একটি খাবার হয়তো বহু বছর ধরে স্থানীয় মানুষের পরিচিত। দোকানের এক কোণে নিয়মিত বিক্রিও হচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ একদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই খাবারের একটি ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়লো। রাতারাতি মানুষ জানতে শুরু করলো খাবারটি কোথায় পাওয়া যায়, কীভাবে তৈরি হয়, স্বাদ কেমন। কয়েক দিনের মধ্যেই দোকানের সামনে ভিড়, বাড়তে শুরু করল অর্ডার। পরিচিত একটি খাবার হয়ে উঠলো ‘ভাইরাল’।
কিন্তু এমনটা কেন হয়? শুধু সুস্বাদু হলেই কি কোনও খাবার মানুষের নজরে আসে? বাস্তবে খাবার ভাইরাল হওয়ার পেছনে স্বাদ, চেহারা, নতুনত্ব, মানুষের কৌতূহল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সবকিছুরই ভূমিকা থাকে।
খাবারের ক্ষেত্রে প্রথম আকর্ষণ অনেক সময় স্বাদ নয়, চোখে পড়ার মতো চেহারা। অস্বাভাবিক আকার, উজ্জ্বল রং, খাবারের ভেতরের স্তর কিংবা তৈরির অভিনব পদ্ধতি মানুষকে থামিয়ে দিতে পারে।
সাধারণ একটি খাবারকে যদি এমনভাবে পরিবেশন করা হয়, যা মানুষ আগে দেখেনি, তাহলে সেটি নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়। কেউ ভিডিওটি দেখেন, কেউ বন্ধুকে পাঠান, আবার কেউ মন্তব্য করেন, ‘এটা কীভাবে বানায়?’ এভাবেই শুরু হতে পারে ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়া।
খাবার তৈরির দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলাদা ধরনের আগ্রহ তৈরি করে। গরম তেলে খাবার ছাড়ার মুহূর্ত, পনির বা চকলেট টেনে নেওয়ার দৃশ্য, আগুনের ওপর রান্না কিংবা বিশাল কোনও পাত্রে একসঙ্গে অনেক খাবার তৈরির দৃশ্য সহজেই দর্শকের নজর কাড়ে।
বিশেষ করে যে খাবার তৈরির প্রক্রিয়া দেখলে দর্শকের মনে ‘এরপর কী হবে?’ ধরনের আগ্রহ তৈরি হয়, সেটি পুরো ভিডিও দেখার প্রবণতা বাড়াতে পারে।
অনেক সময় খাবারটি একেবারেই নতুন নয়। পুরোনো কোনও খাবারকেই নতুন নামে, নতুন পরিবেশনায় কিংবা নতুন উপকরণ যোগ করে সামনে আনা হয়। তখন মানুষের পরিচিত খাবারও নতুন অভিজ্ঞতা হিসাবে ধরা দেয়।
একই খাবারের আকার ছোট-বড় করা, নতুন পুর দেওয়া, ভিন্ন ধরনের সস ব্যবহার করা বা অপ্রচলিত কোনও উপায়ে পরিবেশনসহ কিছু পরিবর্তন খাবারটিকে আলোচনায় নিয়ে আসতে পারে।
কেউ কোনও খাবার খেয়ে তার অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলেন। এরপর অন্যরা সেটি দেখে একই খাবার খেতে গেলেন। তারাও ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করলেন। এভাবে একজনের অভিজ্ঞতা আরেকজনের কৌতূহল তৈরি করে।
এখানেই কাজ করে মানুষের সামাজিক আচরণ। কোনও জায়গায় অনেক মানুষ যাচ্ছেন দেখলে অন্যদের মধ্যেও সেখানে যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হতে পারে। খাবারের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে।
কোনও জনপ্রিয় ব্যক্তি, অভিনেতা, কনটেন্ট নির্মাতা কিংবা খাদ্যবিষয়ক ভিডিও নির্মাতা একটি খাবারের প্রশংসা করলে সেটি দ্রুত অনেক মানুষের নজরে আসতে পারে।
তবে শুধু পরিচিত মুখের প্রচারই যথেষ্ট নয়। খাবারটি যদি দেখতেও আকর্ষণীয় হয় এবং মানুষ সেটি নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে শুরু করে, তাহলে ছড়িয়ে পড়ার গতি আরও বাড়তে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোন ভিডিও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে, তা নির্ধারণে বিভিন্ন ধরনের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা কাজ করে। কোনও খাবারের ভিডিওতে মানুষ বেশি সময় ধরে থাকলে, মন্তব্য করলে, অন্যকে পাঠালে বা বারবার দেখলে সেটি আরও বেশি মানুষের সামনে আসার সুযোগ তৈরি হয়।
ফলে প্রথমে হয়তো কয়েকশ’ মানুষ একটি খাবারের ভিডিও দেখলেন। তাদের মধ্যে অনেকে প্রতিক্রিয়া জানালে ভিডিওটি আরও বড় দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এভাবেই স্থানীয় একটি খাবারের পরিচিতি অল্প সময়ের মধ্যে অনেক দূর ছড়িয়ে পড়ে।
মজার বিষয় হলো, সবচেয়ে সুস্বাদু খাবারটিই যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হবে, তা নয়। একটি খাবারের স্বাদ অসাধারণ হলেও যদি সেটি দেখতে সাধারণ হয় বা তার গল্প মানুষের মধ্যে কৌতূহল তৈরি না করে, তাহলে সেটি হয়তো আলোচনায় আসবে না।
অন্যদিকে তুলনামূলক সাধারণ কোনও খাবারও নতুন উপস্থাপন, মজার গল্প কিংবা আকর্ষণীয় ভিডিওর কারণে ব্যাপক পরিচিতি পেতে পারে।
কোনও খাবার ভাইরাল হয়ে গেলে তার বিক্রি বাড়তে পারে, নতুন দোকান বা উদ্যোক্তা একই ধরনের খাবার তৈরি শুরু করতে পারেন। কোনও ক্ষেত্রে একটি খাবারকে ঘিরে তৈরি হয় নতুন ব্যবসার সুযোগ।
তবে ভাইরাল জনপ্রিয়তা সবসময় দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মানুষের আগ্রহ দ্রুত বদলায়। আজ যে খাবার নিয়ে সবাই কথা বলছেন, কিছুদিন পর সেটির জায়গা নিতে পারে অন্য কোনও খাবার।
শেষ পর্যন্ত কোনও খাবারের ভাইরাল হওয়ার পেছনে একক কোনও কারণ থাকে না। চোখে পড়ার মতো উপস্থাপন, নতুনত্ব, স্বাদ, গল্প, মানুষের কৌতূহল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের প্রতিক্রিয়া এবং প্রচারের গতির কারণই একটি খাবারকে হঠাৎ আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারে।