‘কুয়াশায় শাদা ঘোড়া’: মা ও ছেলের মর্মরিত বয়ান

Send
মনি হায়দার
প্রকাশিত : ০০:০০, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০০, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৯

'কুয়াশায় শাদা ঘোড়া' সৈয়দ শামসুল হকের ছোট উপন্যাস। আকারে খুব বড় নয়, পৃষ্ঠায় মাত্র সত্তর। কিন্তু ভাবগত, বিস্তারগত এবং লোকায়ত জীবনের মন্থনে আরো একটি অনন্য উপন্যাস। গোটা উপন্যাসের ক্ষেত্রভূমি রংপুর এবং তার আশপাশের এলাকা। উপন্যাসের একেবারে শেষের দিকে পাই ঢাকা শহরের কাছে রূপগঞ্জ এলাকার বৃত্তান্ত।

প্রকৃতপক্ষে, উপন্যাসের সীমানা নির্দিষ্ট কোনো চৌহদ্দিতে আটকানো যায় না। ঔপন্যাসিকের কল্পনা, চরিত্রের যাত্রা, আখ্যানের আলেখ্য আর বাস্তবতার নিরিখে একটি উপন্যাস স্বার্থক, স্বয়ংভু হয়ে ওঠে।

‘কুয়াশায় শাদা ঘোড়া’ উপন্যাসের নির্মাতা সৈয়দ শামসুল হক ঔপন্যাসিক হিসেবে তার কেরামতি দেখাতে শুরু করেছেন, ১৯৫৭-৫৮ সালে ‘দেয়ালের দেশ’ উপন্যাস দিয়ে, পাটুয়াটুলীর প্রকাশনা সংস্থা ‘আর্টস এ্যান্ড লেটার্স’ বের করেছিলো। সেই কবেকার কথা, কেবল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন পার হয়ে বাংলা ভাষা যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশের দিকে, সেই প্রত্যুষবেলার নায়ক, উপন্যাসের এবং গল্পের সৈয়দ শামসুল হক। যাকে আমরা ভালোবেসে সংক্ষেপে বলি, সৈয়দ হক।

১৯৫৭-৫৮ সালের ‘দেয়ালের দেশ’ দিয়ে সৈয়দ হকের যাত্রা শুরু বখতিয়ার খিলজির মতো, সেই তিনি ২০১৫ সালে এসে রংপুরের জটিল এবং মানবিক উপপাদ্য জানাচ্ছেন এক জনম দুখী মা, আর তার ছেলের মর্মরিত জীবনবোধ, জীবনের চারুপাঠ, জীবনের বিষাদ সৌন্দর্য্যের সাধ। আগেই লিখেছি, ‘কুয়াশায় শাদা ঘোড়া’ খুব বড় উপন্যাস নয়। ছোট উপন্যাস, কিন্তু পাঠ শেষে মনে হয়, এ যে আমারই নামতা। অথবা আমার বন্ধুর শতকিয়া। কিংবা আমার চারপাশের জীবনের আলো ও অন্ধকারের অবাক উদ্ভাস। ফলে, উপন্যাসটা আর ছোট থাকে না। ভেতরে ঘটনার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের মনতরঙ্গের ডানা মেলে দেয় আসমানে, জমিনে, মনের গহিনে। তল পাওয়া বড় দুষ্কর। পাঠক তলের তল পেয়ে গেলে ঔপন্যাসিকের কেরামতি আর থাকে?

উপন্যাস, ‘কুয়াশায় শাদা ঘোড়া’ শুরু হয় মৃত্যু-সংবাদ দিয়ে। উপন্যাসের নায়ক উত্তম পুরুষে ঘটনা পরম্পরা বলে যাচ্ছে, আমরা পাঠ করে যাচ্ছি। যেতে যেতে বাংলার গ্রামীণ দিন-রাত্রির সৌরভ আর দুঃখের বেদনা পান করতে করতে এগোতে থাকি, না এগিয়ে উপায় থাকে না, কারণ, কুয়াশা, শাদা আর ঘোড়ার মিশেলে সৈয়দ হকের তৈরী করা ইন্দ্রজালের ট্যানেলে প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে আছে, তৃষ্ণা। না, কোনো নায়িকা নয়, নয় গনিকা, এই তৃষ্ণা জীবনবোধের পানপাত্র, মাত্র।

নায়ক, এই চরিত্রকে কি নায়ক বলা যায়? এই উপন্যাসে যে চরিত্র, কেবল আলেখ্য লিখে যায়, যার নেই কোনো সুকৃতি কিবাং দুষ্কৃতি, কিন্তু গোটা উপন্যাস জুড়ে তার পদচারনা।
মৃত মাকে মাটি দিয়ে আসতে আসতে নায়ক বা প্রধান চরিত্র আমাদের শোনাচ্ছেন ফেলে আসা দিনের ঘটনা, বেদনা, উচ্ছাস, আনন্দ, বিরহ, সর্বনাশ, জলোচ্ছ্বাস আর মানুষ হিসেবে টিকে থাকার জন্য নিরন্তর লড়াই। তার লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত মা আম্বিয়া খাতুনের লড়াই। দুই লড়াই মিলে ‘কুয়াশায় শাদা ঘোড়া’ এগিয়ে যায়। ভেতরের বুনোট ঘনত্বের দিকে। আম্বিয়ার ছেলে জানাচ্ছে শাদা ঘোড়ার সংবাদ—শুরতে।

‘মায়ের মৃত্যুর আগে প্রায় এক মাস যাবত বারেবারেই আমি একটি স্বপ্ন পাচ্ছিলাম প্রায় প্রতি রাতেই। শাদা একটি ঘোড়া। দাঁড়িয়ে আছে ঘোর কুয়াশার ভেতরে। যেন সে কুয়াশা দিয়েই তৈরি। এক পা তুলে আছে। যেন এক্ষুনি সে ছুটে যাবে। অথবা ছুটে যেতে যেতে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়েছে।’ এইভাবে উপন্যাসের ভেতরে প্রবেশ করে শাদা ঘোড়াটি। কিন্তু গোটা উপন্যাসে ঘোড়াটি চরিত্র হয়ে ওঠেনি, তবে প্রবল প্রতীক হয়েছে। প্রতীকের ভেতর দিয়ে ঘোড়াটি উপন্যাসে নিজের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে।

রংপুরে থাকেন উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। জলেশ্বরীতে মা আম্বিয়া, ছেলে রংপুরে সংবাদপত্রের সাংবাদিক। এই সাংবাদিক তেমন কেউ নয়। কারণ রংপুর একটি মফস্বল। সবাই মোনাজাতউদ্দিন হয়ে উঠতে পারে না। যদিও সৈয়দ হক উপন্যাসটি উৎসর্গ করেছেন চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনকে। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রংপুর থেকে মাঝে মাঝে মাকে দেখতে আসতো। বারো বছর বয়সে বড় চাচার কাছে পাঠিয়েছিলো আম্বিয়া—রংপুর শহরে, পড়াশোনা করা জন্য, সেই থেকে রংপুরেই আছে। না, বড় চাচার বাসায় থাকার ভাগ্য হয়নি, কারণ চাচার মেয়ে টগর। টগরের কল্যাণে জারুয়া উপাধি দিয়ে রাতেই বের করে দিয়েছিলো চাচা। এমন সংবাদ, স্বাভাবিক কারণেই মাকে জানানো হয়নি। তবে মা বলতেন, ‘ল্যাখাপড়াটা ছাড়িও না বাজন।’

আমাদের গ্রাম গঞ্জের মা-বাবাদের এই এক মন্ত্র—লেখাপড়া। কেমন করে এই মন্ত্র তাদের করোটিতে প্রবেশ করেছিলো কে জানে। আম্বিয়াতো লেখাপড়ার মধ্যেই ছিলেন। তিনি চাকরি করতেন  মেয়েদের স্কুলে। উপন্যাসের নায়ক আমাদের জানান দেয়, সংসার বৈরাগী সে। কারণ, টগরের সঙ্গে সেই জোছনা রাতে বিহারে চাচার চড় আর জারুয়া শব্দের ঝংকার। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পরে জারুয়া শব্দটিকে নতুন করে চিনতে শুরু করে সে। মানুষের জীবনতো গন্ধমের জীবনের চেয়েও গল্পে ঠাসা। না হলে আম্বিয়ার সঙ্গে দেখা হবে কেনো ট্রাক ড্রাইভার জামাল মিয়ার। আর জামাল মিয়ার সঙ্গে বিয়েই বা হবে কেনো? বিয়ে হয়েছে, সংসারটা হোক। আম্বিয়াদের জীবন এ-রকমই হয়, এই তো হয়, আসলে হয় না, কিছুই হয় না। কেবল আশার পিছনে প্রবল দুরাশা নিয়ে দিনরাত্রি যাপন। জামাল মিয়ার বিয়ে করা দরকার, বিয়ে করেছে। ট্রাক ড্রাইভারগুলো থাকে মাঠে-ঘাটে এখানে-সেখানে, দেখে কতো রাতপাখি—সেখানে এক আম্বিয়ায় কি আটকে থাকতে পারে? পারে না। অকালে, অপেক্ষায় অপেক্ষায়, ঝরঝর আম্বিয়ার কাছে জামাল মিয়ার খবর নিয়া আসে একজন, আমিনুল্লাহ।

কী খবর নিয়ে আসে আম্বিায়ার জন্য? খবর ভালো না। জামাল মিয়া এখন চোরাকারবারে ঢুকছে। মহাজন ট্রাক ওর হাত থেকে নিয়ে নেবে। আর যায় খারাপ মেয়ে মানুষদের আস্তানায়। অতি অভাগিনী আম্বিয়া হাত ধরে আমিনুল্লার, ‘ভাইজান! ভাই, দুনিয়া যে মোর আন্ধার হয়া গেইলো। ’

পরিস্থিতি তৈরীতে সৈয়দ হক অনবদ্য। নারী ও পুরুষের মধ্যে নিঃশব্দ সংরাগের বৈভব এমন নিঁখুদভাবে বোনেন, মনে হয় চেতনার রঙে সুন্দরের সুই সুতোয় নকশী আঁকছেন। আম্বিয়া আর আমিুনল্লার সঙ্গে সেই সন্ধ্যার আলো ছায়াটুকু তুলে ধরলে পাঠক আমার ব্যক্ত কথাকে অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন।

‘সন্ধ্যা তখন কেবল নেমে এসেছে। আকাশে ফুটফুট করে তারা ফুটতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে তল্লামারী বিজন সুনসান। চালাঘরের বারান্দায় দুটি মানুষ। এক নারী অচেনা এক পুরুষের হাত ধরে বসে আছে। নারীর চোখে অশ্রুর ধারা। পুরুষটির হাতের ভেতর নারীর হাত। হঠাৎ দূরে ডেকে ওঠে শেয়াল। হুক্কা হুয়া হুয়া। চমকে ওঠেন নারীটি। চৈতন্য হয় তার। কে-বা দেখে ফেললো! আম্বিয়া ত্রস্ত হয়ে হাত সরিয়ে নেয়। আমিনুল্লাহ পুরুষ মানুষ, নারী হাত ছাড়িয়ে নিলেও তার হাতের ভেতরে নারীহস্তের কোমলতাটুকু তখনো থেকে যায়। আমিনুল্লাহ উদভ্রান্ত হয়ে পড়ে।’

আম্বিয়া চেষ্টা করে স্বামীর যোগ্য হয়ে ওঠার। যদিও সংসার, যদিও স্বামী ফিরে এলে পাশাপাশি ঘুমোয় আম্বিয়া আর জামাল মিয়া, কিন্তু ব্যবধান দুস্তর। সংসারে রুচির সংকটে নেমে আসে দানবিক বিপর্যয়। এ এক অপ্রতিরোধ্য নিয়তি। নিয়তি? মানুষ কি নিয়তিকে নিয়ন্ত্রন করে না? মানুষই মানুষের শক্তির নিয়ামক। সেই নিয়ামকের হাত ধরে খবর আসে জামাল মিয়া আত্মহত্যা করেছে। মারা যাওয়ার মধ্যে দিয়ে জামাল মিয়া এক অর্থে আম্বিয়াকে মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু মুক্তি কি এতো সহজবাচ্য? মুক্তিরও আড়ালে যে নিগড়ের, স্বপ্নের, কামনার বাঁশঘুঘু ডাক দিয়ে যায় উদাস দুপুরে? কামনার সেই ডাক কে ফেরাতে পারে? যার আছে শরীর, মাংস আর উদাত্ত আগুন রক্ত?

স্বামী মারা যাওয়ার পর আম্বিয়া স্কুলে আয়ার কাজ নেয়। ছেলেকে পাঠায় রংপুর শহরে। ছেলে কোনোভাবে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখে সাংবাদিকতার কিংখাবে। কিন্তু মায়ের প্রতি তার অসীম দরদ, টান। মা কেবল তারই জন্য বেঁচে আছে। জলেশ্বরীতে বৃদ্ধ মায়ের আশ্রয় হয়, মদিনা খালার আস্তানায়। যে আস্তানা বাবা কুতুবদ্দিনের মাজারের সঙ্গে।

‘কুয়াশায় শাদা ঘোড়া’ উপন্যাসের মোক্ষম চরিত্র আমিনুল্লাহ কিন্ত জলেশ্বরীর কেউ না। সে কোত্থেকে এসেছে? আমিনুল্লাহ ঢাকার কাছের রূপগঞ্জ থেকে এসেছে জলেশ্বরীতে। কেনো এসেছে? সংসারের সঙ্গে বিবাগী হয়ে? মানুষ সেই অনন্তকাল থেকে অভিযাত্রী। দেশের ভেতরে, দেশের বাইরে। আর সৈয়দ হক আমাদের কথাশিল্পের শ্রেষ্ঠ মহাজন। উপন্যাসের আখ্যান তৈরীর করা সময়ে তিনিই গণিতের সজ্ঞায় আকেঁন সকল চরিত্র, স্থান, আর উপাখ্যানের ভূগোল। তার আঁকা ভূগোলের পথ বেয়ে জলেশ্বরীতে এসে থিতু হয়েছে আমিনুল্লাহ। ‘কুয়াশায় শাদা ঘোড়া’ পাঠের শুরুতে, অথবা পাঠের মাঝামাঝিও এসেও আমরা বুঝতে পারি না যে, আমিনুল্লাহ এই উপন্যাসে কেনো এসেছে! পাঠের শেষ অংকে গিয়ে আমরা চমকে উঠি, অথবা ঔপন্যাসিকের বিভ্রান্তপথে  যেতে যেতে আমরা আরও বিভ্রান্ত হয়ে অবাক নাচ নাচতে থাকি। আবিষ্কার করে স্তম্বিত হই মানুষের ভেতর-বাইরের কপাট খোলা করতল। এ না হলে মানুষ কেনো? মানুষের ভেতরইতো থাকবে ভোগের কামনার লালসার লোভ এবং গভীর থেকে গভীরতম ভালোবাসা, সুখ-অসুখ। আপন হাতে র‌্যাঁদার মতো ছেনে ছেনে  দেখেছে আম্বিয়া—জীবন, জীবনের চাপকল কতো ভঙ্গুর, কতো অসমতল, কতো বায়বীয়। এই দেখা-শোনা-জানার পরিধিতে রূপগঞ্জের আমিনুল্লাহ শেষে রেখে যায় পৌরুষের দাগ!

উপন্যসাটি মাত্র সত্তর পৃষ্ঠার। কিন্ত ভেতরের আখ্যান, বয়ন ও বুনন এমন ঋদ্ধ, এমন প্রবল, মনে হয় দীর্ঘ এক পথ পাড়ি দিচ্ছি, পাড়ি দিয়ে, হাঁটতে হাঁটতে আমি এমন দরজায় সম্মুখে এসে দাঁড়াই, দেখি দরজার ওপাশেই কুয়াশা, আর কুয়াশার ভেতর দিয়ে একটি শাদা অশ্ব ধাবমান। শাদা ধাবমান অশ্বের ওপর কেবল একটা জীন পাতা, কোনো আরোহী নেই। কোথায় আরোহী? কে ধাবমান শাদা অশ্বের মালিক? সৈয়দ হকের বর্নিত নায়ক, নাকি ...। আমরা সেই বৃত্তান্তে যাবো আরও পরে, এখন যাই আম্বিয়ার কাছে। মৃত্যু আম্বিয়ার শিথানে দাঁড়িয়ে। মদিনা খালা যায় মৃত্যু পথযাত্রী আম্বিয়াকে শেষ তওবা করানোর জন্য গদ্দিনশিন পীর হুজুর সৈয়দ সাহেবকে আনতে। কিন্তু সে আসে না। জানায়, উয়ার জীবন বড় পাপের।

কার জীবন পাপের? আম্বিয়ার? শরীরের সমস্ত ক্রোধে হাতের তালুতে আসে, মনে হয়, পীরকে কাটা মরুগীর মতো ফালি ফালি করি কাটি। কিন্তু আগেই মদিনা খালা খেলেন আসল পাশার দান। আম্বিয়ার ছেলেকে নিয়ে আবার গেলেন পীরের কাছে। কিন্ত পীর কী বলছে?

‘মদিনা খালা ছাড়বার পাত্রী নন। তিনি বলেন, সে বেলায় আপনে তাকে কইছিলেন না, যে সংগ্রামের কথা পত্রিকায় ল্যাখে বলিয়া তার মায়েকে জাগা দিবার নন?

হুজুর পিকদানে মুখের তার পানের রস তীরের মতো ফেলে, মাথার টুপি খুলে টুপি দিয়েই বাতাস করতে থাকেন নিজেকে। মদিনা খালা তার মোক্ষম অস্ত্রটি এবার ছাড়লেন। শুনে অবাক হয়ে যাই।

তওবা তাকে দিবার যে নন, তার পাপের কথা যে কন, কীসের পাপ? পাপ আপনের বাড়িতে! আপনের নাতিন ফুলকির কথা ভুলি গেইছেন? তার পেটে না বাচ্চা আসিছিল বিয়ার আগে। পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধের কালে মহিউদ্দিন, আপনেরই চাচার নাতি, শুতে নাই ফুলকির সাথে? সেই রাইতেই যে যুদ্ধে ...ফুলকি গর্ভবতী হয় নাই? শামসুদ্দিনের জন্ম দেয় নাই?’

মদিনা খালা ডালা একেবারে উপুড় করে, ন্যাংটো করে পীরদের মুখোশ খুলে দিলেন। বাধ্য হয়ে পীর আম্বিয়ারকে তওবা পড়াতে যায়।

জন্মই যাদের অভিশাপ সেই তাদের প্রতিনিধি আম্বিয়া, আম্বিয়ার ছেলে, আর মদিনা খালারা। সুখ দুঃখের কারবারের মধ্যে দিয়ে সুতোর মতো বড় অনামী অকিঞ্চিৎকর জীবন বহন করতে করতে আম্বিয়া একেবারে মৃত্যুর এক ইঞ্চি সামনে দাঁড়িয়ে। যাবার বেলায়, জীবনের গোপন কারখানা থেকে একটা কৌটা তুলে দিতে চায় সন্তানের কাছে, দুনিয়ায় রেখে যাওয়া তার একমাত্র প্রতিনিধির কাছে।

মানুষের জীবন একটি তিলের সমানও নয়। সেই ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর জীবনের সংসারে কত-শত পালাগান রচিত হয়, হতে পারে সৈয়দ শামসুল হক মাত্র বিশটি পর্বে, তার মন্থিত জলেশ্বরীর গদ্যে, বাঁকা জলের মতো গেঁথে দিলেন আত্মার লেবুপাতায়।

সৈয়দ হক দীর্ঘ লেখাযাত্রায় নিজের মতো করে সুললিত, জাগ্রত জলেশ্বরীর একটি ভাষা নির্মাণ করেছেন। যে ভাষা একান্তই তার আত্মার নীড় থেকে উঠে আসা, যে ভাষার শৈলী লোকজ জীবনের রান্নাঘরের সালুন, যে ভাষা শরীর থেকে গন্ধ আসে পাটের আর তামাক পাতার। সেই অনন্য ভাষার কারুকাজে সৈয়দ দিলেন উপহার বাংলা ভাষার পাঠকদের—তার আরো একটি পানপাত্র।

উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে পাঠক সমাবেশ। প্রচ্ছদ এঁকেছেন সেলিম আহমেদ। দাম : ১৯৫ টাকা।

//জেডএস//

লাইভ

টপ