করোনায় আক্রান্ত হলে ঘাবড়াবেন না, মানসিক শক্তিই বড় শক্তি

Send
ডা. মহসীন আহমদ
প্রকাশিত : ১৫:০০, জুন ০৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩০, জুন ০৫, ২০২০

ডা. মহসীন আহমদবাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহতার দিকে যাচ্ছে। দেশে লকডাউন তুলে নেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। এ পর্যম্ত দেশে ৫২টি পরীক্ষাগারে মাত্র ৩ লক্ষ ৭২ হাজার টেস্ট হয়েছে, ৬০ হাজারের বেশি করোনা পজেটিভ এসেছে। সেই হিসেবে দেশে প্রায় ২০ ভাগ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। করোনায় মৃত্যু সরকারি হিসেবে ৮০০ এর বেশি। দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। আমার ধারণা জুলাইয়ের মাঝামাঝি বাংলাদেশে করোনার প্রকোপ  নিম্নগামী হবে। এতদিনে কত প্রাণহানি হয়, সেটাই দুশ্চিন্তার কারণ। তাই দয়া করে কেউ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বের হবেন না। ঘরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন। করোনায় আক্রান্ত হলে ঘাবড়াবেন না, মনোবল অটুট রাখুন।

  • সবসময় ভেবে নিন, আপনি অথবা আপনার পাশের লোকটি করোনা পজেটিভ। কারণ, ৫০-৬০ ভাগ করোনা পজেটিভদের উপসর্গ থাকছে না। এটা করোনা ছড়িয়ে পড়ার উল্লেখযোগ্য কারণ। তাই আপনি-আমি সবাই মাস্ক ব্যবহার করবো। চিকিৎসক ছাড়া বাকিরা পাতলা সুতি কাপড়ের পরিষ্কার মাস্ক ব্যবহার করবে। ৩টি মাস্ক বাসায় রাখুন, একটা ধুয়ে অন্যটা ব্যবহার করুন। বাসা থেকে শুরু করে সব জায়গায় ৬ ফুট দূরত্বে থাকার চেষ্টা করুন। কমপক্ষে ৩ ফুট তো অবশ্যই।
  • জরুরি প্রয়োজনে বাসার বাইরে গেলে মাস্ক পরে বের হবেন, ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রাখবেন। গণপরিবহনে উঠবেন না, হাঁটার অভ্যাস করুন। প্রয়োজনে রিকশা অথবা সাইকেল ব্যবহার করুন। ৬০ বছর বয়সের বেশি অথবা যে কোনও বয়সী হার্ট, কিডনি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাজমা ইত্যাদি রোগে যারা ভুগছেন- তারা  কোনোভাবেই বাসা থেকে বের হবেন না। 
  • বাসায় ফিরে সরাসরি বাথরুমে যান, কাপড় খুলে গোসল করে ঘরের অন্য সদস্যের রুমে প্রবেশ করুন।
  • ধূমপান করবেন না। প্রচুর পানি, ফল, শাকসবজি, ডিম খাবেন। ৭- ৮ ঘন্টা ঘুমাবেন। পরিবারকে সময় দিন। আপনার নিজের ভেতরের সৃজনশীলতা খুঁজুন আর সেটাকে কাজে লাগিয়ে বাসায় সময় কাটান।
  • রোগ প্রতিরোধ বাড়ায় এমন কিছু ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। যেমন ভিটামিন সি (Tab Ceevit), ভিটামিন ডি (Cap D Rise   20000/ 40000 unit) সপ্তাহে ২টি করে ২ মাস,  জিংক (Tab Xinc)  ২টি করে ২ মাস, ভিটামিন এ (Cap Retinol Forte 50000 unit) ১টি করে পর পর ৪ দিন- ৬ মাসে ১ কোর্স খেতে পারেন। 
  • আপনার ও পরিবারের কারোর করোনা পজেটিভ হয়ে গেলে ঘাবড়াবেন না। ৫০-৬০ ভাগ রোগীদের কোনও উপসর্গ থাকে না। ৩০- ৪০ ভাগের অল্প ও মধ্যম মানের উপসর্গ থাকে যেমন - জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা, মাথা ব্যথা, শরীর ব্যথা, খাবারে অরুচি, গন্ধ না পাওয়া ইত্যাদি। এই পর্যায়ে আক্রান্ত রোগী নিজের বাড়িতে সম্পূর্ণ কোয়ারেন্টিনে থাকবেন। কোনোভাবেই বাড়ির অন্যান্য সদস্যের সামনে আসবেন না। খাওয়া, বাথরুম  ইত্যাদি সবকিছু আলাদাভাবে করবেন। যদি বাসায় কমন বাথরুম থাকে, সেটাকে ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ধোয়ার পর অন্যরা ব্যবহার করবেন। রোগীসহ অন্যরাও মাস্ক ব্যবহার করবেন, এতে সংক্রমণের হার কমে যাবে। যেহেতু রোগী সবসময় একা থাকেন, তাই মানসিক শক্তি খুব জরুরি। তাকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে যোগাযোগ রেখে সাহস দিতে হবে।
  • অল্প ও মধ্যম উপসর্গে চিকিৎসা তেমন কিছু নেই, শুধু উপসর্গ অনুযায়ী ঔষধ খেতে হবে। যেমন  জ্বর আর শরীর ব্যথায়  প্যারাসিটামল (Tab Napa), সর্দি-কাশিতে অ্যান্টি হিস্টামিন (Tab Deslor), ক্ষেত্রবিশেষে চিকিৎসকের পরামর্শমত Cap Doxicap 100 mg ২টি একসাথে তারপর সকালে ও রাতে ১টি করে ৭ দিন খেতে হবে। Tab Ivermactin (Scabo 6 mg/ Ivera 6 mg), ওজন ৬০ কেজির বেশি হলে ৩টি আর কম হলে ২টি ঔষধ শুধুমাত্র ১ বার খাবেন। তবে প্রতিটি  ঔষধ চিকিৎসকের পরামর্শে খাবেন। যেমন যারা Tab Warfarin খান তারা Tab Ivermactin খাবেন না। কারণ রক্তক্ষরণ হতে পারে। চিকিৎসকদের চেম্বার আর হাসপাতালে একেবারে প্রয়োজন ছাড়া যাবেন না, টেলিমিডিসিনের মাধ্যমে পরামর্শ নেবেন।
  • করোনা পজেটিভ রোগী কখন হাসপাতালে যাবেন? আপনার বাসায় যদি Pulse oxymetry থাকে তাহলে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা জানা সহজ, যদি ৯০ এর নীচে নেমে যেতে থাকে দেরি না করে হাসপাতালে যাবেন। আর Pulse oxymetry না থাকলে যদি শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে, আপনার নিজস্ব স্বাভাবিক কাজ যেমন কথা বলতে, বাথরুমে যেতে কষ্ট হয় তাহলে হাসপাতালে যোগাযোগ করবেন। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপায়ী, হার্ট, কিডনি রোগী যে কোনও বয়সীরা হাসপাতালে যোগাযোগ করবেন। হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়ে গেছে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ মতো বাসায় অক্সিজেন দিতে পারেন। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শমত Inj Enoxaparine 40 mg নাভির পাশে চামড়ার নিচে দেওয়া যেতে পারে। উল্লেখ্য, ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়াতে ডেঙ্গু টেস্ট ও প্লাটিলেট কাউন্ট দেখে নেওয়া ভালো।
  • কিন্তু ৫-১০ ভাগ করোনা পজেটিভ রোগীদের আসলেই ভাগ্য খুব খারাপ। কেউ কেউ অল্প ও মধ্যম উপসর্গ থেকে খুব খারাপ অবস্থায় চলে যেতে পারে। আবার কিছু রোগী হঠাৎ করেই খারাপ হয়ে যেতে পারে।  তাদেরকে অতি দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। Concentrated oxygen নিজেরা ব্যবস্থা করতে পারেন। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়া কোনও উপায় নেই। তবে যতটা সম্ভব ভেন্টিলেটর ছাড়াই চিকিৎসা করা উত্তম। সঠিক ফলোআপ, নিয়মিত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, অ্যান্টি ভাইরাল ওষুধ, Inj Enoxaparine 80 mg, প্লাজমা থেরাপি, ব্যবস্থার সাথে সাথে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মানবিক ব্যবহার রোগীকে সুস্থ করতে ভূমিকা রাখবে।
  • চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা এখন করোনার ফ্রন্ট লাইন যোদ্ধা। তাদেরকে সব রোগীদের করোনা পজেটিভ ধরে নিয়ে নিজেদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মানবিক আচরণ দিয়ে সকলের চিকিৎসা করতে হবে। সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও জনগণকে এই ফ্রন্টলাইন যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বুঝতে হবে উনারাও মানুষ, তাদেরও পরিবার আছে। তারা সবাই করোনা ঝুঁকি নিয়ে জনগণের সেবায় হাসপাতালে কর্মরত আছেন। তাদেরকে সন্মান করুন, নিজে বাঁচুন।
  • করোনা বায়ুবাহিত ছোঁয়াচে রোগ। তবে করোনা রোগী অচ্ছুৎ নয়, তাদেরকে অসন্মান করবেন না। মনে রাখবেন, আপনি আমি সবাই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারি। অতএব করোনা রোগী ও তাদের পরিবারের সাথে মানবিক আচরণ করি। করোনা রোগী মারা গেলে তার সৎকারের ব্যবস্থা করি।

ইতিহাসে মানুষের জয় হয়েছে সবসময়, আশা করি এবারও করোনাকে জয় করবে মানবজাতি। ততদিন শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে সাবধানে সব নিয়ম মেনে চলি।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা।

প্রধান পৃষ্ঠপোষক, হেলদি হার্ট হ্যাপি লাইফ অর্গানাইজেশন।

/এনএ/

লাইভ

টপ