X
শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪
১ আষাঢ় ১৪৩১

কাশ্মির সীমান্তের দুই দিকে বিপরীত দুই দৃশ্য

দিল্লি প্রতিনিধি
১৭ মে ২০২৪, ১২:১০আপডেট : ১৭ মে ২০২৪, ১৭:৩৯

‘আবার অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে কাশ্মির’– এই পরিচিত শিরোনামটি কাশ্মিরের যে অংশের সঙ্গে মানুষ বেশি ‘রিলেট’ করে থাকেন সেখানে পরিস্থিতি এখন এমন নয়। বরং বলা চলে যে এলাকা নিয়ে দীর্ঘদিন এমন শিরোনাম চোখে পড়েছে সেটা এখন শান্ত ও স্বাভাবিক। বরং কাশ্মিরের অন্য অংশটিতেই বিক্ষোভ-প্রতিবাদ ক্রমশ প্রশাসনের হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে!

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে যখন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ঢল নেমেছে এবং দারুণ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দেশের সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তখন নিয়ন্ত্রণরেখা বা লাইন অব কন্ট্রোলের (এলওসি) অন্য পারে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে সাধারণ মানুষ রোজ তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, পাকিস্তান যেটাকে ‘আজাদ কাশ্মির’ বলে থাকে সেই ভূখণ্ড রীতিমতো জ্বলছে। 

পাকিস্তান শাসিত কাশ্মিরে বিক্ষোভ সমাবেশ (ছবি: সংগৃহীত)

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এমনও বলছেন, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে এই মুহূর্তে যা পরিস্থিতি, সেটাকে একাত্তরে বাংলাদেশের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করলেও বোধহয় ভুল হবে না। ৫৩ বছর আগে যেভাবে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানের নির্যাতন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক প্রতিবাদ জানিয়ে ইসলামাবাদের শাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করেছিলেন, ‘আজাদ কাশ্মিরে’ও ঠিক সেই ধরনের আন্দোলন দানা বাঁধছে বলে তারা অনেকেই বলছেন।  

স্বাধীনতার দাবিতে ২০১৯ সালে পাকিস্তানশাসিত কাশ্মিরে মিছিল (ছবি: সংগৃহীত)

অন্যদিকে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে যেখানে মাত্র কয়েক বছর আগেও বিক্ষোভ-প্রতিবাদ, জঙ্গি হামলা কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের পাথর ছোড়া ছিল রোজকার নিয়মিত দৃশ্য, সেই জায়গায় বছর পাঁচেক আগে ৩৭০ ধারা বিলোপের পর থেকেই পরিস্থিতির  অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকা কাশ্মিরের বাসিন্দারা ক্রমশ জাতীয় জীবনের মূল ধারায় ফিরে আসছেন এবং উন্নয়ন ও পর্যটনের হাত ধরে সেখানে অর্থনীতির লেখচিত্রও ঊর্ধ্বমুখী বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হচ্ছে।

কিন্তু পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে পরিস্থিতি কেন এভাবে আচমকা অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠলো?

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ও স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালিস্ট অমিত বনসাল দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মিরের ওই ভূখণ্ডটি নিয়ে গবেষণা করছেন। তার মতে, এই বিক্ষোভ-প্রতিবাদ রাতারাতি শুরু হয়নি। এর পেছনে আসলে নির্দিষ্ট কিছু কারণ আছে এবং রয়েছে বহু দিনের পুঞ্জীভূত অসন্তোষ।

প্রথমত, পাকিস্তান অংশের কাশ্মির সে দেশের একটি অবহেলিত ভূখণ্ড। জ্বালানি, খনিজসম্পদ, রেমিট্যান্স, কৃষি, পর্যটন– নানা দিক থেকে পাকিস্তানের বাকি অংশের চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ এই এলাকা, কিন্তু প্রশাসনের কাছে এটি বঞ্চিতই রয়ে গেছে। যেমন– ওই অঞ্চলের মংলা ড্যাম একাই পুরো পাকিস্তানের ২০ শতাংশ জলবিদ্যুৎ তৈরি করে থাকে। কিন্তু তার ৭০ শতাংশই কাজে লাগানো হয় পাঞ্জাব প্রদেশে। পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মির ও গিলগিত-বালতিস্তানের বেশিরভাগ জায়গায় আজও ইলেকট্রিসিটিই পৌঁছায়নি। আবার বাকি পাকিস্তানের চেয়ে কাশ্মিরের ওই অংশে সাক্ষরতার হার অনেক বেশি, তা সত্ত্বেও সেখানে উচ্চশিক্ষার জন্য কোনও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়নি। 

অবহেলা ও বঞ্চনার প্রতিবাদে পথে নেমেছেন মানুষ (ছবি: সংগৃহীত)

দ্বিতীয়ত, ওই অঞ্চলে ভালো রাস্তা, সেতু, হাসপাতালের মতো অবকাঠামো আজ পর্যন্ত নেই। যেটুকু যা হয়েছে তা পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর জন্য বা চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডরের সুবাদে। কিন্তু সেখানে স্থানীয়দের অ্যাকসেস নেই। ২০০৫ সালে বিধ্বংসী ভূমিকম্পে যখন পাকিস্তান শাসিত কাশ্মিরে লক্ষাধিক লোক নিহত হয়েছিলেন, দুর্গতরা কিন্তু পাকিস্তানে সেনা ক্যাম্পের হাসপাতালে পর্যন্ত ঢুকতে পারেননি!

তৃতীয়ত, এই মুহূর্তে ওখানে যে তুমুল বিক্ষোভ চলছে তার মূল কারণ হলো আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি ও জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্য। পুরো পাকিস্তানেই এই সমস্যা তীব্র, কিন্তু পাকিস্তানের দিকের কাশ্মিরে তা আরও ভয়ংকর আকার নিয়েছে। এর একটা কারণ আটার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যে গোটা পাকিস্তানে যেখানে ভর্তু‍কি দেওয়া হয়, সেই জায়গায় কাশ্মিরের মানুষ তা থেকে বঞ্চিত। তাদের আটা কিনতে হয় অনেক বেশি দামে। ফলে গত সপ্তাহের বিক্ষোভের সময় ক্ষুব্ধ কাশ্মিরিরা যে একজন পুলিশকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে, তাতে তাই বোধহয় অবাক হওয়ার কিছু নেই!  

চতুর্থত, পাকিস্তানি কর্তৃ‍পক্ষের হাতে স্থানীয়রা প্রবলভাবে শোষিত ও নির্যাতিত। উপদ্রুত ওই অঞ্চলে গোলাগুলিতে কারও প্রাণ গেলে বা মাইন বিস্ফোরণে কেউ মারা গেলে তারা ক্ষতিপূরণ পর্যন্ত পান না। পাকিস্তানি সেনা বা জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো স্থানীয়দের জমি জোর করে দখল করে সেখানে ঘাঁটি স্থাপন করে, তাদের ব্যবহার করে পোর্টার (কুলি) বা গাইড হিসেবে। স্থানীয় তরুণ বা যুবকদের তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিলিশিয়া বাহিনীতে ভর্তি করানো হয়। বাইরে থেকে আসা ভাড়াটে সেনা বা মার্সিনারিদের হাতে এলাকার তরুণীদের লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও প্রচুর ঘটেছে, যার বিরুদ্ধে মানুষ এখন গর্জে উঠেছেন।

এছাড়াও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে আজ পর্যন্ত যত নির্বাচন হয়েছে তার সবই কারচুপি করে ইসলামাবাদের পছন্দের প্রার্থীকে জেতানো হয়েছে বলে অভিযোগ। এছাড়া গোটা নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে পাকিস্তানি সেনারা যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, সেটাও স্থানীয়দের ক্ষোভের একটা বড় কারণ।

সর্বোপরি, আজকের যুগে সব খবরই সর্বত্র পৌঁছায়। পাকিস্তানের দিকের কাশ্মিরিরাও জানতে পারেন ভারতের দিকে তাদের ভাইবোনরাও কেমন আছেন। এই তুলনাটাও তাদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয় যথারীতি। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট যেখানে ৫০ বিলিয়ন ডলার, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে সেই অঙ্কটা ৮৮ থেকে ৯০ মিলিয়ন ডলারের মতো, যা কিনা ২ শতাংশেরও কম। ফলে পাকিস্তানের দিকের কাশ্মিরিরা যে তুলনায় কতটা উন্নয়নবঞ্চিত ও অবহেলিত তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি একেবারে আমূল বদলে গেছে (ছবি: সংগৃহীত) 

পহেলগাম

ভারতের দিকে কাশ্মিরে ছবিটা কতটা বদলেছে, তা বোঝানোর জন্য জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য পহেলগামের উদাহরণই বোধহয় যথেষ্ট। পহেলগাম ডেভেলপমেন্ট অথরিটির সিইও তারিক হুসেইন নাইক জানাচ্ছেন, এ বছরের প্রথম চার মাসে শুধু পহেলগামেই তিন লাখেরও বেশি পর্যটক এসেছেন, যা একটি সর্বকালীন রেকর্ড।

এর মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত হাজারেরও মতো আবার বিদেশি পর্যটক এবং তাদের মধ্যে অর্ধেকই বাংলাদেশি নাগরিক, এই তথ্যও জানাচ্ছেন তারিক হুসেইন নাইক।

গুলমার্গ-সোনমার্গেও পর্যটকের ঢল নেমেছে (ছবি: সংগৃহীত)

পহেলগামে গ্রীষ্মের পুরো সিজনটাই সব হোটেল বুকড হয়ে আছে, দেশ-বিদেশ থেকে দলে দলে ট্যুরিস্টরা আবার আসছেন। স্থানীয় দোকানদার, হোটেল-মালিক, ঘোড়াওয়ালা থেকে শুরু করে পর্যটন-শিল্পের সঙ্গে জড়িত সবারই তাই মুখভরা হাসি!

মুজফফরাবাদ (পাকিস্তানের দিকে কাশ্মিরের রাজধানী) আর শ্রীনগরের (ভারতের দিকে কাশ্মিরের রাজধানী) সার্বিক পরিবেশে এতটা বৈপরীত্য বোধহয় গত সাত দশকে কখনও দেখা যায়নি!

/এফএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
কুয়েতে অগ্নিকাণ্ডে নিহত শ্রমিকদের মরদেহ ফিরলো ভারতে
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা‘ভারতের সঙ্গে পানির সমাধান না হলে বাংলাদেশের খাদ্যঝুড়ি ঝুঁকিতে পড়বে’
এমপি আজীম হত্যাকাণ্ডখুনির সঙ্গে তৃতীয় মাধ্যমে যোগাযোগ করেন মিন্টু, দিয়েছেন অর্থ
সর্বশেষ খবর
ঈদযাত্রা: বঙ্গবন্ধু সেতুতে টোল আদায়ে নতুন রেকর্ড
ঈদযাত্রা: বঙ্গবন্ধু সেতুতে টোল আদায়ে নতুন রেকর্ড
শনি ও রবিবার যেসব এলাকায় ব্যাংক খোলা
শনি ও রবিবার যেসব এলাকায় ব্যাংক খোলা
প্রোটিয়াদের কাছে হেরে বাংলাদেশকে হুমকি দিয়ে রাখলো নেপাল
প্রোটিয়াদের কাছে হেরে বাংলাদেশকে হুমকি দিয়ে রাখলো নেপাল
আমরা আক্রান্ত হলে ছেড়ে দেবো না: সেন্টমার্টিন নিয়ে ওবায়দুল কাদের
আমরা আক্রান্ত হলে ছেড়ে দেবো না: সেন্টমার্টিন নিয়ে ওবায়দুল কাদের
সর্বাধিক পঠিত
অবশেষে বদলি হলেন সাতক্ষীরা পৌরসভার সেই সিইও
অবশেষে বদলি হলেন সাতক্ষীরা পৌরসভার সেই সিইও
সেন্টমার্টিনে খাদ্যসংকট, কক্সবাজার থেকে গেলো পণ্যবোঝাই জাহাজ
সেন্টমার্টিনে খাদ্যসংকট, কক্সবাজার থেকে গেলো পণ্যবোঝাই জাহাজ
যানজট এড়াতে ঘুরতে হচ্ছে ২৯ কিলোমিটার সড়ক
যানজট এড়াতে ঘুরতে হচ্ছে ২৯ কিলোমিটার সড়ক
রুশ সম্পদ ‘চুরি’র পরিণতি পশ্চিমাদের ভুগতে হবে, হুঁশিয়ারি পুতিনের
রুশ সম্পদ ‘চুরি’র পরিণতি পশ্চিমাদের ভুগতে হবে, হুঁশিয়ারি পুতিনের
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ‘পিঁপড়ার গতিতে’ চলছে গাড়ি
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ‘পিঁপড়ার গতিতে’ চলছে গাড়ি