X
সোমবার, ০৩ অক্টোবর ২০২২
১৭ আশ্বিন ১৪২৯

স্বৈরতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে মুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ

মাসুদা ভাট্টি
২৬ মার্চ ২০২১, ১১:৩৮আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২১, ১১:৩৮

১৯৯১ সালে এসে বাংলাদেশের নব-গণতান্ত্রিক যাত্রাকে অনেকেই মাইলফলক বলে চিহ্নিত করতে চান। ব্যক্তিগতভাবে আমি সেটা মানতে নারাজ। নারাজ এ কারণেই যে, যাদের নিয়ে এই যাত্রা তাদের মধ্যে তিনটি প্রধান রাজনৈতিক গোষ্ঠীর এদেশে রাজনীতি করার কথাই ছিল না। বিএনপি বা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, যে প্রক্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছে বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা না হলে এই দলটি কোনও অস্তিত্ব পেতো? হয়তো এই দলের গরিষ্ঠসংখ্যক রাজনীতিবিদ তখন চৈনিকপন্থী মাওলানা ভাসানীর দলে গিয়ে আশ্রয় নিতেন, তাতেও বাংলাদেশের উপকার বৈ অপকার হতো না। আর বিএনপি গঠিত না হলে এদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে জামায়াতে ইসলামীকেও ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন পড়তো না। গোলাম আজমসহ অন্যান্য জামায়াত নেতারা হয় লন্ডনে, নয় সৌদি আরবে কিংবা পাকিস্তানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতেন। জেনারেল জিয়া যদি বিএনপি গঠন না করতেন তাহলে জেনারেল এরশাদ এসে জাতীয় পার্টি গঠনেরও সুযোগ বা সাহস পেতেন না। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগ, সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার দলসমূহ এবং পরবর্তীতে জাসদের মতো আওয়ামী-বিরোধী কিছু রাজনৈতিক দল গঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতো, যেমনটি পাকিস্তানে হয়েছে। হতে পারতো এদেশেও সেনা-আমলা সমর্থনপুষ্ট রাজনৈতিক দল হতো কিন্তু তারা সরাসরি সামরিক শক্তির বড়াই নিয়ে রাজনীতিতে অস্ত্র-অর্থ-ধর্ম-দুর্নীতির সুযোগ ইত্যাদির সম্মিলন ঘটিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিকে আজকের অবস্থান এনে ফেলার সুযোগ পেতো না। আমাদের গণতন্ত্রও ভারতের মতো সুস্থির না হলেও স্বাবলম্বী হতো। এই জায়গায় এসে আমাদের এই প্রশ্ন তুলতেই হবে যে, কেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমÐল ভারতের মতো না হয়ে পাকিস্তানের মতো হলো? আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থেই আমাদের এই প্রশ্নটি নিয়ে বিশদ আলোচনা করতে হবে।

বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয় তখন বাংলাদেশের চোখে বিশেষ করে দেশের শিক্ষিত শ্রেণিটির একটি বড় অংশই দেশে ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে বলে স্বপ্ন দেখেছেন। যেটি ভারতে সেই ১৯৪৭ সালের পরেই শুরু হয়েছে। জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে ভারত যে গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা শুরু করেছিল এবং যে সংবিধানটি ভারত সর্বসম্মতক্রমে গ্রহণ করেছিল তা মূলত সেক্যুলার এবং বাহ্যত বহুপক্ষের জন্য রক্ষাকবচ। নেহেরু আরও যে সকল কাজ করেছিলেন তার মধ্যে অন্যতম হলো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থাসমূহ এমন এক শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন যে, দীর্ঘদিন তারা তাদের সঠিক রাজনৈতিক অবস্থানটি ধরে রাখতে পেরেছিলেন। এমনকি নেহেরুর ‘বি ইন্ডিয়ান বাই ইন্ডিয়ান’ পলিসি দেশটির জনগণকে কখনোই বিদেশমুখী করেনি, তারা নিজেদের দেশের উৎপাদন ব্যবস্থাকেই প্রাধান্য দিয়েছে সর্বাগ্রে। নেহেরুর রাজনৈতিক ত্রুটি ছিল না সেকথা তার পরম মিত্রও বলবে না কিন্তু তার সবচেয়ে উত্তম পদক্ষেপ ছিল ভারতীয় গণতন্ত্রকে সেনা ও আমলাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখায় সফলতা অর্জন। অপরদিকে পাকিস্তানে শুরুতেই এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হোঁচট খায়। অনেক গবেষকই মনে করেন যে, জিন্নাহ্ সাহেব শেষকালে এসে ‘পোকায় কাটা পাকিস্তান নিয়া আমি কী করবো’ ধরনের উপলব্ধি প্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং পাকিস্তানেও দুই বৃহৎ ধর্ম-সম্প্রদায়ের সম্মিলন ঘটানোর চেষ্টা চালানোর পক্ষপাতি ছিলেন কিন্তু ততোদিনে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। পাকিস্তানে সেনা-আমলাতন্ত্র দেশটির রাজনীতিবিদদের দুর্বলতা আবিষ্কার করে ফেলেছে এবং তাদেরকে কখনও লোভ দেখিয়ে কখনও ভয় দেখিয়ে মূলত তারাই দেশটির নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করে ফেলে। অখণ্ড পাকিস্তানের ২৫ বছর এই সেনা-আমলাতন্ত্র যেভাবে দেশটিকে নিয়ে ছেলেখেলা করেছে সেরকমটি আর কোথাও দেখা যায় না। মজার ব্যাপার হলো, পশ্চিমা গণতন্ত্র তথা পৃথিবীর স্বঘোষিত মোড়লরা কিন্তু পাকিস্তানের এই সেনা-আমলাতন্ত্রের ঘোরতর সমর্থকই কেবল নয় তাদের সকল অনৈতিক পদক্ষেপকে সর্বৈব সমর্থন দিয়ে গেছে। নেহেরু যতোই সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দিকে ঝুঁকেছেন, একটু দূরে দাঁড়িয়ে চেষ্টা করেছেন জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন গড়ে তুলতে ততোই পাকিস্তান ঝুঁকেছে সামরিকতন্ত্রের দিকে এবং এতে পশ্চিমা মোড়লরা যারপরনাই সমর্থন, সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। পাকিস্তানের এই পুরো রাজনৈতিক সমীকরণে কেবলমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকে পাকিস্তানের সেনাতন্ত্র পাশে পায়নি, নাহলে মাওলানা ভাসানী থেকে শুরু করে এদেশের সেই সময়ের বাঘা বাঘা রাজনীতিবিদদের তারা কাত করে ফেলতে সমর্থ হয়। বঙ্গবন্ধু ও তার সঙ্গী নেতৃবৃন্দের এই অনড় ও অসহযোগিতাই যে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের নিগড় থেকে বের করে আনায় সফলতা অর্জন করে সেটা বলাই বাহুল্য। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশ ভারতীয় বা ওয়েস্টমিনিস্টার গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করবে নাকি ফেলে আসা পাকিস্তানের মতোই সেনা-আমলাতান্ত্রিক একটি উদ্ভট পথে হাঁটবে সে সিদ্ধান্ত বঙ্গবন্ধু নিলেও অর্থাৎ তিনি ওয়েস্টমিনস্টার গণতন্ত্রের দিকে পা বাড়ালেও সদ্য স্বাধীন দেশের সেনা-আমলাতন্ত্র পাকিস্তানের মতোই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশটাকে ভয়ংকর এক অস্থিরতার ভেতর নিয়ে গিয়ে ফেলে। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক শক্তির অসহযোগিতার সঙ্গে দেশের ভেতর অচলাবস্থা স্বাধীন বাংলাদেশকে শুরুতেই একটি দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি করে দেয়। তখনকার সময়ে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা লাভকারী যে কোনও দেশের মতোই বাংলাদেশও এক গভীর খাঁদের মুখোমুখি হয়। বঙ্গবন্ধু এই খাঁদ পার হওয়ার জন্য দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন কিন্তু দেশের সেনা-আমলা-রাজনীতিবিদদের মিলিত চক্রটি আন্তর্জাতিক শত্রুপক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব শুরু হওয়ার আগেই সপরিবারে তাকে ও তার সঙ্গী নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে। ফলে বাংলাদেশে পুরোপুরি পাকিস্তানি ধাঁচের সেনা-আমলাতন্ত্র থানা গেড়ে বসে এবং সংক্ষিপ্তভাবে এটাই মূল কারণ বাংলাদেশে প্রতিবেশি ভারতের মতো একটি গণতান্ত্রিক আবহ না গড়ে ওঠার।

যে কথা আগেই বলেছি যে বাংলাদেশের এই সেনা-আমলাতন্ত্র পাকিস্তানের চেয়ে আরেক কাঠি সরেশ হয়ে দেশের রাজনীতিতে দু’দু’টি রাজনৈতিক দল এবং একটি স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করে, আওয়ামী লীগ বা দেশের অন্যান্য পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোকে মূলত এই ত্রয়ী শক্তির সঙ্গে ভোটের রাজনীতি, রাজপথের রাজনীতি কিংবা রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণী যুদ্ধে মুখোমুখি হতে হয়। ক্ষমতায় থাকলে এই সেনাতান্ত্রিক শক্তিটি মূলত ধ্বংসগ্রাহী, নিজেদের এবং আপন স্বার্থ রক্ষাকারী শ্রেণিটির উন্নয়ন ছাড়া দেশের অবকাঠামো কিংবা জনগণের সার্বিক কল্যাণে কোনও ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণে অনাগ্রহী এবং যতভাবে সম্ভব রাজনীতিকে কলুষিত করার চেষ্টায় সদা মগ্ন। ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেওয়াই কেবল নয় নব্বইয়ের দশকে এসে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়া সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির প্রশ্রয়ও এদেশে এই সেনাতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তিটিই দিয়েছে। অথচ পশ্চিমসহ দেশের ভেতরকার একটি বিশিষ্ট ও শিক্ষিত শ্রেণি তাদের এই অনৈতিক ও বিধ্বংসী রাজনীতির সঙ্গী থেকেছে কখনও না দেখার ভান করে, কখনও এই অনাচারকে প্রশ্রয় এবং সমর্থন দিয়ে। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য এখানেই যে, এদেশে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলকে ঠেকানোর জন্য সেনা-আমলা-সুশীল নামে একটি চক্র বঙ্গবন্ধুর আমল থেকেই কাজ শুরু করেছিল, একুশ বছর ঠেকিয়ে রাখতে সফল হয়েছিল আওয়ামী লীগকে এবং শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব পৃথিবীর আর দশটা রাজনৈতিক দলের মতোই ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কোথাও কোথাও বেশ কিছু আপসের ফর্মুলা গ্রহণ করে এবং তাতে ১৯৯৬ সালে সফল হয় এবং ২০০৮ সালের পর তো দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের মোড় ঘোরাতে উন্নয়নকেই কেবলমাত্র আরাধ্য হিসেবে ধরে নিয়ে এগুতে থাকে। এতে সফলতা এসেছে, বেশ ভালোভাবেই এসেছে, বাংলাদেশ এখন আর ‘বাস্কেট কেইস’ নয়, এশিয়ার উদিয়মান সূর্য্য, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে এখন তুলনা করা হয় আশির দশকের সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ার সঙ্গে।

এই উন্নয়নের পথে এবং কেবলমাত্র উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে এগুতে গিয়ে আমরা কী হারিয়েছি তার যেমন হিসেব কষতে হবে তেমনই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে নির্ধারিত বাংলাদেশের রাজনীতির স্বাভাবিক ও সঠিক চলার পথটি কেন এবং কীভাবে বদলে দিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে পাকিস্তানের জনগণের মতোই ক্ষমতাহীন করে তোলা হয়েছিল সেসব আলোচনায় আনতে হবে অবধারিতভাবেই। তবে তিনপর্বের এই আলোচনা শেষ করতে চাই একথা বলে যে, বাংলাদেশের জনগণকে আবার ক্ষমতাবান করে তোলার কাজটি শুরু হয় ২০০৮ সালেই। অনেকেই হয়তো এ প্রশ্ন তুলবেন যে, নির্বাচনি ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে জনগণকে ক্ষমতাবান করার প্রক্রিয়াটি কী করে সম্ভব? এই সম্ভাবনাটি অনেক দেশেই বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলিতে মূলত অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ইউরোপের গণতান্ত্রিক শ্লাঘা মূলত ঔপনিবেশ থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে তৈরি অবকাঠামো নির্মিত হওয়ার পরই কেবল সেখানে গণতন্ত্র তার পূর্ণ সৌন্দর্য নিয়ে বিকশিত হতে পেরেছে। তার আগের ইতিহাস মূলত রক্তপাত, দুর্নীতি, দখলদারীত্বের, বৈষম্যের এবং বহুলাংশে ভঙ্গুর গণতন্ত্রের। ব্রিটেনের রাণী ভিক্টোরিয়ার আমলকে যদি আমরা আলোচনায় আনি তাহলে আমরা দেখতে পাই যে, বাংলাদেশের বর্তমান সময়টাকে আমরা ভিক্টোরিয়ার সময়কালের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারি। গোটা বিশ্বের ঔপনিবেশ থেকে সম্পদ আহরণ করে ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আর ক্রমশ দেশটি তার অভ্যন্তরীন অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্রকেও সুস্থির করে তুলছে। নির্বাচন-ব্যবস্থাকে সর্বজনীন করেছে, নারীর অধিকার নিশ্চিত করার কাজটি শুরু হয়েছে, ধনী-গরিবের বৈষম্য কমছে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থ-বিত্তের প্রভাব থেকে মুক্ত করে সাধারণ নাগরিকের জন্য সুলভ করে তুলছে। হয়তো অনেকেই একমত হবেন না আমার সঙ্গে তবে আমি গবেষণালব্ধ তথ্য দিয়েই একথা প্রমাণ করতে পারবো যে, বাংলাদেশও সে পথে হাঁটছে। এই বৈষম্য ও বিভেদপূর্ণ পৃথিবীতে যেখানে বাণিজ্যের নামে একে অপরকে কব্জায় রাখার যে নগ্ন প্রতিযোগিতা বিশ্বময় চলছে সেখানে বাংলাদেশের মতো দেশে গণতন্ত্র, নির্বাচন-ব্যবস্থা কিংবা মানবাধিকার আসলে বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণে রাখার একেকটি অস্ত্র। লক্ষ্য করে দেখবেন যখনই বাংলাদেশ সরকারকে ‘টাইট’ দেওয়ার প্রয়োজন হয় তখনই হয় নিউ ইয়র্ক কিংবা ওয়াশিংটন কিংবা লন্ডনে বাংলাদেশের এসব অবস্থা নিয়ে একেকটি উচ্চ পর্যায়ের সেমিনার হয় কিংবা নিউ ইয়র্ক টাইমস বা দ্য গার্ডিয়ানে কারো নেতিবাচক কলাম প্রকাশিত হয় কিংবা অধুনা আল-জাজিরার মতো টেলিভিশন ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার্স মেন’ নামে ডকুড্রারা প্রচার করে, যদিও কাতার একটি সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক দেশ, যে দেশের আমীরের টাকায় আল-জাজিরা চালিত হয়। এই যখন অবস্থা তখন বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনা সরকারও ‘বাস্তব থেকে শিক্ষা’ নিয়ে প্রথমে মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন বা ভাগ্যোন্নয়ন ঘটিয়ে তারপর প্রকৃত গণতন্ত্রকে মানুষের সামনে উন্মুক্ত করার যে পথটি দৃশ্যতঃ গ্রহণ করেছেন তাকে আমরা ‘টপ-ডাউন এ্যাপ্রোচ’ হিসেবে দেখতে পারি। এর সমালোচনা থাকতে পারে বিস্তর, রয়েছে দুর্নীতির কারণে ‘সিস্টেম লস’-এর বিস্তর উদাহরণও কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই পদ্ধতি বাংলাদেশে কাজ করবে বলে আমার মতো অনেকেই বিশ্বাস করেন। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় বেড়িয়ে অভ্যস্ত হওয়া বাঙালি এই দু’টি দেশের মতো উন্নয়ন চায় কথায় কথায়, এবং বাংলাদেশ অতি দ্রুত সে পথেই হাঁটছে। হয়তো আর কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশকে আমরা অর্থনৈতিক ভাবে অন্য এক উচ্চতায় দেখতে পাবো এবং তখন থেকে আমাদের নতুন করে শুরু হবে কার্যকর ও অভিজ্ঞতা-লব্ধ গণতান্ত্রিক পদযাত্রা।
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে একথা তাই আমরা জোর দিয়েই বলতে পারি যে, এর মধ্যে পয়ত্রিশ বছর গিয়েছে দিক্ ঠিক করায় যে বাংলাদেশ আসলে কোন পথে হাঁটবে। আর বাকি পনেরো বছর কাটছে মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে। কোন পথে হাঁটবে সেটা এখনও পর্যন্ত ঠিক না হলেও একথা আরও জোর দিয়েই বলা যায় যে, এদেশের মানুষের এটুকু  বোধোদয় হয়েছে যে, দু’দু’জন সেনাশাসকের তৈরি রাজনৈতিক সেনাতন্ত্রকে তারা আর মূল্যায়ন করছে না।  এখনও পর্যন্ত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির ব্যাপারে বাঙালি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনি, বরং এই শক্তির সঙ্গে বার বার আপসের ধারাটিই আমরা দেখতে পাচ্ছি। হয়তো একদিন ধর্মকে জায়নামাজের চৌকিতে রেখে বাঙালি প্রকৃত গণতান্ত্রিক শক্তি নিয়ে মাঠে নামবে, সে আশা আমরা এই পঞ্চাশতম জন্মদিনে করতেই পারি। মাত্র পঞ্চাশ বছরে জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে এমনকি মহাকাশে বাঙালির বিজয়চিহ্ন অঙ্কিত হয়েছে, এ যেমন বিস্ময়কর তেমনই বিশ্লেষকদের চোখে ‘প্যারাডক্স’ বা কূটাভাষ বা প্রচলিত সত্যের বিপরীত ধারণা।

তাহলে প্রচলিত সত্যটি কি? যে কথা এতোক্ষণ ধরে বলেছি, বাংলাদেশকে ‘বাস্কেট কেইস’ বানানোর জন্য দেশ-বিদেশি সকল চক্র সকল শক্তি নিয়োগ করেছিল, দু’দু’টি সামরিকতন্ত্রজাত রাজনৈতিক দল বাঙালির গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছিল, ধর্মভিত্তিক উগ্রবাদের চাষাবাদ হয়েছে বা হচ্ছে এখনও তারপরও কী করে বাংলাদেশ এতোটা এগোলো? পশ্চিমা গবেষকরা তাই একে ‘প্যারাডক্স’ বলছেন, আমরা বলতে চাই আসলে ‘প্যারাডক্স’ নয়, জাতির পিতা যে কথা ৭ই মার্চ ১৯৭৫ সালে তার পঞ্চাশতম জন্মদিনের মাত্র দশদিন আগে বলে গিয়েছিলেন, “আর দাবায়ে রাখতে পারবা না”- বাঙালিকে দাবায়ে রাখা যায়নি।

শুভ জন্মদিন প্রিয় বাংলাদেশ, প্রিয় মাতৃভূমি।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

প্রথম পর্ব: বঙ্গবন্ধু ১০০ বাংলাদেশ ৫০

 
/এসএএস/
সম্পর্কিত
দেশের স্বার্থে দুই প্রধানমন্ত্রী আপসহীন ছিলেন
দেশের স্বার্থে দুই প্রধানমন্ত্রী আপসহীন ছিলেন
অর্থনীতি, আইএমএফ-এর ঋণ আবেদন এবং প্রচারণা
অর্থনীতি, আইএমএফ-এর ঋণ আবেদন এবং প্রচারণা
পদ্মা সেতু খুলে গেলো আর হেরে গেলো ‘ওরা’
পদ্মা সেতু খুলে গেলো আর হেরে গেলো ‘ওরা’
আপনার বিবেক বলবে ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
আপনার বিবেক বলবে ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
আগামী প্রজন্মের জন্য পরিকল্পিত নগরায়ণের বিকল্প নেই : রাষ্ট্রপতি
আগামী প্রজন্মের জন্য পরিকল্পিত নগরায়ণের বিকল্প নেই : রাষ্ট্রপতি
শান্ত হত্যা মামলায় শোন অ্যারেস্ট ছাত্রলীগ নেতা অনিক
শান্ত হত্যা মামলায় শোন অ্যারেস্ট ছাত্রলীগ নেতা অনিক
তেলের উৎপাদন কমাচ্ছে ওপেকপ্লাস, দাম বাড়ার আশঙ্কা
তেলের উৎপাদন কমাচ্ছে ওপেকপ্লাস, দাম বাড়ার আশঙ্কা
গাজীপুরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ব্যবসায়ী ও কলেজছাত্র নিহত
গাজীপুরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ব্যবসায়ী ও কলেজছাত্র নিহত
এ বিভাগের সর্বশেষ
নয় ভারত, নয় পাকিস্তান, আমরা বাংলাদেশ
নয় ভারত, নয় পাকিস্তান, আমরা বাংলাদেশ
বঙ্গবন্ধু ১০০ বাংলাদেশ ৫০
বঙ্গবন্ধু ১০০ বাংলাদেশ ৫০