দুধ দিয়ে গোসল করলেই কি অতীত মুছে ফেলা যায়?

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক 
১৪ জুন ২০২৬, ১২:৪৩আপডেট : ১৪ জুন ২০২৬, ১২:৪৩

কিছুদিন আগেও তিনি ছিলেন এক দলের সমর্থক। বিশ্বকাপ ফুটবল শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ ঘোষণা—‘ভুল করেছি, এবার নতুন শুরু।’ এরপরই সবার সামনে কয়েক লিটার দুধ ঢেলে গায়ে গোসল।

এমন দৃশ্য এখন আর খুব অস্বাভাবিক নয়। কেউ রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে দুধ দিয়ে গোসল করছেন, কেউ আবার ব্যক্তিগত জীবনের আগের কোনও কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি করবেন না জানিয়ে বলছেন,‘আজ থেকে আর কখনও ওই পথে হাঁটব না’—তারপর দুধে ভিজে নিচ্ছেন নতুন শুরুর শপথ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে মুহূর্তেই। কেউ হাসছেন, কেউ সমালোচনা করছেন, কেউ আবার এটিকে মনোযোগ পাওয়ার কৌশল বলছেন। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে—দুধ দিয়ে গোসল করলেই কি সত্যিই অতীত মুছে ফেলা যায়? কিংবা এতে কি মানুষ সত্যিই ‘শুদ্ধ’ হয়ে ওঠেন?

এদিকে, দুধ দিয়ে গোসলের এই প্রবণতা শুধু সাম্প্রতিক ভাইরাল সংস্কৃতির অংশ নয়। এর শিকড় ছড়িয়ে আছে ইতিহাস, ধর্মীয় আচার, প্রতীকী ভাষা এবং মানুষের মনস্তত্ত্বে।

দুধকে বহু সভ্যতায় দেখা হয়েছে শুদ্ধতা, পবিত্রতা এবং নতুন শুরুর প্রতীক হিসেবে। দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে দুধ দিয়ে অভিষেকের রীতি রয়েছে, যেখানে বিশ্বাস করা হয়—এটি অপবিত্রতা দূর করে নতুন শক্তি আনে। প্রাচীন সভ্যতাগুলোতেও দুধকে পুনর্জন্ম, সমৃদ্ধি ও সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো।

এই প্রতীকী ধারণাই আধুনিক সময়ে এসে রূপ নিয়েছে এক ভিন্ন আচরণে—নিজের অনুশোচনা, সিদ্ধান্ত বা পরিবর্তনকে দৃশ্যমানভাবে প্রকাশ করার মাধ্যম হিসেবে দুধ দিয়ে গোসল।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘রিচুয়ালাইজড বিহেভিয়ার’। মানুষ যখন জীবনে বড় কোনও পরিবর্তন আনে, তখন সেটিকে শুধু কথায় নয়, আচরণেও স্থায়ী করতে চায়। কেউ চুল কেটে ফেলেন, কেউ পুরোনো জিনিস ভেঙে ফেলেন, কেউ আবার শরীরে দুধ ঢেলে ঘোষণা দেন—“আমি বদলে গেছি।”

এর পেছনে কাজ করে একটি মানসিক প্রবণতা, অতীত থেকে আলাদা হওয়ার দৃশ্যমান সংকেত তৈরি করা। নিজের কাছে এবং সমাজের কাছেও নিশ্চিত করা যে একটি অধ্যায় শেষ, শুরু হয়েছে নতুন অধ্যায়।

কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। কারণ পরিবর্তন কখনও শরীরের ওপর দিয়ে নয়, বরং ভেতরের অভিজ্ঞতা ও সময়ের মধ্য দিয়ে ঘটে। তবুও মানুষ প্রতীক খোঁজে—একটি দৃশ্য, একটি মুহূর্ত, একটি নাটকীয় ঘোষণা।

আর এখানেই বড় ভূমিকা রাখছে সোশ্যাল মিডিয়া। আগে এসব ছিল ব্যক্তিগত বা সীমিত পরিসরের ঘটনা, এখন তা হয়ে উঠেছে পাবলিক পারফরম্যান্স। দুধ দিয়ে গোসল এখন শুধু নিজের জন্য নয়—দর্শকের জন্যও। যত বেশি নাটকীয়তা, তত বেশি ভাইরাল। কেউ সমর্থন বদলাচ্ছেন, কেউ সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছেন, আর সেই পরিবর্তনের ‘প্রমাণ’ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন দুধ।

ফলে প্রশ্নটা আবারও ফিরে আসে—দুধ দিয়ে গোসল করলেই কি সত্যিই অতীত মুছে ফেলা যায়? নাকি এটি শুধু একটি দৃশ্যমান ঘোষণা, যেখানে মানুষ পরিবর্তনের চেয়ে পরিবর্তনের গল্পটাকেই বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে চায়?

শেষ পর্যন্ত হয়তো দুধ দিয়ে গোসল অতীত মুছে ফেলে না। এটি শুধু বলে দেয়—মানুষ অতীতকে ভুলতে চায়, আর সেই ভুলে যাওয়ার চেষ্টাটাকেই কখনও কখনও সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান করে তোলে।

/এম/ 
সম্পর্কিত
আপনার ‘হ্যাঁ’ আর সঙ্গীর ‘হ্যাঁ’ কি একই অর্থ বহন করে?
গ্যাস সংকটে রান্না সহজ করবে যে কৌশল
নিজের মাকেই নকল মানুষ মনে হয়, আছে এমন মানসিক রোগ
সর্বশেষ খবর
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য নতুন সুবিধা
ব্যারিকেড ভেঙে ভোপালে ২০০০ কৃষক, যোগ দিলো জেন-জিরাও
বিদেশের মিশনগুলো থেকে ৯ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দেশে ফেরার নির্দেশ
রাকসুর সব কর্মসূচি বর্জনের ঘোষণা সাংবাদিকদের, ভিপিকে ক্ষমা চাইতে হবে
সর্বাধিক পঠিত
২৩ বছর ধরে বন্ধ কারখানা এখন রফতানিমুখী, চাকরি পেলো ৩৫০০ মানুষ
ফেসবুকে ইলিশ বিক্রির নামে প্রতারণা, অবশেষে ধরা পড়লো প্রতারক
এক ক্লিকেই করদাতার সব তথ্য, এনবিআরকে নতুন রোডম্যাপ দিলো আইএমএফ
নাসীরুদ্দীন-সারজিসের ওপর হামলা কেন, যা বলছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা
যুক্তরাজ্যে ঘুরতে রিপ টাইডের কবলে বাংলাদেশি পরিবার: তৃতীয় সদস্যের মৃত্যু