X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি

‘দৈনিক বাংলার প্রেসে বোমা ফাটাইছি’

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ২০:৩১

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মাত্র ২০-২২ জনের একটি তরুণ দল, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন এবং ওই সময়ের ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকায় ছোট ছোট টিমে বিভক্ত হয়ে সুযোগ মতো তারাই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত রাখার জন্য অপারেশন চালিয়েছেন। কোথাও গ্রেনেড চার্জ, কোথাও বোমা বিস্ফোরণ। ‘সাধারণ মানুষের মনোবল আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতি আস্থা সৃষ্টিতে এসব আক্রমণচেষ্টা প্যানিক তৈরি করতে সহজ হতো’ বলে মনে করেন সেই দলের সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে তিনি ও তার বন্ধুদের অংশগ্রহণের গল্প। তার গল্পে উঠে এসেছে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিনের প্রসঙ্গও।  

বাংলা ট্রিবিউন: ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর কি আপনি ঢাকাতেই ছিলেন?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: বেসিক্যালি আমরা ঢাকাতেই ছিলাম বেশিরভাগ সময়। আমরা তো ‘হিট অ্যান্ড রান’ ছিলাম। বাংলাদেশে তো নানান রকমের ফোর্স কাজ করেছে। কেউ কেউ ইন্ডিয়ায় গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে সেক্টরে কাজ করছে। নিজেরা নিজেরা সংগঠিত হয়ে অস্ত্র ও বোমা গ্রেনেড সংগ্রহ করে বিভিন্ন জায়গায় আক্রমণ করতাম। আর আমরা একটা পত্রিকা বের করতাম। পত্রিকার নাম ছিল ‘পূর্ব বাংলা’। রণাঙ্গনের খবরগুলো নিয়ে পত্রিকা বের করতাম। পত্রিকাটা ছাপা হতো বাংলা একাডেমিতে। তখন কবীর চৌধুরী সাহেব ছিলেন বাংলা একাডেমির ডিজি। আর আরেকজন ছিলেন রাব্বি সাহেব। ওখান থেকে ছাপানোর কাজ করে বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি বিলি করতাম। ছাপানোর কাজটি করতেন একজন বিহারি। আমরা তো জানতাম, উনি বাংলা জানেন না। কিন্তু স্বাধীনের পর উনার চাকরি চলে গেলো। তো, তিনি ডিজিকে বললেন, স্যার, আমি তো বাংলা জানি। তারা যে পত্রিকা বের করতো, আমি পড়তে পারতাম। ওই বিহারি লোকটির জন্য আমরা কিন্তু ওই সময় বেঁচে গেছি। না হলে কবীর চৌধুরী, রাব্বি সাহেবসহ আমরা বিপদে পড়তাম। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে মানুষ যেন হতাশ না হয়, সে জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে খবর পৌঁছে দিতাম। এটা শুরু করেছিলাম এপ্রিল মাস থেকে। তো পরে আমরা পাকিস্তানিদের ওপর নিউ মার্কেটে বোমা মেরেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও বোমা মেরেছি। এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় বোমা হামলা করেছি। তখন দেশের মানুষের মাঝে একটা আশার সঞ্চার হয়েছে যে আমরা (মুক্তিযোদ্ধারা) আছি। এটা আমরা চালাতে পেরেছি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তারপর মোটামুটি আমাদের কেউ মরে গেছে, কেউ জেলে চলে গেছে।

বাংলা ট্রিবিউন: কেমন সংখ্যক তরুণরা ছিলেন আপনারা?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: একসঙ্গে প্রায় ২০ জন ছিলাম। আমরা নিজেরা কথা বলেই সব ঠিক করতাম। মাহফুজ উল্লাহ ছিল, আমি ছিলাম, তারপর মজনু ছিল। মনির, মনিরের ছোট ভাই পল্টনের জামি, তারপরে বেনজির আহমেদের ছেলে ছিল, নামটা মনে নেই। তখন আমি ইউনিভার্সিটিতে সেকেন্ড ইয়ারে। তারপর বেশিরভাগ ধরা পড়ে যায়। আর আমি হাইডে চলে যাই। যখন ১৬ ডিসেম্বর এলো তখন আমরা হাইড থেকে বের হলাম। আমাদের কাছে যা ছিল ছোটখাটো ওগুলো ব্যবহার করছি। আমাদের কাছে কার্বাইন ছিল, ওগুলো নিয়ে লড়ছি মিলিশিয়াদের সঙ্গে। তারপর ১৪ তারিখ থেকে ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্স স্টেপিং করা শুরু করলো। বেসিক্যালি করছে এলিফ্যান্ট রোডে। আমাদের সিভিলিয়ানও মারা গেছে। আমার এক ক্লাস নিচে পড়তো একটা মেয়ে মারা গেছে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তো। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীনত হচ্ছে এটা তো আমরা তিন-চার দিন আগে থেকেই জানতে পেরেছি। সব ফল করে গেছে ঢাকায়। আমরা সবাই তো এক্সাইটেড। এরমধ্যে আবার এসব করার জন্য সেকেন্ড বেঙ্গলের কিছু লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে জিনিসপত্র নিতাম আমরা। ওদের সঙ্গে সম্পর্ক করে তাদের কাছ থেকে নিতাম। তো বন্ধুবান্ধব সব মারা গেছে, যারা আছে তাদের মধ্যে ছাত্রলীগের তারেক ছিল, শমসেরের ছোট ভাই শাহান ছিল। এরাও আমাদের সঙ্গে বিচ্ছিন্নভাবে ছিল আরকি। বাট মাঝে মাঝেই আমরা যোগাযোগ করতাম। আমিও ধরা পড়েছিলাম, বাট লাকিলি আমি আর মাহমুদুল্লাহ বেঁচে গেছি। সেদিন আমরা সাতটা ওয়াল টপকেছিলাম, এখন ভাবি সেটা কীভাবে সম্ভব হয়েছিল।’

বাংলা ট্রিবিউন: ১৬ ডিসেম্বর আপনি তখন কোথায়?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: আমি তখন ইস্কাটনে ছিলাম। আমরা জানতেছি, ঘুরে বেড়াচ্ছি।

বাংলা ট্রিবিউন: পরিস্থিতি কেমন ছিল সেদিন?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: পাকিস্তানিরা গুটিয়ে যাচ্ছে আরকি, রাস্তা খালি হয়ে যাচ্ছে। আমাদের বাঙালি সাধারণ মানুষও রাস্তায় উঁকিঝুকি করছে।

বাংলা ট্রিবিউন: ওই সময় শহরের অবস্থা কেমন ছিল?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: থমথমে ভাব। আমার যতদূর মনে পড়ে কারফিউ দিয়েছিল ওরা। তারপর যখন ঘোষণা হলো রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ হবে, তখন মানুষ একবারে স্রোতের মতো বের হয়ে আসছে। ১৫, ১৬ ডিসেম্বর দুই দিনই মানুষ রাস্তায় ছিল এবং রেসকোর্সে, রাস্তায়, পুরো শহরেই মানুষ গিজগিজ করছিল।

বাংলা ট্রিবিউন: তখন আপনারা বের হয়ে গেছেন?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: বের হয়ে গেছি, মুক্তিযোদ্ধারা ঢুকতেছে, ফিল্ডে ছিল যারা ঢুকছে; কৃষক সাধারণ মানুষের সন্তানদেরই দেখলাম। যুদ্ধে কৃষক শ্রমিক এরাই ছিল। ১৫ তারিখ বিকালের দিকে, বোধহয়; আমরা তখন ইন্টারকনে (শাহবাগের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল) গেছি। পাকিস্তানের দালালগুলোকে ধরার জন্য। আমাদের কাছে খবর ছিল ক্যান্টনমেন্টের লোকজনও আছে সেখানে। আমরা ধরবো, মারবো আরকি। আমরা অনেককে ধরছিলামও। পরে অনেকে আওয়ামী লীগ করছে, বিএনপিতে গেছে। বড় আমলা, সিএসপি সার্ভিসেস লোকজন। তখনকার অনুভূতিটা ভাষায় বলা যায় না আরকি। উই আর সো এক্সাইটেড। ষাটের দশক থেকে আন্দোলন করতে করতে মুক্তিযুদ্ধ। ৭ মার্চের ভাষণে মুক্তিযুদ্ধের কোনও ঘোষণা পেলাম না আমরা। জাতি আশাহত হয়ে গেছে ২৫ রাত যখন এলো, তারপর কোনও ঘোষণা আমরা পেলাম না কারও কাছ থেকে। তারপর মানুষও কিন্তু হতাশ ছিল দুই তিন দিন পর্যন্ত। তখন জিয়াউর রহমানের ঘোষণা যখন এলো তখন মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরলো যে বাঙালি সৈন্যরা যুদ্ধ শুরু করেছে। রাতের বেলা তো টেস্ট হয়ে গেছে যে আমরা সিভিল ছাড়া কিছু করতে পারবো না যদি আমাদের সামনে বাঙালি সৈনিকরা না থাকে। যখন জিয়াউর রহমান বললো “উই রিভোল্ট”। যুদ্ধ ঘোষণা দিলো। তখন আমরা বুঝলাম বাঙালি সৈনিকরা নেমে গেছে। বাঙালি সৈনিকরা নামলে সঙ্গে পুরা জাতি একসঙ্গে হলে তো পাকিস্তানিদের আটকানো যাবে। আপনাকে বুঝতে হবে, যখন বললো উই রিভোল্ট, তার অর্থ বিদ্রোহ করলো। হি ব্রোক দ্য প্রমিস। যদি ফেল করতে তাহলে তো ফাঁসি হতো।

বাংলা ট্রিবিউন: ঢাকার কী কোনও একটা অপারেশনের বিষয় আপনার স্মৃতিতে ভাসে?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: আমার স্মৃতিতে ভাসে এই যে আমরা এলিফ্যান্ট রোডে সাবস্টেশনটা আছে, ওটা ওড়ায়ে দেওয়ার অনেক চেষ্টা করছি আমরা। কিন্তু রাতের বেলায় এত লাইট থাকতো তো।

বাংলা ট্রিবিউন : তখন ওখানকার দৃশ্যটা কী ছিল?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: খালি জায়গা। তখন তো কিছু ছিল না। পুরান বস্তি ছিল, মহসিন হলের পেছনে বস্তি ছিল। নীলক্ষেতে বাবুপুরা বস্তি। এত মসজিদ ছিল না। আমাদের হল ছিল মহসিন হল, সূর্য সেন হল আর ওই দিকে জগন্নাথ হল। আর জিন্নাহ হল আরকি, পরে সূর্যসেন হল হলো। এগুলোই ছিল আর কিছু ছিল না। ইভেন এখন যে পাবলিক লাইব্রেরি আছে ওটাও তো ইনকমপ্লিট, এগুলো কিছু ছিল না। আর শাহবাগ হোটেল, আর তখন কেবল পিজি হাসপাতাল করছে। 

বাংলা ট্রিবিউন: এখানে কি কোনও একটা খাল ছিল? শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটটা এখন যেখানে।

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: হ্যাঁ বড় খালের মতো ছিল। খাল ছিল বলেই তো হাতিরপুলের ব্রিজ ছিল। দুটো কারণে ছিল। এক ছিল ট্রেন যেত নিচ দিয়ে ফুলবাড়িয়া স্টেশনে। ড্রেনের মতো, অত বড় খাল না। ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু

বাংলা ট্রিবিউন: হাতি যাওয়ার সুবিধার্থে ব্রিজ করেছে?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: ট্রেনের জন্য, তবে হাতিরপুল নাম দিয়ে দিছে। ওখানে অনেক চেষ্টা করে কোনও কিছু ফিট করা যাচ্ছিল না। পরে একদিন ধৈর্যহারা হয়ে কাছ দিয়ে গ্রেনেড চার্জ করে ভেগে গেলাম। 

বাংলা ট্রিবিউন: এটা কোন মাসে?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: এটা জুন-জুলাইয়ের দিকে। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ওই ৯ মাসে কিন্তু কোনও বিদ্যুৎ যায়নি। কিছু যে করবো, তার সুযোগ ছিল না। ইউনিভার্সিটি যখন খুললো তখন ভয় দেখানোর জন্য ঘুরে বেড়াতাম। কীভাবে কী করা যায়। তো একদিন একটা ক্লাসের মধ্যে বোমা মেরে দিলাম।

বাংলা ট্রিবিউন: তখন কি ক্লাস হচ্ছিল নিয়মিত?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: ক্লাস হয় মাঝে মাঝে। তার মধ্যে খালি ক্লাস ছিল, বোমা ফিট করে চলে আসছি। তারপর দৈনিক বাংলাতেও বোমা মারছি।

বাংলা ট্রিবিউন: দৈনিক বাংলা মোড়ে নাকি পত্রিকায়?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: মোড়ে না, ভেতরে। নিচে প্রেস আছে যে প্রেসের সিঁড়ির নিচে বোমা ফাটাইছি। তখন তো গেরিলা যুদ্ধ করতাম, প্যানিক করার জন্য। মানুষকে কনফিডেন্স গ্রো করানোর জন্য এগুলো করতাম। সবচেয়ে এক্সাইটিং ছিল যে আমরা পত্রিকা বের করতাম। পূর্ব বাংলার পত্রিকা বের করতাম। 

বাংলা ট্রিবিউন: এ কাজগুলো কোথায় করতেন?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: প্রথমে করতাম শান্তিনগরে, আমার বোনের বাড়িতে। তারপর শিফট করে এলাম এখানে। 

বাংলা ট্রিবিউন: কী ছাপাতেন পূর্ব বাংলায়?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: যুদ্ধের খবর। সিলেটে কী যুদ্ধ হচ্ছে, কোথায় কী হচ্ছে এসব। 

বাংলা ট্রিবিউন: খবরগুলো পেতেন কীভাবে?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: কোথায় যুদ্ধ হচ্ছে জানতাম। মোবাইল ছিল না টেলিফোনও ছিল না। বই পুস্তক পড়ে যে খবর পাইছি, রেডিওতে শুনে- ওভাবে খবরটা তৈরি করতাম। মানুষের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য এসব খবর করতাম।

বাংলা ট্রিবিউন: এটা কখনও ধরা পড়েনি পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: এটা ধরে পড়েনি। তবে আমরা ধরা পড়ে গেছিলাম একটা ভুলের জন্য। আমাদের মধ্যে একটা ছেলে বিট্রে করে। একদিন বিকালে অস্ত্র আসার কথা। আমি ওয়েট করছি শান্তিনগরে বোনের বাসায়। আমাকে ইনফর্ম করা হলো যে গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে দাঁড়ায়ে থাকবে। হঠাৎ দেখলাম নীল একটা জিপ পার হয়ে গেলো। ওখানে আমাদেরই কোনও একটা ছেলে বসে আছে ওর মধ্যে। জিপটা একটু সামনে গিয়ে ঘুরালো, তখন আমি ভয় পাইছি। আমার বোনের বারান্দায় মাসকিটো নেট ছিল। নেটের ওখানে দাঁড়াই দেখলাম গাড়িটা এই বাড়ির সামনে থামলো। মাহফুজ উল্লাহও ছিল আমার সঙ্গে। ওকে বললাম, কাজ তো হয়ে গেছে।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনারা দুজন ক্লাস ফ্রেন্ড?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: পলিটিক্যাল ফ্রেন্ড। ওপরে বোনের বাড়িওয়ালি ছিল নন-বাঙালি। তো উনার ওখানে উঠে যাই। ‘ক্যায় হুয়া ব্যাটা’, আমি বললাম আমাদের তো মুক্তি বলে ধরতে আসছে পাকিস্তানিরা। সিভিল ড্রেসে পাকিস্তানি ওই ছেলেটা খুব দেখাই দিচ্ছে। তো বললো ‘ঠিক হ্যায় আন্দার যাও।’ ভিতরে বাথরুমে গিয়ে ছিলাম আরকি। সিভিল পাকিস্তানি ছিল সাদা কুর্তা পরা একজন বললো ‘মুক্তি হে ইদার? মুক্তি হে?’ তো উনি খেপে গেলেন। উনি তাদের বললেন, একবার আমরা ইন্ডিয়া থেকে মার খেয়ে এখানে আসছি। এখন এখানে, আমার ঘরে মুক্তি খুঁজতেছো, তুম লোগোকো কেয়া মিলা হে। তিনি তাদের সঙ্গে চিল্লাচিল্লি করলেন। আমরা বাথরুম সব শুনতেছি। পাকিস্তান সিভিল তখন ‘মা’জি মাফ কি জি য়ে, হাম লোগ সোচা মুক্তি ইদার হে। হামনে দেখা মুক্তি ইদারই আয়া থা।’ কিছুক্ষণ পর ওনি এসে বললো তাড়াতাড়ি ভাগো তোমরা। বোনের বাসার পেছনে ওয়াল ছিল। সেই ওয়াল টপকাইছি। চার-পাঁচটা ওয়াল টপকাইছি। জোনাকি সিনেমার পিছনে বস্তি ছিল। সেই বস্তির মধ্যে ঢুকেছি আমরা দুজন।

বাংলা ট্রিবিউন: এটা কয় মাস বের করলেন?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: এটা বেশি দিন না, চার মাস চালিয়েছি।

বাংলা ট্রিবিউন: এটার কোনও কপি সংরক্ষণে আছে?
 
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: নাই। সবাই তো পালাই গেছিলাম আমরা।
 
বাংলা ট্রিবিউন: কোথাও কারও কাছে নাই?
 
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: আমাকে মাহফুজ উল্লাহ বলছিল জাদুঘরে নাকি আছে।
 
বাংলা ট্রিবিউন: এটার সম্পাদক কে ছিলেন?
 
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: আমি আর মাহফুজ উল্লাহ চালাতাম এটা। মাহফুজ উল্লাহ লিখতো।
 
বাংলা ট্রিবিউন: ছাপাতেন কোথায়?
 
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: বাংলা একাডেমিতে। পূর্ব বাংলা পত্রিকা তো লাল একটা ব্লক বানিয়ে নিয়ে লাল কালি দিয়ে চাপাই-চাপাই লিখতাম। নিজেদের হাতে। সারা রাত ভরে কাজ করতাম।

 

বাংলা ট্রিবিউন: তারপর?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: তখন আবার বস্তির লোকজন আমাদের ঘিরে ধরছে, এই মুক্তিবাহিনী আসছে, মুক্তিবাহিনী আসছে। কেউ আবার দেখছে মেইন রোডে আর্মি খুঁজতেছে। ‘এদের তো আর্মি ধইরা ফালাইছিল, বাঁইচা গেছে’। একজন বুড়ি, বিশ্বাস করো মুক্তিযুদ্ধে কী ইউনিটি ছিল। একজন বুড়ি এক গ্লাস দুধ নিয়ে আসছেন। বলেছেন, বাবা ‘খাও তোমরা খাও’। আমি বললাম দুধ খাবো কেন? ওনি বললো, ‘তোমরা ভয় পাইছো না। দুধ খাও, তাহলে বল হবে।’ আমি অর্ধেক ও মাহফুজ উল্লাহ অর্ধেক খাইছে।

বাংলা ট্রিবিউন: তখন কি আপনারা ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: হ্যাঁ। আমরা তো ইন্ডিয়ান বর্ডার ক্রস করার চেষ্টা করলাম। ক্রস করতে গিয়েই তো জিয়াউর রহমানের ঘোষণা শুনলাম।

বাংলা ট্রিবিউন: এটা কোন এলাকায়?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: প্রথমে শিবগঞ্জ গেছি। বিএনপির সাবেক মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়ার ওখানে। ওখান থেকে আমরা রওনা দিছি কুমিল্লা।

বাংলা ট্রিবিউন: নরসিংদী থেকে কুমিল্লা?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: ওখানে থেকে ট্রেনে করে কুমিল্লায় নামছি। যাওয়ার আগে জিয়াউর রহমানের ঘোষণা শুনে গেলাম আরকি।

বাংলা ট্রিবিউন: ভারতে যেতে পারেননি?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: না। খবর আসলো যে ওখানে আইডেন্টিফিকেশন করছে। আমরা তখন নকশাল করতাম। আওয়ামী লীগ যাদের আইডেন্টিফাই করতে না পারবে, তাদের অ্যারেস্ট করতেছে।  

বাংলা ট্রিবিউন: এটা কোন মাসের কথা?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: এটা মে’র মাঝামাঝি। তারপর ঢাকায় থাকছি। নিজেরা নিজেরা যেটা করার করছি।

বাংলা ট্রিবিউন: ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা যোদ্ধারা তো স্বীকৃতি পেয়েছেন, সরকার কী আপনাদের স্বীকৃতি দিয়েছে?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: ওদেরটা দিছে, আমাদেরটা দেয়নি।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনাদের লিখিত স্বীকৃতি নেই?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: না, আমাদের নেই। আমার দরকারও নেই। ইতিহাস আমার আছে। যখন মুক্তিযোদ্ধাদের সার্টিফিকেট দেবে, শেখ কামালকে বলছিলাম, জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করলা এটা। সে বললো কেন? আমি বলেছিলাম, আমি মায়ের জন্য যুদ্ধ করেছি, মায়ের ইজ্জত বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ করছি। মায়ের ভালোবাসার জন্য সার্টিফিকেট দিতে হবে? তখন ‘মাস্কো সু’ বলে বড় জুতার দোকান ছিল। সাবস্টেশনের উল্টা দিকে, এলিফ্যান্ট রোডের মোড়ে বস্তির উল্টা দিকে। এখনও আছে ছোট, তখন ওটা বড় দোকান ছিল। তখন আমরা স্যান্ডেল কিনতে গেছি। একজন শেখ কামালের কাছে সার্টিফিকেট নিয়ে আসছে। বলতেছে ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা, দুই দিন ধরে খাই নাই।’ কামাল দশ টাকা বের করে দিলো। এ কামই করছে এখন। মুক্তিযোদ্ধা খায় না, সার্টিফিকেট দেখায়ে ভিক্ষা করতেছে। যে লোকটা জান দিতে গেলো সে ভিক্ষা করবে কেন? তাও আবার সার্টিফিকেট দেখাইয়া। এই যে সার্টিফিকেট দিতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধার মূল্যায়ন পড়ে গেলো। আমাকে সার্টিফিকেট জোর করে দিছিল। আমি ব্যবহারও করি নাই, বিএনপির সময়। এবার তো অ্যাপ্লাইও করি নাই। অ্যাপ্লাই করলেই অপমান করতো।

বাংলা ট্রিবিউন: ১৬ তারিখে আত্মসমর্পণ করলো। আপনারা কি মাঠের ভেতরে যেতে পেরেছিলেন?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: রেসকোর্সের ভেতরে যেতে পারিনি। ঢাকা ক্লাবের ওই সাইডে যেতে পারছি। ভেতরে যেতে পারিনি।

বাংলা ট্রিবিউন: সন্ধ্যায় যখন আত্মসমর্পণ শেষ, তখন কী মনে আছে আপনার। কী হচ্ছিল?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: বন্দুকের গুলি, যা যা আছে, বন্দুকের গুলি চলছে সবদিকে।

বাংলা ট্রিবিউন: কয়টা পর্যন্ত এমন চলছে?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: সারা রাত, সারা রাত উল্লাস চলছে। তখন তো ল অ্যান্ড অর্ডার নেই। প্রত্যেকে ইনসিকিউরিটির মধ্যে, কী হবে না হবে। শেখ মুজিব নাই। তাজউদ্দীনের সরকার, এরাও নাই। তারা তো পরে এলেন। এসব নিয়ে সবাই টেনশনে ছিল। আমাদের সুবিধা ছিল, আমাদের সব মেজরদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। ওরা ঢুকছে, ওদের কাছে যাচ্ছি আমরা। ইন্ডিয়ান আর্মির সঙ্গে আমরা ঢুকে গেলাম। এই সময় ল অ্যান্ড অর্ডারে আনতে বিভিন্ন অপারেশনে সঙ্গে ছিলাম। মিরপুর অপারেশনে যাইনি আমি, ইচ্ছা ছিল। বিহারিদের সঙ্গে অপারেশনে আমাদের যেতে দেয়নি। আর্মিরাই গেছিল, ওখানে অনেকে জীবন দিছে।

বাংলা ট্রিবিউন: ওই রাতে ঢাকার যে পরিবেশ ছিল, লাইট বা বিদ্যুৎ কি তখন চলছিল?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: হ্যাঁ বিদ্যুৎ ছিল। সবই ছিল। মরতেছে, গুলি হচ্ছে। কাদের সিদ্দিকী এলো। স্টেডিয়ামের মধ্যে রাজাকারদের বিচার করলো।

বাংলা ট্রিবিউন: স্বাভাবিক হতে কতদিন লাগলো?

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: স্বাভাবিক হতে অনেক দিন লাগছে। শেখ সাহেব আসলেন ১০ তারিখে। গভর্নমেন্ট একটা ফর্ম নিলো, তারপর আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হওয়া শুরু করলো। কিন্তু তারপরও ইট ওয়াজ নট সেফ, মানে ডাকাতি বেড়ে গেলো। পুলিশও খুব একটা সাহস পেলো না। আমি যা মনে করি, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী আবুল ফজল সাহেব আমাকে একদিন বলেছিলেন, একাত্তর থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত বাঙালি জাতি কাদামাটির মতো ছিল। যদিও বাঙালি জাতি যে কারণে যুদ্ধ করেছে তার যথাযথ রূপায়ণ সম্ভব হয়নি।

/আইএ/এমএস/এমওএফ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
তেলের দাম আর কাকে বলে!
কান ডায়েরি-২তেলের দাম আর কাকে বলে!
অনুমোদন না থাকায় সাভারের ৪ হাসপাতাল বন্ধ
অনুমোদন না থাকায় সাভারের ৪ হাসপাতাল বন্ধ
উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় চুরির অপবাদে নারীকে লাঠিপেটা
উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় চুরির অপবাদে নারীকে লাঠিপেটা
সাপের বিষ থেকে বাঁচতে ট্যাবলেট, কলকাতায় মিলছে সাফল্য
সাপের বিষ থেকে বাঁচতে ট্যাবলেট, কলকাতায় মিলছে সাফল্য
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত