X
রবিবার, ১৯ মে ২০২৪
৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

‘চোখের বদলে চোখ’ আইন ফিরিয়ে আনলো তালেবান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭:৫৭আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭:৫৭

আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় গজনির একটি আদালতের ছোট্ট কক্ষে মাথায় পাগড়ি পরা বিচারকের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন এক বয়স্ক ব্যক্তি। তাকে হত্যার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি বিচারকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন।

৭৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তি স্বীকার করেছেন প্রতিশোধ নিতে তিনি এক আত্মীয়কে গুলি করে হত্যা করেছেন। কারণ তিনি শুনেছেন, তার শ্যালিকার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক রয়েছে ওই ব্যক্তির।

চোখের বদলে চোখ শরিয়াহ সাজার বিধান আদালতে পালন করার জন্য গত মাসে নির্দেশ দিয়েছেন তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা। এই নির্দেশের পর প্রথমবার প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো। আদালতের রায় অনুসারে, নিহত ব্যক্তির এক আত্মীয় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন।

 বয়স্ক ব্যক্তি বিচারককে বলেন, দুই পরিবারের মধ্যে আমরা মীমাংসা করে ফেলেছি। আমরা যে ক্ষতিপূরণ প্রদানে একমত হয়েছি, এই বিষয়ে সাক্ষী রয়েছে।

গত বছর আফগানিস্তানে পুনরায় তালেবান ক্ষমতায় আসার গজনির আদালতে এই বিচার প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করার বিরল সুযোগ প্রথমবারের মতো পেয়েছে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি।

২০০১ সালে তালেবান ক্ষমতা থেকে উৎখাত হওয়ার পর আফগানিস্তানে নতুন বিচার ব্যবস্থা গঠনে কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। যা ছিল ইসলামি ও ধর্মনিরপেক্ষ আইনের মিশেল। যাতে থাকতে যোগ্য কৌঁসুলী এবং বাদীর আইনজীবী ও বিচারক।

বিচার ব্যবস্থায় অনেক নারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তারা কট্টরপন্থী তালেবান জঙ্গিদের অনেক মামলা পরিচালনা করেছেন এই নারীরা। পারিবারিক আদালতে অনেক বেশি লিঙ্গ সমতা এসেছিল।

কিন্তু গত বছর ক্ষমতা নেওয়ার পর তালেবান এই পুরো ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছে। এখন রায় ও শাস্তি কার্যকরের দায়িত্ব পালন করছেন সব পুরুষ মাওলানা।

ইসলামি আইন, বা শরিয়াহ মুসলিম বিশ্বের জন্য বিধান হিসেবে কাজ করে। যা বিনয়, অর্থ এবং অপরাধের বিষয়ে পথ নির্দেশনা দেয়। অবশ্য, স্থানীয় রীতি, সংস্কৃতি ও মাদ্রাসার শিক্ষা অনুসারে এই শরিয়াহ আইনের বাস্তবায়ন একেক জায়গায় একেক রকম।

তালেবানের ধর্মীয় নেতারা আফগানিস্তানে এই শরিয়াহ আইনের সবচেয়ে কট্টর সংস্করণ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। তারা এমন মৃত্যুদণ্ড এবং শারীরিক শাস্তির বিধান জারি করেছে যা আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রে খুব একটা কার্যকর নয়।

 গজনি আদালতের প্রধান মহিউদ্দিন উমারি বলেন, আগের সরকার ও বর্তমানের বিচার ব্যবস্থার পার্থক্য আকাশ-পাতাল।

 ‘আল্লাহ আমাদের পথ দেখান’

গজনির কর্মকর্তারা আগের সরকারের আমলের পশ্চিমা ধাঁচের কোর্টরুম ব্যবস্থার ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে। এর বদলে বিচার প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয় ছোট আকারের একটি কক্ষে, যেখানে উপস্থিতরা মেঝেতে কার্পেটে বসেন।

বদ্ধ ঘরটিতে উষ্ণতার জন্য পুরনো কাঠের চুলা রয়েছে, ঘরের এক কোনায় রয়েছে একটি বিছানা। যেখানে আছে ধর্মীয় বই এবং একটি কালাশানিকভ রাইফেল।

তরুণ বিচারক মোহাম্মদ মোবিন কোনও প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার আগে নির্বিকারভাবে অন্যদের কথা শোনেন।

এরপর আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরেকটি শুনানির তারিখ ঘোষণা করেন। তিনি সময় দেন হত্যায় দায়ে অভিযুক্ত বয়স্ক ব্যক্তির দাবি অনুসারে নিহতের পরিবারের সঙ্গে ক্ষতিপূরণের বিষয়ে সমঝোতার পক্ষে সাক্ষী হাজির করার জন্য।

বিচারক মোবিন বলেন, যদি দাবি প্রমাণ করতে পারেন তাহলে রায় সংশোধন হতে পারে। যদি প্রমাণে ব্যর্থ হন তাহলে নিশ্চিতভাবে শরিয়াহ আইনের কিসাস (চোখের বদলে চোখ) বাস্তবায়ন করা হবে।

মোবিনের চারপাশে পাতলা, হাতে লেখা নথিপত্র রয়েছে। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তিনি আপিল আদালতে দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি বলেছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গজনি প্রদেশে প্রায় এক ডজন মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও কোনও রায় কার্যকর করা হয়নি। মূলত আপিল প্রক্রিয়ার কারণে।

৩৪ বছর বয়সী বিচারক বলেন, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব কঠিন এবং আমরা খুব সতর্ক থাকি। কিন্তু যদি আমাদের অকাট্য প্রমাণ থাকে, তাহলে আল্লাহর দেখানো পথ অনুসারে এসব মানুষের জন্য আমাদের কোনও সহানুভূতি থাকে না।  

প্রবীন হত্যাকারীর আপিল যদি ব্যর্থ হয় তাহলে মামলাটি যাবে কাবুলে সুপ্রিম কোর্টে, শেষে যাবে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লা আখুন্দজাদা সব সর্বোচ্চ সাজার অনুমোদন দেন।

এই বয়স্ক ব্যক্তির বিচার প্রক্রিয়াটি গজনির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ফারাহতে এই মাসের শুরুতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর তালেবান ক্ষমতায় আসার প্রথম প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মানবাধিকার সংগঠন, বিদেশি সরকার ও সংস্থাগুলো এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

‘স্বচ্ছতা প্রদর্শন’

গজনি আদালতের প্রধান উমারির দাবি, আগের সরকারের বিচার প্রক্রিয়ার চেয়ে শরিয়াহ আইন অনেক ভালো। যদিও স্বীকার করছেন কর্মকর্তাদের আরও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন রয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের র‍্যাংকিং অনুসারে, বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ১৮০টি দেশের মধ্যে আফগানিস্তানের অবস্থান ১৭৭তম। দেশটির আদালতগুলো ঘুষের জন্য কুখ্যাত এবং বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে।

উমারির দাবি, ‘ইসলামি আমিরাত স্বচ্ছতা প্রদর্শন করছে।’ আফগানিস্তানকে ইসলামি আমিরাত নামেই অভিহিত করে

অনেক আফগান বলছেন, ফৌজদারি মামলা নিয়ে শরিয়াহ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পক্ষে তারা। তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়া কম দুর্নীতিপ্রবণ।

আইনবিদরা যুক্তি তুলে ধরে বলছেন, নতুন ব্যবস্থায় ফৌজদারি মামলাগুলোতে ভুল বিচার হওয়ার আশঙ্কা বেশি। 

নিরাপত্তা আশঙ্কায় উদ্বিগ্নতার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বেকার প্রসিকিউটর বলেন, কিছু কিছু মামলার রায় দ্রুত হলে ভালো। কিন্তু বেশিরভাগ মামলায় তা হঠকারী রায়ের দিকে নিয়ে যায়।

উমারি জোর দিয়ে বলছেন, সব রায় গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়। কোনও বিচারক ভুল করলে আমরা তদন্ত করি।

কিন্তু গজনিতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া বয়স্ক ব্যক্তি বলেছেন, তার কোনও আইনজীবী ছিল না এবং তার আপিলের মীমাংসা মাত্র ১৫ মিনিটে শেষ হয়ে গেছে।

তিনি বলেছিলেন, আদালতের আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত হয়নি।

হাতকড়া পরা দুই হাতে তসবিহ পড়তে পড়তে তিনি আরও বলেন, আট মাসের বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছি আমি। নিহতের পরিবার আমাকে ক্ষমা করতে রাজি হয়েছে।

সূত্র: এএফপি

/এএ/
সম্পর্কিত
লোকসভা নির্বাচনের পঞ্চম দফার ভোট কাল
বাংলাদেশি টাকা পাচার করতে গিয়ে সিপিএম নেতা গ্রেফতার
তাইওয়ানের পার্লামেন্টে এমপিদের হাতাহাতির ভিডিও ভাইরাল
সর্বশেষ খবর
অভিবাসী কর্মীদের জন্য আরও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণ হবে: প্রতিমন্ত্রী
অভিবাসী কর্মীদের জন্য আরও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণ হবে: প্রতিমন্ত্রী
কেন স্বাস্থ্য খাতে বাজেটে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন
কেন স্বাস্থ্য খাতে বাজেটে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন
কিংসের বিপক্ষে ফাইনালের পাঁচ রেফারি নিয়ে আপত্তি মোহামেডানের 
কিংসের বিপক্ষে ফাইনালের পাঁচ রেফারি নিয়ে আপত্তি মোহামেডানের 
লোকসভা নির্বাচনের পঞ্চম দফার ভোট কাল
লোকসভা নির্বাচনের পঞ্চম দফার ভোট কাল
সর্বাধিক পঠিত
মামুনুল হক ডিবিতে
মামুনুল হক ডিবিতে
‘নীরব’ থাকবেন মামুনুল, শাপলা চত্বরের ঘটনা বিশ্লেষণের সিদ্ধান্ত
‘নীরব’ থাকবেন মামুনুল, শাপলা চত্বরের ঘটনা বিশ্লেষণের সিদ্ধান্ত
ভারতীয় পেঁয়াজে রফতানি মূল্য নির্ধারণ, বিপাকে আমদানিকারকরা
ভারতীয় পেঁয়াজে রফতানি মূল্য নির্ধারণ, বিপাকে আমদানিকারকরা
মোবাইল আনতে ডিবি কার্যালয়ে মামুনুল হক
মোবাইল আনতে ডিবি কার্যালয়ে মামুনুল হক
‘অধিকার দিতে হবে না, কেড়ে না নিলেই হবে’
‘অধিকার দিতে হবে না, কেড়ে না নিলেই হবে’