উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হঠাৎ আগ্রাসী হয়ে উঠেছে ধরলা নদী। রবিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাতে কুড়িগ্রামের উলিপুরের বেগমগঞ্জ ইউনিয়নে নদীর তীব্র ভাঙনে পাঁচটি বসতভিটাসহ শতাধিক বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। একইসঙ্গে হুমকিতে রয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক, বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ভূমি আফিসসহ বসতি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো বলছে, রবিবার রাতে ধরলা তীরবর্তী বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের খুদিরকুটি ব্যাপারীপাড়া গ্রামে ধরলার তীব্র ভাঙন শুরু হয়। ভাঙনের তীব্রতায় মানুষ রাত জেগে বাড়িঘর সরিয়ে নিতে শুরু করেন। এরই মধ্যে করিম বাদশা, লুৎফর মুন্সি, দেওয়ান আলী, মোহাম্মদ আলী ও রোস্তমের বসতভিটা বিলীন হয়ে যায়। কোনও রকমে তারা ঘরের চালসহ জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে পেরেছেন। এ ছাড়া একরাতেই অন্তত ১০০ বিঘা আবাদি জমি, শত শত গাছপালা নদীগর্ভে চলে গেছে। এখনও ভাঙন হুমকিতে শতাধিক পরিবার ও স্থাপনা।
‘অবস্থা খুব খারাপ। সামলায় যায় না। কোনটা ধরি কোনটা সরাই। গাছপালা, খড়ের পালা সউক শ্যাষ। খালি ঘরের চালটা করি সরবার পাছি। কাই কারটা সামলায়। এলা যে কোটাই যায়া থাকমো সেটায় কবার পাই না।’
ধরলার আকস্মিক ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে এভাবেই ভাঙনের তীব্রতার বর্ণনা দিয়েছেন বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দা দেওয়ান আলী। রবিবার রাতে ধরলার তীব্র ভাঙনে বসতভিটা হারিয়েছেন এই দিনমজুর। শুধু দেওয়ান আলী নন, তার গ্রামের অনেকের এখন একই অবস্থা।
ভাঙনের শিকার দিনমজুর রোস্তম বলেন, ‘কপাল ভালো টের পাইছি। না হইলে মানুষ সুদ্দোয় নদীত ভাসি গেইলং হয়। কোনোমতে ঘরগুলা সরবার পাছি। কিন্তু এলা কোটাই যায়া কেমন করি বাস করমো, সেই কিনারা পাইতেছি না।’
রাতের ভাঙনের পর সোমবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সারাদিন ভাঙন নিয়ে লোকালয়ের দিকে অগ্রসর ছিল ধরলা। এর বাম তীরের নিকটবর্তী বসতভিটা ও স্থাপনা ভাঙন হুমকিতে দাঁড়িয়ে আছে। সোমবার দুপুরে কথা হয় ভাঙনের শিকার আরেক দিনমজুর সামেদ আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘চারটা ঘরের চাল সরে নিয়া স্কুল মাঠত থুচি। ভিটার অর্ধেক গেইছে। যে ধার (স্রোত) পড়ছে নগদ বাকিকোনাও যায়। একজনের কাছত ঘর তুলি থাকার জন্য জমি চাছি। না দিলে কোটেই থাকমো সে উপায় নাই।’
ভাঙনের হুমকিতে আছে ওই ইউনিয়নের একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় খুদির কুটি আব্দুল হামিদ উচ্চ বিদ্যালয়, তৎসংলগ্ন বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, ভূমি অফিস ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আক্কেল মামুদ কমিউনিটি ক্লিনিক। এ ছাড়া আবাদি জমিসহ বিভিন্ন বসতি ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে।
৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য (মেম্বার) শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে ভাঙন চলছে। গত এক ১০ দিনে ওয়ার্ডের স্কুল সংলগ্ন ২৯টি পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। ভাঙনের তীব্রতা এখন আরও বাড়ছে। কিন্তু পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আক্তার হোসেন বলেন, ‘ধরলার ভাঙনে একরাতে ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি পরিবার ভিটা হারিয়েছে। অনেক আবাদি জমি ও গাছপালা নদীগর্ভে চলে গেছে। আমার নিজের বাড়িও ভাঙন হুমকিতে আছে। অনেকে বাড়িঘর সরিয়ে নিচ্ছেন। ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে অন্তত এক হাজার মিটার প্রতিরক্ষা কাজ করা প্রয়োজন। তা না হলে কোনও কিছুই রক্ষা করা যাবে না।’
ভাঙনের খবরে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) তাৎক্ষণিক দুই হাজার বস্তা জিও ব্যাগ ফেলার অনুমতি দিয়েছে জানিয়ে এই আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, ‘জেলা প্রশাসন ও পাউবো থেকে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। মঙ্গলবার থেকে জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বেগমগঞ্জে ধরলার বাম তীরে প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশজুড়ে ভাঙন রয়েছে। এত বড় অংশে জরুরি প্রতিরক্ষা কাজ করার বরাদ্দ নেই। ভাঙনের খবরে আমরা তাৎক্ষণিক দুই হাজার জিও ব্যাগ সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছি। স্কুল, কমিউনিটি ক্লিনিকসহ স্থাপনাগুলো রক্ষায় আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি।’








