মিয়ামির নিজের ছোট বাড়িটির সামনে প্রস্ফুটিত কৃষ্ণচূড়া গাছটির নিচে বসেও একধরনের অস্বস্তি তাড়া করে বেড়াচ্ছে আলিনা ফার্নান্দেজ রেভুয়েলতাকে (৭০)। কিউবার বিপ্লবের নায়ক ফিদেল কাস্ত্রোর এই গৃহত্যাগী মেয়ে তিন দশক ধরে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি শহরে। কিউবা আবার স্বাভাবিক হবে এবং তিনি নিজের জন্মভূমিতে ফিরে যেতে পারবেন, সেই আশায় বছরের পর বছর কেটে গেলেও পরিস্থিতি বদলায়নি। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন কিউবা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অঙ্গীকার করছেন, তখন রাত ৩টায় উঠেও ইনস্টাগ্রামে নজর রাখছেন কাস্ত্রোর এই আলোচিত কন্যা।
তেল সংকট, ময়লা-আবর্জনার স্তূপ আর বিদ্যুৎহীনতায় যখন কিউবার সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত, তখনও ক্ষমতার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন কাস্ত্রোর আত্মীয়রা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আশ্বাস দিয়েছেন যে, তিনি কিউবার বিষয়টি দেখবেন এবং বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে কাস্ত্রোর মেয়ে আলিনা মনে করেন, বাইরের সাহায্য নিয়ে যেমন স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তেমনি বাইরের সামান্য ধাক্কাতেই তা ভেঙে পড়ে। পাতিল বাজিয়ে ৫০ বছরের ওপর চেপে বসা কোনও সরকারকে উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়।
ফিদেল কাস্ত্রো ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারী নাতালিয়া রেভুয়েলতা ক্লিউসের সম্পর্কের ফসল আলিনা ফার্নান্দেজ। তাদের এই সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল এক চরম বৈরী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। তবে বাবার নামের পদবি ব্যবহার করেন না আলিনা। কাস্ত্রোর অন্য সন্তানরা যখন তার আদর্শ মেনে নিয়েছেন, তখন ১৯৯৩ সালে ছদ্মবেশে স্প্যানিশ পর্যটক সেজে দেশ ছাড়েন আলিনা। এরপর মিয়ামিতে রেডিও শো সিম্পলি আলিনা-এর মাধ্যমে বছরের পর বছর নিজের বাবার শাসনের তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদ করে এসেছেন তিনি।
কাস্ত্রোর মৃত্যুর পর তার স্বজনরা ক্ষমতায় থেকে গেলেও আলিনা নিজের মতো সাধারণ জীবনযাপন বেছে নেন। সম্প্রতি তাকে কেন্দ্র করে ‘রেভোলিউশনস ডটার’ নামের একটি ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে। এর মাঝেই আবার ট্রাম্প প্রশাসনের কিউবা নীতি নিয়ে বিভিন্ন গুঞ্জন শুরু হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর নামে বিচার বিভাগে অভিযোগ দায়ের এবং তার জন্মদিনে বিপ্লবী পোশাক পরে প্রকাশ্যে আসা; সব মিলিয়ে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আলিনা ফার্নান্দেজ আফসোস করে বলেন, এত নাটকীয় মোড়ের পরও দিনশেষে লাভ কিছুই হয়নি।
বাবার মৃত্যুর আগে ও পরে নিজের জীবনকে সাদা-কালো হিসেবেই মূল্যায়ন করেন ফার্নান্দেজ। ১০ বছর বয়সে নিজের পিতৃপরিচয় জানার পর থেকে একধরনের চরম হতাশা আর প্রতারণার অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরে। কাস্ত্রো তাকে কাঠের পুতুল উপহার দেওয়া থেকে শুরু করে ১৬ বছর বয়সে বিয়ে করতে বাধা দেওয়া, সবটাই ছিল কাস্ত্রোর একতরফা প্রভাব। তিনি আরও বলেন, আমার প্রজন্ম এই বিপ্লব শুরু করেনি। কিন্তু আমরা প্রতিদিনই এর মাশুল গুনেছি।
দেশ ছেড়ে আসার পর নিজের মাতৃভূমি এবং জীবনের ছায়া তাকে তাড়া করে চলেছে। সম্প্রতি মা মারা যাওয়ার পর হাভানার স্মৃতিচিহ্নগুলো প্রায় মুছে গেলেও তিনি কেবল কাস্ত্রো এবং তার মায়ের মধ্যে বিনিময় হওয়া ঐতিহাসিক চিঠিগুলো উদ্ধার করে মিয়ামির ব্যাংকের সেফ ডিপোজিট বাক্সে রেখেছেন।
সবশেষে এক বিশাল রক্তের টান ও ইতিহাসকে বয়ে নিয়ে চলা আলিনা ফার্নান্দেজ জীবনের শেষ অধ্যায়ে হলেও নিজের জন্মভূমিতে ফিরতে চান। তিনি বলেন, সেখানে আমার কোনও চমৎকার অভিজ্ঞতা কখনোই ছিল না, তবে হয়তো ভবিষ্যতে হতেও পারে।
সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট

কোন উড়োজাহাজকে বলা হয় ‘আকাশের সম্রাট’
যে শহরকে বলা হয় ভারতের ‘লাচ্ছি রাজধানী’
‘কৃত্রিম সূর্য’ তৈরির আরও কাছাকাছি চীন