শ্বাসতন্ত্র শক্তিশালী করতে রেসপিরেটরি ফিজিওথেরাপির ভূমিকা

Send
এহসানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৩:৫২, মে ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১৬, মে ১৮, ২০২০

রেসপিরেটরি ফিজিওথেরাপি হচ্ছে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পদ্ধতির এক বিশেষায়িত অংশ যা ফুসফুসের বিভিন্ন রকম রোগের জটিলতা কমাতে ও শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার কষ্ট কমাতে পারে। এতে রয়েছে বিভিন্ন রকমের পজিশনিং টেকনিক, চেস্ট পেইন ম্যানেজমেন্ট টেকনিক, এয়ারওয়ে ক্লিয়ারেন্স টেকনিক, ব্রিদিং এক্সারসাইজ, কন্ট্রোল্ড ব্রিদিং এক্সারসাইজ ইত্যাদি। বিভিন্ন দেশে রেসপিরেটরি ফিজিওথেরাপিস্টরা চিকিৎসা দিচ্ছেন, বিভিন্ন অবস্ট্রাক্টিভ এবং রেস্ট্রিকটিভ (সিওপিডি, ব্রংকিয়েকটেসিস, অ্যাজমা) রোগে কাউন্সিলিং করছেন এবং রোগের অবস্থা সম্পর্কে রোগীদের অবগত করছেন।

যেহেতু করোনা ভাইরাস মানুষের দেহে প্রবেশের পর শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ করে, তাই এই রোগের সাথে সাথে শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা তথা নিউমোনিয়া, প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। শ্বাসকষ্ট কমানোর জন্য রেসপিরেটরি ফিজিওথেরাপিস্টগণ রোগীকে পজিশনিং করানো যেমন উপুড় করে শোয়ানো, ডান কাত করে শোয়ানো, আধশোয়া ইত্যাদির পরামর্শ দিয়ে ফুসফুসে বাতাস প্রবেশের পথ সুগম করেছেন। রোগীদের অবস্থা অনুযায়ী পোসচারাল ড্রেনেজ টেকনিক যেমন ক্ল্যাপিং, শেকিং, ভাইব্রেটিং ইত্যাদি ব্যবহার করে বুকে জমে থাকা কফ বের করতে সহায়তা করেন। এর ফলে সংক্রমণের মাত্রা কমে আসবে। ওষুধ গ্রহণের পাশাপাশি ডিপ ব্রিদিং এক্সারসাইজ, কন্ট্রোল্ড ব্রিদিং এক্সারসাইজ, পারস লিপ ব্রিদিং, ইন্সপাইরেটরি মাসল ট্রেনিং, ইন্টারকোস্টাল মাসল স্ট্রেচিং, হাফিং ইত্যাদি থেরাপিউটিক এক্সারসাইজের দ্বারা রোগীর শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা কমানো যায়। একজন দক্ষ রেসপিরেটরি ফিজিওথেরাপিস্টের মূল লক্ষ্য থাকে রোগীকে মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশনে যাবার পূর্বেই তার শ্বাসতন্ত্রকে শক্তিশালী করে তোলা এবং যারা ভেন্টিলেশনে আছেন তাদের দ্রুত উইনিং প্রক্রিয়ায় নিয়ে যাওয়া যেন ভেন্টিলেটরের উপর নির্ভরশীলতা কমে যায়। আমেরিকার ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. তাসবিরুল ইসলাম করোনাভাইরাস আক্রান্ত দুর্বল রোগীদের চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার গুরুত্বের কথা বলেছেন।

উন্নত বিশ্বে রেসপিরেটরি ফিজিওথেরাপিস্টগণ চেস্ট মেডিসিন ওয়ার্ডে, আই সি ইউ তে, ফুসফুসের সার্জারির পূর্বে ও পরে এবং রোগীর প্রয়োজন অনুসারে মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিমে পালমোনারি বা রেসপিরেটরি পুনর্বাসন সম্পন্ন করতে নিয়োজিত থাকেন। ইতালির মিলান শহরের গ্রেট মেট্রোপলিটন হাসপাতালের কর্মরত অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্ট মারতা ল্যাজেরই কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর ফুসফুসের চিকিৎসায় রেসপিরেটরি ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, এ রোগীদের প্রচণ্ড রকমের নিউমোনিয়া হতে পারে যার পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট এবং ফুসফুসে অক্সিজেনের প্রবাহে সমস্যার সৃষ্টি হয়ে রোগীর এআরডিএস (একিউট রেস্পিরেটরি ডিসট্রেস সিন্ড্রোম) হতে পারে। এর ফলে রোগীকে জরুরি ভিত্তিতে হাই ফ্লো অক্সিজেন থেরাপির পাশাপাশি সিকেপ (কনটিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেসার) এ রাখতে হবে। এসকল কিছু একজন রেসপিরেটরি ফিজিওথেরাপিস্টের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে করা হয়। রোগীর এয়ারওয়ে সচল রাখা এবং শ্বাসকষ্ট নিরাময়ে রোগীকে ব্রিদিং এক্সারসাইজ করানো এবং পোসচারাল ড্রেনেজ প্রক্রিয়া ব্যবহারের কথাও বলেছেন এই বিশেষজ্ঞ রেসপিরেটরি ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক। মিসেস র‍্যাচেল কোলক্লহ যিনি যুক্তরাজ্যের চার্টার্ড রেসপিরেটরি ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশন এর সহ-সভাপতি এবং বারমিংহাম কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালে কর্মরত একজন ফিজিওথেরাপিস্ট, সম্প্রতি স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর আইসিইউ সেবায় একজন ফিজিওথেরাপিস্টের ভূমিকা সম্পর্কে বলতে গিয়ে উল্লেখ করেন, ‘আইসিইউতে আমাদের কাজ হলো, রোগীর ফুসফুসকে সাহায্য করা এবং এর ভেতরকার শ্লেষ্মাগুলোকে বের করে ফুসফুসে বাতাস চলাচলের পথকে সচল রাখা। এটা করার জন্য আমরা হাতের কিছু কৌশলের আশ্রয় নেই যেমন, ভাইব্রেশন বা অ্যাসিসটিভ কফ টেকনিক যা বাতাস চলাচলের পথ থেকে শ্লেষ্মা সরাতে সাহায্য করে।’
ভারতের মুম্বাইয়ে অবস্থিত টোপিওয়ালা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের সহকারী অধ্যাপক এবং রেসপিরেটরি ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ ডা. রচনা অরোরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে কোভিড-১৯ শ্বাসকষ্টের জটিলতা কমাতে ফিজিওথেরাপি দিয়ে আসছেন। এছাড়াও সিওপিডি, রেসপিরেটরি ফেইলুর অথবা আইসিইউতে শ্বাসকষ্টের যেসব রোগীরা ভর্তি থাকে তাদের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া এবং ভেন্টিলেশনে যারা আছেন তাদের দ্রুত উইনিং প্রক্রিয়ায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও রেসপিরেটরি ফিজিওথেরাপিস্টের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। কিছু কিছু রোগ যেমন সিওপিডি, ব্রংকিয়েকটেসিস, অ্যাজমা ইত্যাদির ক্ষেত্রে রোগীদের সব সময়

ওষুধের পাশাপাশি রেসপিরেটরি ফিজিওথেরাপি প্রয়োজন। হাসপাতালে কিংবা বাসায় বয়স্ক রোগীরা (৬০-৮০ বছর) পালস অক্সিমিটারের সাহায্যে অক্সিজেনের স্যাচুরেশন হার দেখতে পারেন, এটি যখন ৯১-৯৩% থাকে তখন বিভিন্ন অ্যাকটিভ এক্সারসাইজের মাধ্যমে যেমন হাঁটা, উঠা-বসা, ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করে এই হার স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। একজন দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্টই নির্ধারণ করতে পারেন যে কখন কোন পর্যায়ে এই ধরনের পরামর্শ দেবেন।

ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড এন এইচ এস ট্রাস্ট হাসপাতালের কার্ডিওথোরাসিক সার্জন ডা. শাকিল ফরিদ কোভিড-১৯ চিকিৎসার গাইডলাইন সম্পর্কে বলতে গিয়েও রোগীর সুস্থতার জন্য রেসপিরেটরি ফিজিওথেরাপির গুরুত্বের কথা বলেন।  কোভিড-১৯ প্রতিরোধ থেকে প্রতিকার সব পর্যায়েই রেসপিরেটরি ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার ভূমিকা রয়েছে। সংক্রমিত হননি এমন মানুষও ব্রিদিং এক্সারসাইজ করে শ্বাসতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারেন এবং রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াতে পারেন। তাতে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসবে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি স্বীকৃত এই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার গুরুত্ব আমাদের দেশে অনুধাবিত হয়নি এবং স্বাস্থ্য কাঠামোতে দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্টদের সংযোজন হয়নি। এ দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্টদের সর্বাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা কাজে লাগাতে অতিসত্ত্বর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক নিয়োগ করা ভীষণ জরুরি।

লেখক: ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ

সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশনস ইনস্টিটিউট,

সি আর পি, সাভার, ঢাকা

/এনএ/

লাইভ

টপ