‘মোরা একখানা ভালো ছবির জন্য যুদ্ধ করি’

মাজহারুল হক লিপু, মাগুরা
০৭ মার্চ ২০২২, ১১:০০ আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২২, ১৫:৫৯

সত্তরোর্ধ্ব অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান সময় পেলেই ছবিটি হাতে নিয়ে দুই চোখ ভরে দেখেন। মনের অজান্তেই ফিরে যান ৫০ বছর আগের দিনগুলোতে। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে দেশ স্বাধীন করতে বাড়ি ছেড়েছিলেন মাগুরার মহম্মদপুরের হাফিজুর রহমান। তখন তিনি ছিলেন ২১ বছরের তরুণ।

আরও কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে মহম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় নেমে পড়েন যুদ্ধে। প্রথমে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের খোঁজখবর নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন তারা। পরে যুদ্ধে অংশ নেন হাফিজুর রহমান। যুদ্ধের নয় মাস থেকেছেন আত্মগোপনে। বাড়ির খুব কাছে গিয়েও একবারের জন্য ঘরে যেতে পারেননি।

সেসময়ের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমি এই অঞ্চলের সন্তান। এখানেই বড় হয়েছি। এজন্য এখানের সবগুলো স্থান ছিল পরিচিত। এলাকার রাজাকারদের প্রতিরোধ করাই ছিল আমাদের প্রধান কাজ। রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিতাম আমরা। তাদের ধরে এনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো নিতাম। বেশ কয়েকটি বড় অপারেশনে অংশ নিয়েছিলাম। আজও মনে পড়ে সেই দুই ভাই আহম্মদ ও মহম্মদের শহীদ হওয়ার কথা।’

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘১৯৭১ সালের ১৯ নভেম্বর মহম্মদপুর উপজেলার মুসল্লি বাড়ির সামনে পুকুরের দুদিক থেকে গোলাম ইয়াকুব ও মাসরুর-উল-হক সিদ্দিকীর (কমল সিদ্দিকী, বীর উত্তম) নেতৃত্বে আমরা পরিকল্পিত আক্রমণ করেছিলাম। তখন সিও অফিসে ছিল শত্রুদের ক্যাম্প। সেখান থেকে পাল্টা বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ছিল। সবার সামনে ছিলেন আহম্মদ ও মহম্মদ। হঠাৎ গুলিতে মহম্মদ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাকে উদ্ধার করতে ছোট ভাই আহম্মদ জাপটে ধরেন। এ সময় আহম্মদকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে আহম্মদও শহীদ হন। চোখের সামনে তাদের মৃত্যু হলো। সেই দিনটির কথা আজও ভুলতে পারি না।’ বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজুর রহমান

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চার বন্ধু মিলে একটি ছবি তুলে বাঁধাই করে রেখেছিলেন। সময় পেলেই ছবিটি হাতে নিয়ে দুই চোখ ভরে দেখেন, আর স্মৃতিগুলো স্মরণ করেন হাফিজুর রহমান।

এই ছবির প্রসঙ্গে হাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিজয় অর্জনের পর আমরা একদিকে যেমন স্বজন হারানোর বেদনায় পুড়ে চলেছি অন্যদিকে নতুন স্বপ্ন ছিল সবার চোখে। মহম্মদপুর উপজেলায় কোনও স্টুডিও ছিল না। তাই ভাবলাম অস্ত্র জমা দেওয়ার আগে মাগুরায় গিয়ে একটা ছবি তুলি। চার বন্ধু তখন খেয়ালি স্টুডিওতে ছবিটি তুলেছিলাম। ছবিতে আমার সঙ্গে রয়েছেন সোহরাব হোসেন, আনোয়ার হোসেন মন্টু ও একেএম ফজলুল হক।’

হাফিজুর রহমান বলেন, ‘মোরা একখানা ভালো ছবির জন্য যুদ্ধ করি। এই ছবিটি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমার দুই কন্যাসন্তান ছবিটি নিয়ে গর্ব করে। আজ যদি সবাই তাদের সন্তানকে এমন গল্প শোনাতে পারতো। তবে বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানের পতাকা উড়তে দেখা যেতো না। নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস জানানো খুব জরুরি। এতে তাদের মধ্যে দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হবে।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল প্রকৃত জনযুদ্ধ: স্পিকার
আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ, ভিডিও করায় সাংবাদিকের ওপর হামলা
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কার্যালয়ে ভাঙচুর, চেয়ার-টেবিল-আসবাব-আলমারি লুট
সর্বশেষ খবর
‘দোকানদাররা বলে দাম কমেছে, কিন্তু কীভাবে বা কতটুকু কমে আমরা বুঝতে পারি না’
‘দোকানদাররা বলে দাম কমেছে, কিন্তু কীভাবে বা কতটুকু কমে আমরা বুঝতে পারি না’
‘ঘুম ভাঙলো বিকট শব্দে, চোখ খুলেই দেখি পাশে চার লাশ’
‘ঘুম ভাঙলো বিকট শব্দে, চোখ খুলেই দেখি পাশে চার লাশ’
কারফিউয়ে শান্ত ফরাসি শহর, পুলিশের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা স্বীকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
কারফিউয়ে শান্ত ফরাসি শহর, পুলিশের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা স্বীকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
রাজধানীতে পাকিস্তানি নাগরিকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
রাজধানীতে পাকিস্তানি নাগরিকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির