কাঠের বাক্সে ডিম দিচ্ছে বালিহাঁস

Send
সাইফুল ইসলাম, মৌলভীবাজার
প্রকাশিত : ১২:৩৫, আগস্ট ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৭, আগস্ট ১৪, ২০২০

কাঠের বাক্সে ডিম দিচ্ছ বালিহাঁসমৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মাছের অভয়াশ্রম বাইক্কা বিলের হাইল হাওর। এখানে কাঠের তৈরি বাক্সে ডিম থেকে ছানা ফুটছে ধলা বালিহাঁসের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃত্রিম বাসায় বালিহাঁসের ডিম পাড়ার জন্য দেশে, এমনকি বিশ্বেও এটিই একমাত্র স্থান।

২০০৬ সাল থেকে বালি হাঁসের প্রাকৃতিক প্রজননস্থলের বিকল্প হিসেবে কাঠের বাসা তৈরি করে পরীক্ষামূলক ডিম থেকে ছানা ফুটানো হয়। এরপর থেকে প্রতিবছরই কৃত্রিম এসব বাসায় বালিহাঁস ডিম পাড়ছে। তা থেকে ছানা ফুটছে। ছানারা নিরাপদেই বড় হয়ে বিলের পানিতে নেমে পড়ছে। এবারও প্রজনন মৌসুমের শুরুতেই অন্তত ছয়টি বাসায় ডিম পেড়েছে বালিহাঁস। একটি থেকে এরই মধ্যে সবগুলো ছানা ফুটে বেরিয়ে গেছে।কাঠের বাক্সে ডিম দিচ্ছ বালিহাঁস

বাইক্কাবিলে হাইল হাওরে পর্যবেক্ষণে থাকা বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডি (সিএনআরএস) শ্রীমঙ্গল অফিস সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি সংস্থা ম্যানেজমেন্ট অব অ্যাকুয়াটিক সিস্টেম থ্রো কমিউনিটি হাজবেনট্রি (ম্যাচ) প্রকল্পের অংশ হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে হাইল হাওরের বাইক্কাবিল এলাকায় কাঠের বাক্স স্থাপন করে। ২০০৬ সালে প্রথমে ১০ থেকে ২০ ফুট উঁচু ১০টি পাকা খুঁটির সঙ্গে ১০টি বাক্স স্থাপন করা হয়। যে বছর তৈরি হয়েছিল সে বছর বালিহাঁস ওই সব বাক্সে আশ্রয় নেয়নি। তবে পরের বছর ২০০৭ সালে প্রথম দেখা যায়, ৩-৪টি বাক্সে বালিহাঁস বাসা বেঁধেছে। পরে ডিম পেড়েছে এবং বাচ্চাও ফুটিয়েছে। বাচ্চাগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে গেছে বিলের পানিতে। সেই থেকে প্রজননের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত হওয়ায় প্রতিবছরই কিছু না কিছু কৃত্রিম কাঠের বাসায় বালিহাঁস ডিম দিয়ে আসছে। আর কৃত্রিম বাসায় বালিহাঁসের ডিম পাড়ার জন্য দেশে এটিই একমাত্র স্থান বাইক্কাবিল হাইল হাওর।কাঠের বাক্সে ডিম দিচ্ছ বালিহাঁস

সিএনআরএস শ্রীমঙ্গলের সাইট অফিসার মো. মনিরুজ্জামান চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বালিহাঁসের ডিম পাড়ার মৌসুম হচ্ছে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস। কোনও কোনও সময় অক্টোবর মাস পর্যন্ত ডিম দেয়। প্রজনন মৌসুমের শুরুতেই এ পর্যন্ত বাইক্কাবিলের কৃত্রিম বাসার ছয়টিতে বালিহাঁসকে ডিম পাড়তে দেখা গেছে। এর মধ্যে একটি থেকে ছানা ফুটে বেরিয়ে গেছে। ১৫ দিন পর পর বাসাগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়। আবার বেশি পর্যবেক্ষণ করলে অনেক সময় ডিম ফোটানো ব্যাহত হয়। বালি হাঁসের বাসা এলাকায় প্রচুর সাপ গাছের পাতায় ঝুলে আছে। অনেক ভয় লাগে।’

তিনি আরও জানান, এখন খুঁটি আছে ৩০টির ওপরে। তার মধ্যে সব খুঁটিতে কাঠের বাক্স স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। এবার ২৮টি বাক্স বসানো হয়েছে। ২৫টি কাঠের এবং তিনটি পাকা। ১৫টি বসানো হয়েছে পাকা খুঁটিতে, আর ১৩টি বাক্স বসানো হয়েছে গাছের ডালে। এ বছর ২৫টি বাক্সই নতুন করে বানানো হয়েছে। এতে খরচ হয়েছে ২৭ হাজার ৫০০ টাকা।কাঠের বাক্সে ডিম দিচ্ছ বালিহাঁস

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও পাখি গবেষক ইনাম আল হক বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশ নয়, সম্ভবত বিশ্বের মধ্যে একমাত্র বাইক্কাবিল হাইল হাওরে বালিহাঁস কাঠের বাক্সে সফলভাবে প্রতিবছর ছানা তুলতে পারছে। ওদের ডিম পাড়ার জায়গাই নেই দেশে। পুরনো বড় গাছ, জলাশয় সংলগ্ন পুরাতন মঠমন্দির প্রভৃতি নেই বলে তাদের প্রজনন বাধাগ্রস্ত। এজন্য কাঠের বাক্স দেওয়ার ফলেই ধলা-বালিহাঁস প্রতি বছর বর্ষামৌসুমে তার বংশবৃদ্ধি করে চলেছে।’

তিনি বলেন, ”ধলা-বালিহাঁসের জন্য কৃত্রিম কাঠের বাক্স হাকালুকি হাওরেও দেওয়া হয়েছিল। তার কোনও সফলতা পাওয়া যায়নি। সাফল্য এসেছে এবং চলছে ক্রমাগতভাবে একমাত্র বাইক্কা বিল হাইল হাওরে। বাইক্কা বিলেও যে সাফল্য আসবে এটা আমাদের ধারণা ছিল না, অনুমাননির্ভর ছিল। ধলা-বালিহাঁসের সঙ্গে আকার-আকৃতি ও স্বভাবগত অনেকটা মিল আছে বলে এই কাঠের বাক্সের ডিজাইনটা আমরা ‘আমেরিকান উড ডাক’ এর সঙ্গে তুলনা করি। এখন কাঠের বাক্সগুলো কিছু কিছু ভুল ও শুদ্ধভাবে করা হচ্ছে। ভুল করলে হবে কী, ডিম পাড়বে, কিন্তু বাচ্চাগুলো বাঁচবে না। কারণ বাচ্চা ডিম থেকে বেরিয়ে লাফিয়ে পানিতে পড়তে পারে ঠিক এমন সঠিক মাপের গর্ত থাকতে হবে।’

তিনি জানান, ২০০৩ সালের দিকে ছোট উদ্যোগ হিসেবে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে শুরুটা হয়েছিল। তবে এখন প্রকল্পের উদ্যোগে এ কার্যক্রম চলছে।

 

/এফএস/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ