অকাল দীপাবলীর ডাক যেভাবে হয়ে উঠলো মোদির ‘মাস্টারস্ট্রোক’

Send
রঞ্জন বসু, দিল্লি
প্রকাশিত : ২৩:৫২, এপ্রিল ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৫৯, এপ্রিল ০৬, ২০২০

 দীপ জ্বালাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি

প্রথমে হাততালি দেওয়া আর থালা-বাসন বাজাতে বলা, তার ঠিক দুই সপ্তাহের মাথায় রাতে বাড়ির আলো নিভিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে অকাল দীপাবলীর আবাহন!

করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পরপর এই দুই আহ্বান নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা বা ব্যঙ্গ বিদ্রূপ কম হয়নি। রবিবার ৫ এপ্রিল রাত ৯টার সময় কোটি কোটি ভারতীয় এক সঙ্গে বাড়ির বৈদ্যুতিক বাতি নিভিয়ে দিলে জাতীয় পাওয়ার গ্রিড ধসে পড়বে, এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছিলেন ভারতের অনেক বিশেষজ্ঞ।

এমন কী, ভেড়ামাড়া আর কুমিল্লা দিয়ে বাংলাদেশও যেহেতু ভারতীয় পাওয়ার গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত – সে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহেও তার বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন।

কিন্তু ৫ এপ্রিলের রাতে দারুণ সফল আর মসৃণভাবে সেই ডাকে ভারত যেভাবে সাড়া দিল এবং ৯ মিনিটের পুরো কর্মসূচি কোনও কারিগরি বিভ্রাট ছাড়াই যেভাবে নির্বিঘ্নে মিটে গেলো - তাতে নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি আরও একবার বুঝিয়ে দিলেন ভারতের কোটি কোটি আম আদমির সঙ্গে তার ‘কানেক্ট’ কেন এত প্রবল! ভারতের সাধারণ জনগণের ‘পালস’ যে তার চেয়ে ভাল আর কেউ বোঝে না, সেটা স্পষ্ট হয়ে গেল আরও একবার।

যা ভাবা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ বাড়ির আলো নিভিয়েছেন

অথচ ভারতের বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ও অ্যাকাডেমেশিয়ানসহ বহু দিকপাল এর আগে মোদিকে ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন, “সারা দুনিয়া যেখানে করোনাভাইরাসের টেস্টিং, পিপিই আর সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং প্রয়োগ করে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ছে – সেখানে ভারত থালা বাজিয়ে আর প্রদীপ জ্বালিয়ে কোভিড-১৯ তাড়াতে চায়!”

প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী পর্যন্ত টুইট করেছিলেন, পৃথিবী করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে বাঁচতে চাইছে মাস্ক, স্যানিটাইজার, গ্লাভস বা সাবান দিয়ে – আর সেই জায়গায় ভারতের হাতিয়ার হলো কড়াই, হাতা-খুন্তি, দিয়া আর টর্চলাইট!

কিন্তু ভারতের কোটি কোটি মানুষ যেভাবে রবিবারের রাতে সোৎসাহে আলো নিভিয়ে নরেন্দ্র মোদির ডাকে সাড়া দিলেন, গরিব-বড়লোক একসঙ্গে ৯ মিনিট ধরে প্রদীপ জ্বালিয়ে ঘরের দরজায় দাঁড়ালেন এবং পাড়া-মহল্লা প্রার্থনা সংগীত আর স্তোত্রগানে মুখরিত হয়ে উঠল – তাতে স্পষ্ট ভারতীয়রা ওই সব ব্যঙ্গ বিদ্রূপ একেবারেই গায়ে মাখেননি।

ভারতের খ্যাতনামা সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শেখর গুপ্তার কথায়, ‘হাততালি-থালি-দিয়া নিয়ে আপনারা যতই হাসাহাসি করুন, নরেন্দ্র মোদির তাতে কিচ্ছু আসে যায় না। তিনি জানেন কাদের সঙ্গে তিনি কথা বলছেন, আর সেই বার্তা তাদের কাছে নির্ভুলভাবে পৌঁছেও গেছে।’

একটি বহুতল আবাসন কমপ্লেক্সে মোদির ডাকে অকাল দীপাবলী

‘আসলে রাজীব গান্ধী থেকে শুরু করে ভারতের পরবর্তী আটজন প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে যে গুণ একেবারেই ছিল না, নরেন্দ্র মোদির মধ্যে সেটা আছে পুরোমাত্রায়। তিনি এ দেশের মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে জানেন – আর তার কথাকে তারা বেদবাক্য বলেই মেনে নেয়। একটা পর্বের ইন্দিরা গান্ধী ছাড়া এই কোয়ালিটি ভারতের পরবর্তী যুগের আর কোনও নেতার ছিল না!’, বলছেন মি গুপ্তা।

সমাজতাত্ত্বিক প্রিয়াংশু বোসের কথায়, ‘বস্তুত করোনাভাইরাস সামাল দেওয়ার যুদ্ধে গোটা ভারত জুড়ে তিন সপ্তাহের লকডাউনে সাধারণ দেশবাসীর যে নানা রকম অসুবিধা হচ্ছে তা বলাই বাহুল্য। এই পরিস্থিতিতে কোটি কোটি মানুষ যদি হাততালি দেওয়া, থালা বাজানো কিংবা প্রদীপ জ্বালানোর মতো কোনও কাজ এক সঙ্গে করে, সেটা একটা দারুণ ন্যাশনাল মর‍্যাল বুস্টিংয়ের কাজ করে – আর নরেন্দ্র মোদি সেটা খুব ভাল জানেন!’

‘এর আগেও আমরা দেখেছি, ডিমনিটাইজেশন বা নোটবন্দির সময় ভারতের মানুষ নিজেদের হাজার দুর্ভোগ সয়ে নিয়েছেন স্রেফ প্রধানমন্ত্রীর কথায়। সেই একই মন্ত্র তিনি আবারও কাজে লাগালেন – এবার লকডাউনের ভোগান্তিকে একটু সহনীয় করে তুললেন একটা সমবেত এক্সারসাইজের মধ্যে দিয়ে’, বলছিলেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই অধ্যাপক।

তবে একসঙ্গে কোটি কোটি ভারতীয় বাড়ির আলো নেভালে এক ধাক্কায় লোড কমে গিয়ে জাতীয় পাওয়ার গ্রিড বসে যায় কি না, সেই আশঙ্কা কিছুটা ছিলই। শশী থারুরের মতো কংগ্রেস নেতা, মহারাষ্ট্রের বিদ্যুৎমন্ত্রী পর্যন্ত এই নিয়ে দুশ্চিন্তা ব্যক্ত করেছিলেন – প্রধানমন্ত্রী কি অকাল দীপাবলীর ডাক দেওয়ার আগে প্রযুক্তিগত এই ঝুঁকির বিষয়টা আদৌ ভেবেছিলেন, সে প্রশ্নও তুলেছিলেন তারা।

কার্যক্ষেত্রে দেখা গেলো, ১২ গিগাওয়াট বিদ্যুতের লোড কমবে বলে ধারণা করা হলেও রাত ৯টা নাগাদ এক ধাক্কায় প্রায় ৩২ গিগাওয়াট লোড কমে গেলো। বছরের এই সময়টায় রাতের পিক আওয়ারে ভারতের জাতীয় গ্রিডে লোড থাকে ১১৭ গিগাওয়াটের মতো, রবিবার রাত ৯টা বাজার মিনিট চারেক আগেই সেটা নেমে এল ৮৫.৩০ গিগাওয়াটে। অর্থাৎ, যা ভাবা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ বাড়ির আলো নেভালেন – প্রধানমন্ত্রীর ডাকে সোৎসাহে সাড়া দিলেন।

ভারতের বিদ্যুৎমন্ত্রী আর পি সিং নিজে জাতীয় মনিটরিং রুমে বসে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছিলেন। অকাল দীপাবলী মিটতেই তিনি টুইট করলেন, ‘সব কিছু একদম স্বাভাবিক। প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি লোড কমলেও গ্রিড তা অনায়াসে সামলে নিয়েছে!’ ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে আরও একটি কিস্তিমাত করলেন নরেন্দ্র মোদি।

রবিবার রাতে দীপ জ্বালান প্রবীণ শিল্পপতি রতন টাটা

রতন টাটার মতো বর্ষীয়ান ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিল্পপতি এই বয়সে নিজে মোমবাতি ও প্রদীপ জ্বালিয়ে যেভাবে সারা দেশের এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছেন, সেটাও প্রধানমন্ত্রী মোদির আবেদনকে একটা অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। বলিউডের মেগাস্টার অমিতাভ বচ্চন কিংবা অর্জুন কাপুর, ভূমি পেডনেকার, মানুষী চিল্লারের মতো তারকাও প্রকাশ্যে টুইট করে প্রধানমন্ত্রীর আবেদনে সমর্থন জানিয়েছিলেন।

অন্যদিকে এখন পাল্টা ব্যঙ্গবিদ্রূপ চলছে কাশ্মিরি অ্যাক্টিভিস্ট ও জেএনইউ-এর সাবেক ছাত্রনেত্রী শেহলা রশিদের টুইট নিয়ে। রাত ৯টায় মোদির মোমবাতি জ্বালানোর ডাককে কটাক্ষ করে তিনি টুইট করেছিলেন, ‘সরি মোদিজি, আমার কাছে কোনও মোমবাতি নেই। আমি পারব না – আমার তখন ডিনার করার সময়!’

প্রায় সঙ্গে সঙ্গে শেহলা রশিদের প্রায় চার বছরের পুরনো একটি টুইট তুলে এনে নেটিজেনরা তাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘ঢাকার হলি আর্টিজানে নিহতদের স্মরণে মোমবাতি জ্বালিয়েই তো আপনি সব মোমবাতি শেষ করে ফেলেছেন, এখন ভারতীয়দের একসাথে লড়ার আন্দোলনে আপনি মোমবাতি পাবেন কোত্থেকে?’

ফলে এক কথায় বলতে গেলে, প্রধানমন্ত্রীর থালাবাসন বাজানো আর দিয়া-টর্চ জ্বালানোর ডাককে নিয়ে তথাকথিত আধুনিক ‘ইন্ডিয়া’-র একটা অংশ যতই হাসাহাসি করুক, নরেন্দ্র মোদি কিন্তু আরও একবার হাসতে হাসতে সাবেকি ‘ভারত’র মন জিতে নিলেন!

/এএ/

লাইভ

টপ