X
বুধবার, ২৯ মে ২০২৪
১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

যেভাবে ৫ টাকায় ৩৫০ কিমি পথ পাড়ি দিলেন জাবি শিক্ষার্থী

এস এম তাওহীদ, জাবি
০৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৫২আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৫৯

তাসনিম হাসানের গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী। পড়াশোনা করেন রাজধানীর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি)। আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গ্রামের বাড়িতে যাবেন ছুটি কাটাতে। ২৪ মার্চ সকাল ৮টা থেকে ৪ এপ্রিলের ট্রেনের টিকেট বিক্রি শুরু হওয়া কথা জেনে তাসনিম ২৪ মার্চ সকাল পৌনে ৮টা থেকে টিকেট বিক্রির ওয়েবসাইটে ঢুকে বসে থাকেন। কিন্তু আশঙ্কায় সত্যি হলো ৮টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে চেষ্টা করেও কোনও টিকিট পেলেন না তাসনিম। এরপর এক বড় ভাইয়ের পরামর্শে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মাত্র পাঁচ টাকা খরচে কুড়িগ্রাম পৌঁছান তাসনিম। পাঁচ টাকায় ৩৫০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে তাসনিমের বাড়িতে যাওয়ার গল্প শুনিয়েছেন বাংলা ট্রিবিউনকে।

তাসনিমের ভাষ্য অনুযায়ী, রোমাঞ্চকর এই যাত্রাটি শুরু হয় ৩ এপ্রিল সকালে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে কুড়িগ্রামের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে দাঁড়িয়ে এক হাতে ‘টাঙ্গাইল’ লেখা প্ল্যাকার্ড আর অন্য হাত দিয়ে গাড়ি থামার সংকেত দিতে থাকেন। কিন্তু তার অনুমানে একে একে হাজার দুয়েক গাড়ি তার পাশ দিয়ে চলে গেলেও একটি গাড়িও থামেনি।  

এভাবে আধঘণ্টা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকার পর তার ইশারায় সাড়া দেন এক ট্রাক চালক। ট্রাক চালক তাকে টাঙ্গাইল পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাইলেও ভাড়া দাবি করেন। কিন্তু টাকা দিয়ে তো যাবেন না তাসনিম। তাই আবারও অপেক্ষা করতে লাগলেন কাঙ্ক্ষিত গাড়ির জন্য। এরপর প্রায় ১ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর সিমেন্টবাহী একটা ট্রাক তার ডাকে সাড়া দেয়। তাকে কালিয়াকৈর পর্যন্ত নিতে রাজি হন ট্রাক চালক। ভেবে-চিন্তে দূরত্ব কমবে এই আশায় ট্রাকে উঠে পরেন তাসনিম। কালিয়াকৈরে ট্রাক থেকে তাকে নামিয়ে দিলে সেখান থেকে আরেকটি পিকআপে করে পৌঁছে যান টাঙ্গাইলে। 

সেখানে দেখা দেয় আরেক বিপত্তি। এখন তৈরি হয়েছে নতুন গন্তব্য বানাতে হবে নতুন প্ল্যাকার্ড। কিন্তু সঙ্গে কাগজ নেই। একটা দোকানে প্যাকেজিং বক্স (কার্টন) চাইলে দোকানি বিনামূল্যে দিতে রাজি নন। অগত্যা পাঁচ টাকা দিতে হলো। এই সেই পাঁচ টাকা, যা দিয়ে ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী পর্যন্ত আসতে খরচ হয়েছে তাসনিমের। 

তারপর কয়েক ধাপে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পৌঁছান। এলেঙ্গা থেকে ওঠেন এক অ্যাম্বুলেন্সে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল পর্যন্ত যাবেন, এমন কথায়। তবে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার পর চালকের সাথে গল্পে গল্পে জানতে পারেন তিনি রংপুর পর্যন্ত যাবেন। তখন চালককে অনুরোধ করে তিনি রংপুর পর্যন্ত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু রংপুরে পৌঁছাতে রাত হয়ে যাবে, তখন সেখান থেকে আর গাড়ি পাবেন না। এই আশঙ্কায় বগুড়াতে নেমে যান। বগুড়ায় নেন প্রথম দিনের যাত্রাবিরতি। এরপর পূর্ব পরিচিত এক বড় ভাইয়ের সহায়তায় বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের মেসে রাত কাটানোর ব্যবস্থা করেন।

রাত কাটিয়ে পরদিন সকালে আবার প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়েন তাসনিম। বগুড়ার চারমাথা থেকে দুই অপরিচিত বাইকের রাইডে রংপুর, সেখান থেকে কাউনিয়া। অতঃপর এক আখভর্তি পিকআপের ছাদে পা ঝুলিয়ে পৌঁছে গেলেন কুড়িগ্রামের রায়গঞ্জে। যাত্রাপথে বিভিন্ন গাড়িতে চড়লেও আখভর্তি পিকআপের ছাদে চড়ার অনুভূতিকে সবচেয়ে আনন্দের উল্লেখ করেন তাসনিম। 

প্রথমে বগুড়া পর্যন্ত যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তাসনিম

এরপর নিজ উপজেলার সরকারি কলেজের এক শিক্ষকের মোটরসাইকেলে লিফট নেন। মোটরসাইকেল যেখানে তাকে নামিয়ে দেয় সেখান থেকে আর মাইল দেড়েক হাঁটলেই তার বাড়ি।

কেন এমন পন্থায় ঈদযাত্রা করলেন তাসনিম

তাসনিম যেভাবে বাড়িতে পৌঁছান এর নাম হিচ-হাইকিং। শব্দটি বাংলাদেশে পরিচিত না হলেও ইউরোপে ব্যাপক পরিচিত একটি শব্দ। হিচ-হাইকিং বলতে বোঝায় একজন অচেনা বা অপরিচিত ব্যক্তির সহায়তা নিয়ে, বিনা পয়সায়, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভ্রমণ। 

মূলত টিকেট পেতে বিড়ম্বনার জন্য তাসনিম হিচ-হাইকিংকে বেছে নেন। এ বিষয়ে তাসনিম বলেন, ‘হিচ-হাইকিং করার ইচ্ছে আগে থেকেই ছিল তবে টিকেট না পাওয়ায় হুট করেই প্ল্যান করে বেড়িয়ে পরি।যদিও হিচ-হাইকিংয়ে সবসময় প্ল্যান মতো সবকিছু হয় না, তবু বের হওয়ার আগে নিজের মতো করে একটা প্ল্যান সাজিয়েছিলাম। কোথায় কোথায় থামতে হবে, কোথায় গাড়ি পরিবর্তন করতে হবে, কত সময় লাগবে ইত্যাদি। সম্পূর্ণ ফলপ্রসূ না হলেও আমার প্ল্যান মোটামুটি কাজে দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘যাত্রাপথে কয়েকবার নতুন করে প্ল্যান করতে হয়েছে। তবে কেবল পণ্য পরিবহনের গাড়ি এবং মোটরসাইকেল ছাড়া অন্য কিছুতে লিফট পাইনি। এক্ষেত্রে আসলে দুঃখিত হওয়ার কিছু নেই। কেননা সবাই আসলে অপরিচিত কাউকে গাড়িতে নেবে, এমনটাও না। সবকিছু মিলিয়ে আমি একটি সুন্দর, নিরাপদ এবং চমৎকার জার্নি করেছি। বিশেষ করে আখ ভর্তি পিকআপের অংশটুকু আমি সবার উপরে রাখবো।’

 হিচ-হাইকিং করতে চাইলে

কেউ হিচ-হাইকিং করতে চাইলে তাদের উদ্দেশে তাসনিম বলেন, ‘বাইরের দেশগুলোতে জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশে হিচ-হাইকিংয়ের আইডিয়াটা সম্পূর্ণ নতুন। বাইরের দেশে যে ঝুঁকি নেই তা নয়, তবে বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় হিচ-হাইকিংয়ে বাংলাদেশে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। তবে সচেতনভাবে হিচহাইক করলে প্রায় সবসময়ই ঝুঁকি এড়ানো যায়। যারা নতুন হিচ-হাইকিং করতে চান তাদের জন্য আমার পরামর্শ থাকবে আগে ভালোভাবে বিষয়টি বুঝতে হবে। আপনি যে রাস্তায় এবং যে শহরে হিচহাইক করবেন সেটা সম্পর্কে আগে থেকে জেনে নিতে হবে। 

থাকতে হবে সতর্ক

হিচ-হাইকিংয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তার বিষয় ডাকাতি বা ছিনতাই। হিচ-হাইকিংয়ের সময় দামি মোবাইল, ঘড়ি, ল্যাপটপ বা অন্যান্য জিনিস না নেয়াটাই সব থেকে ভালো। এগুলো আপনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিবে। কোনও গাড়ি থামলেই যে আপনাকে সেই গাড়িতে উঠতে হবে এমনটি নয়। যদি মনে হয় গাড়িটি নিরাপদ নয় তাহলে ভদ্রভাবে তাকে না করে দিন। গাড়িতে ওঠার পর যদি এরকম মনে হয় তখনো নেমে যাবেন। গাড়িতে ওঠার সময় প্রয়োজনে গাড়ির নম্বর এবং আপনার অবস্থান পরিচিত কাউকে জানিয়ে দিন এবং এমনভাবে করুন, যেন ড্রাইভার সেটি বুঝতে পারেন। আর চেষ্টা করবেন ম্যাপ সঙ্গে রাখার। আপনাকে ধৈর্যশীল হতে হবে। অনেক সময় আপনাকে ২-৩ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হতে পারে লিফটের জন্য। চেষ্টা করবেন পরিপাটি পোশাক পরতে এবং হাসি মুখে কথা বলতে। মেয়েদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে। রাতে হিচ-হাইকিং করবেন না। সচেতনভাবে চোখ কান খোলা রেখে ভ্রমণ করলে ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
চাকরির মেয়াদ শেষে জাবি রেজিস্ট্রারের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ: ইউজিসির নির্দেশনা লঙ্ঘন
জাবি রেজিস্ট্রারের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, ইউজিসির নির্দেশনা লঙ্ঘন
ঈদে ট্রেনের আগাম টিকিট মিলবে শুধুই অনলাইনে, বিক্রি শুরু ২ জুন
সর্বশেষ খবর
উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে: ওবায়দুল কাদের
উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে: ওবায়দুল কাদের
শেষ ম্যাচে মোরসালিনের দারুণ গোল
শেষ ম্যাচে মোরসালিনের দারুণ গোল
তাপপ্রবাহ স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে: পরিবেশমন্ত্রী
তাপপ্রবাহ স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে: পরিবেশমন্ত্রী
ধান বিক্রি করে ৯৬ হাজার টাকা পেলেন প্রধানমন্ত্রী
ধান বিক্রি করে ৯৬ হাজার টাকা পেলেন প্রধানমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
আরেক পুলিশ কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
আরেক পুলিশ কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমানসহ ৪ জনের রিমান্ড নামঞ্জুর
ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমানসহ ৪ জনের রিমান্ড নামঞ্জুর
আ.লীগের ১১ এমপি খুন, বিদেশে প্রথম আনার
আ.লীগের ১১ এমপি খুন, বিদেশে প্রথম আনার
ব্যাংক বাড়ায় সুদ, টাকা যায় মানুষের পকেটে!
ব্যাংক বাড়ায় সুদ, টাকা যায় মানুষের পকেটে!
শান্তি সম্মেলনে বাইডেনের অনুপস্থিতিতে হাততালি দেবেন পুতিন: জেলেনস্কি
শান্তি সম্মেলনে বাইডেনের অনুপস্থিতিতে হাততালি দেবেন পুতিন: জেলেনস্কি