ওলগা তোকারচুকের নোবেল ভাষণ (পর্ব : এক)

Send
অনুবাদ: দুলাল আল মনসুর
প্রকাশিত : ১৭:১৭, জানুয়ারি ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২০, জানুয়ারি ১২, ২০২০

সাহিত্যে ২০১৮ সালের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক ওলগা তোকারচুক গত ৭ ডিসেম্বর শনিবার সুইডিশ একাডেমিতে পোলিশ ভাষায় তার নোবেল ভাষণ প্রদান করেন।

কোমল বর্ণনাকারী                                                

আমার সচেতন অভিজ্ঞতায় দেখা প্রথম আলোকচিত্রটা আমার মায়ের। তখন আমার জন্ম হয়নি। দুর্ভাগ্যক্রমে আলোকচিত্রটা সাদা-কালো। ছবির অনেক কিছুই আবছা হয়ে মুছে গেছে। ফলে ছবিটা শুধু ধূসর অবয়বে পরিণত হয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে আলো খুব নরম হয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে বৃষ্টি-স্নাত। বসন্তের আলোর মতো। ঠিক জানালা-পথে চুইয়ে আসা আলোর মতো। তার ফলে কোনো রকমে বোঝা যায় এমন আভার মধ্যে রুমের চেহারাটা ধরে রাখা গেছে। মা বসে আছেন আমাদের পুরনো রেডিওটার পাশে। রেডিওটার একটা নীল চোখ আর দুটো ডায়াল: একটা ভলিউম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, আরেকটা স্টেশন খুঁজে নেওয়ার জন্য। এই রেডিওটা পরে আমার ছোটবেলার বড় সঙ্গী হয়ে যায়। এই রেডিওর মাধ্যমেই আমি বাইরের বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারি। আবলুসের শক্ত নব ঘুরিয়ে অ্যান্টেনার কোমল শুঁয়া স্থানান্তর করা হতো। ওয়ারশ, লন্ডন, লুক্সেমবার্গ এবং প্যারিস—সব রকমের স্টেশনই পড়ত সেগুলোর আওতার মধ্যে। যা হোক, কখনও কখনও শব্দ ভেঙে ভেঙে আসছে মনে হতো যেন প্রাগ এবং নিউ ইয়র্ক কিংবা মস্কো এবং মাদ্রিদের মাঝখানে অ্যান্টেনার শুঁয়াগুলো কৃষ্ণ গহ্বরে হোঁচট খাচ্ছে। এ রকম ঘটলেই আমার মেরুদণ্ড বেয়ে কাঁপন ছড়িয়ে পড়ত। আমার মনে হতো, ক্রমাগত পটপট আওয়াজ এবং কম্পিত সুর তৈরি করে রেডিওর মাধ্যমে বিভিন্ন সৌর-শৃঙ্খলা এবং ছায়াপথ আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাঠাচ্ছে। অথচ আমি অর্থ উদ্ধার করতে পারছি না।

     খুব ছোটবেলায় ছবিটার দিকে তাকালে আমি নিশ্চিত অনুভব করতাম, রেডিওর নব ঘোরানোর সময় মা আমাকেই খুঁজছেন। সংবেদনশীল রাডারের মতো তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অসীম জগতে ঢুকে পড়ছেন, খুঁজে দেখার চেষ্টা করছেন, আমি কখন আসব, কোথা থেকে আসব। তাঁর চুলের ছাঁট এবং পোশাক দেখে বোঝা যায়, ছবিটা কখন তোলা হয়েছে। মানে ষাটের দশকের শুরুর দিকে। ফ্রেমের বাইরে অন্য কোথাও তাকিয়ে একটুখানি সামনের দিকে ঝুঁকে থাকা নারী কী যেন দেখছেন, পরবর্তীতে কেউ ছবিটার দিকে তাকিয়ে সেটা বুঝতে পারার কথা নয়। ছোটবেলায় আমি কল্পনায় দেখতাম, মা সময়ের মধ্যে তাকিয়ে আছেন। ছবিতে আসলে কিছু ঘটছে না। ছবিটার মধ্যে একটা স্থির অবস্থা ধরা আছে, চলমান কোনো বিষয় নয়। দেখে মনে হয়, তিনি খানিকটা দুঃখবোধের মধ্যে ডুবে আছেন, চিন্তার ভেতর মগ্ন হয়ে আছেন, কোথায় যেন হারিয়ে গেছেন।

     পরে মাকে আমি তাঁর এই দুঃখী চেহারা সম্পর্কে বহুবার জিজ্ঞেস করেছি। প্রতিবার একই রকম সাড়া পেয়েছি: মা বলেছেন, তাঁর দুঃখের কারণটা হলো, তখনও আমার জন্ম হয়নি। তবু তিনি আমাকে মিস করছেন।

     আমি মাকে জিজ্ঞেস করেছি, আমার তো তখন জন্মই হয়নি। তাহলে আমাকে মিস করলে কীভাবে?

     আমি জানতাম, আমরা যাকে হারিয়ে থাকি তাকে মিস করি। সে আকুতিটা হলো কাউকে হারানোর ফল।

     মা বলেছেন, সেটা অন্যভাবেও হতে পারে। কাউকে মিস করা মানে, সে অন্য কোথাও আছে।

     ষাটের দশকের শেষের দিকে পশ্চিম পোল্যান্ডের গ্রামাঞ্চলের কোথাও মা এবং আমার মধ্যে এ রকম ছোটখাটো বিষয়ের আদান-প্রদান হয়েছে। তখন আমি তাঁর নেহায়েত ছোট একটা মেয়ে মাত্র। কিন্তু সে অভিজ্ঞতা সারা জীবন আমার সঙ্গে রয়ে গেছে, আমাকে টিকে থাকার শক্তির যোগান দিয়েছে। সে শক্তির কোনো ফুরান নেই। কেননা সে শক্তি আমার অস্তিত্বকে ওপরে তুলে ধরেছে; জগতের সাধারণ বস্তুগত বিষয়াদির বাইরে, কাকতালের বাইরে, কার্যকারণের বাইরে এবং সম্ভাব্যতার সূত্রের সীমা ছাড়িয়ে যেতে সহায়তা করেছে। মা আমার অস্তিত্বকে সময়ের বাইরে মহাকালের মধুর সন্নিকটে স্থাপন করেছেন। আমার শিশুমনে আমি তখন বুঝতে পারতাম, আগে যা যা কল্পনা করতে পারতাম তার চেয়েও বেশি কিছু আমার জন্য আছে। এমনকি যদি আমাকে বলতে হতো, ‘আমি হারিয়ে গেছি,’ তবু আমি আবার জগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অদ্ভূত সেই কথামালা বলতে শুরু করতাম, ‘আমি আছি।’

     আমার মা কখনও ধার্মিক ছিলেন না। তবে তাঁর ওই অল্প বয়সেই তিনি আমাকে একটা জিনিস দিয়েছিলেন, এক সময় যেটা আত্মা বলে পরিচিত ছিল। এভাবেই তিনি আমাকে জগতের সবচেয়ে কোমল একজন আখ্যানকারী হিসেবে তৈরি করেছিলেন।

     আমাদের জগৎ একটা বস্ত্র খণ্ড; তথ্য, আলোচনা, চলচ্চিত্র, বইপত্র, গুজব, ছোটখাটো ঘটনা ইত্যাদিসহ আমরা প্রতিনিয়ত বুনন করে যাচ্ছি এই বস্ত্র। আজকের দিনে এইসব বয়নের আওতা বিশাল। ইন্টারনেটকে ধন্যবাদ, এই বয়ন প্রক্রিয়ায় প্রায় সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে, দায়িত্ব নিয়ে কিংবা না নিয়ে, ভালোমন্দ যে কোনো অবস্থায়, পছন্দ করে কিংবা ঘৃণা করে হলেও পারে। এই গল্প যখন বদলে যায় জগৎও বদলে যায়। এ অর্থে জগৎটা কথার সমন্বয়েই তৈরি।

     সম্ভবত আরো গুরুত্বের কথা হলো, জগৎ সম্পর্কে আমরা কেমন করে চিন্তা করি, কেমন করে জগতের আখ্যান তৈরি করি—এগুলো তাহলে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। কোনো ঘটনা ঘটল, অথচ সেটার কথা কাউকে বলা হলো না, তাহলে সেটার অস্তিত্ব আর থাকে না, সেটা বিলীন হয়ে যায়। এ সত্য শুধু ইতিহাস রচয়িতাদের কাছে সুপরিচিত নয়, সম্ভবত মোটের ওপর সব ধরনের রাজনীতিবিদ এবং স্বৈরাচারীর কাছে তেমনই। গল্প বুননের কাজ যিনি করেন দায়িত্ব তারই।

     মনে হয়, শুধু ভবিষ্যতের জন্য নয়, সুনির্দিষ্ট বর্তমানের জন্য, অতিদ্রুত পরিবর্তনশীল বর্তমান বিশ্বের জন্যও আমাদের হাতে কোনো তৈরি আখ্যান নেই; সমস্যা এখানেই। আমাদের ঘাটতি আছে; আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির দুর্বলতা আছে; আমাদের ঘাটতি আছে রূপকের, পুরাণের এবং নতুন নতুন উপকথার। তবু আমরা দেখি, মরচেধরা কালপ্রমাদী আখ্যানসমূহ কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে; তবে ভবিষতের কাল্পনিক বিষয়ের সঙ্গে ভবিষ্যতকে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা এভাবে সম্ভব হচ্ছে না। সন্দেহ নেই, এখানে একটা অনুমানের ওপর নির্ভর করা হচ্ছে: নতুন ‘কিছুই না’র চেয়ে পুরাতন ‘কিছু একটা’ শ্রেয়। কিংবা অন্য কথায় বলা যায়, এভাবে আমাদের সীমাবদ্ধ দিগন্তকেই কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সংক্ষেপে বলা যায়, আমাদের জগতের গল্প বলার পর্যাপ্ত নতুন উপায় আমাদের হাতে নেই।

     বহুস্বরিক প্রথম-পুরুষ আখ্যানের বাস্তবতায় বাস করছি আমরা। সব দিক থেকে আসা বহুস্বরিক আওয়াজের সঙ্গে আমাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রথম-পুরুষ বলতে আমি বোঝাচ্ছি এমন কাহিনি যেটা কথকের ব্যক্তিত্বের খুব নিকট দিয়ে পরিক্রমণ করে; কথক কমবেশি নিজের সম্পর্কে নিজের ভেতর দিয়েই লিখে যান। আমি স্থির সিদ্ধান্তে এসেছি, বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিরত তাকলেও এ ধরনের ব্যক্তিতে-রূপান্তরিত দৃষ্টিভঙ্গিই, মানে ব্যক্তির নিজ সত্তার ভেতর থেকে আসা কণ্ঠই সবচেয়ে স্বাভাবিক, মানবীয় এবং সৎ। এভাবে পাওয়া প্রথম-পুরুষের আখ্যান হলো পুরোপুরি একটা অনন্য প্যাটার্ন বুনে যাওয়ার কাজ, অন্য কোনো প্যাটার্নের সঙ্গে এর মিল নেই। এর মধ্যে থাকে ব্যক্তি হিসেবে স্বায়ত্বশাসনের একটা বোধ—মানে নিজের সম্পর্কে এবং নিজের নিয়তি সম্পর্কে অবগতি। তবু এই বোধ বলতে বোঝায় নিজের এবং জগতের মধ্যে বৈপরীত্ব তৈরি। আর এই বৈপরীত্ব মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্নতাও তৈরি করতে পারে।    

আমি মনে করি, প্রথম-পুরুষের আখ্যান সাম্প্রতিক দৃষ্টির একটা বৈশিষ্ট্য; সেখানে বিশ্বের ব্যক্তিক কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে থাকে ব্যক্তি। পশ্চিমা সভ্যতা অনেকখানি প্রতিষ্ঠিত এবং নির্ভর করে থাকে ব্যক্তির এই আবিষ্কারের ওপর এবং সেটাই বাস্তবতার অন্যতম আদর্শ গঠন করে থাকে। এখানে মানুষই প্রধান ভূমিকা পালন করে এবং তার বিচারবুদ্ধি সব সময় সিরিয়াস হিসেবে গণ্য করা হয় যদিও এখানকার বিচারবুদ্ধি তার অন্যান্য বিচার ক্ষমতারই অন্যতম। প্রথম-পুরুষে সাজানো কাহিনি মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার বলেই মনে হয়। এ রকম কাহিনি পড়া হয়ে থাকে পরিপূর্ণ আত্মবিশ্বাস অর্পণ করে এবং সমীহের সঙ্গে। এ রকম কাহিনিতে আমরা জগৎ দেখে থাকি অন্যদের থেকে আলাদা কোনো সত্তার চোখ দিয়ে। এ রকম কাহিনি কথকের সঙ্গে আমাদের একটা বিশেষ বন্ধন তৈরি করে দেয়। কথক তার শ্রোতাকে আহ্বান জানান তাকে বিশেষ স্থানে স্থাপন করতে। 

     সাহিত্যের জন্য এবং মানব সভ্যতার জন্য প্রথম-পুরুষের বয়ানের অবদানকে বাড়িয়ে বলার কিছু নেই। এ রকম বয়ানের কাহিনিগুলো জগতের গল্পকে পুনরায় পুরোপুরি সাজিয়ে দিয়েছে। ফলে কাহিনি এখন আর শুধু বীর এবং দেবদেবীদের কাজকর্ম দেখানোর জায়গা নয় যাদের ওপরে আমাদের কোনো প্রভাব ফেলার ক্ষমতা থাকে না। বরং কাহিনি এখন আমাদের মতো মানুষদের জায়গা; এখানে থাকে ব্যক্তির ইতিহাস। যারা আমাদের মতো মানুষ তাদের সঙ্গে আমাদের মিল খুঁজে পাওয়া সহজ। ফলে একাত্মতা বোধের ভিত্তিতে কাহিনির কথক এবং পাঠক কিংবা শ্রোতার মধ্যে আবেগগত বোঝাপড়ার একটা নতুন বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়। আর স্বভাবগতভাবেই এ বোঝাপড়াটা উভয়কেই একাত্ম করে দেয় এবং তাদের মাঝের সীমারেখা মুছে দেয়; কথকের সত্তা এবং পাঠকের সত্তার মাঝে সীমারেখা আছে এমন উপন্যাসে পথ হারিয়ে ফেলা সহজ; আর তথকথিত ‘আত্মীভূত করার ক্ষমতাসম্পন্ন’ উপন্যাস ওই সীমারেখা মুছে ফেলার ওপরই নির্ভর করে, পাঠকের ওপরও নির্ভর করে যেন পাঠকও একাত্মতা বোধের গুণে কিছু সময়ের জন্য কথক হয়ে যান। এভাবেই সাহিত্য হয়ে উঠেছে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ক্ষেত্র, হয়েছে একটা মুক্তস্থান যেখানে প্রত্যেকে নিজের নিয়তি সম্পর্কে কথা বলতে পারে, কিংবা নিজের আত্মস্বরূপের ভেতরের কথা প্রকাশ করতে পারে। সুতরাং সাহিত্য হয়ে উঠেছে গণতন্ত্রের জায়গা। এখানে যে কেউই কথা বলতে পারে। প্রত্যেকেই নিজের জন্য কথা বলার কণ্ঠ সৃষ্টি করতে পারে। মানব ইতিহাসে আর কখনও এত বড় সংখ্যক মানুষ লেখক এবং গল্পবলিয়ে ছিলেন না।

     যখনই আমি বইমেলায় যাই দেখার দেখার চেষ্টা করি, আজকের পৃথিবীতে কতগুলো বই এ রকম লেখক সত্তা তৈরি করার জন্য প্রকাশ করা হচ্ছে। যে প্রবৃত্তিগুলো আমাদের জীবনকে সুরক্ষা দিয়ে থাকে সেগুলোর মতোই শক্ত হতে পারে নিজেকে প্রকাশ করার প্রবৃত্তিও। আর এই প্রবৃত্তি পুরোপুরি তুলে ধরা যায় শিল্পে। আমরা অন্যদের চোখে পড়তে চাই। আমরা ব্যতিক্রমী হতে চাই। ‘আমি আপনাদের আমার গল্প বলতে যাচ্ছি’, কিংবা ‘আপনাদের আমার পরিবারের গল্প বলতে যাচ্ছি’, কিংবা ‘আমি আগে যেখানে ছিলাম সে জায়গা সম্পর্কে গল্প বলতে যাচ্ছি আপনাদের,’ এ রকম আখ্যান নিয়েই তৈরি হয়ে থাকে আজকের দিনের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্য-শাখা। সাহিত্যের পরিসরও এখন অনেক বড়। কারণ আজকের দিনে আমরা বিশ্বজনীনভাবেই লেখালেখির জগতে প্রবেশ করতে পারি এবং অনেকেই কথা ও কাহিনিতে নিজেদেরকে প্রকাশ করার ক্ষমতা অর্জন করে থাকেন। অতীতে এই ক্ষমতা সীমাবদ্ধ ছিল অল্প সংখ্যক মানুষের জন্য। বিপরীতক্রমে এই পরিস্থিতিটা একক সংগীত পরিবেশনকারীদের সমন্বয়ে তৈরি ঐকতানবদ্ধ ধর্ম সংগীতের নেতৃত্বদানকারী গায়কদের মতো: দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে সবার কণ্ঠই অন্যদের কণ্ঠকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, একই পথে চললেও একে অন্যকে ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করে। তাদের সম্পর্কে যা যা জানার আমরা সে সব জানতে পারি, তাদের সঙ্গে আমরা একত্মতা প্রকাশ করতে পারি এবং তাদের জীবনকে আমাদের অভিজ্ঞতায় ধারণ করতে পারি যেন তাদের জীবন আমাদেরই জীবন। তবু লক্ষণীয়ভাবে প্রায়ই পাঠকসুলভ অভিজ্ঞতা অপূর্ণ এবং হতাশাজনক, কেননা এ অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, লেখক সত্তা সার্বজনীনতার নিশ্চয়তা দেয় না। আমরা যেটা মিস করি সেটা হলো কাহিনির মাত্রা, মানে রূপক। কারণ রূপকের নায়ক একদিকে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক এবং ভৌগলিক অবস্থার মধ্যেকার ব্যক্তি, আবার একই সময়ে সে ওইসব বাস্তব অবস্থার বাইরেও চলে যায়, কিছুটা প্রত্যেক জায়গার প্রত্যেক মানুষ হয়ে ওঠে। কোনো উপন্যাসে লিখিত কারো গল্প অনুসরণ করার সময় বর্ণিত চরিত্রের সঙ্গে পাঠক নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারেন, তার পরিস্থিতিকে নিজের পরিস্থিতি বলে গণ্য করতে পারেন; অন্যদিকে কোনো রূপককাহিনিতে তাকে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় ত্যাগ করে সবখানকার সব মানুষে পরিণত হতে হয়। এ রকম জোরালো মনস্তাত্ত্বিক ঘটনাপ্রবাহে রূপককাহিনি ভিন্ন ভিন্ন নিয়তির জন্য একটা সাধারণ বিভাজক খোঁজার প্রক্রিয়ায় আমাদের অভিজ্ঞতাকে সার্বজনীন করে ফেলে। আমাদের বর্তমান সময়ের অসহায়ত্বের একটা প্রমাণ হলো, আমাদের দৃষ্টির সীমা থেকে আমরা রূপক অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছি। শিরোনাম এবং শেষ নামের আধিক্যের মধ্যে ডুবে না যাওয়ার লক্ষ্যেই আমরা সাহিত্যের প্রকাণ্ড অবয়বকে বিভিন্ন শাখায় ভাগ করেছিলাম; এই শাখাগুলোকে আমরা ক্রীড়ার ভিন্ন ভিন্ন ভাগের মতো মনে করি। আর লেখকদেরকে একেকটা শাখার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত খেলোয়াড় মনে করি।

     সাহিত্য-বাজারের সাধারণ বাণিজ্যিকীকরণ বিভিন্ন শাখার মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছে। আজকাল অমুক তমুক ধরনের সাহিত্যের মেলা এবং উৎসব হয়ে থাকে। একটা থেকে আরেকটা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। তাতে এক রকম পাঠক-খরিদ্দার তৈরি করা হয়; তারা অপরাধমূলক কাহিনি, অতিকল্পিত কাহিনি কিংবা কল্পবিজ্ঞানের মধ্যে আশ্রয় খোঁজেন। এ রকম পরিস্থিতির লক্ষণীয় একটা বৈশিষ্ট্য হলো, যা বই বিক্রেতা এবং লাইব্রেরিয়ানদের প্রকাশিত বইয়ের বিশাল পরিমাণ নিয়ে তাদের তাক সাজাতে সাহায্য করার কথা ছিল এবং এই বিশাল বই উপহারের সঙ্গে নিজেদের পরিচয় করানোর কথা ছিল পাঠকদের, সেটা হয়ে গেল বিমূর্ত শ্রেণি। এই শ্রেণিগুলোতেই ফেলা হলো আগে থেকে প্রকাশ করা সাহিত্যকর্ম এবং এইসব শ্রেণি অনুসারেই লেখকরাও লেখা শুরু করলেন। ক্রমবর্ধমান হারে দেখা যাচ্ছে, শাখাভিত্তিক কাজ হলো কেকের ছাঁচের মতো যেটা একই রকম ফলাফল তৈরি করে। এগুলোর অগ্রকথনযোগ্যতাকে মনে করা হয় গুণ, আর মামুলিত্বকে মনে করা হয় অর্জন। সেখান থেকে কী আশা করা যেতে পারে তা পাঠক জানেন এবং আগে যা চেয়েছেন সেটাই পেয়ে থাকেন। চলবে

//জেডএস//

লাইভ

টপ