X
শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪
১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

৫১ দিনে লাখ রোগী, আরও ভয়ংকর হতে পারে ডেঙ্গু

সাদ্দিফ অভি
২০ নভেম্বর ২০২৩, ২২:০০আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২৩, ২২:২৭

দেশে গত ২৯ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ২ লাখ ছাড়ায়। এরপর ১৯ নভেম্বর এই সংখ্যা ছাড়ায় তিন লাখ। অর্থাৎ গত ৫১ দিনে এক লাখেরও বেশি রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

এর আগে গত ২১ আগস্ট অতীতের সব রেকর্ড ভাঙে ডেঙ্গু। ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ১ লাখ রোগী ভর্তির রেকর্ড ছিল। এ বছর এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ১ হাজার ৫৫৪ জন। এটিও এযাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন সারা বছর থেকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাই ২০৩০ সাল পর্যন্ত একটি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে। কেননা, ডেঙ্গুর টিকার ওপর নির্ভর হওয়া বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তবসম্মত না। 

ডেঙ্গুর সংক্রমণ কমছেই না (ছবি: ফোকাস বাংলা)

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩ লাখ ২ হাজার ৪৫২ জন এবং মারা গেছেন ১ হাজার ৫৫৪ জন। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম। এর আগে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গিয়েছিল ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন; ওই বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় ১৭৯ জনের।

বাংলাদেশে ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর তথ্য রাখে স্বাস্থ্য অধিদফতর। ওই বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। ২০১৮ সালের আগে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার পেরোয়নি। সে বছর হাসপাতালে ভর্তি হন ১০ হাজার ১৪৮ জন রোগী। ২০২০ সালে ১ হাজার ৪০৫ জন, ২০২১ সালে ২৮ হাজার ৪২৯ জন এবং ২০২২ সালে ৬২ হাজার ৩৮২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন ডেঙ্গু নিয়ে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মাসভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসেই ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ২০২০ সালের করোনা মহামারির কারণে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা তেমন দেখা যায়নি। তবে ২০২১ সাল থেকে আবারও প্রতি মাসে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আক্রান্তরা। সেই বছরের ডিসেম্বরেও ১২০০-এর বেশি রোগী ভর্তি হয়েছিলেন।

এ বছর ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি (ছবি: ফোকাস বাংলা)

ঢাকার বাইরে রোগী দ্বিগুণ

ডেঙ্গুকে একসময় ‘শহরের রোগ’ বলা হলেও তা এখন ছড়িয়ে গেছে গ্রামে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, ২০২১ সালেও অনেক জেলায় রোগী পাওয়া যায়নি। ২০২২ সাল থেকে হাতে গোনা কয়েকটি জেলা বাদে প্রায় প্রতিটি জেলায় রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এ বছর সব জেলায় রোগী পাওয়া গেছে। ঢাকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ রোগী পাওয়া গেছে ঢাকার বাইরে।

গত ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ঢাকার হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৫ হাজার ৮২১ জন। ঢাকার বাইরে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৯৬ হাজার ৬৩১ জন।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ২০১৯ সালে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু রোগ তেমন ছিল না। তারপরও দেখা গেছে, কুষ্টিয়া, যশোর, মেহেরপুর, বরিশালসহ কয়েকটা জেলায় ছিল। এই বছর কোনও জেলা বাদ নেই। ঢাকার বাইরে যেসব জায়গায় সার্ভে হয়েছে সবখানেই এলবোপিকটাস বেশি পরিমাণে পাওয়া গেছে। এর চরিত্র এজিপ্টি থেকে একদমই আলাদা। এলবোপিকটাস কচু গাছের পাতায় জমা পানিতেও বংশ বিস্তার করতে পারে।

আরও বাড়বে সংক্রমণ

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) এক কীটতত্ত্ববিদ জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বছরজুড়ে চালাতে হবে। এ বছর আমরা গ্রামাঞ্চলে রোগী পেতে শুরু করেছি। আগামী বছর এই পরিমাণটা আরও বাড়তে পারে। বাড়লে আমাদের চিকিৎসা সক্ষমতার ওপর অনেক চাপ পড়বে।

কীটতত্ত্ববিদ ড. জি এম সাইফুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা ২০১৩ সালের আগ পর্যন্ত দেখেছি যে মার্চ-এপ্রিলে ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে। ২০১৩ সালের পর থেকে ২০১৬ পর্যন্ত দুই-এক মাস বাদ দিয়ে প্রায় সব মাসেই ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে। ২০১৬ থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি মাসেই একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী পাওয়া যায়। এখন সারা বছর ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যায়। গত বছরের তুলনায় এই বছর একটু বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো ছাড়া মশার আচরণে কোনও পরিবর্তন দেখা যায়নি। বৃষ্টিতে সুযোগ পেয়েছে। পরিবেশে লার্ভা আছে, মশা আছে। তাই ব্রিডিং বেড়েছে। ভাইরাস আগে থেকে ছিল, মশা আক্রান্ত হয়ে গেছে।   

আগামী বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলে শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)

বদলে গেছে সংক্রমণের সময়

২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন। ওই বছর ডেঙ্গু সন্দেহে ২৬৬টি মৃত্যু হলেও ১৬৪টি মৃত্যুর কারণ ডেঙ্গু বলে জানিয়েছিল আইইডিসিআর। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রকৃত মৃত্যু ছিল ১৭৯ জন।

ওই বছর জুলাইতে ১৬ হাজার ২৫৩ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলেও আগস্টে তা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। সেপ্টেম্বর থেকে কমতে শুরু করে রোগীর সংখ্যা।

২০২০ সালে করোনা পরিস্থিতির কারণে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী কম ছিল। তবে ২০২১ সালে আবারও ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা গেলে জুলাই থেকে শুরু হয় রোগী বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা। সে সময় জুলাইয়ে রোগী ছিল ২ হাজার ২৮৬, আগস্টে ছিল ৭ হাজার ৬৯৮, সেপ্টেম্বরে ছিল ৭ হাজার ৮৪১, অক্টোবরে ছিল ৫ হাজার ৪৫৮, নভেম্বরে ছিল ৩ হাজার ৫৬৭ জন। সে বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছিল ২৮ হাজার ৪২৯ জন। আর মারা গিয়েছিল ১০৫ জন।

গত বছর ডেঙ্গু রোগী বাড়তে শুরু করে জুন থেকে। জুনে ৭৩৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলেও জুলাই থেকে তা দেড় হাজার ছাড়িয়ে যায়। আগস্টে ৩ হাজার ৫২১ জন, সেপ্টেম্বরে ৯ হাজার ৯৯১, অক্টোবরে ২১ হাজার ৯৩২, নভেম্বরে ১৯ হাজার ৩৩৪ এবং ডিসেম্বরে ছিল ৫ হাজার ২৪ জন। সে বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৩৮২ জন এবং মারা গিয়েছিল ২৮১ জন। 

রেকর্ড ভাঙার বছর ২০২৩

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এই বছরে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ১ হাজার ৫৫৪ জন। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরেই মারা গেছেন ৩৯৬ জন। এযাবৎকালে ডেঙ্গুতে এক মাসে এত মৃত্যু আগে কখনও দেখা যায়নি বাংলাদেশে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ডেঙ্গু চিকিৎসায় রোগীর ব্যবস্থাপনা ভালো থাকলে মৃত্যু কম হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মশা কমানো বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। গত বছর অক্টোবরে ছিল পিক পয়েন্ট। এবার নভেম্বর পর্যন্ত সেটা থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। তারপর হয়তো কমতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যা বোঝা যাচ্ছে তাতে ডেঙ্গু সারা বছরই থেকে যাবে। সামনের দিনগুলোতে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাবে। যদি একটা জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন এবং লক্ষ্য নির্ধারণ করা যায় ২০৩০ সালের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের, সে জন্য যদি পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা যায়, তাহলে ভালো কিছু আশা করা যেতে পারে। এছাড়া এটি গ্রামীণ জনপদের জন্য বড় জনস্বাস্থ্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে ডেঙ্গু।

তিনি আরও বলেন, টিকার ওপর নির্ভর করা বাস্তবতার দিক থেকে কঠিন হবে। এখন পর্যন্ত সেই মানের টিকা তৈরি হয়নি যেটি সব ধরনের মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারে। তারপরও যদি টিকা তৈরি হয় সেটি ১৮ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যাবে। কোভিডের টিকার সময় আমরা সেটা দেখেছি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি শিকার আমরা হচ্ছি। নভেম্বর-ডিসেম্বর চলে এলেও তাপমাত্রা তেমন কমার লক্ষণ আমরা দেখতে পাচ্ছি না।

তিনি আরও বলেন, সারা দেশে যেভাবে রোগী পাওয়া গেছে সেটি আগে কখনও হয়নি। সুতরাং আমরা যদি কর্মকৌশল ঠিক করতে না পারি, আগামীতে আক্রান্তের হার অনেক বেশি হবে। এখন ঢাকায় রোগী কম আছে, ঢাকার বাইরেও রোগী কমে আসছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করি।

/এফএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
এডিস মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সবার সহযোগিতা চান মেয়র তাপস
সফলতার সঙ্গে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছি: মেয়র তাপস
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সামাজিক আন্দোলনের প্রভাব কতটুকু?
সর্বশেষ খবর
খারকিভে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ৭
খারকিভে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ৭
নির্মাণের ২ মাস পর থেকেই বন্ধ চট্টগ্রামের একমাত্র এস্কেলেটর ফুটওভার ব্রিজটি
নির্মাণের ২ মাস পর থেকেই বন্ধ চট্টগ্রামের একমাত্র এস্কেলেটর ফুটওভার ব্রিজটি
সোহাগসহ পাঁচ জনকে ফিফার সাজা
সোহাগসহ পাঁচ জনকে ফিফার সাজা
টাকা না পেয়ে পোস্ট অফিসে নারীর আত্মহত্যার চেষ্টা
টাকা না পেয়ে পোস্ট অফিসে নারীর আত্মহত্যার চেষ্টা
সর্বাধিক পঠিত
নেপথ্যে ২০০ কোটি টাকার লেনদেন, সিলিস্তাকে দিয়ে হানি ট্র্যাপ
এমপি আজীম হত্যাকাণ্ডনেপথ্যে ২০০ কোটি টাকার লেনদেন, সিলিস্তাকে দিয়ে হানি ট্র্যাপ
পূর্ব তিমুরের মতো খ্রিষ্টান দেশ বানানোর চক্রান্ত চলছে: শেখ হাসিনা
পূর্ব তিমুরের মতো খ্রিষ্টান দেশ বানানোর চক্রান্ত চলছে: শেখ হাসিনা
কবে থেকে পরিকল্পনা ও কেন কলকাতায় হত্যা, জানালো ডিবি
এমপি আনার হত্যাকবে থেকে পরিকল্পনা ও কেন কলকাতায় হত্যা, জানালো ডিবি
বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্র?
বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্র?
এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না আমার ভাই এমপি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে: মেয়র সেলিম
এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না আমার ভাই এমপি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে: মেয়র সেলিম