চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন বাড়ছে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। তবে রোগী শনাক্তে চট্টগ্রামে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কোনও পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। ফলে সন্দেহজনক রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠাতে হচ্ছে ঢাকার ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে (এনপিএমএল)। এতে রোগ শনাক্তে সময় লাগার পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাতেও তৈরি হচ্ছে জটিলতা।
অথচ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল ইনফেকশাস ডিজিজেসে (বিআইটিআইডি) রয়েছে হাম শনাক্তের সক্ষমতা থাকা পরীক্ষাগার। তারপরও স্থানীয়ভাবে নমুনা পরীক্ষা না হওয়ায় ঢাকানির্ভর হতে হচ্ছে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগকে। চট্টগ্রামে হামে ৭ হাজার ৯৪১ জন আক্রান্ত এবং ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জন উপসর্গ নিয়ে এবং তিন জনের পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৭০ জন হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে মোট ৭ হাজার ৯৪১ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চট্টগ্রামে হামে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জন উপসর্গ নিয়ে এবং তিন জনের পরীক্ষায় হাম শনাক্তের পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৯৬০ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার এনপিএমএল ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে নগরের ১ হাজার ৬৪৫ জন এবং জেলার বাসিন্দা ৩১৫ জন। পাঠানো নমুনার মধ্যে বেশিরভাগ রিপোর্ট চলে এসেছে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে বর্তমানে ল্যাবে হাম রোগ শনাক্ত করা হচ্ছে না। হামের পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। চিকিৎসকরা উপসর্গ দেখলেই হাম কিনা বুঝতে পারেন। তবে সরকারের সিদ্ধান্তে উপসর্গ নিয়ে কেউ চিকিৎসার জন্য এলে তাকে হামের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা পরীক্ষা করাতে চান সেসব রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে ঢাকার ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে (এনপিএমএল) ল্যাবে। সেখান থেকে দুই-তিন দিনের মধ্যে রিপোর্ট চলে আসছে।’
রাউজান উপজেলার বাসিন্দা মো. সাইফুদ্দিন বলেন, ‘আমার তিন মাস বয়সী মেয়ের হাম উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শে গত মাসের শেষের দিকে একটি বেসরকারি ল্যাব থেকে পরীক্ষার নমুনা দেওয়া হয়। তারা নমুনা পাঠায় ঢাকায়। ফি নেওয়া হয় ৪ হাজার ৫০০ টাকা। রিপোর্ট পেতে সময় লেগেছে এক সপ্তাহ।’
তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের শরীরে হামের উপসর্গ থাকলেও চিকিৎসক পুরোপুরি হামের বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারেনি। এ কারণে পরীক্ষার জন্য নমুনা দেওয়া হয়। হামের পরীক্ষা ব্যয়বহুল। চট্টগ্রামে এই পরীক্ষা না থাকায় রিপোর্ট পেতে সময়ও নষ্ট হচ্ছে। এ কারণে রোগীর শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়ে।’
নগরের কোতোয়ালি থানার জামালখান এলাকার বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, ‘দেশের দ্বিতীয় জনবসতিপূর্ণ নগরী চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনেও হামের পরীক্ষা চালু করা যায়নি। অথচ প্রতিদিন ৫০ থেকে ৭০ জন মানুষ হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বাইরেও বিপুল সংখ্যক মানুষ উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন।’
২০১৩ সালে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাম ও রুবেলাসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ব্যবস্থা রয়েছে। এ হাসপাতালে রয়েছে অত্যাধুনিক রিয়েল-টাইম পিসিআর মেশিন এবং অ্যালাইজা মেশিন। এ ছাড়াও যক্ষ্মা শনাক্তে জিন এক্সপার্ট, রক্ত পরীক্ষার জন্য অটোমেটেড অ্যানালাইজার মেশিনসহ বিশ্বমানের রডলফ মেরিয়ো ল্যাবরেটরির সুবিধা এখানে রয়েছে।
বিআইটিআইডির অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রোগীর উপসর্গ দেখেই চিকিৎসকরা হাম শনাক্ত করতে পারেন। কেননা হাম একটি পরিচিত এবং পুরাতন রোগ। হামের প্রধান তিনটি লক্ষণের মধ্যে রয়েছে, বেশি মাত্রায় জ্বর, কাশি এবং শরীরে রেশ থাকবে। সাধারণত হাম রোগীদের র্যাশ মুখ এবং কান দিয়ে শুরু হয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। যে কারণে এসব লক্ষণ দেখা গেলে বোঝা যায় তার শরীরে হাম হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিআইটিআইডি হাসপাতালের ল্যাবে হাম পরীক্ষা সম্ভব। তবে হাম-রুবেলা পরীক্ষার জন্য কিট নেই। কিটের জন্য ঢাকায় চিঠি লেখা হয়েছিল। কিট এবং অনুমোদন পেলে পরীক্ষা শুরু করা যাবে।’









