গোপালগঞ্জে আদালতের এজলাসে কাচের পেপারওয়েটের আঘাতে এক শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবী আহতের ঘটনায় বিচারক মো. সুজন মিয়ার আমলি ক্ষমতা (কগনিজেন্স পাওয়ার) প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে প্রজ্ঞাপন হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন গোপালগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (নাজির) মনিরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘গোপালগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (দ্বিতীয়) আদালতের বিচারক মো. সুজন মিয়ার আমলি ক্ষমতা প্রত্যাহার করা হয়েছে।’
এর আগে বুধবার দুপুরে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক মো. সুজন মিয়ার এজলাসে কথা বলায় বিচারকের ছুড়ে মারা কাচের পেপারওয়েটের আঘাতে শিক্ষানবিশ আইনজীবী সাবিহা সুলতানা গুরুতর আহত হন। তাকে উদ্ধার করে গোপালগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই ঘটনার পর জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে মৌখিক অভিযোগ দেন।
এদিকে, শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবীর মাথা ফেটে যাওয়ার ঘটনায় ওই বিচারকের অপসারণ ও শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন আইনজীবীরা। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আইনজীবীরা আদালত চত্বরসহ শহরের কয়েকটি সড়কে এ ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন।
আইনজীবী ও আদালত সূত্রে জানা যায়, সকালে গোপালগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের সামনে জড়ো হন আইনজীবীরা। পরে সেখান থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে বিভিন্ন সড়ক ঘুরে গোপালগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। বিক্ষোভ চলাকালে বিক্ষোভকারী আইনজীবীরা ‘আমার বোন আহত কেন, প্রশাসন জবাব চাই’, ‘এজলাসে রক্ত কেন, প্রশাসন জবাব চাই’, ‘ঘুষখোরের আস্তানা, গোপালগঞ্জে হবে না’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
বিক্ষোভ মিছিল শেষে আদালত চত্বরে সমাবেশ করেন তারা। এ সময় আইনজীবী হাবিবুর রহমান, মিলন শরীফ, সোহাগ সমাজদার ও রোকাইয়া আক্তারসহ অনেকে বক্তব্য রাখেন।
আইনজীবীরা বলেন, এ ধরনের ঘটনা যে বিচারক ঘটাতে পারেন, তার আর এখানে বিচার কাজ পরিচালনা করার কোনও অধিকার নাই। ওই বিচারকের দ্রুত অপসারণ ও শাস্তির দাবি জানান তারা।
সমাবেশে আইনজীবী হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আদালত চলাকালে কোনও আইনজীবী বা শিক্ষানবিশ আইনজীবী অশোভন আচরণ করলে বিচারক আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি যেটি করেছেন, সেটি আইনবহির্ভূত। একজন শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবীকে আহত করা ফৌজদারি অপরাধের শামিল। এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে দায় নিরূপণ এবং সংশ্লিষ্ট বিচারককে দ্রুত গোপালগঞ্জ থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি আমরা।’
আইনজীবী মিলন শরীফ ও সোহাগ সমাজদার বলেন, আমরা জানতে পেরেছি সংশ্লিষ্ট বিচারকের আমলি ক্ষমতা প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে শুধু আমলি ক্ষমতা প্রত্যাহার নয়, তাকে গোপালগঞ্জ থেকে সরিয়ে দেওয়ারও দাবি জানাচ্ছি। একজন বিচারকের কাছ থেকে মানুষ ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করে। তাই তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
আইনজীবী রোকেয়া আক্তার বলেন, ‘শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবীকে আহত করার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। এর আগেও একই বিচারক একজন মোহরারের দিকে পেপারওয়েট ছুড়ে মেরেছেন বলে অভিযোগ আছে। আদালতে আইনজীবীদের সঙ্গে বিচারকের এসব আচরণ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে।’
আদালত সূত্র ও আইনজীবীদের দেওয়া তথ্যমতে, বুধবার দুপুরে গোপালগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এ বিচার কার্যক্রম চলছিল। ওই সময় আদালত কক্ষের পেছনের সারিতে বসা বিচারপ্রার্থীরা কথা বলছিলেন। একই সময়ে কয়েকজন আইনজীবীও কথা বলছিলেন। এতে অসন্তুষ্ট হয়ে আদালতের বিচারক সুজন মিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং নিজের টেবিল থেকে কাচের পেপারওয়েট ছুড়ে মারেন। পেপারওয়েটটি সরাসরি সেখানে অবস্থানরত শিক্ষানবিশ আইনজীবী সাবিহা সুলতানার মাথায় গিয়ে আঘাত করে। এতে তার মাথা ফেটে যায়। ঘটনার পরপরই এ নিয়ে আদালত কক্ষে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। উপস্থিত আইনজীবীরা দ্রুত সাবিহা সুলতানাকে উদ্ধার করে গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সেখান থেকে তাকে গোপালগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

আদালতে বিচার চলাকালে শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবীর মাথা ফাটালেন বিচারক
শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবীর মাথা ফাটানো বিচারকের অপসারণ চেয়ে বিক্ষোভ






