X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

স্কুলের চেয়ে মাদ্রাসা কেন বেশি পছন্দ অভিভাবকদের

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ১৮:৫২

একটি আবাসিক মাদ্রাসা (ছবি- মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন) বাড়ির পাশে দু’টি কিন্ডারগার্টেন স্কুল থাকলেও গাজীপুরের ৩৩ বছর বয়সী মাদ্রাসা শিক্ষক মোহাম্মদ মশিউর রহমান তার বড় ছেলেকে নিজের মাদ্রাসাতেই ভর্তি করিয়েছেন। তার আরেক ছেলে ও এক মেয়েকেও মাদ্রাসাতেই ভর্তি করাবেন তিনি। মশিউর বলেন, ‘আমার বড় ছেলে এখন নূরানি পড়ছে (ইবতেদায়ি বা প্রাথমিক স্তর)। ভবিষ্যতে সে হাফেজি (কোরান শরিফ মুখস্ত করা) পড়বে।’
একজন হাফেজের সুপারিশ একজন মুসলিমকে বেহেস্তবাসী করে বলে বিশ্বাস করেন মশিউর রহমান। ছেলেকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর কারণ জানতে চাইলে মশিউর বলেন, ‘আমি ছেলেকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছি যেন আল্লাহ তাকে পুরস্কৃত করেন। তাছাড়া, পরকালে তো প্রচলিত শিক্ষার কোনও দাম নেই। এ কারণেই ছেলেকে মাদ্রাসায় পাঠিয়েছি।’
মাদ্রাসা ও মসজিদের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেকের ধারণাই মশিউর রহমানের মতো। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন ধারণার দেখা বেশি মেলে। এসব মানুষের মধ্যে তাদের সন্তানদের সাধারণ স্কুল-কলেজে ভর্তি করার উদাহরণ অনেক কম।
কেবল ধর্মীয় কারণেই নয়, আর্থিক কারণেও অনেক অভিভাবকই সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠিয়ে থাকেন। কারণ, সাধারণ স্কুলগুলোর তুলনায় মাদ্রাসার খরচ কম। ২০১১ সালে প্রকাশ হয় ‘বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষার রাজনৈতিক অর্থনীতি’ শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থ। এই বইয়ের লেখক অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেছেন, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অর্ধেকেরও বেশি দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে আসা। ওই বইয়ে তুলে ধরা গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৪ শতাংশ। আর মাত্র ৫ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল পরিবার থেকে আসা।
এই প্রতিবেদন তৈরির সময় অন্তত ১০ জন অভিভাবক তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর সপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তবে তারা এও বলছেন, মাদ্রাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের মাসে ৫ হাজার টাকা আয় করতেও অনেক কষ্ট করতে হয়।
মসজিদে ইমাম-মুয়াজ্জিন হিসেবে কিংবা মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে থাকেন মাদ্রাসার ডিগ্রিধারীরা। এর বাইরে আরবি ও কোরান শরিফ শিক্ষা দেওয়া, মিলাদ পরিচালনা করা কিংবা কোরান খতম পড়িয়ে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয়ের সুযোগ থাকে তাদের জন্য। এছাড়া, রমজান মাসে তারাবির নামাজ পড়ানোর মাধ্যমেও বাড়তি কিছু আয় করতে পারেন ইমামরা। তবে সাকুল্যে তারা যে টাকা পান, তা পরিবার চালানোর জন্য পর্যাপ্ত নয়।
তবে এমন পরিবারের অনেক সন্তানও ইবতেদায়ি (মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার প্রাথমিক স্তর) শেষ করার পর হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। পরে তারা কলেজেও ভর্তি হয়। এসব শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার নজির খুবই কম।
সন্তানদের মাদ্রাসায় ভর্তি করার বিষয়ে যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাদের সবাই মাদ্রাসার কম খরচের কথাই বলেছেন। গাজীপুর মুন্সিপাড়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার অধ্যক্ষ মওলানা রফিকুল আলম বলেন, ‘আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে পড়ালেখার খরচ নেই। শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়ার জন্য কেবল কর্তৃপক্ষ সামান্য কিছু খরচ নিয়ে থাকে। শিক্ষার্থীকে মোট খরচের অর্ধেকের মতো দিতে হয়। আর এতিমদের জন্য সেই খরচও লাগে না।’
অধ্যাপক আবুল বারকাতের গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, বড় পরিবারগুলোর মধ্যে সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠানোর প্রবণতা বেশি। এসব পরিবার অন্তত একটি সন্তানকে মাদ্রাসায় পড়াতে চায়। এছাড়া, নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে এমন ধারণা আছে যে, মাদ্রাসার শিক্ষকরা অনেক বেশি যত্নবান হন। তাছাড়া, সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তাদের মধ্যে নেতিবাচক বা ভুল ধারণাও আছে। এসব বিষয়ও তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠাতে উৎসাহিত করে থাকে।
সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠানোর বিষয়ে আরেকটি কারণ উল্লেখ করেছেন অভিভাবকরা। তা হলো— যারা একটু দুষ্ট বা বেয়াড়া, তাদের ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পাঠানো হয় আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে।
এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছেন আব্দুল্লাহ। তিনিও ছোটবেলায় পড়েছেন মাদ্রাসায়। তিনি বলেন, ‘আমি ছোটবেলায় বাবা-মায়ের কথা শুনতাম না। এ কারণে আমার মা আমাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর কথা বলেন। তারা ভেবেছিলেন, মাদ্রাসার কড়া শাসনের মাধ্যমে আমাকে নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।’
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে মাদ্রাসা শিক্ষক, বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষকদের অনেক বেশি যত্নবান বলে মনে হয়েছে আব্দুল্লাহর কাছে। তিনি বলেন, ‘মাদ্রাসা শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের প্রতি বেশি যত্নবান— এটা আবাসিক মাদ্রাসাগুলোর ক্ষেত্রে আংশিকভাবে প্রযোজ্য। এসব শিক্ষকের বেশিরভাগের পরিবারই আলাদা থাকে। ফলে এই শিক্ষকদের বেশিরভাগ সময় কাটাতে হয় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। আমার অভিজ্ঞতায় তারা একটু কঠোর হন।’
কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাদ্রাসা শিক্ষকরাও সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠাতে অভিভাবকদের উৎসাহিত করেন। মওলানা রফিকুল আলম বলেন, ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় কাজ করতে চান, তারাই সাধারণত সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠিয়ে থাকেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক অভিভাবকই ফোন করে আমাকে বলেন, তাদের সন্তানরা কোনও কথা মানে না। আমিই তাদের মাদ্রাসায় পাঠানোর পরামর্শ দেই, যেন এখানে তাদের সঠিকভাবে গড়ে তোলা যায়।’ কোনও এলাকার মানুষের মধ্যকার গোষ্ঠীবদ্ধতার ধারণাও কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাদ্রাসা শিক্ষাকে উৎসাহিত করে থাকে বলে মনে করেন তিনি।
এর বাইরে ব্যতিক্রম হিসেবে কিছু কিছু সচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের মধ্যেও সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠানোর আগ্রহ দেখা যায়।
বাংলাদেশে এখন বিভিন্ন ধরনের মাদ্রাসা দেখা যায়। এসব মাদ্রাসায় আরবি ও ধর্মীয় শিক্ষার বাইরে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয়ও পড়ানো হয়। কিছু কিছু মাদ্রাসায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর মতো স্ট্যান্ডার্ড ইংরেজিও পড়ানো হয়। মূলত মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সময়োচিত কিছু পদক্ষেপের কারণেই এসব মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে। এই মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যাডেট মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন মাদ্রাসা এবং মেয়েদের জন্য পৃথক মাদ্রাসা।
উত্তরার মুহাম্মাদিয়া মাকজুনুল উলুম মাদ্রাসার এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, ‘আমার সন্তানের শিক্ষাজীবনের শুরুটা ধর্মীয় আবহের মধ্যে থেকে হোক, এটা আমি চেয়েছিলাম। এ কারণেই আমার সন্তানকে মাদ্রাসায় ভর্তি করেছি।
এখানে আরবির পাশাপাশি স্ট্যান্ডার্ড ইংরেজিও পড়ানো হয় জানিয়ে এই অভিভাবক বলেন, ‘এখান থেকে আমার ছেলেকে পরে ইংলিশ মিডিয়ামের কোনও স্কুলে ভর্তি করানোর ইচ্ছে আছে।’ এই মাদ্রাসায় সন্তানের পড়ালেখার খরচ একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রায় সমান বলেও জানান তিনি।
(ঢাকা ট্রিবিউনে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ছয় পর্বের ধারাবাহিকের তৃতীয় পর্ব। চতুর্থ পর্ব পড়ুন আগামীকাল)

প্রথম পর্ব: আট কিলোমিটারে ৬৮ মাদ্রাসা!
দ্বিতীয় পর্ব: চাকরিক্ষেত্রে সুযোগ কতটুকু মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের

/টিআর/এপিএইচ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পদ্মা সেতুর নাম ‘জীবনানন্দ সেতু’ করার দাবি
পদ্মা সেতুর নাম ‘জীবনানন্দ সেতু’ করার দাবি
ব্যবসায়ীর গুদামে ৩ হাজার লিটার সয়াবিন তেল
ব্যবসায়ীর গুদামে ৩ হাজার লিটার সয়াবিন তেল
যেভাবে বানাবেন স্বাস্থ্যকর জিরা পানি
যেভাবে বানাবেন স্বাস্থ্যকর জিরা পানি
শনাক্ত ২২, টানা ২৭ দিন মৃত্যু নেই 
শনাক্ত ২২, টানা ২৭ দিন মৃত্যু নেই 
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত