ব্রিটেনের নির্বাচন: লড়ছেন ৭ নারী প্রার্থীসহ ৯ ব্রিটিশ বাংলাদেশি

Send
মুনজের আহমদ চৌধুরী, লন্ডন
প্রকাশিত : ১৪:০০, ডিসেম্বর ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৪, ডিসেম্বর ১২, ২০১৯

যুক্তরাজ্যের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো আভাস দিয়েছে, এবারের নির্বাচনে এথনিক মাইনোরিটি ভোট নির্বাচনের ফলে বিরাট প্রভাব রাখবে। এমন বাস্তবতায় এবার সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৯ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী। এদের মধ্যে ৭ জনই নারী। লেবার দল থেকে সর্বোচ্চ ৭ বাংলাদেশি প্রার্থীর পাশাপাশি লিবারেল ডেমোক্র্যাট ও কনজারভেটিভ পার্টি থেকে একজন করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী এবার নির্বাচনি লড়াইয়ে নেমেছেন। এদের অনেকেই জয়ী হতে যাচ্ছেন বলে আভাস পাওয়া গেছে।


নিশ্চিত জয় পাচ্ছেন রুশনারা-আপসানা-রূপা?
২০১০ সাল থেকে বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো আসনে টানা তিন মেয়াদে লেবার পার্টির মনোনয়নে নির্বাচিত হয়ে আসছেন রুশনারা আলী। ৪৪ বছরের এ রাজনীতিকের জন্ম সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার ভুরকি গ্রামে। ছোটবেলায় মা-বাবার সঙ্গে লন্ডনে পাড়ি জমান তিনি। ২০১৫ সালের নির্বাচনে ৩২ হাজার ৩৮৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন রুশনারা আলী। মোট ভোটের ৬১ দশমিক ০২ শতাংশই পান তিনি। ২০১০ সালে তার পাওয়া ভোট থেকে এই সংখ্যা ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির ম্যাথু স্মিথ পান মোট ভোটের মাত্র ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৭ সালের নির্বাচনেও ভোট বাড়ে রুশনারার। ওই নির্বাচনে মোট ভোটের ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ পান তিনি। ৪২ হাজার ৯৬৯ ভোটে নির্বাচিত হন রুশনারা। প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির চার্লটি চিরিকো পান সাত হাজার ৫৭৬ ভোট। এবারের নির্বাচনে সে রকম কোনও প্রার্থী না থাকায় তার ভোট আরও বাড়বে বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বাম থেকে রুশনারা, আপসানা, রূপা
রুশনারা আলীর পাশের আসনই পপলার অ্যান্ড লাইমহাউস। বাংলাদেশি অধ্যুষিত এই আসনটি গত কয়েক দশক ধরেই লেবার পার্টির দখলে। ফলে এটিকে অনেকেই দলটির দুর্গ হিসেবে দেখে থাকেন। এবার প্রথমবারের মতো কোনও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী হিসেবে এই আসনে লেবার পার্টির মনোনয়ন পেয়েছেন আপসানা বেগম। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠাও পপলার অ্যান্ড লাইমহাউসে। তিনি টাওয়ার হ্যামলেটসের সাবেক কাউন্সিলর ও মেয়র মনির উদ্দিন আহমদের মেয়ে। এছাড়া আপসানা বেগম লেবার পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান ও দলটির লন্ডন অঞ্চলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার জয়ও অনেকটাই নিশ্চিত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লেবার পার্টির মনোনয়নে লন্ডনের ইলিং সেন্ট্রাল ও একটন আসন থেকে টানা দুইবার এমপি হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রুপা হক। দলের অভ্যন্তরীণ ইস্যুর পাশাপাশি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তিনি সবসময়ই সোচ্চার। আগাম জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশি অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডনের যে ৩টি আসনে লেবার পার্টির জয়ের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি; রূপার আসন তার অন্যতম। তিনি নিজেও জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। বিশ্লেষকরাও প্রার্থী হিসেবে তাকেই এগিয়ে রাখছেন।
টিউলিপের সামনে হ্যাটট্রিক জয়ের চ্যালেঞ্জ
পরপর দুইবার ব্রিটেনের পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন বঙ্গবন্ধুর নাতনি টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক। লন্ডনের একই আসন থেকে এবার তৃতীয়বারের মতো প্রার্থী হয়েছেন। তার সামনে এখন হ্যাটট্রিক জয়ের চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের প্রাধান্যের কেন্দ্রে রয়েছে ব্রেক্সিট ইস্যু। কোনও দল কিংবা প্রার্থীর চেয়ে ব্রেক্সিট প্রশ্নে ভোটারদের অবস্থানই ফল নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর বোন শেখ রেহানার দ্বিতীয় সন্তান টিউলিপ তার ব্যক্তিগত ইমেজের কারণে আবারও জয়ী হতে পারেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিজ আসনের পূর্ব ইউরোপীয় ও মুসলিম ভোটারদের সমর্থন টিউলিপের জয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

টিউলিপ রেজওয়ানা
নির্বাচনে যে পাঁচ-ছয়‌টি আসনের জয়-পরাজয় নিয়ে ভোটার ও ব্রি‌টিশ সংবাদমাধ্যমের উন্মুখ দৃ‌ষ্টি; তার এক‌টি হলো টিউলিপের হ্যাম‌পস্টেড ও কিলবার্ন। লন্ডনের আসনগুলোর ম‌ধ্যে এবারও সেখানেই সবচেয়ে প্র‌তিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভো‌টের লড়াই হবে। নব্বই‌য়ের দশক থে‌কে এ আসন‌টি ব্রি‌টে‌নের তীব্র প্র‌তিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আস‌নগু‌লোর তা‌লিকায় দ্বিতীয় স্থা‌নে উঠে আসে।
বে‌কেনহা‌মে জিত‌তে চান নারায়ণগ‌ঞ্জের মে‌রিনা
যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে দক্ষিণ পূর্ব লন্ডনের বেকেনহাম আসনে লেবার পার্টির প্রার্থী ব্যারিস্টার মেরিনা মাসুমা আহমেদ। বর্তমানে কনজারভেটিভ পার্টির দখলে রয়েছে আসনটি। গত দুই নির্বাচনে মেরিনা পরাজিত হলেও ক্রমাগত বেড়েছে তার প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ। ফলে সেই আশাতে ভর করে এবারে লেবার পার্টির হয়ে আসনটি জিতে নিতে চাইছেন বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জে জন্ম নেওয়া মেরিনা।

মেরিনা মাসুমা
এমপি হতে রাত-দিন ছুটেছেন বাংলাদেশের বাবলিন
ব্রিটেনের তৃতীয় বৃহত্তম দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (লিবডেম) থেকে মনোনয়ন পাওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী ড. বাবলিন মল্লিক দলটির পক্ষে কার্ডিফ সেন্ট্রাল আসন থেকে লড়ছেন। বাবলিন মৌলভীবাজারের মেয়ে। সদর উপজেলার কচুয়া গ্রামে তার জন্ম। ১৯৮৬ সালে ৬ বছর বয়সে মা-বাবার সঙ্গে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। পরিবারের তিনি সন্তানের মধ্যে তিনি সবার ছোট। লেখাপড়া আর ক্যারিয়ার গড়েছেন যুক্তরাজ্যেই। বায়ো-ক্যামেস্ট্রিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। বাবলিন ব্রিটেনের খ্যাতনামা কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট ডক্টোরাল রিচার্স অ্যাসোসিয়েট ও সাবেক শিক্ষক। বর্তমানে কাজ করছেন চ্যা‌রি‌টি প্র‌তিষ্ঠান সাইট ক্যামরোর সিইও হিসেবে। ব্যক্তিজীবনে তিনি বিবাহিত। দুই কন্যাসন্তান রয়েছে তার।

বাবলিন মল্লিক
বাংলা ট্রিবিউনকে বাবলিন বলেছেন, ‘আমার রাজনীতি একটি উদার গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার পক্ষে। সেজন্যই আমি লিবডেমে যোগ দিই’। তাকে সমর্থন জানিয়ে তার আসনে গ্রিন পার্টির পাশাপাশি কার্ডিফের আরও একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল আগামী নির্বাচনে প্রার্থী না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বাবলিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘এবারের নির্বাচন ব্রিটিশ রাজনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর আমার এই আসনটি লিবডেমের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। অতীতে এই আসনে আমাদের দলের প্রার্থীরা এমপি, অ্যাসেম্বলি মেম্বার ও কাউন্সিলর হিসেবে বেশ কয়েকবার নির্বাচিত হয়েছেন। আমিও জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।’
সিলেটের আনোয়ারার আসনে ‘ফ্যাক্টর’ ভারতীয়রাই

ডা. আনোয়ারা আলী
লন্ডনের হ্যারো ওয়েস্ট আসন থেকে কনজারভেটিভ পার্টির হয়ে লড়ছেন সাবেক কাউন্সিলর ডা. আনোয়ারা আলী। সবশেষ নির্বাচনে একই দল থেকে টাওয়ার হ্যামলেটস-এর প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি। আনোয়ারার আদি নিবাস সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায়। তার আসনে বাংলাদেশি ভোটার কম হলেও গুজরাটের বিপুল সংখ্যক ভারতীয় ভোটার রয়েছে সেখানে। আসনটি লেবার ও কো-অপারেটিভ পার্টির দখলে থাকলেও এবারের বাস্তবতা ভিন্ন। নিজস্ব রাজনৈতিক সমীকরণে এবার ব্রিটিশ ভারতীয়দের কনজারভেটিভ পার্টিকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই বিবেচনায় সেখানকার ভারতীয় ভোটাররা আনোয়ারাকেই বেছে নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবশ্য তার প্রতিদ্বন্দ্বী ও বর্তমান লেবার ও কো-অপারেটিভ পার্টির এমপি রিচার্ড থমাসও ব্রিটিশ ভারতীয়দের ভোট নিতে মরিয়া। তবে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী আনোয়ারা এবং তার সমর্থকরা।
দুই পুরুষ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী নুরুল হক আলী ও আখলাক খান

আখলাক খান (বামে) ও নুরুল হক
স্কটল্যান্ডের অ্যাবারডিন নর্থ সংসদীয় এলাকা থেকে লেবার পার্টির প্রার্থী হয়েছেন আরেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নুরুল হক আলী। প্রায় ২৭ বছর ধরে লেবার পার্টির সঙ্গে যুক্ত তিনি। লন্ডনের নিউহাম এলাকার একজন লেবার কাউন্সিলর হিসেবে ১৯৯৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনে হার্টফোটশেয়ার থেকে লেবার দলের প্রার্থী হয়ে লড়ছেন আখলাক খান। আদি বাড়ি সিলেট সদরে। সাত বছর বয়সে বাবার সঙ্গে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। এরপর সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। জয়ী হলে তারা প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ পুরুষ হিসেবে সে দেশের পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করবেন। 

/বিএ/

লাইভ

টপ