থানায় অভিযোগ করতে এসে ভিডিও ধারণ, প্রকাশের পর ফোন করে টাকা দাবি

রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি
০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৭ আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৭

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর থানার সামনে কয়েকটি কম্পিউটার দোকানকে ঘিরে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ও অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। একটি দালালচক্র এ অপতৎপরতার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

ভুক্তভোগীদের দাবি, এসব দোকানে অভিযোগ বা মামলা-সংক্রান্ত কাগজপত্র তৈরি করার পরপরই অচেনা নম্বর থেকে তাদের কাছে ফোন আসছে। কেউ পুলিশের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তি, আদালতের মুহুরি, কেউ থানার লোক আবার কেউ সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, এর বিনিময়ে টাকা দাবি করা হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, তারা থানায় অভিযোগ লেখানোর পরপরই বাইরের লোকজন কীভাবে তাদের মোবাইল নম্বর ও অভিযোগের বিষয় জানতে পারছেন। অভিযোগের তথ্য দোকান থেকে বাইরে যাচ্ছে কি না, নাকি এর পেছনে কোনও সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিযোগ রয়েছে, কম্পিউটার দোকানে আসা কিছু ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক বা সাংবাদিকদের স্টাফ পরিচয় দিয়ে অভিযোগকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। কখনও মামলা করে দেওয়ার আশ্বাস, আবার কখনও পুলিশের মাধ্যমে কাজ করিয়ে দেওয়ার কথা বলে তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

এ ছাড়া কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিযোগ, থানার সামনে থাকা এসব কম্পিউটার দোকানে বিভিন্ন আইনজীবীর মুহুরিরাও বসেন। কেউ থানায় অভিযোগ বা মামলা-সংক্রান্ত কাগজপত্র তৈরি করতে এলে তার সঙ্গে কথা বলে থানায় অভিযোগ না করে আদালতে মামলা করার জন্য চাপ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কোর্টে গেলে অনেক হয়রানি এবং টাকা খরচ হয় দাবি করে সোলাইমান নামে এক ব্যক্তি বলেন, আমরা থানায় আসি যাতে সহজে সমস্যাগুলো সমাধান করা যায়। কিন্তু এখানে এসে কেউ কেউ তাদের নিজস্ব আইনজীবীর কাছে আমাদের কোর্টে যাওয়ার জন্য চাপ দেন।

ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, শুধু অভিযোগকারী নয়, মামলার বিবাদীপক্ষের সঙ্গেও এসব ব্যক্তি যোগাযোগ করেন। তাদেরও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে থানায় অভিযোগ না করে সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এমনকি সালিশে বসার জন্য নিজেদের অফিস বা নির্দিষ্ট স্থানে যেতে বলা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে অভিযোগকারী ও বিবাদী উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে মধ্যস্থতার নামে টাকা দাবি করা হচ্ছে।

তবে স্থানীয়রা বলছেন, কোনও ব্যক্তি আইনগত সহায়তার প্রয়োজন হলে আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সাধারণ মানুষকে তাদের প্রয়োজন, অধিকার ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে না জানিয়ে কোনও নির্দিষ্ট পথে মামলা করতে চাপ দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

জাহিদ নামে একজন দাবি করেন, আমি থানায় অভিযোগ করার জন্য কম্পিউটার দোকানে গিয়ে অভিযোগটি লেখাচ্ছিলাম। লেখা শেষ হওয়ার পরপরই দুই-তিনজন লোক দোকানের ভেতরে এসে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দেন। তারা কী সমস্যা জানতে চেয়েই ভিডিও ধারণ শুরু করেন।

আমরা তো থানায় অভিযোগ করতে এসেছি, সাংবাদিকদের কাছে সাক্ষাৎকার দিতে আসিনি উল্লেখ করে তিনি আরও অভিযোগ করেন, আমার অনুমতি ছাড়াই সেই ভিডিও বিভিন্ন ইউটিউব ও ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। এরপর ভিডিও প্রকাশের বিষয়টি দেখিয়ে আমাকে ফোন করে টাকা দাবি করা হয়।

জাহিদের মতোই সিদ্দিক সরকার নামে আরেক ব্যক্তিও একই ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন।

তিনি বলেন, কম্পিউটার দোকানে অভিযোগ লেখানোর সময় কয়েকজন নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আমার ভিডিও করেন। পরে জানতে পারি, ভিডিওটি বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়েছে। এরপর সেটি নিয়ে আমাকে ফোন করে টাকা দাবি করা হয়।

সোহাগ নামে একজন বলেন, থানায় অভিযোগ করে আসার পরের দিন কয়েকজন সাংবাদিক পরিচয়ে আমার বাড়িতে আসেন। তারা বলেন, আপনি তো গতকাল থানায় এই বিষয়ে অভিযোগ করেছেন, আমরা সাংবাদিক হিসেবে নিউজ করতে এসেছি।

এতে তিনি অবাক হন এবং প্রশ্ন তোলেন, আমি তো তাদের কাউকে বিষয়টি জানাইনি। তাহলে আমার অভিযোগের খবর তারা কীভাবে পেলেন?

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিষয়টি শুধু তথ্য জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কারও কারও কাছে মামলা করে দেওয়া বা পুলিশের মাধ্যমে কাজ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অর্থ চাওয়া হয়েছে।

আবার অভিযোগকারী ও বিবাদী উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের প্রস্তাবও দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি তাদের।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, থানার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সামনে কোনো ব্যক্তি পুলিশের নাম ব্যবহার করে অর্থ আদায় করলে কিংবা সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করলে বিষয়টি তদন্ত করা উচিত।

একইসঙ্গে অভিযোগ বা মামলা-সংক্রান্ত ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে দোকানের বাইরে যাচ্ছে, কারা এসব তথ্য পাচ্ছেন এবং বিভিন্ন ব্যক্তি কীভাবে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সংশ্লিষ্ট কম্পিউটার দোকানদাররা জানান, তাদের দোকান থেকে কোনও ব্যক্তির অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য বাইরে দেওয়া হয় না এবং কারও কাছ থেকে অনৈতিকভাবে টাকা নেওয়ার সঙ্গে তারা জড়িত নন।

এ বিষয়ে রায়পুর থানার ওসি নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, থানার নাম ব্যবহার করে কেউ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

থানার সামনে কোনও দালালচক্রের তৎপরতা থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে উল্লেখ করে ওসি প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের প্রমাণসহ থানায় অভিযোগ করার জন্য অনুরোধ করেন।

/আরএইচ/আইএএম/
সম্পর্কিত
থানায় গিয়ে পুলিশকে মারধর করা যুবদল নেতাকে বহিষ্কার
মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে জামায়াত নেতাকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা
নরসিংদীতে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে একজন নিহত
সর্বশেষ খবর
খুবি শিক্ষার্থীদের মাদক-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে ফেসবুক পোস্ট, রাতে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা
খুবি শিক্ষার্থীদের মাদক-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে ফেসবুক পোস্ট, রাতে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা
গাজায় ঘুমন্ত বাসিন্দাদের ওপর ইসরায়েলি হামলা, নিহত ৫
গাজায় ঘুমন্ত বাসিন্দাদের ওপর ইসরায়েলি হামলা, নিহত ৫
পোশাক কেনার আগে কেমন মানাবে দেখতে চান, আছে সহজ উপায়
পোশাক কেনার আগে কেমন মানাবে দেখতে চান, আছে সহজ উপায়
রোদে পোড়া ভাব যাচ্ছে না? পূজার আগে করুন এই বিশেষ ফেশিয়াল
রোদে পোড়া ভাব যাচ্ছে না? পূজার আগে করুন এই বিশেষ ফেশিয়াল
সর্বাধিক পঠিত
নির্বাচনের আগেরদিন গ্রেফতার, তবুও বিপুল ভোটে জিতলেন আ.লীগ নেতা
নির্বাচনের আগেরদিন গ্রেফতার, তবুও বিপুল ভোটে জিতলেন আ.লীগ নেতা
ব্র্যাকের পর নতুন যাত্রায় মিথিলা
ব্র্যাকের পর নতুন যাত্রায় মিথিলা
ফের বাড়লো তেলের দাম
ফের বাড়লো তেলের দাম
ভারতের পর পাকিস্তানি নায়িকা শাকিবের!
ভারতের পর পাকিস্তানি নায়িকা শাকিবের!
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান গ্রেফতার
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান গ্রেফতার