কাদের দখলে সড়ক-ফুটপাত, কারা তোলে চাঁদা?

দুলাল আবদুল্লাহ, রাজশাহী
১২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০১আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০১

রাজশাহী মহানগরীর সড়ক ও ফুটপাত দখল করে চলছে হরেক রকমের ব্যবসা। এর মধ্যে ফুল, ফল থেকে শুরু করে ভাতের হোটেল পর্যন্ত রয়েছে। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদের কয়েকদিনের মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় চলে যায়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন পথচারীরা। তারা রাস্তায় হাঁটার কারণে বেড়ে যায় যানজট।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, সড়ক ও ফুটপাত দখল করে এসব দোকান বসায় শহরে দিন-রাত যানজট লেগেই থাকে। এতে দুর্ভোগে পড়েন পথচারীরা। এসব দোকান বসার নেপথ্যে আছে কোটি টাকার চাঁদাবাজি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর মোট পাকা সড়ক রয়েছে ৪১০ কিলোমিটার। এই সড়কের ১৫ কিলোমিটারে ফুটপাত আছে। নগরীর আলুপট্টি থেকে রাজশাহী কলেজ, রেলগেট থেকে গণকপাড়া, লক্ষ্মীপুর থেকে রেলগেট, শিরোইল, ভদ্রা, তালাইমারী, কাজলা, বিনোদপুর, কোর্ট স্টেশন, শালবাগান, নওদপাড়া এলাকার অধিকাংশ ফুটপাত দখল করা হয়েছে। এসব স্থানের ফুটপাতগুলো দোকানের সম্প্রসারিত অংশ, হকার, অস্থায়ী দোকানপাট ও পার্ক করা যানবাহনে দখল হয়ে থাকছে প্রতিদিন। অনেক জায়গায় ফুটপাতগুলো কার্যত অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক স্থানে পরিণত হয়েছে। ফলে পথচারীদের হাঁটার জন্য জায়গা থাকছে না। এ অবস্থায় পথচারী ও শিশু শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত রাস্তায় চলন্ত যানবাহনের পাশ দিয়ে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে ঘটছে দুর্ঘটনা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসা মানুষের জন্য উত্তর পাশের ফুটপাতটিই বেশি জরুরি। অথচ উত্তর পাশের ফুটপাতে প্লাস্টিকের সামগ্রী, ফল ব্যবসায়ীরা বসিয়েছেন দোকানের পসরা। যেটুকু জায়গা বাকি আছে, তা দখল করে দাঁড়িয়ে থাকে রিকশা ও অটোরিকশা। এতে করে মুমূর্ষু রোগী নিয়ে স্বজনদের সেখান দিয়ে যাতায়াতের অবশিষ্ট জায়গা নেই বললেই চলে। নগরীর সাহেব বাজার এলাকায় ফুলের দোকান আর ফলের দোকান যেন ফুটপাতেরই ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার সঙ্গে রয়েছে তালাচাবি মেরামত, গামছা-লুঙ্গি, সুতা-দড়ি, টুপি, বেল্ট, আতর-সুরমার দোকান।

মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদের কয়েকদিনের মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় চলে যায়

ফুটপাত ব্যবহারকারীদের ভাষ্যমতে, সড়কের ফুটপাত দিয়ে দৈনন্দিন চলাচল কঠিন ও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। অবৈধ দখলের জন্য সিটি করপোরেশন সেভাবে আইন প্রয়োগ করছে না। এজন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছাও দরকার। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও এই দখলের সঙ্গে জড়িত। আছে চাঁদাবাজি।  

সম্প্রতি রিসার্চগেটে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় রাজশাহীর হাঁটার উপযোগিতাকে ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৪৩ দশমিক ২০ রেটিং দেওয়া হয়েছে। যা ‘হাঁটার অনুপযোগী’ বিভাগে স্থান দিয়েছে। জনগোষ্ঠীর জন্য অবকাঠামোগত স্কোর আরও কম। স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ দখলের ধারাবাহিকতায় চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা আছে। অভিযান চালানো হলেও আবার দোকান বসানো হয়। কারণ প্রতিদিন এসব দোকান থেকে কোটি টাকা চাঁদাবাজি করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা।

ভোগান্তির কথা জানিয়ে স্কুলশিক্ষক শওকত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নগরীর ফুটপাতগুলো ব্যবহারযোগ্য না। আমাদের প্রতিদিন রাস্তায় হাঁটতে হয়। এজন্য ব্যাটারিচালিত রিকশার ভয় আছে। তারা নিয়ন্ত্রিত করতে পারে না। মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু এগুলো কার্যত উচ্ছেদ করা দরকার।’

সড়ক ও ফুটপাত দখল করে এসব দোকান বসায় শহরে দিন-রাত যানজট লেগেই থাকে

এ নিয়ে অভিভাবকরা তাদের শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যানজটপূর্ণ রাস্তায় চলাচল করতে অসুবিধার সম্মুখীন হতে দেখা গেছে। 

স্থানীয় অভিভাবক ফেরদৌসী রহমান বলেন, ‘ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ার কারণে ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে হেঁটে মেয়েকে স্কুল ও কোচিং ক্লাসে নিয়ে যেতে হয়। এতে শঙ্কার মধ্যে থাকতে হয় সারাক্ষণ।’

একই কথা বলেছেন নগরীর উপশহর এলাকার ব্যবসায়ী জিএম বাবুল চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘ফুটপাতগুলো যদি পথচারীর জন্য উন্মুক্ত হয় তাহলে অনেক দুর্ঘটনা কমে যাবে। পথচারীরাও শহরের মধ্যে চলাফেরা করে শান্তি পাবেন। এখন ফুটপাত ছেড়ে ব্যস্ত রাস্তা ধরে হাঁটতে গেলে সব সময় উৎকণ্ঠায় থাকতে হয়।’

সচেতন নাগরিক কমিটির রাজশাহীর সভাপতি দীপক দাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যারা ফুটপাত দখল করে তারা রাজনৈতিক মদতে করে থাকে। এমনকি হকাররাও ব্যবসা চালাতে চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফুটপাত যারা দখল করে রেখেছেন তাদের জীবিকার অন্য কোনও ব্যবস্থাও নেই। তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে প্রতিদিন। এজন্য রাজনৈতিক নেতাদের মদতে দোকানের পসরা সাজিয়ে বসেন তারা।’

এসব দোকান বসার নেপথ্যে আছে কোটি টাকার চাঁদাবাজি

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাইমিনুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। কিন্তু ধারাবাহিক নজরদারির অভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফুটপাতগুলো পুনরায় দখল হয়ে যাচ্ছে। অনানুষ্ঠানিক হকারদের জন্য পুনর্বাসন পরিকল্পনার অভাবে দখলের চক্র অব্যাহত আছে।’

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, ‘নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানো হয়। অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু ফুটপাত পরিষ্কার রাখতে সব অংশীজনের সহযোগিতা প্রয়োজন। দখলকৃত ফুটপাত উদ্ধার করাও বড় চ্যালেঞ্জ।’

 

/এএম/ 
সম্পর্কিত
খসে পড়ছে পলেস্তারা, তার ভেতরে নাগরিক সেবা
বাস সার্ভিস বন্ধের প্রতিবাদডাকসু নেতার নেতৃত্বে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ, ভোগান্তি
এমপি হান্নান মাসউদের জন্য দুই ঘণ্টা ফেরি আটকে রাখার অভিযোগ
সর্বশেষ খবর
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
শিশুর হাতে স্মার্টফোন: আশীর্বাদ না অভিশাপ? 
শিশুর হাতে স্মার্টফোন: আশীর্বাদ না অভিশাপ? 
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে কিমের বড় ঘোষণা
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে কিমের বড় ঘোষণা
শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা, রায় রবিবার
শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা, রায় রবিবার
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান