমিনবহুল সমালোচিত এবং বিতর্কিত সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের মেয়ে ঐশী খান লন্ডন যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যেতে পারেননি। যেতে পারেননি করোনা জটিলতায়। ঐশী খান বিমানবন্দর থেকে ফিরে আসার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল শুরু হয়েছে। টার্গেট অবশ্য ঐশী খান নন, তার বাবা শাজাহান খান। সবচেয়ে ভালো ট্রল হলো ‘বাপকা বেটি’। অনেকেই বলছেন, বাপ যেমন গরু-ছাগল চেনা মানুষকেই ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার পক্ষে, মেয়েও তেমন ভুয়া করোনা সার্টিফিকেট নিয়ে বিদেশ যাওয়ার পক্ষে। কিন্তু পরে জানলাম, ব্যাপার তা নয়। সরকারের দেওয়া করোনার নেগেটিভ সনদ নিয়েই তিনি বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর জানতে পারেন, আসলে তিনি করোনা পজিটিভি। ল্যাবের ভুলে আগে নেগেটিভ পেয়েছিলেন। আগে জানতাম, পাপ বাপকেও ছাড়ে না। এখন দেখছি, বাপের পাপ মেয়েকেও ছাড়ে না। নইলে কোনও অন্যায় না করেও ঐশী খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে পরিমাণ হেনস্তার শিকার হলেন, তা রীতিমতো অন্যায়। তিনি যদি বিমানবন্দরের নিয়ম না মানতেন, জোর করে বিমানে উঠতে চাইতেন বা উঠতেন; তাহলে আমিও সমালোচনার ঝড় তুলতাম। কিন্তু শাজাহান খান খারাপ, তাই বলে তার সবকিছু খারাপ বা তার চৌদ্দগোষ্ঠীর সবাই খারাপ; এমন ভাবনা এক ধরনের অন্ধত্বের লক্ষণ। সরকারি সংস্থাই ঐশী খানকে নেগেটিভ সার্টিফিকেট দিয়েছে। কিন্তু ওয়েবসাইটে তুলেছে পজিটিভ এবং আসলে তিনি পজিটিভ। শাজাহান খান স্বাস্থ্য অধিদফতরে অভিযোগ করেছেন এবং ব্যাপারটি তাদের ভুলের কারণে হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন সরকারের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের (এনআইএলএমআরসি) পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল খায়ের মো. শামসুজ্জামান। বিষয়টি তদন্তের জন্য তিন সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়েছে। ব্যক্তিটি শাজাহান খানের মেয়ে ঐশী খান বলেই অভিযোগ, স্বীকারোক্তি, তদন্ত পর্যন্ত গেছে; সাধারণ মানুষ হলে তো পাত্তাই পেতো না। ভুলে যান ব্যক্তিটি ঐশী খান। এখন অনুরাগ-বিরাগের ঊর্ধ্বে উঠে বিবেচনা করে দেখুন সরকারি রেফারেল সেন্টারের ভুলের কারণে তার কী কী ক্ষতি হয়েছে। সামাজিক হেনস্তার ক্ষতিকে তো বাংলাদেশে আমলেই নেওয়া হয় না। তাই অন্যগুলোই বিবেচনায় নিতে হবে।

নেগেটিভ সার্টিফিকেট পাওয়ায় তিনি নিশ্চয়ই বিমাবন্দরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে নিশ্চিন্তে মিশেছেন এবং বিদায় নিয়েছেন। বিমানবন্দরে গিয়েছেন বাবার সঙ্গে, বাবার গাড়িতে। তার মানে তিনি কতজনকে সংক্রমিত করেছেন, তার কোনও ইয়ত্তা নেই। শাজাহান খান প্রতিদিন পরিবহন থেকে টাকা পান; তার মেয়ের লন্ডন যাওয়া আর আমাদের মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিল যাওয়া সমান। তাই আর্থিক ক্ষতি বাদই দিলাম। কিন্তু যেখানে যাওয়ার কথা ছিল, নির্ধারিত সময়ে সেখানে যেতে না পারার ক্ষতি কী দিয়ে পোষাবেন? শাজাহান খান জানিয়েছেন, তার আরেক মেয়েরও ল্যাবএইড ও বিএসএমএমইউতে করোনা টেস্টে দুইরকম রিপোর্ট এসেছে।
আমাদের দেশে সরকারি এসব খামখেয়ালি বা অনিয়ম বা অদক্ষতার কোনও বিচার হয় না। ক্ষতিপূরণ পাওয়া তো দূরের কথা, চাওয়ার সংস্কৃতিই গড়ে ওঠেনি। নইলে শাজাহান খানের দুই মেয়ে যদি আদালতে ক্ষতিপূরণ মামলা করতেন, তাহলে অবশ্যই জিততেন। তবে করোনা টেস্টের নামে বাংলাদেশে যা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত সবাই আদালতে গেলে ক্ষতিপূরণ দিতেই সরকার ফতুর হয়ে যাবে।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার দুবাই যাওয়ার কথা ছিল গত শনিবার সন্ধ্যায়। শুক্রবার তিনি করোনা টেস্ট করতে দেন। তার রিপোর্ট দেওয়ার কথা ছিল শনিবার দুপুর ২টা থেকে ৫টার মধ্যে। কিন্তু তিনি রিপোর্ট পাননি। তাকে বলা হয়, রিপোর্ট ওয়েবসাইটে আপডেট হবে। তিনি মহাখালীতে একজনকে বসিয়ে রেখে নিজে এয়ারপোর্ট চলে যান, যাতে হার্ড কপি, সফট কপি যাই পান শেষ মুহূর্তে অন্তত ফ্লাই করতে পারেন। কিন্তু বিমান উড়ে যায়, রিপোর্ট আর আসে না। পরদিন রবিবার তিনি রিপোর্ট পেয়েছেন। কিন্তু তাতে শুরু হয়েছে নতুন জটিলতা। তার রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। অথচ মাস তিনেক আগেই তিনি করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন। এত অল্প সময়ে আবার পজিটিভ হয়ে তিনি ভয় পেয়ে যান। তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে আবার টেস্ট করান। তাতে নেগেটিভ আসে। কিন্তু এভারকেয়ার হাসপাতালের রিপোর্ট তো বিমাবন্দরে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই বিদেশে যেতে হলে আবারও তাকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা দিয়ে ভোগান্তি কিনতে হবে। তার ধারণা, নির্ধারিত সময়ে রিপোর্ট দিতে না পারার ব্যর্থতা ঢাকতে তার নেগেটিভকে পজিটিভ বানানো হয়েছে। চড়া দামে কেনা বিমানের টিকেটের অর্থ তো গচ্চা যাবেই, তবে নির্ধারিত সময়ে দুবাই যেতে না পারায় তার যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়।
ওপরে যে দুটি উদাহরণ দিলাম, দুজনই সচ্ছল। বিমান টিকিটের টাকার গচ্চা তাদের গায়েই লাগবে না। কিন্তু চট্টগ্রামের নাজিমউদ্দিনের মতো অনেক প্রবাসী শ্রমিকই সরকারের খামখেয়ালির কারণে ফ্লাইট মিস করেছেন। আর এই মিস তাদের কারও কারও জন্য সারাজীবনের কান্না হয়ে যেতে পারে। কারও ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাবে, কেউ সময়মতো যোগ দিতে না পারায় চাকরি হারাবেন। আর এই শ্রমিক ভাইয়েরা কিছুটা কমে অফেরতযোগ্য টিকিট কেনেন। ফ্লাইট মিস করলে যার পুরো টাকাটাই জলে যাবে। যেতে হলে তাদের আবার টিকিট কিনতে হবে এবং সাড়ে ৩ হাজার টাকায় হয়রানি কিনতে হবে। যে শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এই করোনাকালেও রেকর্ড স্পর্শ করে, তাদের আমরা সময়মতো ফ্লাইট ধরাটা নিশ্চিত করতে পারি না। কী দুর্ভাগা জাতি আমরা। এরপর কেউ বাংলাদেশের সিস্টেমকে গালি দিলে আমরা তার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলবো।
করোনা মোকাবিলা, নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা হয়েছে। তবে করোনা টেস্ট নিয়ে বাংলাদেশে যা হয়েছে, তা রীতিমতো অপরাধ, শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দেশি-বিদেশি সব বিশেষজ্ঞরাই যখন বেশি বেশি টেস্ট করার পরামর্শ দিচ্ছিল, তখন বাংলাদেশ কম কম টেস্ট করে করোনা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। নানাভাবে সরকার মানুষকে করোনা টেস্টের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করেছে। লম্বা ইন্টারভিউ দিয়ে করোনা টেস্টের জন্য যোগ্য হতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত করোনা টেস্টের জন্য সরকারি ফি ধার্য করেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
শুরু থেকেই বাংলাদেশে করোনা টেস্ট মানেই হয়রানি, দুর্ভোগ আর ভোগান্তির দীর্ঘ করুণ ইতিহাস। সিরিয়াল পেতে ৫ দিন, রিপোর্ট পেতে ১৫ দিন, রিপোর্ট পাওয়ার আগেই মরে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে এই বাংলাদেশে।
তবে এখন যা হচ্ছে, তা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। আর বিষয়টি নিছক ভাবমূর্তিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা, রেমিট্যান্সের প্রশ্নও জড়িত। করোনা টেস্ট এখন আর শুধু স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়। এর অনেকরকম প্রয়োজনীয়তা আছে। অনেক অফিসে চাকরিতে যোগ দিতে গেলেই করোনার নেগেটিভ সার্টিফিকেট লাগে। আবার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে করোনা পজিটিভ সার্টিফিকেটের দাম ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা। করোনা সার্টিফিকেটের যখন এত দাম, এত গুরুত্ব; তখন এটা নিয়ে বাণিজ্য না করে কি আর ছাড়ে। হঠাৎ গজিয়ে উঠলো কিছু প্রতারক চক্র। তারা ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে আপনার চাহিদামতো করোনা সার্টিফিকেট সরবরাহ করবে। এমন একাধিক চক্রকে পুলিশ ধরেছেও। তবে এই চক্রগুলো নিছকই ছ্যাঁচড়া প্রতারক। এগুলোর তেমন গুরুতর প্রভাব নেই। কিন্তু বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ধরে টান দিয়েছে রিজেন্ট, জেকেজি, সাহাবউদ্দিন মেডিক্যাল। সরকারের অনুমতি নিয়ে যারা দিনের পর দিন ভুয়া করোনা সার্টিফিকেট বিলি করেছে। এদের প্রতারণা শুধু কিছু ব্যক্তির করোনা হওয়া না হওয়ার বিষয় নয়। তারা বাংলাদেশের করোনা টেস্টের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। করোনা সার্টিফিকেট এখন প্রবাসী বাংলাদেশিদের লাইফ লাইন। নেগেটিভ সার্টিফিকেট না থাকলে আপনি ফ্লাই করতে পারবেন না। অথচ ফ্লাই করতে করোনা সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও নেই। নিজেদের কারও কারও দুর্নীতির কারণে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। তাই ইতালি থেকে আমাদের ফ্লাইট ফিরিয়ে দেয়, অনেক দেশ আমাদের ভিসা দেয় না। দায় তো আমাদের।
বাংলাদেশ সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে করোনা টেস্ট করতে টাকা লাগে। সাধারণ মানুষের জন্য ২০০ টাকা, অসাধারণ প্রবাসীদের জন্য সাড়ে ৩ হাজার। টাকা নেন আপত্তি নেই। কিন্তু সময়মতো সঠিক রিপোর্ট তো দিতে হবে। প্রবাসীদের টেস্ট করার সময় পাসপোর্ট ও বিমানের টিকিটের কপি জমা দিতে হয়। তাই সংশ্লিষ্টরা জানেন কাকে কখন রিপোর্ট দিতে হবে। তাও কেন অনেক মানুষকে ফ্লাইট মিস করতে হয়। কেন পদে পদে তাদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়, অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়? এই প্রশ্নের জবাব কে দেবে? ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ১৬টি কেন্দ্রে প্রবাসীদের করোনা স্যাম্পল নেওয়া হয়। সামনে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। ঈদ আমাদের কাছে বড় উৎসব। আমরা বড় কিছু হলে বলি, ঈদ লাগছে। প্রবাসীদের করোনা টেস্ট নিয়ে যা হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে হয়রানির ঈদ লেগেছে। আল্লাহর দোহাই লাগে প্রবাসীদের এই হয়রানি থেকে মুক্তি দিন।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 
/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ