X
শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪
৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অভিযানে আটক

মাদকের মূলহোতাকে বাঁচাতে ‘টাকার বিনিময়ে’ বসলো ভ্রাম্যমাণ আদালত

আরিফুল ইসলাম রিগান, কুড়িগ্রাম
০৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:০১আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:০১

কুড়িগ্রামে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অভিযানে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ নিয়ে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযানে একই অপরাধে একসঙ্গে তিন ব্যক্তিকে আটক করলেও মূলহোতাকে ‘টাকার বিনিময়ে’ ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়া হয়েছে। অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া অধিদফতরের এক উপপরিদর্শকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে।

পরস্পর যোগসাজশে মাদক পরিবহনের সময় আটক হলেও ‘টাকার বিনিময়ে’ আইনের পৃথক প্রয়োগ করায় অভিযান পরিচালনাকারীদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা জানা গেছে, গত ৮ মার্চ সকালে নাগেশ্বরী উপজেলার কুড়িগ্রাম-নাগেশ্বরী সড়কের পাশে ভিতরকুটি ভাঙামোড় তেপথি এলাকায় অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপপরিদর্শক আসাদুল হকের নেতৃত্বে একটি দল। এ সময় একটি সিএনজি অটোরিকশার গতিরোধ করে দলটি। অটোরিকশায় থাকা তিন জনের কাছ থেকে দুই ব্যাগে রাখা ১০০ বোতল ফেনসিডিল ও একটি এস্কাফ সিরাপ উদ্ধার করা হয়। পরে তাদের নাগেশ্বরী থানায় নেওয়া হয়। আটক ব্যক্তিরা হলেন ইমান মেহেদী হাসান সৌরভ (৩১), রোমান মিয়া (২৬) ও মোরশেদ আলম (২৪)। এর মধ্যে সৌরভের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে। অপর দুই জনের বাড়ি শেরপুর জেলায়। সৌরভ পেশায় প্রকৌশলী। রোমান ও মোরশেদ তার সহযোগী। তারা পূর্বপরিচিত এবং চোরাচালানের উদ্দেশ্যে একসঙ্গে কুড়িগ্রামে এসেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তাদের তিন জনকে আটকের পর উপপরিদর্শক আসাদুল হকের সঙ্গে দেনদরবার শুরু করেন মাদক চোরাচালানের মূলহোতা সৌরভ। নিজের পেশার দোহাই দিয়ে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। ‘সমঝোতা’ হওয়ায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করেন তিনি। ওই দিন দুপুরের পর তাকে আবারও ঘটনাস্থলে নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তিন দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নাগেশ্বরী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এ সাজা দেন। অপর দুই যুবককে মাদকদব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। তারা বর্তমানে কুড়িগ্রাম কারাগারে রয়েছেন। অটোরিকশা থেকে তিন জন আটক হলেও মামলার এজাহারে দুজনকে আটকের বর্ণনা দিয়েছেন মামলার বাদী ও উপপরিদর্শক আসাদুল হক।

বিষয়টি নিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধান করেন এই প্রতিবেদক। মামলার সাক্ষী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, অভিযানে অটোরিকশা থেকে তিন যুবককে আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের দলটি। আটকের পর মাদকের বোতল গণনা করে তিন জনকে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন তারা। দুপুরের পর একজনকে নিয়ে আবারও ঘটনাস্থলে আসে দলটি। সেখানে আদালত বসিয়ে একজনকে সাজা দেওয়া হয়।

ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন ভাঙামোড় তেপতি এলাকার ট্রাকশ্রমিক মোখলেছুর, জামিনিকান্ত এবং স্থানীয় বাসিন্দা ফেরদৌস আলী ও শিবু। তারা বলেন, ‘সেদিন সকালে অটোরিকশা থেকে তিন জনকে নামানো হয়েছিল। তাদের কাছে থাকা ব্যাগ থেকে ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। পরে তাদের নিয়ে চলে যায়। এরপর আর কিছু জানি না। দুপুরের পর আটক একজনকে এখানে নিয়ে এসে তিন দিনের সাজা দেওয়া হয়।’

মামলায় সাক্ষী হিসেবে অটোরিকশাচালক শওকত ও স্থানীয় বাবুর্চি মফিজুল ইসলামের নাম রয়েছে। তারা জানান, তিন জনকেই আটক করা হয়েছিল। পরে একজনকে সাজা দিয়ে দুজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।

অটোরিকশাচালক শওকত বলেন, ‘তিন যাত্রী আন্ধারীরঝাড় থেকে অটোরিকশায় ওঠেন। তারা একসঙ্গে ছিলেন। সৌরভ অটোরিকশা ভাড়া করেন। পথিমধ্যে ফেনসিডিলসহ আটক হন তারা।’

আরেক সাক্ষী মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘ফেনসিডিলসহ তিন জনকে আটক করেছিল। পরে কতজনকে আসামি করেছে, কত বোতল ফেনসিডিল ছিল; তা আমাকে বলেননি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তা। আমাকে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করতে বলায় করেছি। এর বেশি কিছু জানি না।’

ঘটনার বিস্তারিত জানতে রোমান মিয়া ও মোরশেদ আলমের সঙ্গে কারাগারে দেখা করেন এই প্রতিবেদক। তারা জানান, তাদের ১০ হাজার টাকা দেওয়ার চুক্তিতে ভারতীয় কসমেটিকস পরিবহনের কথা বলে ভূরুঙ্গামারীতে নিয়ে আসেন সৌরভ। ভূরুঙ্গামারীতে দুই দিন থাকার পর ৮ মার্চ সকালে উপজেলার আন্ধারীরঝাড় এলাকা থেকে তারা অটোরিকশায় করে কুড়িগ্রাম শহরে রওনা হন। কসমেটিকসের পরিবর্তে ব্যাগে ফেনসিডিল দেখে তারা আপত্তি জানান। কিন্তু সৌরভ তাদের টাকা বাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে রাজি করান। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অদিদফতরের দল তাদের আটক করে নাগেশ্বরী থানায় নেয়। পরে সৌরভকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে তিন দিনের সাজা দিলেও তাদের দুই জনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়।

রোমান মিয়া বলেন, ‘সৌরভ মাদকের মূলহোতা। আমরা কিছুই না। কসমেটিকসের ব্যবসার কথা বলে সে ভারত থেকে মাদক নিয়ে আসছিল। তিন জনকে ধরার পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তা থানায় নিয়ে যান। পরে সৌরভ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাদের ম্যানেজ করে ফেলে। তাকে ফেনসিডিল সেবনকারী দেখিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়া হয়। মামলা দিয়ে আমাদের কারাগারে পাঠায়।’

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপপরিদর্শক আসাদুল হক। তিনি বলেন, ‘অটোরিকশায় তিন জন যাত্রী ছিলেন। দুই জনের কাছে ফেনসিডিল ছিল। সামনের সিটে বসে থাকা একজনের হাতে অর্ধেক বোতল ফেনসিডিল ছিল। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, তারা সহযোগী নয়। এজন্য একজনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়া হয়েছে।’

মাদকসহ সকালে আটক করে দুপুরের পর ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়ার বিধান আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আসাদুল হক বলেন, ‘এই তথ্য সঠিক নয়। সকালে অভিযানে ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন।’

৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে মূলহোতাকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়ার প্রশ্নের জবাবে এই উপপরিদর্শক বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে কিছু জানি না। কার সঙ্গে টাকার লেনদেন হয়েছে, তা আমার জানা নেই। যারা বলছেন, ভুল বলছেন।’

তবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী সহকারী কমিশনার আশিক আহমেদ দুপুরের পর আদালত পরিচালনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘ওই দিন দুপুরের দিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে একজনকে সাজা দেওয়া হয়েছিল। অপর দুই জনের কাছে বেশি পরিমাণ মাদক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দেওয়া হয়েছে। আসামিদের সকালে আটকের বিষয়টি আমাকে জানানো হয়নি। আমাকে বলা হয়েছিল, কিছুক্ষণ আগে আটক করা হয়েছে। আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও আমার জানা নেই।’

ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে অপরাধ সংঘটিত না হলেও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা আইনসিদ্ধ কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে এই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ‘আটকের সময় আমি ঘটনাস্থলে না থাকলেও সাক্ষীদের সামনে আসামি দোষ স্বীকার করেছে। এজন্য তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কুড়িগ্রাম জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আবু জাফর বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। অভিযোগটি খতিয়ে দেখবো। অভিযানে কোনও অনিয়ম হয়ে থাকলে ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আমি কঠোর ব্যবস্থা নেবো।’

/এএম/
সম্পর্কিত
এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না আমার ভাই এমপি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে: মেয়র সেলিম
৩০ শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেফতারসেই শিক্ষকের ‘ওপরের চেহারা’ বিভ্রান্ত করেছে সহকর্মীদেরও
রাজধানীতে মাদকসহ গ্রেফতার ৩৮
সর্বশেষ খবর
দুই কোরবানির হাটে ক্যাশলেস লেনদেন
দুই কোরবানির হাটে ক্যাশলেস লেনদেন
কানের অফিসিয়াল লালগালিচায় ঢাকার একমাত্র মুখ
কান উৎসব ২০২৪কানের অফিসিয়াল লালগালিচায় ঢাকার একমাত্র মুখ
ফেসবুকে ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপন দিয়ে তরুণীকে ধর্ষণ, গ্রেফতার ১
ফেসবুকে ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপন দিয়ে তরুণীকে ধর্ষণ, গ্রেফতার ১
১৪ দলের শরিকদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ, সান্ত্বনা জোটনেত্রীর
১৪ দলের শরিকদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ, সান্ত্বনা জোটনেত্রীর
সর্বাধিক পঠিত
পূর্ব তিমুরের মতো খ্রিষ্টান দেশ বানানোর চক্রান্ত চলছে: শেখ হাসিনা
পূর্ব তিমুরের মতো খ্রিষ্টান দেশ বানানোর চক্রান্ত চলছে: শেখ হাসিনা
কবে থেকে পরিকল্পনা ও কেন কলকাতায় হত্যা, জানালো ডিবি
এমপি আনার হত্যাকবে থেকে পরিকল্পনা ও কেন কলকাতায় হত্যা, জানালো ডিবি
নেপথ্যে ২০০ কোটি টাকার লেনদেন, সিলিস্তাকে দিয়ে হানি ট্র্যাপ
এমপি আজীম হত্যাকাণ্ডনেপথ্যে ২০০ কোটি টাকার লেনদেন, সিলিস্তাকে দিয়ে হানি ট্র্যাপ
সেই শিক্ষকের ‘ওপরের চেহারা’ বিভ্রান্ত করেছে সহকর্মীদেরও
৩০ শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেফতারসেই শিক্ষকের ‘ওপরের চেহারা’ বিভ্রান্ত করেছে সহকর্মীদেরও
এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না আমার ভাই এমপি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে: মেয়র সেলিম
এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না আমার ভাই এমপি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে: মেয়র সেলিম