X
শুক্রবার, ২৬ জুলাই ২০২৪
১০ শ্রাবণ ১৪৩১

বিশৃঙ্খলা থামছেই না ভিকারুননিসায়

এস এম আববাস
২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:০০আপডেট : ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:৫৫

শিক্ষার্থী ভর্তিতে দুর্নীতি, অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে ৬৯ জন শিক্ষক নিয়োগ, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগে অনিয়মসহ নানা কারণে দীর্ঘ দিন থেকে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি চলছে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। নতুন করে যুক্ত হয়েছে ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ। আর এই পরিস্থিতির মধ্যেই ১৬৯ জন ছাত্রী ভর্তির দুর্নীতির চিত্র সামনে এসেছে।

এত কিছু ঘটে গেলেও প্রতিষ্ঠানটির শৃঙ্খলা রক্ষায় গভর্নিং বডি কোনও ভূমিকা পালন করছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটিতে গভর্নিং বডির দুর্নীতি, অযোগ্যতা এবং অধ্যক্ষের গাফিলতির কারণে বিশৃঙ্খলা থামছে না।

গাফিলতি যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের আজিমপুর দিবা শাখায় সিনিয়র শিক্ষক মোহাম্মদ মুরাদ হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের লিখিত অভিযোগ করা হয় গত ৭ ফেব্রুয়ারি। পরদিন ৮ ফেব্রুয়ারি তদন্ত কমিটি গঠন করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী জানান, কমিটিকে ৭ কর্ম দিবস সময় দেওয়া হয়েছিল প্রতিবেদন দাখিলের জন্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মমতাজ বেগমকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত গঠন করা হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য হচ্ছেন শিক্ষক ড. ফারহানা খানম এবং শামসুন আরা সুলতানা। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয় গত ২২ ফেব্রুয়ারি।

অভিযোগ উঠে যৌন হয়রানির অভিযোগের পর এ বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন না অধ্যক্ষ বা গভর্নিং বডি। এই পরিস্থিতির মধ্যে গত শুক্রবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হলে তড়িঘড়ি করে অভিযুক্ত শিক্ষক মোহাম্মদ মুরাদ হোসেন সরকারকে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কাজটি দায়সারা গোছের। কারণ তদন্ত কমিটি সময়মতো প্রতিবেদন দাখিল করেনি। আর পরে দাখিল করলেও কোনও ব্যবস্থা না নিয়ে চুপচাপ ছিল গভর্নিং বডি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল না হলে কিছুই হতো না।

যৌন হয়রানির তদন্ত নিয়ে বিতর্ক

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘মোট ৭৭ জন ছাত্রীর মধ্যে ৬০ জন ছাত্রী শিক্ষক মুরাদের পক্ষে ইতিবাচক মন্তব্য করেন। আর ১৭ জন ছাত্রী নেতিবাচক মন্তব্য করেন।’

ছাত্রীদের কাছে লিখিত প্রশ্ন সরবরাহ করে এসব মন্তব্য নিয়েছে তদন্ত কমিটি। যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের কথা উল্লেখ করেছে ১৭ জন ছাত্রী। অভিযোগ রয়েছে, ভয়ে অনেক ছাত্রী লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তদন্ত কমিটি ১৭ জন ছাত্রীর কাছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ পাওয়ার পর আরও ৬০ জন ছাত্রীর কাছ থেকে বক্তব্য নিয়েছে যারা ভুক্তভোগী নন। এমনকি তারা জানেই না ওই শিক্ষকের আচরণ সম্পর্কে। অভিযুক্ত শিক্ষককে বাঁচাতে এভাবে তদন্ত করা হয়েছে। তাছাড়া তদন্ত কমিটি সুপারিশ করেছে শিক্ষককে কোনও শাস্তি না দিয়ে অধ্যক্ষর কার্যালয়ে সংযুক্ত করতে।

তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, ‘কোনও শিক্ষক নিজে বা তার সন্তান দ্বারা বা কোনও বর্তমান অথবা প্রাক্তন ছাত্রী দ্বারা প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করলে (বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহার করে বা অন্য কোনোভাবে) তা প্রমাণিত হলে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে, নতুবা শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হবে।

শিক্ষক মুরাদ হোসেনের বিরুদ্ধে ৩ জন ছাত্রীর আনা অভিযোগের ঘটনাগুলো এক বছর আগের হওয়ায় এবং তিনি পবিত্র হজ করার পর এ ধরনের কোনও ঘটনা ঘটেনি বিধায় তাকে বরখাস্ত না করে শেষবারের মতো সতর্ক করে অন্য কোনও শাখায় বদলি করা যেতে পারে। তাছাড়া অভিযোগকারীরা উপযুক্ত কোনও প্রমাণ দিতে না পারায় তার বিরুদ্ধে অন্য কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে উচ্চ পর্যায়ে কমিটি গঠন করা যেতে পারে।

জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী বলেন, ‘উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই নাম প্রকাশ করছি না।’

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মজিদ সুজন বলেন, ১৭ জন ছাত্রী যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের কথা বলার পরও অভিযোগের প্রমাণ হয়নি তদন্ত কমিটি এ কথা বলে কীভাবে? তাছাড়া হজ করার পর এ ধরনের কাজ করেনি বলেই তাকে এখন আগের অপরাধ থেকে অব্যাহতি দিতে হবে?

ভর্তি নিয়ে নতুন দুর্নীতি

বুধবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) প্রতিষ্ঠানটির প্রথম শ্রেণির ১৬৯ জন শিক্ষার্থীর ভর্তি বাতিল করতে নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বয়সের নিম্নসীমা (৬+) ভর্তি নীতিমালায় উল্লেখ করা আছে। আর বয়সের উচ্চসীমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারণ করতে বলা আছে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ নিজেরাই বয়সের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ করে তা নিজেরাই মানেনি।’

আগের ভর্তি নিয়ে দুর্নীতি

এর আগে ২০১৯ সালে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ৪৪৩ জন অতিরিক্ত ছাত্রী ভর্তি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সমালোচনার মুখে পড়ে। ওই সময় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে কেকা রায় চৌধুরী দায়িত্বে থাকাকালে ৬ থেকে ৮ জানুয়ারি প্রথম শ্রেণিতে ১৬২ জনকে ভর্তি করানো হয়। আর পরবর্তী ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে হাসিনা বেগম দায়িত্বে থাকাকালে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি করা হয় ২৮১ জন। এই দুই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষেরই ভর্তি ফরমে সই ছিল না। অভিযোগ ছিল গভর্নিং বডি জোর করে শিক্ষার্থী ভর্তি করায়। এই অতিরিক্ত ছাত্রী ভর্তির বিরোধিতা করলে ওই সময়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হাসিনা বেগমের বিরুদ্ধে গভর্নিং বডি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরে অভিযোগ জানায়। ফলে হাসিনা বেগমের এমপিও বন্ধ করে দেয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। কিন্তু কোনও শিক্ষার্থীর ভর্তি বাতিল হয়নি। আর কেকা রায়ের বিরুদ্ধে আজও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সেই সময়ের ও বর্তমান গভর্নিং বডি এ ব্যাপারে উদ্যোগও নেয়নি।

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগে অনিয়ম

নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র শিক্ষক হবেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। কিন্তু তা করা হয়নি। কর্তৃপক্ষ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর থেকে বলা হয়েছে, হাসিনা বেগম সিনিয়র শিক্ষক হলেও তার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ছাত্রী ভর্তির অভিযোগ ছিল। অথচ তথ্য বলছে— কেকা রায় চৌধুরী দায়িত্বে থাকাকালে গত ৬ থেকে ৮ জানুয়ারি প্রথম শ্রেণিতে ১৬২টি ভর্তি করানো হয়েছে। অথচ তাকেই দেওয়া হয়েছে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ।

অ্যাডহক কমিটির জন নিয়োগ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়নি বর্তমান কমিটি

২০২২ সালের অ্যাডহক কমিটি ৬৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ করে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। ওই সময় সরকারের একজন সচিব ছিলেন অ্যাডহক কমিটির সভাপতি। এই নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ উঠলেও ব্যবস্থা নেয়নি পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ কমিটি। বর্তমান কমিটির সভাপতি ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার। সরকারের বড় বড় কর্মকর্তারা গভর্নিং বডির সভাপতি ও সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ থাকার পরও বিশৃঙ্খলা বন্ধ হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন, ‘সরকারের বড় কর্মকর্তারা গভর্নিং বডির সভাপতি থাকার পরও প্রতিষ্ঠানটিকে শৃঙ্খলায় আনা যাচ্ছে না। শিক্ষক নিয়োগ, ছাত্রী ভর্তিতে দুর্নীতি, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগে অনিয়মসহ নানা কারণে বিশৃঙ্খলা থামছে না। নতুন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটিতে।

প্রতিষ্ঠানটিকে শৃঙ্খলায় আনতে গভর্নিং বডির ভূমিকার বিষয়ে জানতে চাইলে গভর্নিং বডির সদস্য মৌসুমী খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার, তিনি ভালো মানুষ কিন্তু সময় পান না। তাছাড়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের আরও একটু বুঝে-শুনে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তাহলে বিশৃঙ্খলা হতো না। অধ্যক্ষ গভর্নিং বডির সঙ্গে সময় কম দেন। প্রায়ই তিনি বলেন, অসুস্থ আছি। উনি যদি ভূমিকা নিতেন তাহলে আজকের এই দিনটা দেখতে হতো না।’

বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ও নানা দুর্নীতির বিষয়ে গভর্নিং বডির সদস্য গোলাম বেনজীর পলাশ বলেন, ‘অনিয়ম করে শিক্ষার্থী ভর্তি না করানোর জন্য আমি লিখিতভাবে অধ্যক্ষকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারপরও ভর্তি করা হয়েছে।’

যৌন হয়রানি প্রসঙ্গে গোলাম বেনজীর পলাশ বলেন, ‘যৌন হয়রানির বিষয়টি নিয়ে আমি জানার পরপরই অধ্যক্ষকে জানিয়েছি। তদন্ত কমিটি করা হয়েছে কিন্তু আমি জানতে পারিনি, পরে জেনেছি। সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে, সেই চিঠি আমাকে দেওয়া হয়নি। সবকিছু আমি একা করতে পারি না। অধ্যক্ষের নিয়ন্ত্রণ কম, পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ থাকলে এ অবস্থা হতো না। অধ্যক্ষ সময় দিলে বিশৃঙ্খলা হতো না। আমাকে অনেক ক্ষেত্রেই সংযুক্ত করা হয় না। সভাপতিকে তথ্য দিলে তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেন। কিন্তু সভাপতি হয়তো অনেক তথ্যই সময়মতো পান না।

/এমএস/
সম্পর্কিত
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক সহিংসতার স্থান নেই: মেয়র তাপস
পুরান ঢাকায় কেমন চলেছে কারফিউ
সদরঘাট থেকে চলছে লঞ্চ, তবে যাত্রী নেই
সর্বশেষ খবর
অনতিবিলম্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে: সাধারণ শিক্ষার্থী মঞ্চ
অনতিবিলম্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে: সাধারণ শিক্ষার্থী মঞ্চ
অলিম্পিকে ৪০ বছরে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স যেমন ছিল
অলিম্পিকে ৪০ বছরে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স যেমন ছিল
জুমার নামাজ ঘিরে বাড়তি সতর্কতা
জুমার নামাজ ঘিরে বাড়তি সতর্কতা
এক দফা আন্দোলন সফলের আহ্বান ছাত্রদলের
এক দফা আন্দোলন সফলের আহ্বান ছাত্রদলের
সর্বাধিক পঠিত
নাটকীয় হারে আর্জেন্টিনার অলিম্পিক যাত্রা শুরু
নাটকীয় হারে আর্জেন্টিনার অলিম্পিক যাত্রা শুরু
মারা গেলেন ব্যান্ড তারকা শাফিন আহমেদ
মারা গেলেন ব্যান্ড তারকা শাফিন আহমেদ
যা ঘটেছিল নরসিংদী কারাগারে, যেভাবে পালালেন ৮২৬ বন্দি
যা ঘটেছিল নরসিংদী কারাগারে, যেভাবে পালালেন ৮২৬ বন্দি
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক অস্থিরতা প্রসঙ্গে যা বলছে ভারত
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক অস্থিরতা প্রসঙ্গে যা বলছে ভারত
এখনও আঁতকে ওঠেন যাত্রাবাড়ী, কাজলা ও শনির আখড়ার বাসিন্দারা
এখনও আঁতকে ওঠেন যাত্রাবাড়ী, কাজলা ও শনির আখড়ার বাসিন্দারা