ঐতিহ্যবাহী কালাই রুটি ফুটপাত থেকে রেস্তোরাঁয়

Send
দুলাল আবদুল্লাহ,রাজশাহী
প্রকাশিত : ১৯:৩৬, জানুয়ারি ০৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০৩, জানুয়ারি ০৮, ২০২০

এক সময় ফুটপাতের খাবার হিসাবে প্রচলন ছিল রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার কালাই রুটির। কিন্তু ভোজনরসিকদের পছন্দের কারণে কালাই রুটি এখন রাজশাহীর রেস্তোরাঁর নিয়মিত খাবারে পরিণত হয়েছে। এতে করে কালাই রুটির কারিগরদের চাহিদা তৈরি হয়েছে। ক্রেতাদের রুচির পরিবর্তনে সুযোগ তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানও।


গত দশ বছর ধরে রাজশাহী নগরীতে কালাই রুটির জনপ্রিয়তার কারণে বেশ কিছু দোকান গড়ে উঠেছে। এরমধ্যে নগরীর উপশহর এলাকায় রয়েছে পাশাপাশি তিনটি দোকান। এই দোকানগুলোতে সন্ধ্যার পরপরই অসাধারণ স্বাদের কালাইয়ের রুটি খেতে অনেকে ছুটে আসেন দূরদূরান্ত থেকে। সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ১৯ ব্যাচের ছাত্র শফিউল ইসলাম ওরফে মামুন তেমনই একজন। তিনি জানালেন, ২৭ ডিসেম্বর রাজশাহীতে এসেছেন। আসার পর থেকেই প্রায় গরম গরম কালাইয়ের রুটির স্বাদ নিতে উপশহরে আসেন। শুধু নিজেই নয়, স্থানীয় বন্ধুদের সঙ্গে করে আসেন। তবে কালাই রুটির সাথে বেগুন ভর্তা ভালো লাগে না বলে জানালেন শফিউল। তার মতে, হাঁসের মাংস ও ধনিয়া চাটনি দিয়েই এই রুটি বেশি সুস্বাদু।


রাজশাহী কোর্ট মহাবিদ্যালয়ের ছাত্রী তোরসা ও নগরীর বহরামপুর এলাকার গৃহিণী নুসরাত অবশ্য জানালেন, বেগুন ভর্তা, চাটনি, বট দিয়ে কালাইয়ের রুটি খেতে অসাধারণ।
শুধু উপশহর নয়, নগরীর ব্যস্ততম এলাকা সাহেববাজার বড় মসজিদের কাছে দামি রেস্তোরাঁ বিদ্যুৎ হোটেলের বাইরে টাঙানো হয়েছে ‘নতুন সংযোজন’ নামের একটি ব্যানার। যেখানে বড় হরফে লেখা আছে কালাই রুটি পাওয়া যায়। এই রেস্তোরাঁর সামনে গ্যাসের চুলায় কালাই রুটি তৈরি করছিলেন তারেক নামের এক কারিগর। তিনি জানালেন, এখানে এক মাস আগে অন্য খাবারের সাথে কালাই রুটি বিক্রি করা হচ্ছে।  তারেক বলেন, ‘গ্যাসের চুলার চেয়ে মাটির চুলায় তৈরি কালাই রুটির স্বাদের ভিন্নতা অন্যরকম লাগে। কিন্তু জায়গা ও পরিবেশের কথা চিন্তা করে গ্যাসের চুলায় আমরা কালাই রুটি তৈরি করছি।’ তার পাশের একটি রেস্টেুরেন্টে বিকালের নাস্তা খাচ্ছিলেন নগরীর খুলিপাড়া এলাকার গোলাম মোস্তাফা মামুন। তিনি বলেন, ‘তেলে ভাজা-পোড়া খাবারের চেয়ে কালাই রুটি খাওয়া অনেক ভালো। তাই অল্প খরচে ভর্তা দিয়ে কালাই রুটি দিয়ে নাস্তাটা করছি।’


নগরীর কালাই হাউসের মালিক ফুয়াদ হাসান রিপন বলেন, ‘এক সময় বাবা ফুটপাতে কালাই রুটি তৈরি করে বিক্রি করতো। এখন ফুটপাত থেকে কালাই রুটি উঠে এসেছে রেস্তোরাঁয়। আগে যেমন নিম্ন আয়ের মানুষরা কালাই রুটি ফুটপাতে বসে খেয়েছেন। এখন সব শ্রেণির মানুষ এসে আমাদের মতো কালাই রুটির দোকানে ঢুঁ মারছেন। স্বাদের কারণে তাদের আগ্রহ যেমন বাড়ছে, ঠিক একইভাবে কালাই রুটি কী দিয়ে খাওয়ানো যায়। সেটাও ভাবা হচ্ছে নতুন করে। কালাই রুটির সাথে গরুর মাংস, টার্কি মাংস, হাঁসের মাংস, বেগুন ভর্তা, ধনিয়া চাটনি দেওয়া হয় এখন।’


নগরীর রানী বাজারে ফুটপাতে কালাই রুটি তৈরি করছেন গোদাগাড়ী উপজেলার কাঁকনহাট এলাকার আব্দুল মমিন। তিনি বলেন, ‘আগে গ্রামে কালাই রুটি তৈরি করতাম। কিন্তু গ্রামের চেয়ে শহরে এই রুটির চাহিদা বেশি। তাই গ্রাম থেকে এসে ফুটপাতেই দীর্ঘদিন ধরে কালাই রুটির ব্যবসা করছি।’


কালাই হাউসের কারিগর রাসেল জানালেন, তার মা-বাবার কাছ থেকে এই রুটি তৈরি করা শিখেছেন। এই রুটি তৈরি করতে প্রথমে এক ভাগ চালের আটা, তিন ভাগ কালাইয়ের আটা মিশিয়ে পানি দিয়ে আটার গোল ডো তৈরি করা হয়। বল দুই হাতের তালুর চাপে চাপে তৈরি হতে থাকে কালাই রুটি। মাটির খোলায় (তাওয়া) এপিট ওপিঠ সেঁকতে হয়। তারপর চুলা থেকে নামিয়ে ক্রেতাদের পছন্দ অনুযায়ী কালাই রুটি পরিবেশন করা হয়।


রাজশাহী নগরীর উপশহর, সাহেবাজার, বিনোদপুর, কোর্ট এলাকা, রেলগেট, শালবাগান, রানীবাজার, লক্ষীপুর, পিএন স্কুলের বিপরীত দিকে, পদ্মার বাঁধসহ বিভিন্ন এলাকার রেস্তোরাঁয় ও ফুটপাতে একটি কালাই রুটি ২০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে স্পেশাল বললে আরও ১০ টাকা যোগ করতে হবে। আর কালাই রুটির সাথে অন্য খাবার যোগ করতে হলে আলাদা বাড়তি টাকা দিতে হবে। শুধু ধনিয়া চাটনি কিংবা লবণ ঝাল কালাই রুটির সাথে ফ্রি দেওয়া হয়। মূলত শীতের খাবার হলেও ক্রেতাদের চাহিদার কারণে সারাবছরেই রাজশাহীতে এই খাবার পাওয়া যায়।

/এনএ/

লাইভ

টপ