আবাসিক হলের ক্যান্টিনের খাবার নিয়ে হলের গ্রুপে অভিযোগ করায় এক শিক্ষার্থীকে মারধর করেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের দুই নেতা। শনিবার (১৮ জুলাই) রাত পৌনে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার প্রতিবাদে এবং অভিযুক্তদের বিচারের দাবিতে দিবাগত রাত ৩টার দিকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। পরে রাত সাড়ে ৩টার দিকে শাবি উপাচার্য অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম সেখানে উপস্থিত হয়ে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত করে ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন। পরে শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি থেকে সরে আসেন।
মারধরের শিকার শিক্ষার্থী সিলেট নগরীর মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে চিকিৎসা নেন বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোখলেসুর রহমান।
মারধরের শিকার হওয়া খাইরুল খন্দকার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। আর অভিযুক্ত দুই শিক্ষার্থী হলেন- পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছাত্রদলের যোগাযোগ সম্পাদক হাসিবুর রহমান ও পরিসংখ্যান বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সহ-দফতর সম্পাদক তারেক রহমান।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী অর্থনীতি বিভাগের আবরার বিন সেলিম বলেন, আমি পাশে একটা দোকানে ছিলাম, তখন দেখি পরিসংখ্যানের তারেক ভাই ও পিএসএসের হাসিব ভাইয়ের সঙ্গে খাইরুলের তর্কাতর্কি হচ্ছে। যাওয়ার পর সেখানে তারেককে সিনক্রিয়েট করতে না করি এবং বিভাগের সিনিয়র দিয়ে বিষয়টা সমাধান করতে বলি। তখন তারেক ভাই আমাকে হলের গ্রুপে খাইরুলের খাবারের অভিযোগটা বলে। তখন আমি তারেক ভাই ও হাসিব ভাই দুই জনের কথা শুনি। একই সঙ্গে তারা বলে হল প্রভোস্ট নাকি তাকে (খাইরুল) মেসেজের স্ক্রিনশট পাঠিয়েছেন বিষয়টি দেখার জন্য। পরবর্তী সময়ে যখন খাইরুলের কথা শুনি, তখন হাসিব তার কথার মধ্যে বারবার ইন্টারফেয়ার করে। তখন হাসিবের কি একটা কথার ওপর খাইরুল বলে- ভাই আপনি কি দলীয় প্রভাব দেখাচ্ছেন? আমি যদি কথা বলি হল প্রভোস্টের সঙ্গে কথা বলবো। আপনাদের সঙ্গে কেন কথা বলবো!
তিনি আরও বলেন, তখন হাসিব এত জোরে খাইরুলের বুকে লাথি মারে, সে নিজেই পড়ে যায়। তখন তারেক খাইরুলের মাথার পেছনে ঘাড়ের ওপরের সংবেদনশীল জায়গা মারা শুরু করে। এভাবে হাসিব-তারেক খাইরুলকে এত মারাত্মকভাবে মারা শুরু করে, যা আমি আমার পুরো লাইফে কখনও দেখেনি।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী খাইরুল খন্দকার বলেন, হলের ক্যান্টিনের খাবারে পচা মাছের তরকারি নিয়ে প্রভোস্ট স্যারকে মেনশন দিয়ে একটা মেসেজ দিই ভালো খাবারের ব্যবস্থা করতে। এ নিয়ে শুক্রবার বিকালে ছাত্রদলের তারেক ভাই আমাকে আমার এক বন্ধু দিয়ে ডেকে নিয়ে যায়। ডেকে নিয়ে বলে, হল গ্রুপে ম্যাসেজ দেওয়ায় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন একজন মনক্ষুণ্ণ হয়েছেন। আমি ঊর্ধ্বতন কে—জানতে চাইলে বলে, প্রভোস্ট স্যার। তিনি আমাকে প্রভোস্ট স্যারকে সরি বলতে বলেন। আমি ওকে বলে চলে আসি। এরপর শুক্রবার রাতে ক্যান্টিনের বাজে খাবার দেখে প্রভোস্ট স্যারকে মেনশন দিয়ে খাবারের বিষয়ে অভিযোগ করি। ম্যাসেজে বলি-ক্যান্টিনে আমাদের যা-তা খাওয়াচ্ছে।
খাইরুল খন্দকার বলেন, শনিবার সন্ধ্যায় গেটে এলে হাসিব ও তারেক আমাকে হলের গ্রুপে খাবারের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। আমি বললাম, কিছু বলার থাকলে হল প্রভোস্ট আমাকে বলবে, আপনারা কেন বলবেন। তখন হাসিব আমাকে জোরে বুকে লাথি মারে ও তারেক মাথার পেছনে, মুখে আমাকে এলোপাথাড়ি মারতে থাকে। এরপর আশপাশ মানুষ এলে কয়েকজন সিনিয়র ভাই ও বন্ধুরা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহ দফতর সম্পাদক তারেক রহমান বলেন, হলের গ্রুপে খাবারের বিষয়ে কথা বলায় প্রভোস্ট স্যার একটু মন খারাপ করছেন। তখন আমরা এ নিয়ে খায়রুলকে বুঝাচ্ছিলাম। কিন্ত সে জুনিয়র হয়েও আমাদের সঙ্গে খুব বাজে আচরণ করে। যেটা আমাদের কাছে সিনিয়র হিসেবে খুব খারাপ লাগছে। তখন এক কথা-দুই কথা হইতে হইতে বিষয়টা বড় পর্যায়ে চলে গেছে। এক পর্যায়ে সে তেড়ে এসে আমার শরীরে তার হাত টাচ করছে। তখন হাসিব বাধা দিতে গিয়ে হাতাহাতি পর্যায়ে চলে গেছে। এতে হাসিবের চশমা ভেঙ্গে গেছে, তার হাত কেটে গেছে। তার ফোন পুরোটা ডেড হয়ে গেছে।
ছাত্রদলের দুই নেতাকে বিষয়টি দেখার দায়িত্ব দিয়েছেন কি না- এমন প্রশ্নে হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইফতেখার আহমদ বলেন, এখানে আমার কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই। কাউকে মারার জন্য মদতও দেইনি, দায়িত্বও দেইনি। হলের সমস্যা নিয়ে কোনও শিক্ষার্থী অভিযোগ করলে আমি আমার রুমে ডেকে তার সঙ্গে কথা বলে সমাধান করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী আমার কাছে সমান।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম বলেন, আমরা বিষয়টি নিয়ে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। ঘটনার যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা হবে।









