ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো, আলো ধরে রাখা নিয়ে দুশ্চিন্তা

সালেহ টিটু, বরিশাল
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৯:২৮আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৯:২৮

দরিদ্র পরিবারে জন্ম। যেখানে তিন বেলা ঠিকমতো খাবার জোটাতে কষ্ট, সেখানে লেখাপড়ার খরচ চালানো ছিল একপ্রকার চ্যালেঞ্জ। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর নিরন্তর সংগ্রাম, এই চ্যালেঞ্জ জয়ের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এখন বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, স্বপ্ন দেখাচ্ছে পরিবারকে। দারিদ্র্য জয় করা এই তরুণের নাম রমজান খান সাব্বির। এ বছর মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ৪৭৪১তম হয়ে পটুয়াখালী মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। এমন খুশির মধ্যে ভর্তিসহ পড়াশোনার পরবর্তী খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় তার পরিবার।

সাব্বির ২০২১ সালে উজিরপুর উপজেলার হস্তিশুন্ড মোড়াকাঠি ইনস্টিটিউশন থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ এবং ২০২৩ সালে গৌরনদী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। তিনি উজিরপুর উপজেলার শোলক ইউনিয়নের দামোদরকাঠি গ্রামের ফিরোজ খান ও শাহিদা বেগমের বড় ছেলে। এই দম্পতির আরেক সন্তান উর্মি খানম দশম শ্রেণিতে পড়ে। তারও স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়ার।

ভাঙাচোরা টিনের ঘরে এই পরিবারের বসবাস

দুই শতক জায়গায় ভাঙাচোরা টিনের ঘরে এই পরিবারের বসবাস। পড়ার টেবিল থাকলে চেয়ার নেই। চৌকিতে বসে পড়তে হয়। ঘরের দরজা থাকলেও জানালা নেই। কোনও রকমে টিনের বেড়া দেওয়া। দামোদরকাঠি গ্রামের বাসিন্দা মো. বুলবুল হোসেন এবং আনোয়ারা বেগম জানিয়েছেন, সাব্বির হলো ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো। ভাঙাচোরা টিনের ঘরে কোনোমতে তাদের বসবাস। ঝড়বৃষ্টি হলে যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে ঘরটি। ঝড়বৃষ্টিতে ভিজে দিন কাটাতে হয়। তবে ছেলেমেয়ে খুবই মেধাবী। লেখাপড়া ছাড়া কিছুই বোঝে না। গ্রামের অন্যান্য ছেলেমেয়ে খেলাধুলা করলেও তাদের কখনও মাঠে দেখা যায় না।

পরিবারে অভাব-অনটনের কথা উল্লেখ করে ফিরোজ খান বলেন, ‘গ্রামে গ্রামে ফেরি করে গামছা বিক্রি করে দিনে ৩০০-৩৫০ টাকা আয় হয়। ওই আয় দিয়ে চলে চার সদস্যের সংসার। ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করে। তাদের পড়াশোনাসহ সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তবু দুঃখ-কষ্টে স্কুল, হাইস্কুল এবং কলেজে ভর্তি করেছি। ধারদেনা ও অনেকের সহায়তায় এতদূর চালিয়ে এনেছি। অনেক সময় পরীক্ষার ফি পর্যন্ত দেওয়া সম্ভব হয়নি। তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সহযোগিতা পেয়েছে সাব্বির। এখন মেডিক্যালে চান্স পাওয়ায় খুশি হয়েছি। কিন্তু তার ভর্তিসহ পড়াশোনার পরবর্তী খরচ নিয়ে আমি ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছি।’

মা শাহিদা বেগম বলেন, ‘মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার দিন ছেলেকে কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের হাতে কোনও টাকা ছিল না। প্রতিবেশীদের কাছে ধার চেয়েও পাইনি। পরে একটি গাছ বিক্রি করে দিই। ওই টাকা দিয়ে ছেলেকে নিয়ে বরিশালের কেন্দ্রে যাই। পরীক্ষা শেষে সাব্বির বলেছিল, মা আমি চান্স পাবো। সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। ছেলের কথাই সত্যি হলো। অনেক বেশি খুশি হয়েছি। তবে তার মেডিক্যালে ভর্তি নিয়ে চিন্তিত আমরা। আগের মতো সবাই সহায়তা করলে ছেলের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নপূরণ হবে।’

ঘরের দরজায় বাবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন রমজান খান সাব্বির

শুরু থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া আমার জন্য ছিল বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে রমজান খান সাব্বির বলেন, ‘প্রতিদিন দুই মাইল হেঁটে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের শানুহার এলাকায় পৌঁছে বাসে গৌরনদী কলেজে যেতাম। কলেজে পড়া অবস্থায় শুধু একদিন টিফিন করার সুযোগ পেয়েছি। কারণ বাসা থেকে যে টাকা দেওয়া হতো, তা দিয়ে বাস ভাড়া দিতাম। টিফিন করা সম্ভব হতো না। লক্ষ্য ছিল মেডিক্যালে চান্স পেতে হবে। এজন্য অনলাইনে মেডিক্যাল ভর্তির শিট পড়েছি। কারণ অফলাইনে কোচিং করার অর্থ ছিল না। বাবা ফেরি করে সংসার চালাতে হিমশিম খান। সেখানে কোচিং খরচ চাওয়া বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। তবে বাবা-মা অনেক কষ্ট করে আমাকে পড়াচ্ছেন। অনেকে সহায়তা করেছেন। এবার যদি বিত্তবান কেউ আমার মেডিক্যাল ভর্তিতে সহায়তা করেন কিংবা পাশে দাঁড়ান, তাহলে চিকিৎসক হতে পারবো। মানবিক চিকিৎসক হতে চাই। চিকিৎসক হতে পারলে হতদরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবা করবো। আমি যে সমস্যায় ভুগছি, একই সমস্যায় ভুগছে দেশের অনেক পরিবারের সন্তান। চিকিৎসক হয়ে তাদের পাশে দাঁড়াবো।’

সাব্বিরের বোন উর্মি খানম বলেন, ‘মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আমাকে একটি ট্যাব দেওয়া হয়। ওই ট্যাব-ই ভাইকে অনলাইনে মেডিক্যালে ভর্তির শিট পড়তে সহায়তা করেছে। ফেসবুক-ইউটিউব থেকে ফ্রি শিট পড়ে পরীক্ষায় অংশ নেয়। এতে সফল হয়েছে। আমি অনেক আনন্দিত।’

/এএম/
সম্পর্কিত
খুলনা মেডিক্যালে আগুন: সরিয়ে নেওয়ার সময় আইসিইউয়ের রোগীর মৃত্যু
খুলনা মেডিক্যালে হাম ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীর ৯০ শতাংশই টিকা নেয়নি
শিক্ষার্থীকে গুলি: মেডিক্যাল কলেজের প্রভাষকের ২১ বছরের কারাদণ্ড
সর্বশেষ খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
জনআস্থা ও জবাবদিহিমূলক সংসদ গঠনে সাংবিধানিক জ্ঞান জরুরি: ডেপুটি স্পিকার
জনআস্থা ও জবাবদিহিমূলক সংসদ গঠনে সাংবিধানিক জ্ঞান জরুরি: ডেপুটি স্পিকার
প্রতিনিধি পরিষদের ইরান যুদ্ধ-বিরোধী ভোটের প্রতিক্রিয়ায় মুখ খুললেন ট্রাম্প
প্রতিনিধি পরিষদের ইরান যুদ্ধ-বিরোধী ভোটের প্রতিক্রিয়ায় মুখ খুললেন ট্রাম্প
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী