রাজনীতি আর মাতৃত্ব নিয়ে সংগ্রামের গল্প বললেন টিউলিপ

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ০১:৪৫, এপ্রিল ১১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৭, এপ্রিল ১১, ২০১৯

রাজনীতিকের কি ব্যক্তিগত জীবন থাকতে নেই? একজন তরুণ নারী রাজনীতিক কি সন্তান ধারণ করবেন না? রাজনীতি করতে গেলে নারীকে কি প্রজন্ম-পরম্পরা রক্ষার প্রাকৃতিক অধিকার কিংবা দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত হতেই হবে? ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গ্রাজিয়া ডেইলিতে প্রকাশিত যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লেবার পাটির্ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকীর সাক্ষাৎকারভিত্তিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব আলাপ। ব্রিটিশ সংবিধান অনুযায়ী, মাতৃত্বকালেও পার্লামেন্টে একজন আইনপ্রণেতার হয়ে অন্য কেউ ভোট দিতে পারেন না। ব্রেক্সিট প্রশ্নে নিজের রাজনৈতিক দায়িত্ব অস্বীকার করতে না পারা টিউলিপ তাই ঝুঁকি নিয়ে সন্তানের জন্মের দিনক্ষণ বদল করে পার্লামেন্টে গিয়ে ভোট দিয়েছেন। ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে মাতৃত্বকালে আইনপ্রণেতাদের জন্য প্রক্সি ভোটের বিধান চালু হয়েছে। তবে সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সন্তানের জন্মপ্রক্রিয়াকে ঝুঁকিতে পর্যবসিত করা, সন্তানকে প্রয়োজনীয় সময় দিতে না পারার মতো বিভিন্ন কারণে রাজনীতি আর মাতৃত্বের দ্বন্দ্ব ঘোচাতে পারেন না এই আইনপ্রণেতা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গ্রাজিয়া ডেইলিকে তিনি বলেছেন, একটা অপরাধবোধ সব সময়ই তার মধ্যে কাজ করে যে খারাপ মা হয়ে গেলেন কিনা।

সন্তান রাফায়েলের সঙ্গে টিউলিপ

যুক্তরাজ্যের দৈনিক পত্রিকা দ্য গ্রাজিয়া ডেইলি’র সাংবাদিক গ্যাবি হিন্সলিফ প্রতিবেদন তৈরির উদ্দেশ্যে টিউলিপের বাড়িতে গিয়ে দেখেছেন, নিজ বাড়ির রান্নাঘরে একটি রকিং চেয়ারে দুই মাস বয়সী সন্তান রাফায়েলকে নিয়ে বসে আছেন তিনি। আটকে আছেন রাজনৈতিক কাজেই। সে সময় ব্রেক্সিট ইস্যুতে নিজেদের মত প্রতিষ্ঠার পক্ষে প্রচারণা করছিলেন টিউলিপ। সারাক্ষণই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে খোঁজ রাখছিলেন সবকিছুর। তার মতো যারা নমনীয় ব্রেক্সিট চায় তাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।    

সাংবাদিক গ্যাবি হিন্সলিফকে টিউলিপ জানান, বিনা বিচারে আটকদের মুক্তির ব্যাপারে সম্প্রতি তাকে বৈঠক করতে হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একজন নারী হিসেবে আপনি বলতে পারেন না, আমি দুধ খাওয়াচ্ছি বলে বৈঠকে বসতে পারবো না।’ ব্রিটিশ আইনপ্রণেতাদের মাতৃত্বকালীন ছুটি সংক্রান্ত জটিলতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি একটি অদ্ভুত আইন, কাজের অর্ধেকে আছি, অর্ধেকে নেই। সম্ভবত এটি কোন নারীর মাতৃত্বকালীন ছুটির ধারণা নয়। তবে একটি শিশু জন্মের পর সংসদ সদস্যদের সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই।’

প্রথম সন্তান আজায়েলা জন্মের পরও টিউলিপকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ছুটি জটিলতার কারণে ছয় সপ্তাহ পরেই পার্লামেন্টে যাওয়া শুরু করেন টিউলিপ। তবে পরে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এবার তার দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের মুহূর্তে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের মুখে ছিল। ব্রেক্সিট সংশোধনীর গুরুত্বপূর্ণ ভোটাভুটি চলছিল তখন। ব্রিটিশ হাউস অব কমন্সের নিয়ম, আইনপ্রণেতাকে শারীরিকভাবে উপস্থিত হয়েই ভোট দিতে হবে। সন্তান প্রসবের জন্য ভোটাধিকার প্রশ্নে আপস করতে রাজি ছিলেন না টিউলিপ। তাই নির্ধারিত সিজারিয়ান অপারেশন বিলম্বিত করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। গত ১৫ জানুয়ারি হুইলচেয়ারে করে কমন্সে যান ভোট দিতে। ওই দিন ব্রেক্সিট কার্যকরে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র প্রস্তাবিত খসড়া চুক্তিটি পাসের জন্য ভোটাভুটি হয়েছিল। মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা অবস্থায় প্রক্সি ভোট দিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন টিউলিপ।

ব্রেক্সিট ভোটের দিনে পার্লামেন্টে টিউলিপ

সিজার বিলম্বিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে পার্লামেন্টে ভোট দিতে গিয়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হন টিউলিপ। ঘটনার পর তার দীর্ঘ এক বছর ধরে আন্দোলন ও দাবির প্রেক্ষিতে কমন্সে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। অবেশষে সদ্য বাবা-মা হওয়া সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলকভাবে এক বছরের জন্য প্রক্সি ভোটিং চালুর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এখন সংসদ সদস্যরা তাদের পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য অপর একজন সংসদ সদস্যকে মনোনীত করতে পারবেন। এরইমধ্যে এমপি বিম আফোলামি পিতৃত্বকালীন ছুটির জন্যও প্রক্সিভোট সুবিধা পেয়েছেন।

পার্টি হুইপ ভিকি ফক্স ক্রফট মনে করছেন, টিউলিপের অবস্থান খুবই শক্ত। খুবই ন্যায্য অবস্থানে রয়েছেন তিনি। শুধু বাবা-মার জন্য নয়, বরং অসুস্থ এমপিদের ক্ষেত্রেও প্রক্সি ভোটের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছেন তিনি। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। বারবার চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত একরকম ঝুঁকি নিয়েই সিজার বিলম্বিত করেন। কারণ হিসেবে তিনি পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। বলেন, ‘‘আমি এমন একটি পরিবার থেকে এসেছি, যেখানে সবাই জনগণের জন্য কাজ করেন। মা বলেন, ‘তোমাকে কাজ ডাকছে আর কাজকেই তুমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো। সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে।’ আর আমার স্বামী বলেন, ‘এই শরীর তোমার, তাই সিদ্ধান্তও তোমার।”

টিউলিপের স্বামী একজন শিক্ষা বিষয়ক পরামর্শক। তিনিই মূলত বাচ্চাদের দেখাশোনা করেন। তবে রাজনীতি আগে নাকি সন্তান; দ্বন্দ্ব ঘোচে না টিউলিপের। তিনি বলেন, ‘একদিন বাসায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গে আজালিয়া (প্রথম সন্তান) আমাকে বললো, সে আমাকে নয়, তার বাবাকে কাছে পেতে চায়।’ টিউলিপ মনে করেন, তিনি সময় দিতে পারেন না বলেই বাবার প্রতি আজালিয়ার আগ্রহটা দিনকে দিন স্পষ্ট হচ্ছে।  তবে একই রাতেই এক ইমেইলের মাধ্যমে টিউলিপ জানতে পারেন যে রাস্তায় দিন কাটানো এক পরিবার তাদের বাড়ি ফিরে পেয়েছে। আর তখন তিনি ভাবেন, এটাই তো তার অর্জন, রাজনৈতিক পরিশ্রমের ফল।

স্বামী ক্রিস ও সন্তান রাফায়েলের সঙ্গে টিউলিপ

টিউলিপ বলেন, তিনি স্থানীয় পত্রিকায় লেখা পড়েছেন যে ‘তিনি কেন আবার সন্তান নিচ্ছেন।’ আর একজন নারী তাকে জানান, ‘তুমি একজন মা এবং এমপি কখনোই একসঙ্গে হতে পারো না।’ এসব কথার মধ্যে কর্মজীবী নারীর বিপন্নতা খুঁজে পান তিনি। কিলবার্নে এক রিসিপশনিস্ট নারীর সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারেন যে কাজে এক মিনিট দেরি করলে তাদের ৫ পাউন্ড কেটে নেওয়া হয়। লাঞ্চের বিরতি নিতে পারেন না। টিউলিপ ভাবতে থাকেন এমনটা হলে তিনি কী করতেন। প্রায়ই মিটিংয়ে দুই চার মিনিট দেরি হয় তার, সহকর্মীরা আন্তরিকবোধ থেকে ক্ষমা করে দেয়। তিনি তাই ভাবতে থাকেন, ওই নারীর জন্য কাজটা কতো কঠিন। 

সিজার পিছিয়ে দিয়ে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল খুবই কঠিন। অনেকেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন, সন্তানের চেয়ে তিনি কেন রাজনীতিকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। মুসলিম ও জনপ্রিয় হওয়ার কারণে খুনের হুমকিও পেতে হয়েছে তাকে। টিউলিপ স্বীকার করেন যে, সে সময় খুবই আতঙ্কিত ছিলেন তিনি। বলেন, ‘আমি সত্যিই খুব ভীত ছিলাম। এখন রাফায়েলের দিকে তাকিয়ে থাকি। বেশ স্বাস্থ্য ভালো ওর। কিন্তু ভয় হয়, যদি অন্যকিছু ঘটতো সিজারে দেরির কারণে।’

টিউলিপ জানান, সবসময়ই তার ভেতর একটা অপরাধবোধ কাজ করতো। ‘খারাপ মা’ হয়ে যাচ্ছেন না তো। যেমন মানুষ হিসেবে সমাজের প্রতি দায় অস্বীকার করতে চান না, তেমনি মাতৃত্বের দায়ও অস্বীকার করতে চান না তিনি। জানান, বাচ্চার খেলনায় অ্যালার্ম লাগিয়ে রেখেছেন, যেন দেখাশোনা করাটা সহজ হয়।

টিউলিপের কোলে সদ্যোজাত সন্তান রাফাফেল

টিউলিপ সব নারীকে বলতে চান, ব্যক্তিগত সমৃদ্ধি প্রত্যাশ্যা করলে মাথায় রাখতে হবে যে, সবসময় সেটা অর্জনের পথ আরামদায়ক নাও হতে পারে। এজন্য পরিশ্রম দরকার। তিনি বলেন, ‘অনেক স্কুল পরিদর্শনের সময় বাচ্চা মেয়েরা আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, তরুণ নারীদের পক্ষে রাজনীতি করা কি আসলেই সম্ভব। তখন আমি কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ি। এই উজ্জ্বল প্রতিভাগুলোকে নিরাশ করতে চাই না। একইসঙ্গে তাদের মিথ্যাও বলতে চাই না। সবাইকে বোঝাতে চাই যে এমপি হওয়া মানে এই না, আপনাদের সন্তান থাকা চলবে না। বরং অনেক দক্ষ ও সুযোগ্য নারীরা সংসদে আসছেন না। আমরা তাদের হারাচ্ছি। তাদেরই প্রয়োজন আমাদের।'

 

 

/এমএইচ/বিএ/

লাইভ

টপ