X
বুধবার, ২৪ জুলাই ২০২৪
৯ শ্রাবণ ১৪৩১
বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণ

মালিকপক্ষের অবহেলা পেয়েছে ৬ সংস্থা, কিছুই পায়নি ডিবি

নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম
০৫ মে ২০২৩, ২৩:০০আপডেট : ০৫ মে ২০২৩, ২৩:০০

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ৫১ জন নিহত ও দুই শতাধিক আহতের ঘটনায় পুলিশের করা মামলা তদন্তে কারও দায় পায়নি জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মঙ্গলবার (৩ মে) বিকালে চট্টগ্রাম আদালতে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির ইন্সপেক্টর মোস্তাক আহমেদ চৌধুরী।

তবে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই দুর্ঘটনার পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিস, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ও বিস্ফোরক অধিদফতরের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে মালিকপক্ষের অবহেলার বিষয়টি উঠে এসেছিল। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল ডিপো ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি রয়েছে। ছিল না প্রশিক্ষিত জনবল। নিয়ম না মেনে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড রাখা হয় ডিপোতে।

এসব প্রতিবেদন আমলে নেয়নি মামলার তদন্ত সংস্থা। তদন্ত সংশ্লিষ্ট (ডিবি) কর্মকর্তাদের দাবি, অন্যান্য তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কী ছিল তা জানতেন না। ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদনের জন্য লিখিতভাবে আবেদন করলেও তা পাওয়া যায়নি। ফলে নিজেদের মতো তদন্ত শেষ করেছে ডিবি। গুরুত্বপূর্ণ এই মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ‘কারও দায় না থাকায়’ বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। মামলাটি অন্য কোনও সংস্থাকে দিয়ে অধিকতর তদন্তের দাবি উঠেছে।

জানা গেছে, ডিপোতে বিস্ফোরণের এক মাস পর ২০২২ সালের ৬ জুলাই চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশে করা কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল। ওই কমিটির প্রধান অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মিজানুর রহমান প্রতিবেদনটি জমা দেন। ১৯ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে ২০টি সুপারিশ করা হয়।

সেদিন মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমরা দুর্ঘটনাস্থলে সরেজমিন গেছি এবং কারা দায়ী তা নির্ধারণের চেষ্টা করেছি। প্রতিবেদনে এ দুর্ঘটনার কারণ, দায়-দায়িত্ব নিরূপণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে সুপারিশ করা হয়েছে। বিস্ফোরণের উৎস ছিল হাইড্রোজেন পার অক্সাইড। ডিপোর মূল মালিক স্মার্ট গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আল রাজী কেমিক্যাল কমপ্লেক্স থেকে এসব রাসায়নিক বিদেশে রফতানির জন্য সেখানে রাখা হয়েছিল। দুর্ঘটনার দায় ডিপো কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারেন না। এ ছাড়া তদারকি দফতরগুলোও দায়ী।’

এ প্রসঙ্গে শুক্রবার (৫ মে) কথা হয় ওই তদন্ত কমিটির সদস্য চট্টগ্রাম বিস্ফোরক পরিদর্শক মো. তোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেদনে তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে কীভাবে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ভবিষ্যতে যাতে এমন দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়।’

চট্টগ্রাম বন্দর টার্মিনাল ম্যানেজার কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি ঘটনার এক মাস পর ২৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। তাতে বলা হয়েছে, ‘পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব, অগ্নিনিরাপত্তার জন্য ফায়ার হাইড্রেন্ট না থাকা ও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। সেখানে কেমিক্যালসহ বিপজ্জনক পণ্য এবং পোশাকসহ অন্যান্য রফতানি পণ্যের কনটেইনার একসঙ্গে রাখা হতো। বিপজ্জনক পণ্য আলাদা রাখলে এত মানুষ হতাহত হতো না। একইসঙ্গে ধোঁয়ার সূত্রপাত সরিয়ে নিতে পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেত না’।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘ডিপো মালিকের আরেকটি প্রতিষ্ঠান আল রাজী কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে তৈরি হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের ৩৭টি কনটেইনার সেখানে রাখা ছিল। বিস্ফোরণের পরও ১২টি কনটেইনার অক্ষত ছিল। এসব পণ্যের রফতানি নিয়ে জটিলতা ছিল। দুর্ঘটনার আগেই ২ জুন এসব কনটেইনার ডিপো থেকে কারখানায় নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেটি তারা করেনি।’

জেলা প্রশাসক গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক বদিউল আলম। প্রায় একমাস পর এ কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছিল। কমিটির সদস্য চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের তৎকালীন সহকারী পরিচালক ফারুক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডিপোতে বিস্ফোরণের ঘটনা হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের কনটেইনার থেকে ঘটেছে। সেটি আমরা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছি। ডিপো পরিচালনার ত্রুটিগুলোও তুলে ধরা হয়। এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে জন্য বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছিল। সেখানেও দুর্ঘটনার কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনেও বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়।’

ফায়ার সার্ভিসের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ডিবির তদন্তে কী উঠে এসেছে, তা আমাদের বিষয় নয়। আমরা তদন্তে যা পেয়েছি তা তুলে ধরে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।’

জেলা পুলিশ সুপার এস এস শফিউল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলার তদন্তে কারও কোনও অবহেলা কিংবা নাশকতার সূত্র পাওয়া যায়নি। এটা নিছক একটি দুর্ঘটনা। এ কারণে মামলা থেকে ডিপোর আট কর্মকর্তাকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।’

চট্টগ্রাম ডিবি প্রধান নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘এই ডিপোতে নাশকতা কিংবা অবহেলার কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তদন্তে পাওয়া যায়নি। দুর্ঘটনাজনিত কারণে বিস্ফোরণ হয়েছে। মালিক কিংবা অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর অবহেলাও পাওয়া যায়নি।’

অন্যান্য সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নেওয়া হয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নে ডিবির এই কর্মকর্তা দাবি করেন, ‘কোনও সংস্থা আমাদের তদন্ত প্রতিবেদন দেয়নি। এমনকি ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদন পেতে অফিসিয়ালি চিঠি দিয়েছি, কিন্তু সাড়া দেয়নি। এ কারণে সংস্থাগুলোর তদন্তে কী ছিল জানতে পারিনি। আমরা আমাদের মতো করে তদন্ত করেছি। একটি কনটেইনার বিস্ফোরিত হয়েছে এবং সেখান থেকেই ছড়িয়েছে। ধোঁয়া বের হওয়ার তথ্য পেয়ে ফায়ার সার্ভিস আগুন নেভাতে যায়। পানি দেওয়ার পর কনটেইনার বিস্ফোরিত হয়ে হতাহত এবং ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে।’

তবে এই প্রতিবেদন নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেলা ডিবির ইন্সপেক্টর মোস্তাক আহমেদ চৌধুরী।

এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগরের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, ‘যেখানে এত মানুষ মারা গেছে, অনেকে শরীরের অঙ্গ হারিয়েছেন, সেখানে পুলিশ মামলা করেছে মালিকপক্ষকে বাদ দিয়ে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে। তাদের কি সাধ্য আছে মালিকের অবাধ্য হয়ে কাজ করার? অথচ এখানে মালিককে আসামি করা হয়নি। কারণ, তাদের হাত অনেক লম্বা। এখন দেখলাম পুলিশের তদন্তে কিছুই উঠে আসেনি। এ মামলার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আদালতের ওপর। আদালত এই প্রতিবেদনের ওপর নারাজি দিচ্ছেন কিনা সেটি দেখার বিষয়।’

মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) মহাসচিব জিয়া হাবিব বলেন, ‘মামলাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা উচিত ছিল। যেহেতু এ ঘটনায় অনেক কমিটি আগেই দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করেছে, সেসব কমিটির প্রতিবেদন আমলে নেওয়া উচিত ছিল। যেহেতু আদালতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, আদালত চাইলে অন্য সংস্থাকে দিয়ে অধিকতর তদন্ত করাতে পারেন। এটি নির্ভর করছে আদালতের ওপর।’

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ৪ জুন রাতে সীতাকুণ্ডের কদমরসুল এলাকায় বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের পর বিকট শব্দে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরপর টানা ৮৬ ঘণ্টা আগুন জ্বলতে থাকে। একপর্যায়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ওই দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসকর্মী ও ডিপোর শ্রমিকসহ ৫১ জন নিহত হন। আহত হন দুই শতাধিক। এ ঘটনায় ৭ জুন রাতে সীতাকুণ্ড থানার এসআই আশরাফ সিদ্দিকী বাদী হয়ে ডিপোর আট কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম উল্লেখ করে মামলা করেন।

মামলায় মালিকপক্ষকে বাদ দিয়ে আসামি করা হয় ডিপোর মহাব্যবস্থাপক নাজমুল আক্তার খান, উপমহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) নুরুল আক্তার খান, ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) খালেদুর রহমান, সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্বাস উল্লাহ, জ্যেষ্ঠ নির্বাহী (প্রশাসন) নাছির উদ্দিন, সহকারী ব্যবস্থাপক আবদুল আজিজ, শেড ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম ও সহকারী ইনচার্জ নজরুল ইসলামকে।

২০১১ সালে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের দুই কোম্পানির যৌথ বিনিয়োগে বেসরকারি এই ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোটি গড়ে তোলা হয়। এর মালিকানায় আছে বাংলাদেশের স্মার্ট গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ও তার ছোট ভাই মুজিবুর রহমান।

/এফআর/
সম্পর্কিত
ইয়েমেনের কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে বিস্ফোরণ: যুক্তরাজ্য
ইয়েমেনের উপকূলে জাহাজের কাছে বিস্ফোরণ
মেয়ে-নাতির পর চলে গেলেন গ্যাস বিস্ফোরণে দগ্ধ মান্নানও
সর্বশেষ খবর
ডিএমপির ৮ থানার ওসিকে বদলি
ডিএমপির ৮ থানার ওসিকে বদলি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: জনমত জরিপে ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে কমলা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: জনমত জরিপে ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে কমলা
পাঁচ দিন পর খুললো অফিস-আদালত
পাঁচ দিন পর খুললো অফিস-আদালত
টি-টোয়েন্টিতে লঙ্কানদের নতুন অধিনায়ক
টি-টোয়েন্টিতে লঙ্কানদের নতুন অধিনায়ক
সর্বাধিক পঠিত
চাকরিতে কোটা: প্রজ্ঞাপনে যা আছে
চাকরিতে কোটা: প্রজ্ঞাপনে যা আছে
কোটা আন্দোলন: প্রধানমন্ত্রীর বর্ণনায় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র 
কোটা আন্দোলন: প্রধানমন্ত্রীর বর্ণনায় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র 
কারফিউ বা সান্ধ্য আইন কী 
কারফিউ বা সান্ধ্য আইন কী 
ইন্টারনেটে বিঘ্ন ঘটায় বাংলা ট্রিবিউন পাঠকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখপ্রকাশ
ইন্টারনেটে বিঘ্ন ঘটায় বাংলা ট্রিবিউন পাঠকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখপ্রকাশ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: জনমত জরিপে ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে কমলা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: জনমত জরিপে ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে কমলা