ওলগা তোকারচুকের নোবেল ভাষণ (পর্ব : দুই)

Send
অনুবাদ: দুলাল আল মনসুর
প্রকাশিত : ০৭:০০, জানুয়ারি ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:০০, জানুয়ারি ১৪, ২০২০

সাহিত্যে ২০১৮ সালের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক ওলগা তোকারচুক গত ৭ ডিসেম্বর শনিবার সুইডিশ একাডেমিতে পোলিশ ভাষায় তার নোবেল ভাষণ প্রদান করেন।

প্রথম পর্বের পর থেকে

আমি সব সময় স্বজ্ঞানবলে এ রকম বিন্যাসের বিরোধিতা করে এসেছি। যেহেতু এ রকম বিন্যাস লেখকের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়, নিরীক্ষা প্রবণতা এবং নিয়ম ভাঙার দিকে অনিচ্ছা তৈরি করে। প্রচলিত নিয়মের বাইরে যাওয়ার প্রবণতাই তো সৃষ্টির সাধারণ গুণ। এ রকম বিন্যাস সৃষ্টি-প্রক্রিয়া থেকে যে কোনো রকম অস্বাভাবিকতাকেই নির্দিষ্ট শাখার বাইরে রাখে, অথচ এই অস্বাভাবিকতা না থাকলে শিল্পই তো বিলীন হয়ে যেত। ভালো বই সাধারণ শ্রেণির অর্ন্তভুক্ত হয়ে ওই শ্রেণির জন্য জোরালো সমর্থন আদায় করবেই—এমন কোনো কথা নেই। সামগ্রিকভাবে সাহিত্যের বাণিজ্যিকীকরণের ফলাফল হলো এ রকম বিভিন্ন শাখার বিভাজন।

     চিহ্নিত করা, লক্ষ্য হিসেবে স্থির করা এবং সমসাময়িককালের পুঁজিবাদের একই রকম অন্যান্য আবিষ্কারের অনুসন্ধানসহ সাহিত্যকে বিক্রির পণ্য হিসেবে গণ্য করার ফলও এটা।

     এখন আমরা বিশ্বের গল্প বলার পুরোপুরি নতুন পদ্ধতির আবির্ভাব দেখার বিরাট তৃপ্তি পেতে পারি। আর এ গল্প সরবরাহ করে অন-স্ক্রিন সিরিজ। এর গোপন কাজটা হলো আমাদের মধ্যে একটা অস্বাভাবিক স্বপ্নপ্রয়াণ তৈরি করা। অবশ্য গল্প বলার এই ধরনটা পুরাণকথা এবং হোমারের কাহিনির মধ্যে অনেক আগে থেকেই আছে। হেরাকলস, একিলিস  কিং ওডিসিউসরা সিরিজের প্রথম নায়ক—তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই ধরনটা আগে কখনও এতটা পরিসর দখল করতে পারেনি এবং সমষ্টিগত চিন্তার ওপর এতটা প্রভাব ফেলতেও পারেনি। একুশ শতকের প্রথম দু’দশক এই সিরিজের প্রশ্নাতীত সম্পত্তি। জগতের গল্প বলার ধরন এবং আমাদের ওই গল্প বোঝার ওপর এদের প্রভাবকে একটা বিপ্লব বলা যেতে পারে।

     আজকের ভাষ্যে এই সিরিজ নিজের ভিন্ন ভিন্ন লয় সৃষ্টি করে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে এবং রূপ-চেহারা তৈরি করে শুধু পার্থিব পরিসরের আখ্যানে আমাদের অংশগ্রহণই বিস্তৃত করেনি, বরং নিজেদের নতুন বিন্যাসও চালু করে দিয়েছে। যেহেতু অনেক ক্ষেত্রেই এর কাজ হলো যতক্ষণ সম্ভব দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখা সেহেতু সিরিজ আখ্যান যোগসূত্র বাড়ায় এবং সেগুলোকে এতটাই অসম্ভবভাবে একটার সঙ্গে আরেকটাকে জড়িয়ে দেয় যে, বিমূঢ় অবস্থায় পড়ে গেলে শেষে সেটা পুরনো পদ্ধতির কাছেই ফিরে যায়, যেটা এক সময় তৈরি হয়েছিল ডিউস এক্স মাশিনার ক্লাসিক অপেরার মাধ্যমে। নতুন উপাখ্যানের সৃষ্টির সঙ্গে মাঝে মাঝে যোগ হয়ে থাকে চরিত্রদের মনোস্তত্ত্বের সমগ্র এবং আপাত খুঁটিয়ে দেখার মতো পরীক্ষা যাতে তারা কাহিনির ঘটনাবলীর সঙ্গে আরো ভালোভাবে মানাসনই হতে পারে। শুরুতে কোনো চরিত্র শান্ত এবং চাপা স্বভাবের হতে পারে; তবে কাহিনির গতির সঙ্গে প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং হিংস্র হয়ে উঠতে পারে। কোনো পার্শ্ব চরিত্র প্রধান হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে যে প্রধান চরিত্রের সঙ্গে শুরুতে আমাদের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে সে তাৎপর্য হারাতে পারে কিংবা একেবারে হারিয়ে যেতে পারে, তাতে আমরা যতই বিষণ্ন বোধ করি না কেন। 

     আরেক মৌসুমের বাস্তবায়নের সম্ভাবনা মীমাংসাহীন সমাপ্তির প্রয়োজনীয়তা তৈরি হতে পারে যেখানে আবেগমুক্তির মতো রহস্যজনক কিছু ঘটার কিংবা আদৌ কোনো অনুরণন তোলার কোনো উপায়ই থাকে না। আগে অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের অভিজ্ঞতাকে আবেগমুক্তি বলা হতো, মানে কাহিনির ঘটনায় অংশগ্রহণের সিদ্ধি এবং পরিতৃপ্তি। উপসংহার নয়, এ রকম জটিলতাই দর্শককে নির্ভরশীল করে দেয়, তাকে সম্মোহিত করে দেয়। এ রকম জটিলতাকে বলা যেতে পারে আবেগমুক্তির মতো পুরস্কারের অবিরত স্থগিতাবস্থা। অনেক আগে সৃষ্ট শেহেরজাদের গল্প থেকে সুপরিচিত ফেবিউলা ইন্টারাপ্টা বা আখ্যানের ছেদ এখন সিরিজের মাধমে সদম্ভে ফিরে এসেছে, আমাদের বদলে দিচ্ছে এবং অদ্ভূত মনোস্তাত্বিক প্রভাব ফেলছে, আমাদের নিজেদের জীবন থেকেই আমাদেরকে ছিন্ন করে দিচ্ছে, উদ্দীপকের মতো আমাদেরকে সম্মোহিত করে ফেলছে। একই সময়ে নিজের ছাপ ফেলে যাচ্ছে জগতের নতুন তৈরি এবং অবিন্যস্ত ছন্দের ওপরে, এর গোলমেলে যোগাযোগের ওপরে, এর অস্থিতিশীলতার ওপরে এবং এর প্রবহনশীলতার ওপরে। গল্প বলার আঙ্গিকই আজকের দিনের নতুন বিবৃতির সবচেয়ে সৃষ্টিশীল অনুসন্ধান।

     সে অর্থে ভবিষ্যতের আখ্যানের ওপরে এবং গল্প পুনরায় সাজানোর ওপরে সিরিজের মধ্যে সিরিয়াস কাজ হচ্ছে যাতে সিরিজ আমাদের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে।

     তবে মোটের ওপর আমরা খুব বেশি বৈপরীত্বের জগতে বাস করি। এখানে বিপরীত বাস্তবতাগুলো একটা আরেকটাকে সীমানার বাইরে ফেলে দেয়, একে অন্যের বিপরীতে প্রবলভাবে লড়াই করে।

     আমাদের পূর্ব-পুরুষরা বিশ্বাস করতেন, জ্ঞানার্জন মানুষের শুধু সুখ-সমৃদ্ধি-স্বাস্থ্য-সম্পদই আনবে না, বরং ন্যায় ও সমতার সমাজও তৈরি করবে। তাদের মনে হতো, জগতে অভাব আছে শুধু সর্বব্যাপী প্রজ্ঞার যেটা স্বাভাবিকভাবে তথ্য থেকেই উঠে আসবে। সতেরো শতকের বিখ্যাত পণ্ডিতপ্রবর জন আমোস কামেনিয়াস ‘প্যানসোফিজম’ শব্দটি চালু করেছিলেন। এ শব্দটি দিয়ে তিনি সম্ভাব্য বোঝাতেন সর্বজ্ঞতা বা সার্বজনীন জ্ঞানকে, সেটা নিজের মধ্যে ধারণ করবে সম্ভাব্য সব রকমের বোধকে। মোটের ওপর সেটা ছিল প্রত্যেক মানুষের মধ্যে পাওয়া যায় এমন তথ্যের স্বপ্ন। জগত সম্পর্কিত তথ্য-প্রাপ্তি কি একজন নিরক্ষর কৃষককে তার নিজের সম্পর্কে এবং জগত সম্পর্কে সচেতন চিন্তাশীল ব্যক্তিতে পরিণত করবে না? জ্ঞানকে সহজে নাগালের মধ্যে পাওয়া মানে কি এই নয় যে, মানুষ সুবুদ্ধিসম্পন্ন হবে এবং তারা নিজেদের জীবনের অগ্রগতিকে প্রশান্তি এবং প্রজ্ঞার সঙ্গে পরিচালনা করবে?

     ইন্টারনেটের আগমনের সময় মনে হয়েছিল, এই ধারণাটা শেষ পর্যন্ত একটা সামগ্রিক উপায়ে উপলব্দি করা যাবে। আমি উইকপিডিয়ার প্রশংসা করি, উইকপিডিয়াকে সমর্থন দিই; কামেনিয়াস এবং তাঁর সমমনা দার্শনিকদের কাছে উইকপিডিয়াকে মনে হয়েছে মানবতার স্বপ্নের পরিপূর্ণতা। এখন আমরা বাস্তব তথ্যের বিশাল ভাণ্ডার তৈরি করতে পারি এবং গ্রহণ করতে পারি; বর্তমান তথ্যের সঙ্গে অবিরাম যোগ হচ্ছে নতুন তথ্য, নতুনতর অবস্থায় যাচ্ছে সমগ্র তথ্য। সে তথ্য পৃথিবীর সব জায়গা থেকে গণতান্ত্রিকভাবেই সহজলভ্য।

     কোনো স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেলে হতাশা আসতে পারে। ইতোমধ্যে দেখা গেছে, আমরা তথ্যের এই বিশালত্বকে বহন করতে পারছি না। এই বিশাল তথ্য ভাণ্ডার আমাদেরকে একত্রিত করা, সবাইকে এক পরিচয়ে পরিচিত করা কিংবা মুক্তি দেওয়ার বদলে আলাদা করে ফেলেছে, আমাদের মাঝে বিভাজন তৈরি করেছে, আমাদেরকে ছোট বুদ্বুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। এভাবেই অসংখ্য কাহিনি তৈরি করেছে যেগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা সংগতিহীন, এমনকি খোলাখুলিভাবেই একে অন্যের প্রতি বৈরী, পারস্পারিকভাবে সংঘাতমুখর।

     তারপর পুরোপুরি এবং চিন্তাহীনভাবেই ইন্টারনেট বাজার-পদ্ধতির অধীন এবং একচেটিয়া কারবারীদের প্রতি নিবেদিত। ইন্টারনেট বিপুল পরিমাণের তথ্য উপাত্ত নিয়ন্ত্রণ করে; কিন্তু সে তথ্য উপাত্ত প্যানসোফিক্লি ব্যবহৃত হয় না, কিংবা তথ্য জগতে প্রবেশের স্বার্থেও ব্যবহৃত হয় না। বরং মোটের ওপর ব্যবহারকারীর আচরণকে সাজানোর কাজে ভূমিকা রাখে ইন্টারনেট। ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা ঘটনার পরে আমরা তেমনটাই জেনেছি। জগতের ঐক্যের সুর শোনার বদলে আমরা গোলমেলে বেসুর শুনেছি। আর হতাশার সঙ্গে এই অসহ্য অবস্থায় আমরা কতিপয় মৃদু সুর তুলে নেওয়ার চেষ্টা করি; হতে পারে, সে সুর দুর্বলতম স্পন্দন। এখনকার গোলমেলে নতুন বাস্তবতার কারণে শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত কথাগুলো এখনকার চেয়ে মনে হয় আর কখনও এতটা প্রাসঙ্গিক হয়নি: ইন্টারনেট দিনকে দিন আরো বেশি উচ্চনাদী শব্দ আর প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতাসম্পন্ন আহাম্মকের বয়ানে বর্ণিত গল্পে পরিণত হচ্ছে।

     রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের গবেষণা দুর্ভাগ্যজনকভাবে জন আমোস কামেনিয়াসের স্বজ্ঞার বিপরীত কথাই বলছে। জগৎ সম্পর্কিত তথ্য যত বেশি সার্বজনীনভাবে পাওয়া গেছে রাজনীতিবিদরাও তত বেশি যুক্তির আশ্রয় নিয়েছেন এবং সুবিবেচনাপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন—এ রকম দৃঢ় বিশ্বাসের ওপরই প্রতিষ্ঠিত ছিল তাঁর স্বজ্ঞা। কিন্তু বিষয়টা মোটেও এতটা সোজা নয়। তথ্য বিহ্বলকর হতেও পারে। তথ্যেও জটিলতা এবং দ্ব্যর্থকতা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বৃদ্ধি ঘটাতে পারে; প্রত্যাখ্যান থেকে দমননীতি, এমনকি আদর্শিক দলমুখি চিন্তাকে সরলীকরণের সহজ নীতিতে আশ্রয় খোঁজার জন্যও প্রতিরক্ষা বাড়ানোর দরকার হতে পারে।

     নকল খবরের বিভাজন কথাসাহিত্যের পরিচয় সম্পর্কিত নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে। বারবার প্রতারিত, বিপথে চালিত কিংবা ভুল তথ্য পাওয়া পাঠকরা ধীরে ধীরে সুনির্দিষ্ট খ্যাপাটে স্বভাব-বৈশিষ্ট্য অর্জন করা শুরু করেছেন। কথাসাহিত্যের এ রকম নিঃশেষিত অবস্থার প্রতিক্রিয়ায় বিশাল সাফল্য লাভ হতে পারে ননফিকশনের। তথ্যের এমন মহা গোলমেলে অবস্থায় ননফিকশন আমাদের মাথার ওপর দিয়ে চিৎকার করে যায়, ‘আমি তোমাদের সত্য সম্পর্কে বলব, অন্য কিছু নয়, শুধু সত্য। আমার গল্পের ভিত্তি বাস্তব ঘটনা।’

     কথাসাহিত্য পাঠকের আস্থা হারিয়ে ফেলেছে, কেননা এখন পর্যন্ত প্রাচীন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হলেও গণধ্বংসের এক বিপজ্জনক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে মিথ্যে। প্রায় আমাকে এই অপ্রত্যয়ী প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়: ‘আপনি যা লিখেছেন তা কি সত্যি?’ প্রতিবারই আমার মনে হয়, এই প্রশ্ন আসলে সাহিত্যের পরিণতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

     পাঠকের দৃষ্টি থেকে এই প্রশ্ন নিষ্পাপ নাদান মনে হলেও লেখকের কানের কাছে এটা প্রলয়ের বার্তার মতো বাজে। এ রকম পরিস্থিতিতে আমাকে কী বলতে হবে? আমি কী করে হ্যান্স, কাসটর্প, আনা কারেনিনা কিংবা উইনি দ্য পুহ-এর অস্তিত্বের স্বরূপ সম্পর্কিত অবস্থার ব্যাখ্যা দেবো?

     আমি মনে করি, এ রকম পাঠক-কৌতুহল হলো সভ্যতার পশ্চাদগতি। জীবন নামক ঘটনামালায় অংশগ্রহণে আমাদের বহুমাত্রিক সক্ষমতার (বাস্তব, ঐতিহাসিক তবে প্রতীকি, পৌরাণিক) একটা বড় বৈকল্য এটা। জীবন তৈরি হয়ে থাকে ঘটনার দ্বারা। তবে শুধু যখন আমরা ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে সক্ষম হই, ঘটনাগুলো বোঝার চেষ্টা করি এবং সেগুলোতে অর্থ আরোপ করি তখনই কেবল সেগুলো অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। ঘটনাগুলো বাস্তব; তবে অভিজ্ঞতা হলো অব্যাখ্যাতভাবে ভিন্ন। ঘটনা নয়, শুধু অভিজ্ঞতাই কেবল আমাদের জীবনের উপাদান তৈরি করে থাকে। অভিজ্ঞতা হলো বাস্তবতা, যেটাকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং যেটা আমাদের স্মৃতিতে জায়গা পেয়ে গেছে। অভিজ্ঞতা বলতে বোঝায় কোনো ভিত্তি যা আমাদের মনের ভেতর আমরা লালন করি, অর্থের একটা কাঠামোকেও বোঝায়। সে কাঠামোর ওপরে আমাদের জীবনকে ছড়িয়ে দিয়ে পরিপূর্ণভাবে এবং সতর্কার সঙ্গে পরীক্ষা করি। প্রত্যেকেই জানে, পুরাণকথা কখনও বাস্তবে ঘটেনি তবু সব সময় প্রচলিত আছে। শুধু প্রাচীন কালের নায়কদের অভিযানের মধ্য দিয়ে পুরাণের কাহিনি চলে আসছে তা নয়, বরং পথ করে নিয়েছে সমকালের চলচ্চিত্র, ক্রীড়া এবং সাহিত্যের সর্বব্যাপী ও সর্বাধিক জনপ্রিয় কাহিনিতেও। অলিম্পাস পর্বতের অধিবাসীদের জীবন ‘ডায়নাস্টি’তে রূপান্তরিত হয়েছে এবং নায়কদের নায়কোচিত কাজের প্রতি মনোযোগ দিয়েছে লারা ক্রফট।

     সত্য এবং মিথ্যের মাঝের এই উৎসাহী বিভাজনে আমাদের অভিজ্ঞতার গল্প সাহিত্য যেগুলোকে সৃষ্টি করে থাকে সেগুলোর নিজস্ব মাত্রা থাকে।

     আমি কখনও বিশেষভাবে কথাসাহিত্য এবং ননফিকশনের মাঝের এই বিভাজনে অতিমাত্রায় আবেগতাড়িত হইনি। তবে এ রকম বিভাজনকে স্পষ্ট ঘোষণা এবং বিচক্ষণ বলে বুঝলে অন্য কথা। কথাসাহিত্যের বহুবিধ সংজ্ঞার সমুদ্রে আমার বেশি পছন্দের সংজ্ঞাটা সবচেয়ে পুরনো এবং সেটা এসেছে এরিস্টটলের কাছ থেকে। ফিকশন সব সময় এক ধরনের সত্য।

    লেখক ও প্রবন্ধকার ই.এম. ফর্স্টার সত্যি গল্প এবং ঘটনার রূপরেখার মধ্যে যে পার্থক্য নিরূপণ করেছেন সেটাতে আমার বিশ্বাস আছে। তিনি বলেন, যখন আমরা বলি, ‘রাজা মারা গেলেন এবং তারপর রানি মারা গেলেন,’ তখন এটা গল্প। কিন্তু যখন আমরা বলি, ‘রাজা মারা গেলেন এবং শোকে দুঃখে রানিও মারা গেলেন,’ তখন এটা রূপরেখা। কথাসাহিত্য তৈরির ক্ষেত্রে সব সময়ই একটা রূপান্তর থাকে: ‘তারপর কী হলো?’ থেকে ‘ঘটনাটা এভাবে কেন ঘটল?’। অর্থাৎ প্রথম প্রশ্ন থেকে দ্বিতীয়টা পর্যন্ত। দ্বিতীয় প্রশ্নটার ভিত্তি মূলত আমাদের মানব অভিজ্ঞতার বোঝাপড়ার ওপর।

     সাহিত্য এই ‘কেন’ প্রশ্ন দিয়েই শুরু হয়—এমনকি এই প্রশ্নটার উত্তরে আমাদের যদি এ রকম একটা সাধারণ কথাই বলতে হতো, ‘আমি জানি না,’ তবুও।

     এভাবে সাহিত্য যে প্রশ্ন উত্থাপন করে যায় সে প্রশ্নের উত্তর উইকপিডিয়ার সাহায্যে দেওয়া যায় না। কারণ উত্তরটার ব্যাপ্তি তথ্য এবং ঘটনার বাইরে পর্যন্ত। উত্তরটা সরাসরি আমাদের অভিজ্ঞতার দিকেই ইঙ্গিত করে।

     কিন্তু এটাও সম্ভব যে, আখ্যান উপস্থাপনের অন্যান্য আঙ্গিকের তুলনায় উপন্যাস এবং সাধারণ অর্থে সাহিত্য আমাদের চোখের সামনেই প্রান্তিক পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। চিত্রকল্প এবং চলচ্চিত্র, অলোকচিত্র, যথার্থ বাস্তবতার মতো সরাসরি স্থানান্তর লাভ করতে পারে এমন অভিজ্ঞতার চাপ পুরনো দিনের পড়ার পদ্ধতির একটা টেকসই বিকল্প তৈরি করবে। পড়া যথেষ্ট মাত্রায় একটা মনোস্তাত্ত্বিক এবং বোধগম্য পদ্ধতি। সোজা কথায় বললে, প্রথমত প্রতীক এবং সংকেতে রূপান্তর করে সবচেয়ে বিস্মৃতিপ্রবণ উপাদান কল্পনায় আনা হয় এবং ভাষায় প্রকাশ করা হয়; তারপর ভাষা থেকে সংকেত উদঘাটন করে অভিজ্ঞতায় নিয়ে আসা হয়। এ প্রক্রিয়াটার জন্য দরকার হয় বিশেষ বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা। আর সর্বোপরি মনোযোগ এবং নিবিষ্ট দৃষ্টির দাবি রাখে এই কাজটা। আজকের দিনের মনোযোগ ছিন্নকারী জগতে এই ক্ষমতাগুলো ক্রমান্বয়ে বিরল হয়ে যাচ্ছে।

     ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে বাচনিক ব্যবস্থা থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে মানবতা। জীবন্ত শব্দ এবং মানব স্মৃতির ওপর নির্ভর করে গুটেনবার্গ-বিপ্লবের মাধ্যমে মানবতা এতদূর এসেছে। গুটেনবার্গ-বিপ্লবের পর গল্পের মাঝখানে ব্যাপকভাবে মধ্যস্থতার কাজ করে লেখার পদ্ধতি। গল্প এভাবেই প্রোথিত হয়, গ্রোথিত হয় এবং পরিবর্তন ছাড়াই মানুষ গল্পের বিভিন্ন রূপ দিতে পারে। এই পরিবর্তনের প্রধান অর্জন হিসেবে এভাবে আমরা ভাষার মাধ্যমে চিন্তাকে লিখে প্রকাশ করতে শুরু করি। এখন আবার আমরা ওই একই মাত্রার বিপ্লবের মুখোমুখি হচ্ছি। ছাপার অক্ষরের আশ্রয় ছাড়াই আমরা সরাসরি অভিজ্ঞতা স্থানান্তর করতে পারি।

     আপনি যখন খুব সহজেই ছবি তুলে সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একই সময়ে বিশ্বের অনেক মানুষের কাছে পাঠিয়ে দিতে পারেন তখন আর ভ্রমণ ডায়েরি সঙ্গে রাখার দরকার নেই মোটেও। চিঠি লেখারও দরকার নেই। ফোনে কল দেওয়া আরো সহজ। টেলিভিশন সিরিজের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারলে মোটা মোটা উপন্যাস লেখার দরকার কী? বন্ধুদের সঙ্গে শহরে যাওয়ার চেয়ে বাসায় বসে গেম খেলা আরো ভালো। কারো আত্মজীবনী হাতের কাছে পাওয়া দরকার? খোঁজাখুঁজি করে লাভ নেই; আমি ইনস্টাগ্রামে তারকা ব্যক্তিদের জীবন অনুসরণ করছি এবং তাদের সম্পর্কে সবকিছু জানতে পারছি।

     বিশ শতকে আমরা মনে করতাম, টেক্সটের বড় শত্রু দৃশমান চিত্র। টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রের প্রভাব সম্পর্কে দুশ্চিন্তা করতাম। আজকের দিনে তেমনটি ভাবার মতো নয়। আজ আমাদের ইন্দ্রিয়’র ওপর সরাসরি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করছে জগতের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মাত্রা। চলবে

আরও পড়ুন : ওলগা তোকারচুকের নোবেল ভাষণ (পর্ব : এক)

//জেডএস//

লাইভ

টপ