বদলে গেলো ইউরেলের নাম, ইউরোপ ভ্রমণে বাংলাদেশিদের কী জানা দরকার

ফিচার ডেস্ক
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩০আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩০

ইউরোপের এক দেশ থেকে আরেক দেশে ট্রেনে ঘুরে বেড়ানো, নির্দিষ্ট গন্তব্যের বাঁধনে না থেকে হঠাৎ সিদ্ধান্তে রুট বদলে ফেলা কিংবা রাতের ট্রেনে চড়ে ঘুমিয়ে পড়া দীর্ঘদিন ধরে তরুণ ব্যাকপ্যাকারদের কাছে ইউরোপ ভ্রমণের এমন স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘ইউরেল’ নামটি। তবে ৬৭ বছর পর সেই পরিচিত নামটি এবার বদলে যাচ্ছে। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্বজুড়ে ইউরেলের পরিবর্তে ব্যবহার করা হবে ‘ইন্টাররেল’ নাম।

নাম বদলালেও ভ্রমণসেবায় বড় কোনও পরিবর্তন আসছে না। ব্র্যান্ডটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি মূলত পরিচয়ের পরিবর্তন। নতুন নামে পাস ব্যবহার করলেও যাত্রীরা আগের মতোই একই ধরনের ভ্রমণ সুবিধা পাবেন এবং দামের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। যাদের হাতে ইতোমধ্যে ইউরেল পাস রয়েছে, তাদেরও নতুন করে পাস কিনতে হবে না। বিদ্যমান পাসগুলো নিয়ম অনুযায়ী বৈধ থাকবে।

ইউরেল নামটির যাত্রা শুরু ১৯৫৯ সালে। যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের ১৩টি দেশ মিলে বিদেশি পর্যটকদের জন্য এমন একটি রেলপাস চালু করেছিল, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনও রুটে আটকে না থেকে বিভিন্ন দেশে ট্রেনে ভ্রমণ করা সম্ভব ছিল। সময়ের সঙ্গে এই নেটওয়ার্ক বড় হয়েছে এবং ২০২০ সালের মধ্যে ৩৩টি দেশ এর আওতায় আসে।

এই পাসের জনপ্রিয়তার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল তরুণ ভ্রমণকারীদের। ১৯৭১ সালে ১৪ থেকে ২৬ বছর বয়সীদের জন্য তুলনামূলক কম দামের শিক্ষার্থী পাস চালুর পর উত্তর আমেরিকায় ইউরেল পাসের বিক্রি এক বছরেই প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এখনও তরুণরাই এর বড় একটি ব্যবহারকারী গোষ্ঠী। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, পাসধারীদের প্রায় ৪৯ শতাংশের বয়স ১২ থেকে ২৭ বছরের মধ্যে।

ইউরেলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু ভ্রমণকারীর ব্যক্তিগত স্মৃতিও। জনপ্রিয় ভ্রমণ লেখক রিক স্টিভসের কাছে নামটি ছিল স্বাধীনতার প্রতীক। তাঁর বর্ণনায়, ইউরোপের কোনও স্টেশনে দাঁড়িয়ে সামনে থাকা প্যারিস ও আমস্টারডামের ট্রেনের মধ্যে শেষ মুহূর্তে একটি বেছে নেওয়ার মতো সিদ্ধান্তই ছিল ইউরেল ভ্রমণের আসল মজা। পরিচিত কোনও ব্যাকপ্যাকার দল যে ট্রেনে উঠছে, সেই ট্রেনেই উঠে পড়া আগে থেকে পরিকল্পনা না থাকলেও এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগই ছিল এই ব্যবস্থার বিশেষ আকর্ষণ।

স্টিভস নিজেও ১৮ বছর বয়সে প্রথমবার বাবা-মাকে ছাড়া ইউরোপ ভ্রমণে বের হন ইউরেল পাস নিয়ে। রাতের ট্রেন ব্যবহার করে খরচ বাঁচানোর অভিজ্ঞতাও তার রয়েছে। কখনও চার ঘণ্টা একদিকে গিয়ে আবার ট্রেন বদলে চার ঘণ্টা ফিরে এসে রাত কাটানোর জন্য নিরাপদ ও তুলনামূলক আরামদায়ক জায়গা হিসেবে ট্রেনকে ব্যবহার করতেন তিনি।

তবে ইউরোপ ভ্রমণের চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। কম খরচের বিমান সংস্থাগুলো অনেক রুটে দ্রুত এবং তুলনামূলক কম দামে যাতায়াতের সুযোগ দিচ্ছে। পাশাপাশি পর্যটকদের ভ্রমণধারাতেও পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো এক সফরে একের পর এক দেশ ঘোরার বদলে অনেকেই এখন একটি বা দুটি দেশে বেশি সময় কাটাতে আগ্রহী। ইউরোপে রাতের ট্রেনের সংখ্যাও আগের তুলনায় কমেছে।

তারপরও রেলপাসের চাহিদা যে শেষ হয়ে যায়নি, তার প্রমাণ বিক্রির পরিসংখ্যান। ২০২৩ সালে ১২ লাখ ইউরেল পাস বিক্রি হয়েছিল। এরপরও প্রতিবছর গড়ে ১০ লাখের বেশি পাস বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছে ব্র্যান্ডটি।

ইউরেল ও ইন্টাররেলের মধ্যে পার্থক্যও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমশ কমেছে। ফলে দুটি পাসকে এক ছাতার নিচে আনার সম্ভাবনা নিয়ে রেলভ্রমণ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছিল। ‘দ্য ম্যান ইন সিট ৬১’ ওয়েবসাইটের প্রতিষ্ঠাতা এবং লন্ডনের চারিং ক্রস স্টেশনের সাবেক স্টেশন ম্যানেজার মার্ক স্মিথও এ বিষয়ে ব্র্যান্ডের সঙ্গে মতবিনিময় করেছিলেন।

একীভূত পাসের নাম ইউরেল, ইন্টাররেল নাকি সম্পূর্ণ নতুন কিছু হবে এ বিষয়ে তার মতামত চাওয়া হয়েছিল। কয়েক দশকে ইউরেল নামটির যে পরিচিতি তৈরি হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে তিনি নতুন নামের বিপক্ষে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তার পছন্দ ছিল ইন্টাররেল। তার মতে, এই নামটি ইউরোপীয়দের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কম খরচে ও স্বাধীনভাবে ভ্রমণের প্রতীক হয়ে আছে।

নাম বদলের পরও ইউরেল নামটি যে মানুষের মুখ থেকে সহজে মুছে যাবে না, তার ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। রিক স্টিভসের প্রতিষ্ঠানে ট্রাভেল ইনফরমেশন ম্যানেজার হিসেবে কাজ করা লরা তেরেনজিওর ভাষায়, তাঁদের কাছে রেলপাস বলতেই এতদিন ইউরেল বোঝাতো। তাই নতুন নামের সঙ্গে অভ্যস্ত হতে সময় লাগবে।

বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য এর অর্থ কী

বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে ঘুরতে যাওয়া পর্যটকদের জন্য এই পরিবর্তনটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আতঙ্কের কোনও কারণ নেই। নতুন নামের কারণে ইউরোপ ভ্রমণের রেলসুবিধা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না, বরং একই ব্যবস্থাকে ইন্টাররেল নামে একীভূত করা হচ্ছে। বিশেষ করে যারা এক সফরে ইউরোপের একাধিক দেশ ঘুরতে চান, তাদের জন্য রেলপাস এখনও বিবেচনার মতো একটি বিকল্প হতে পারে।

তবে বাংলাদেশি পর্যটকদের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। প্রথমত, রেলপাস থাকলেই ইউরোপের ভিসার প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায় না। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের সংশ্লিষ্ট দেশের প্রবেশ ও ভিসা-সংক্রান্ত নিয়ম পূরণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সব ট্রেনের জন্য শুধু পাস থাকলেই সরাসরি উঠে পড়া যায় না, কিছু দ্রুতগতির বা জনপ্রিয় ট্রেনে আসন সংরক্ষণ এবং অতিরিক্ত ফি প্রয়োজন হতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে নির্দিষ্ট রুটের নিয়ম পরীক্ষা করা জরুরি।

আরেকটি বিষয় হলো খরচের হিসাব। এক বা দুটি দেশে সীমিত ভ্রমণ করলে প্রতিটি ট্রেনের আলাদা টিকিট কেনাই কখনও কখনও সাশ্রয়ী হতে পারে। কিন্তু কয়েকটি দেশ একসঙ্গে ঘোরার পরিকল্পনা থাকলে এবং ঘন ঘন ট্রেনে যাতায়াতের প্রয়োজন হলে রেলপাস অর্থ ও সময় দুই দিক থেকেই সুবিধাজনক হতে পারে। বিশেষ করে তরুণ বাংলাদেশি ব্যাকপ্যাকারদের জন্য ইউরোপের একাধিক শহর ঘোরার পরিকল্পনায় এটি একটি সম্ভাব্য বিকল্প।

সূত্র: দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস

/এমএএল/
সম্পর্কিত
ভ্রমণের আগে অনলাইন রিভিউ কতটা বিশ্বাস করবেন
দেশে ট্যুর গ্রুপের সঙ্গে ভ্রমণের আগে যাচাই করবেন যেভাবে
ইউরোপ ভ্রমণে কোপেনহেগেন কেন রাখবেন তালিকায়?
সর্বশেষ খবর
‘ইরান আত্মসমর্পণ করবে না’, যুক্তরাষ্ট্রকে পেজেশকিয়ানের বার্তা
‘ইরান আত্মসমর্পণ করবে না’, যুক্তরাষ্ট্রকে পেজেশকিয়ানের বার্তা
জবিতে নাইট্রোজেন সার ব্যবহারে ২২ শতাংশ সাশ্রয়ের সম্ভাবনাময় প্রযুক্তির উদ্ভাবন 
জবিতে নাইট্রোজেন সার ব্যবহারে ২২ শতাংশ সাশ্রয়ের সম্ভাবনাময় প্রযুক্তির উদ্ভাবন 
নতুন মিক্সড রিয়েলিটি হেডসেট আনছে মেটা?
নতুন মিক্সড রিয়েলিটি হেডসেট আনছে মেটা?
জনবল নেবে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেল
জনবল নেবে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেল
সর্বাধিক পঠিত
একসঙ্গে ঝিনুক-কোরাল চাষে সফলতা, অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
একসঙ্গে ঝিনুক-কোরাল চাষে সফলতা, অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
আমাকে সবসময় টাকা কামানোর মেশিন হিসেবে ব্যবহার করেছে: পপি
আমাকে সবসময় টাকা কামানোর মেশিন হিসেবে ব্যবহার করেছে: পপি
গ্রেফতারের পর ৬৩ বিদেশি নাগরিক যার কথা বলেছেন, এবার সেই কর্মকর্তা গ্রেফতার
গ্রেফতারের পর ৬৩ বিদেশি নাগরিক যার কথা বলেছেন, এবার সেই কর্মকর্তা গ্রেফতার
কমলা জামদানিতে পরীমণির সাজে নজরকাড়া বাঙালিয়ানা
কমলা জামদানিতে পরীমণির সাজে নজরকাড়া বাঙালিয়ানা
পে-স্কেল ঘোষণা হলেও গেজেট প্রকাশে দেরি কেন
পে-স্কেল ঘোষণা হলেও গেজেট প্রকাশে দেরি কেন