X
রবিবার, ০২ অক্টোবর ২০২২
১৬ আশ্বিন ১৪২৯

ধর্ষণের শিকার মায়ের বিচার পেতে ছেলের লড়াই

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১১ আগস্ট ২০২২, ১২:৪৯আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২২, ১২:৪৯

প্রায় তিন দশক আগে দুই ভাইয়ের বারবার ধর্ষণের শিকার হওয়া ভারতের এক নারী শেষ পর্যন্ত বিচারের জন্য আশা করছেন। বিচার পাওয়ার এই সংগ্রামে ওই নারীর পাশে দাঁড়িয়েছেন ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া তার ছেলে সন্তান।

ভারতের উত্তর প্রদেশের ওই নারীকে ছয় মাস ধরে ধর্ষণ করে দুই ভাই। ওই সময়ে নারীর বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। এই ধর্ষণের ফলে জন্ম নেয় এক ছেলে শিশু। ওই সময় তাকে দত্তক দেওয়া হয়। ১৩ বছর পর মায়ের কাছে ফিরে আসে ছেলে। এরপরই ধর্ষকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে উৎসাহ দেয় ছেলেটি।

দশ দিন আগে পুলিশ এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে। আর বুধবার দ্বিতীয় অভিযুক্ত পুরুষকেও হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ওই নারী বলেন, ‘ঘটনা অনেক পুরনো কিন্তু এর ক্ষত এখনও প্রশমিত হয়নি। এতে আমার জীবন অচল হয়ে পড়ে আর বারবার আমার মনে পড়ে’।

ভারতের প্রতি বছর শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের হাজার হাজার ঘটনা ঘটে। ২০২০ সালে ভারতের শিশু যৌন নির্যাতন বিরোধী আইনে (পোকসো) ৪৭ হাজার মামলা দায়ের হয়েছে। তবে অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, আরও অনেক ঘটনাতেই মামলা দায়েরই হয়নি কারণ শিশুরা তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপরাধ বুঝতেই পারে না কিংবা এনিয়ে কথা বলতে ভয় পায়। পরিবারগুলোও প্রায়ই কলঙ্কের কারণে বা অপরাধীদের পরিচিত হওয়ার কারণে এই ধরনের অপরাধের মামলা করতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে।

‘আমার মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়’

উত্তর প্রদেশের ওই নারী জানান ১৯৯৪ সালে শাজাহানপুর শহরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত মোহাম্মদ রাজি এবং তার ভাই নাকি হাসান তার প্রতিবেশি ছিল। বাড়িতে একা থাকলেই ওই দুই ভাই দেয়াল ডিঙিতে তাদের বাড়িতে প্রবেশ করে এই ঘটনা ঘটাতো।

ধর্ষণের পর অসুস্থ হয়ে পড়লে ওই নারীর বোন তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে গর্ভবতী হয়ে পড়ার বিষয়টি প্রকাশ পায়। ডাক্তার গর্ভপাতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেন। কারণ ওই সময়ে বয়স বিবেচনায় তার মৃত্যু ঝুঁকি বেশি ছিল। সন্তান জন্ম নেওয়ার পরপরই তাকে দত্তক দিয়ে দেওয়া হয়।

ওই নারী বলেন, ‘এই শিশুর জন্য আমি অনেক কষ্ট সহ্য করেছি কিন্তু তার মুখটা দেখার সুযোগও পাইনি। আমার মায়ের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, এবার তুমি জীবনে আরেকটা সুযোগ পাবে’। ওই নারী কিংবা তার পরিবার কোনও পুলিশি মামলা দায়ের করেননি কারণ তারা অভিযুক্তদের ভয়ের মধ্যে বাস করতেন।

ওই নারী বলেন, ‘ধর্ষণের কথা কাউকে বললে তারা আমার পরিবারকে মেরে ফেলার এবং বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দিতো। আমার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে পুলিশে যোগ দেবো কিন্তু ওই দুই পুরুষের কারণে আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়’।

পরে ওই নারী এবং তার পরিবার আগের বাড়ি ছেড়ে রামপুর জেলায় চলে যায়। ২০০০ সালে তার বিয়ে হয় আর দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়। তিনি বলেন, ভেবেছিলেন জীবনের নতুন অধ্যায়ে পুরনো ক্ষত ভুলে থাকতে পারবেন কিন্তু বিয়ের ছয় বছরের মাথায় তার স্বামী ধর্ষণের কথা জেনে যায় আর এর জন্য তাকেই দায়ী করে।

পরে সন্তানসহ ওই নারীকে তাড়িয়ে দেয় তার স্বামী। ফলে ওই নারী তার বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

সত্যের খোঁজে সন্তানের লড়াই

দত্তক দিয়ে দেওয়া ওই নারীর প্রথম সন্তানও পরিচয়ের কারণে ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হয়। তার মা বলেন, প্রতিবেশিদের কাছে শুনতে শুনতে বড় হয়েছে তার ছেলে। প্রতিবেশিরা তাকে বলতো সে তার বাবা মায়ের সন্তান নয়, তাকে দত্তক নেওয়া হয়েছে।

অভিযুক্ত ধর্ষকদের একজন। ছবি: বিবিসি

মা ছেলে আলাদা হওয়ার ১৩ বছর পর দত্তক নেওয়া বাবা-মা ওই নারীর কাছে তার ছেলেকে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু ছেলে জানতে চায় তার বাবা কে। তার ডাকনামও ছিল না। ভারতে সাধারণত বাবার নামে ডাকনাম হয়ে থাকে। ফলে স্কুলে অন্য শিশুদের উপহাসের পাত্র হতে হয় তাকে।

ছেলেটি বারবার মায়ের কাছে তার বাবার পরিচয় জানতে চাইতে থাকে আর উত্তর না পেয়ে তার হতাশা বাড়তে থাকে। ওই নারী বলেন, ছেলে তাকে বলে দেয় নামহীন জীবন কাটাতে চায় না সে। আর বাবার পরিচয় প্রকাশ করা না হলে আত্মহত্যার হুমকি দেয়।

প্রথমদিকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার জন্য ছেলেকে বকাঝকা করতেন ওই নারী। পরে শেষ পর্যন্ত তিনি শান্ত হয়েছিলেন এবং তাকে সত্য বলে দেন। আতঙ্কিত হওয়ার পরিবর্তে, ছেলে তার সবচেয়ে বড় সমর্থক হয়ে ওঠে, তাকে বলে যে তাকে ‘এই যুদ্ধে লড়তে হবে এবং অভিযুক্তকে শিক্ষা দিতে হবে’। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি ঘটনাটি সম্পর্কে কথা বলেন, তাহলে হয়তো আরও বেশি লোক তা করবে। এতে আমাদের মামলা শক্তিশালী হবে এবং অভিযুক্তরা শাস্তি পাবে। সমাজে একটা বার্তা যাবে অপরাধ করলে কেউ বাঁচাতে পারবে না’।

বিচারের জন্য লড়াই

ছেলের উৎসাহে ওই নারী ২০২০ সালে ফের শাজাহানপুরে যান। তবে তখনও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করা তার জন্য কঠিন ছিল। অনেক পুরনো ঘটনা হওয়ায় পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তিনি আইনজীবী খুঁজতে থাকেন। আইনজীবীও অনিচ্ছুক ছিলেন, বলে দেনপ্রায় তিন দশকের পুরনো মামলা লড়া কঠিন হবে।

শিশু অবস্থায় যে এলাকায় বসবাস করতেন ওই নারী অনেক দিন পর তাও বদলে যায়। নিজেদের পুরনো বাড়িটিও খুঁজে পেতে কষ্ট হয় তার। অভিযুক্তদেরও সন্ধান পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। আইনজীবী তার কাছে জানতে চান, ‘আপনি কীভাবে প্রমাণ করবেন যে আপনি তিন দশক আগে সেখানে থাকতেন এবং সেখানেই আপনাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল?’ ‘আমি তাকে বললাম আমরা আপনাকে প্রমাণ দেবো, আমাদের মামলাটি নিন,’ জবাব দেন ওই নারী।

আইনজীবী আদালতে একটি আবেদন করেন। এবং শাজাহানপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে অভিযুক্ত দুই পুরুষের বিরুদ্ধে ২০২১ সালের মার্চে মামলা নেওয়া হয়। ওই নারী অভিযুক্তদের গ্রেফতার করতে পুলিশের কাছে আবেদন জানান।

ওই নারী বলেন, ‘আমি তাদের খুঁজে পেলাম এবং ফোনে তাদের সঙ্গে কথা বললাম। তারা আমাকে চিনতে পারলো আর বললো এখনো কেন মরে যায়নি। আমি বললাম, এবার তোদের মরার পালা’।

প্রমাণ এবং গ্রেফতার

অভিযুক্তদের অবস্থান শনাক্ত হওয়ার পরও অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কোনও প্রমাণ ছিল না। পুলিশ জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে নেওয়া ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল এখন প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শাজাহানপুরের সিনিয়র পুলিশ সুপার (এসএসপি) এস আনন্দ বলেন, ‘এই মামলাটি একেবারেই অপ্রত্যাশিত। ওই নারী এগিয়ে এসে মামলা করলে আমরা বেশ অবাক হয়েছি। কিন্তু আমরা সুযোগ নিয়ে তার ছেলের ডিএনএ নমুনা নিয়েছি’।

পরিদর্শক ধর্মেন্দ কুমার গুপ্ত গত বছর মামলাটি তদন্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তখন অভিযুক্তদের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করি এবং তাদের পরীক্ষা করি। তাদের একজনের সঙ্গে ছেলের ডিএনএ নমুনা মিলেছে’।

গত ৩১ জুলাই অভিযুক্তদের একজনকে গ্রেফতার করা হয়। আর বুধবার পুলিশ জানিয়েছে, তারা দ্বিতীয় অভিযুক্তকেও হেফাজতে নিয়েছে। তবে অভিযুক্তরা তাদের অপরাধের বিষয়ে এখনো কোনও মন্তব্য করেনি।

ওই নারী বলছেন তিনি চান তার গল্পে অনুপ্রাণিত হয়ে অন্যরাও তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপরাধ প্রকাশ করে দেবে। তিনি বলেন, ‘পুলিশ নীরব থাকে। আমিও নিরবে বসে ছিলাম আর ভেবেছিলাম এটাই আমার ভাগ্যে লেখা ছিল। কিন্তু বিষয়গুলো এমন নয়। আমাদের অবশ্যই পুলিশের কাছে যেতে হবে যাতে অপরাধ করে কেউ পার পেয়ে যেতে না পারে’।

আর অভিযুক্তরা গ্রেফতার হওয়ায় আনন্দিত ওই নারীর ছেলে।

সূত্র: বিবিসি

/জেজে/
সম্পর্কিত
ইমরান খানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি
ইমরান খানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি
আজ মহাষষ্ঠী, দেবীর বোধন কলকাতার বাড়ির পুজোয়
আজ মহাষষ্ঠী, দেবীর বোধন কলকাতার বাড়ির পুজোয়
পারমাণবিক কেন্দ্রের প্রধান রাশিয়ার হাতে আটক: আইএইএ
পারমাণবিক কেন্দ্রের প্রধান রাশিয়ার হাতে আটক: আইএইএ
সাড়ে ৫ হাজার রুশ সেনাকে ঘিরে ফেলেছে ইউক্রেনীয় বাহিনী
সাড়ে ৫ হাজার রুশ সেনাকে ঘিরে ফেলেছে ইউক্রেনীয় বাহিনী
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পদ্মা সেতুর আদলে সেজেছে পূজামণ্ডপ 
পদ্মা সেতুর আদলে সেজেছে পূজামণ্ডপ 
শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে চোরচক্রের ৪ সদস্য গ্রেফতার
শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে চোরচক্রের ৪ সদস্য গ্রেফতার
‘মানবাধিকারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র’
‘মানবাধিকারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র’
গান নকলের অভিযোগে ১০০ মিলিয়ন ডলারের মামলা
গান নকলের অভিযোগে ১০০ মিলিয়ন ডলারের মামলা
এ বিভাগের সর্বশেষ
ইমরান খানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি
ইমরান খানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি
আজ মহাষষ্ঠী, দেবীর বোধন কলকাতার বাড়ির পুজোয়
আজ মহাষষ্ঠী, দেবীর বোধন কলকাতার বাড়ির পুজোয়
পারমাণবিক কেন্দ্রের প্রধান রাশিয়ার হাতে আটক: আইএইএ
পারমাণবিক কেন্দ্রের প্রধান রাশিয়ার হাতে আটক: আইএইএ
সাড়ে ৫ হাজার রুশ সেনাকে ঘিরে ফেলেছে ইউক্রেনীয় বাহিনী
সাড়ে ৫ হাজার রুশ সেনাকে ঘিরে ফেলেছে ইউক্রেনীয় বাহিনী
নিজ দলের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি’র
নিজ দলের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি’র