প্রতিদিনের ব্যস্ততায় আমরা কাজ, পরিবার, দায়িত্ব সবকিছুর খোঁজ রাখি। অথচ নিজের কথাই অনেক সময় ভুলে যাই। নিজের যত্ন নেওয়া যদি আপনার কাছে অনেক দূরের কোনও স্বপ্ন মনে হয়, তবে আজই হতে পারে নতুনভাবে শুরু করার দিন। স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলে, নিজের শরীর ও মনের প্রতি যত্নশীল হয়ে নিজেকে ভালোবাসা ও সম্মান জানান। কারণ আজ আন্তর্জাতিক নিজের-যত্ন দিবস।
আন্তর্জাতিক নিজের-যত্ন দিবসের ইতিহাস
নিজের-যত্ন বা সেল্ফ কেয়ার ধারণাটি জনপ্রিয় হতে শুরু করে ১৯৫০-এর দশকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে। নাগরিক অধিকার আন্দোলন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং পরবর্তীতে শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই ধারণা ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমানে নিজের-যত্ন বলতে শুধু শারীরিক সুস্থতাই নয়, বরং মানসিক, আবেগীয়, সামাজিক এমনকি আত্মিক সুস্থতার প্রতিও সচেতন থাকাকে বোঝায়। সময়ের সঙ্গে এটি একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক নিজের-যত্ন দিবসের সূচনা
আন্তর্জাতিক নিজের-যত্ন দিবস প্রথম পালিত হয় ২০১১ সালে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেল্ফ-কেয়ার ফাউন্ডেশন (আইএসএফ) এই দিবসের সূচনা করে।
দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো মানুষকে নিজের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার প্রতি আরও সচেতন করে তোলা এবং দৈনন্দিন জীবনে নিজের-যত্নকে একটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করতে উৎসাহ দেওয়া। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিবছরই বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
কীভাবে পালন করবেন আন্তর্জাতিক নিজের-যত্ন দিবস
দিবসটি পালন করতে বড় কোনও আয়োজনের প্রয়োজন নেই। বরং ছোট ছোট ইতিবাচক অভ্যাসই হতে পারে নিজের প্রতি সবচেয়ে বড় উপহার।
নিজের যত্ন নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন
আজকের দিনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নিজের শরীর ও মনের প্রতি যত্নবান হওয়া। পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, প্রতিদিন কিছুটা হাঁটা বা ব্যায়াম, নিয়মিত বিশ্রাম নেওয়া, ধ্যান বা প্রার্থনা করা এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা নির্ধারণের মতো অভ্যাসগুলো নিজের-যত্নের অংশ।
মনে রাখবেন, নিজের-যত্ন মানেই বিলাসিতা নয়। এর জন্য প্রচুর অর্থ বা সময়ের প্রয়োজন হয় না। বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্তই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ ও সুখী জীবন গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
নিজের-যত্নের উপকারিতা অন্যদেরও জানান
নিজের-যত্ন শুধু নিজের জন্যই নয়, আশপাশের মানুষদের জন্যও ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত নিজের যত্ন নিলে—
- নিজের-যত্ন শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে।
- নিজের-যত্ন মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে এবং মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়তা করতে পারে।
- নিজের-যত্ন পরিবার, বন্ধু, সহকর্মীসহ অন্যদের সঙ্গে আরও ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
- নিজের-যত্ন আত্মবিশ্বাস, কর্মদক্ষতা ও জীবনের আনন্দ বাড়াতে পারে।
আপনার পরিচিত কেউ যদি অতিরিক্ত কাজের চাপে ক্লান্ত থাকেন বা নিজের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েন, তাহলে এই দিনে তাকেও নিজের যত্ন নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে পারেন। কখনও কখনও একটি আন্তরিক পরামর্শই কারও জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
নিজের-যত্ন নিয়ে লেখা কিছু বই পড়ুন
আন্তর্জাতিক নিজের-যত্ন দিবস হতে পারে নতুন কিছু শেখারও সুযোগ। নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিয়ে লেখা বইগুলো আপনাকে আরও সচেতন হতে এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
পড়তে পারেন—
- ‘বাস্তব জীবনের জন্য নিজের-যত্ন’ (Self Care for the Real World) — নাদিয়া নারাইন ও কাটিয়া নারাইন ফিলিপস (২০১৭)
- ‘নিজের-যত্নের নির্দেশিকা’ (The Self Care Handbook) — গিল হাসন (২০১৯)
- ‘নিজের-যত্ন: সচেতনভাবে জীবনযাপন ও নিজের যত্ন নেওয়ার উপায়’ (Self Care: How to Live Mindfully and Look After Yourself) — ক্লেয়ার চেম্বারলেইন (২০১৯)
- ‘পাহাড়টি আপনিই: আত্ম-ধ্বংসাত্মক অভ্যাস থেকে আত্ম-নিয়ন্ত্রণের পথে’ (The Mountain Is You: Transforming Self-Sabotage into Self-Mastery) — ব্রিয়ানা ওয়েস্ট (২০২০)
এসব বই আপনাকে শুধু নিজের যত্ন নেওয়ার কৌশলই শেখাবে না, বরং জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতেও সহায়তা করবে।
মনে রাখা জরুরি, নিজের জন্য সময় বের করা কোনও বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার একটি প্রয়োজনীয় শর্ত। তাই আজ আন্তর্জাতিক নিজের-যত্ন দিবসে নিজেকে একটি প্রতিশ্রুতি দিন ব্যস্ততার ভিড়েও প্রতিদিন অন্তত কিছুটা সময় রাখবেন নিজের শরীর, মন এবং ভালো থাকার জন্য।









