স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাননি গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার আবদুল হামিদ প্রামাণিক ও মফছার আলী। বারবার আবেদন করলেও স্বীকৃতি না মেলায় সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত তাদের পরিবার। তাই বেঁচে থাকার সংগ্রামে দু’বেলা খাবার জোটাতে মানুষের দ্বারে দ্বারে যেতে হয় মফছার আলীকে। আর বয়সের ভারে নানা রোগে আক্রান্ত ও চোখের দৃষ্টি হারিয়ে বিনা চিকিৎসায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন আবদুল হামিদ প্রামাণিক।
আবদুল হামিদ প্রামাণিক সাদুল্যাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের জয়েনপুর গ্রামের বাসিন্দা। সাদুল্যাপুরবাসীর কাছে তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবদুল হামিদ প্রামাণিক জানান, ছাত্রজীবন থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। ১৯৭১ এ সুবেদার আলতাব হোসেনের নেতৃত্বে প্রশিক্ষণ শেষে রংপুরের মাদারগঞ্জ ও আংরার ব্রিজসহ বেশ কিছু এলাকায় সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদানের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তখন তাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র দেয়।
আবদুল হামিদ আক্ষেপ করে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সনদপত্র থাকার পরেও বিভিন্ন সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করি, কিন্তু আজও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি হয়নি। এছাড়া গত বছরে অনলাইনে আবেদন করার পর উপজেলা যাচাইবাছাই কমিটি আমার আবেদন বাতিল করে। পরে সুবিচার প্রার্থনায় মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে আপিল করি।’
তিনি জানান, সংসারে চার ছেলে, চার মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে ১০ সদস্যের পরিবার চলে সামান্য চাষাবাদের ওপর। বর্তমানে বার্ধক্যের ভারে শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ। শারীরিক অসুস্থতার কারণে গত ৭ বছর আগে হঠাৎ করে চোখের আলোও হারিয়েছেন। অর্থের অভাবে মিলছে না চিকিৎসাও। এখন অন্যের সাহায্য ছাড়া হাঁটাচলাও করতে পারেন না। তবে শেষ জীবনে এসেও আবদুল হামিদের একটাই চাওয়া মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি।
অন্যদিকে, একই ইউনিয়নের ইসবপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মফছার আলীও পাননি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি। তিনি জানান, ৭১ এ নিজের জীবনবাজি রেখে যুদ্ধে যান তিনি। ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে ‘থ্রি নট থ্রি’ রাইফেল চালানো ও গেরিলাযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন মফছার আলী। কমান্ডার এম হামিদুল্লাহ খান ও কোম্পানি কমান্ডার হাবিলদার কাওছার ও আবুল কাশেশের নেতৃত্বে কুড়িগ্রামের রৌমারী, চিলমারী ও নাগেশ্বরী এলাকায় সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৭ বছরে কয়েকবার স্বীকৃতির জন্য আবেদন করলেও তার নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অর্ন্তভুক্ত হয়নি।
তিনি আরও জানান, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে তার সংসার। দুই ছেলে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় রিকশা চালান। দুই মেয়ের বিয়ে হওয়ায় তারা স্বামীর বাড়িতে থাকে। কর্মহীন মফছার আলীর দিনরাত কাটে ছোট টিনের ঘরে। দু’বেলা খাবার যোগান মানুষের কাছে হাত পেতে।
সাদুল্যাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রশীদ আজমী বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধে এই দুই মুক্তিযোদ্ধার সক্রিয় অবদান ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতির জন্য তাদের আবেদনপত্রে সুপারিশও করছিলাম। কিন্তু তারা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি।’ তাদের স্বীকৃতি দিতে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রাণালয় ও সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি।
সাদুল্যাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রহিমা খাতুন বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনায় যাচাইবাছাই কমিটির তালিকায় কেউ বাদ পড়লে তাদের আপিলের সুযোগ রয়েছে। আর সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে নির্দশনা পেলে তাদের সহযোগিতা করা সম্ভব।’
আরও পড়ুন-
‘সেই নির্যাতন-হত্যার চিত্র এখনো মনে আছে তাদের’
সারাদেশে পালিত হচ্ছে ৪৮তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস
স্বাধীনতা দিবসে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলের দাবি
‘যুদ্ধদিনের স্মৃতিকাতরতায় কাটে প্রতিটি স্বাধীনতা দিবস’
এখনও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি গাইবান্ধার আবদুল হামিদ-মফছার আলী
মাকে মিথ্যা বলে প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে গিয়েছিলেন গেরিলাযোদ্ধা বিমল পাল
দ্বিচক্র যানে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন (ফটো স্টোরি)
যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা
রাজারবাগে অস্ত্রাগার খুলে দিয়েছিলেন আবু শামা
‘আমরা যেখানে রেখে যাবো, তোমরা সেখান থেকে দেশকে আরও উন্নতির পথে নিয়ে যাবে’








