বর্ষা এলেই বাড়ে ডেঙ্গুর দাপট। বৃষ্টি থামার পর বাড়ির আশপাশে জমে থাকা সামান্য পানিও হয়ে উঠতে পারে এডিস মশার প্রজননস্থল। কয়েক দিন জমে থাকা পানিতে লার্ভা জন্ম নিয়ে দ্রুত বাড়তে পারে মশার সংখ্যা। এ কারণেই বর্ষাকালে ডেঙ্গি প্রতিরোধে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন হয়।
এবারও বৃষ্টি ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, অনিয়মিত বৃষ্টি ও উষ্ণ আবহাওয়া এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। ফলে ডেঙ্গু থেকে নিরাপদ থাকতে শুধু জ্বর হলে চিকিৎসা নেওয়াই নয়, রোগটি সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা প্রয়োজন।
কখন বেশি কামড়ায় এডিস মশা?
ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস মশা সাধারণত দিনের আলোতেই বেশি সক্রিয় থাকে। মেডিসিনের চিকিৎসক রণবীর ভৌমিকের মতে, সকাল ৮টা থেকে ১০টা এবং বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৮টার মধ্যে এই মশার কামড়ানোর প্রবণতা বেশি। সাধারণত পায়ের নিচের অংশে কামড়ানোর ঘটনাও বেশি দেখা যায়।
তাই মশার উৎপাত বেশি এমন এলাকায় বিশেষ করে দিনের শুরু ও বিকালের পর সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা, শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখা এবং বাড়ির ভেতর-বাইরে কোথাও পানি জমতে না দেওয়া জরুরি।
কীভাবে ছড়ায় ডেঙ্গু?
ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে এডিস মশাই মূল ভূমিকা নেয়। কোনও আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানোর পর মশার শরীরে ভাইরাস প্রবেশ করে। নির্দিষ্ট সময় পর সেই মশা অন্য একজন সুস্থ মানুষকে কামড়ালে তার শরীরেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তাই একজন ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশারি বা মশা প্রতিরোধের ব্যবস্থা ছাড়া রাখলে সংক্রমণের চক্র আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ডেঙ্গু মানেই শুধু জ্বর বা প্লেটলেট কমে যাওয়া নয়
ডেঙ্গু নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোর একটি হলো, রোগটি হলে জ্বর আসবে এবং প্লেটলেট দ্রুত কমতে থাকবে। বাস্তবে রোগের জটিলতা শুধু প্লেটলেটের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না।
চিকিৎসক রণবীর ভৌমিকের মতে, ডেঙ্গুতে লিভারের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। শরীরে ভাইরাসের পরিমাণ বেশি হলে লিভারের ওপরও চাপ পড়তে পারে। একই সঙ্গে পেটে তরল জমা এবং প্লেটলেট কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তাই শুধু প্লেটলেটের রিপোর্ট দেখেই রোগীর অবস্থা বিচার করা ঠিক নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লিভারের কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং পেটে তরল জমছে কি না, সেটিও নজরে রাখা প্রয়োজন।
জ্বর কমলেই কি বিপদ কেটে যায়?
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জ্বর সেরে যাওয়া মানেই রোগী পুরোপুরি বিপদমুক্ত, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অনেক সময় জ্বর কমার পরের সময়টিই নজরদারির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
চিকিৎসকদের মতে, জ্বর কমে যাওয়ার পর অন্তত ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা রোগীর শারীরিক অবস্থার দিকে বিশেষ নজর রাখা প্রয়োজন। ডেঙ্গুতে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে। শরীরে তরলের ভারসাম্য নষ্ট হলে বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অবস্থা গুরুতর হলে ফুসফুস, হৃদ্যন্ত্র, লিভারসহ একাধিক অঙ্গ আক্রান্ত হতে পারে। ডেঙ্গুর জটিল অবস্থায় ‘মাল্টি-অর্গ্যান ফেলিয়োর’-এর মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
কোন লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দেবেন?
ডেঙ্গুর উপসর্গ ব্যক্তি ও রোগের তীব্রতা অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। জ্বরের পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, জন্ডিস, খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা কিডনির কার্যকারিতায় সমস্যা দেখা দিলে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বরের সঙ্গে গাঁটে বা পেশিতে ব্যথা, পেশিতে খিঁচুনি কিংবা শরীরের বিভিন্ন গ্রন্থি ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে জ্বরের সঙ্গে শ্বাস নিতে কষ্ট হলে দেরি না করে চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে নিজের মতো করে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসা করানোই নিরাপদ।
কখন কোন পরীক্ষা?
ডেঙ্গু শনাক্ত করতে রোগের কোন পর্যায়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। জ্বরের শুরুর দিকে এনএস১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করা হয়। সাধারণত জ্বরের প্রথম কয়েক দিনে এই পরীক্ষার মাধ্যমে ডেঙ্গু শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়।
জ্বর কয়েক দিন পার হয়ে গেলে আইজিএম অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা হতে পারে। পাশাপাশি অনেক জায়গায় নিউক্লিক অ্যাসিড অ্যামপ্লিফিকেশন টেস্ট বা এনএএটি করা হয়, যার মাধ্যমে ভাইরাসের জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা সম্ভব।
কোন পরীক্ষা কখন প্রয়োজন, তা রোগীর উপসর্গ ও অসুস্থতার সময়কাল বিবেচনা করে চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন।
পানিশূন্যতা ঠেকানো জরুরি
ডেঙ্গুতে শরীরে পানিশূন্যতার ঝুঁকি থাকে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। একসঙ্গে বেশি খাবার না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া যেতে পারে। সহজপাচ্য ও ঘরে তৈরি হালকা খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
তবে শুধু বেশি পানি খেলেই ডেঙ্গির চিকিৎসা হয়ে যায় এমন ধারণা ঠিক নয়। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জরুরি।
প্রতিরোধের শুরু ঘর থেকেই
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, টব, ফুলের পাত্র, পরিত্যক্ত পাত্র বা যেকোনো স্থানে পানি জমে থাকলে তা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। শুধু বড় জলাধার নয়, অল্প পরিমাণ জমে থাকা পানিও এডিস মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
মশার উৎপাত বেশি হলে মশারি ব্যবহার করা, প্রয়োজনে মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা এবং শরীরের অনাবৃত অংশ কম রাখা দরকার। বাড়ির পাশাপাশি আশপাশের এলাকাও পরিষ্কার রাখা জরুরি।
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সচেতনতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার দিকে নজর দেওয়া। জ্বর কমে গেলেও নজরদারি চালিয়ে যাওয়া, বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং বাড়ির আশপাশে মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে না দেওয়াই পারে ডেঙ্গির জটিলতা ও সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে।









