মুনতাসীর মামুনের সাক্ষাৎকার

Send
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : জাহিদ সোহাগ
প্রকাশিত : ১০:০০, মার্চ ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪৯, মার্চ ১৮, ২০২০

মুনতাসীর মামুন খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ, অধ্যাপক ও সাহিত্যিক। তার জন্ম ১৯৫১ সালের ২৪ মে ঢাকার ইসলামপুরে নানার বাড়িতে। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার গুলবাহার গ্রামে। শৈশব-কৈশোর কেটেছে চট্টগ্রামের চাঁটগায়। ১৯৬৮ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। ১৯৭২ সালে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। মুনতাসীর মামুনের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক। গল্প, কিশোর সাহিত্য, প্রবন্ধ, গবেষণা, চিত্র সমালোচনা, অনুবাদ সাহিত্যের প্রায় সবক্ষেত্রেই তার বিচরণ থাকলেও ইতিহাসই তার প্রধান কর্মক্ষেত্র। পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক-সহ বেশকিছু পুরস্কার ও সম্মাননা। সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেছেন বঙ্গবন্ধু, ইতিহাস এবং মুজিববর্ষের বেশকিছু দিক নিয়ে। 


স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো জাতীয় নেতার জন্মশতবর্ষ রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপিত হচ্ছে, এবং তাও আবার আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। ফলে বাঙালি হিসেবে আমাদের আবেগ-অনুভূতির ব্যাপার আছে। আপনার কাছে জানতে চাই, আপনার আবেগ-অনুভূতি কেমন?
এই প্রশ্নের মধ্যে আরেকটি অনুক্ত প্রশ্ন আছে, সেটি হলো, অন্য নেতাদের কেন জন্মশতবর্ষ পালন করা হয়নি। ওইরকম জাতীয় নেতার স্তরে আছেন মওলানা ভাসানী, এ. কে. ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দীকেও ধরা হয়, কিন্তু তাদের যখন জন্মশতবর্ষ হয়েছে আওয়ামী লীগ বোধহয় তখন ক্ষমতায় ছিলো না। তারা জাতীয় নেতা বটে, কিন্তু আমাকে দেখতে হবে, এই দেশের স্বাধীনতার নেতৃত্ব দিয়ে কে সফল হয়েছেন। সফল হয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি আমাদের জাতির পিতা, সুতরাং আমরা সে কারণেই তার জন্মশতবর্ষ পালন করছি। কেন্দ্রে একজনই, বাকিরা তার চারপাশে। এই জন্মশতবর্ষ বিশেষভাবে পালন করা হচ্ছে, কারণ আমরা আমাদের জাতির পিতাকে সমষ্টিগতভাবে সম্মান এবং ভালোবাসা জানাতে চাই। সেজন্যই মুজিববর্ষ পালন করা হবে, সেজন্যই মুজিববর্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

এতো কর্মসূচির মধ্যে বিশেষভাবে আপনার অনুভূতি কীভাবে প্রকাশ করবেন?
আমি এবং আমাদের সঙ্গে যারা ছিলেন, আমরা এতো দুঃসময় পেরিয়ে এসেছি, আমাদের মধ্যে এখন তত আবেগ নেই। নেই আমাদের বয়সের কারণেও। আমাদের জেনারেশন—শাহরিয়ার কবির সহ অনেকেই—১৯৬৮ সাল থেকেই তো কমবেশি সবাই রাস্তায় আছি। ১৯৬৮ সাল থেকেই কিন্তু আন্দোলন হচ্ছে। ’৬৬-এর রেশ তখনো আছে। এরপর ’৬৯, ’৭০, ’৭১, ’৭২ এবং ’৭৫—এই যে আমরা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আমাদের জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছি—অর্ধেক সময় কেটেছে সামরিক শাসনের মধ্যে আর চারভাগের একভাগ কাটলো আন্দোলন করে করে। স্থির একটা সময় আমরা কিন্তু পাইনি। গতকয়েক বছর যে একটা স্থির সময় যাচ্ছে, এরকম আমরা কখনো পাইনি। আমি যেহেতু ইতিহাসের ছাত্র এবং একজন লেখক, আমি অন্যভাবে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে চেয়েছি। একজন লেখকের কাছে তার আবেগের সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে তার লেখা। এবছরও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমার লেখা দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। একটি হলো বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা—আশ্চর্য ব্যাপার, ছয় দফার কথা আমরা অনেকে বলি, কিন্তু ছয় দফা নিয়ে বড় আকারে এর আগে কোনো বই প্রকাশিত হয়নি। আমারটা প্রথম বলা যেতে পারে। তবে এটাতে ইম্প্রুভমেন্টের একটা চান্স তো থাকেই। আমি বঙ্গবন্ধুর জীবন পুনর্লেখন করতে চেয়েছি, আমাদের এখানে বঙ্গবন্ধুর জীবনী একটাই লেখা হয়েছে এবং একই জিনিস বিভিন্ন মলাটে। শেখ হাসিনা আমাদের একটা উপকার করেছেন, বেশকিছু সিক্রেট ডকুমেন্ট আমাদের দেওয়ার পরে আমরা অথেনটিক কিছু জিনিসপত্র পাচ্ছি। আমি এসবের সাহায্যে এবং তার আত্মজীবনী ও অন্যান্য লেখার সাহায্যে তার জীবনী—১৯২০ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত—পুনর্গঠন করেছি দুই খণ্ডে।
এবং আরেকটি বই সম্পাদনা করেছি বন্ধবন্ধুর সামগ্রিক বিষয় নিয়ে। এই বছরই সম্পাদনা সহ মোট চারটি বই প্রকাশ করেছি। আর বঙ্গবন্ধুর ওপরে আমার এতোদিনের যত রচনা ছিলো সবগুলো মিলিয়ে সময় প্রকাশনী থেকে ‘বঙ্গবন্ধু সমগ্র’ প্রকাশিত হয়েছে। জন্মশতবর্ষে আমার শ্রদ্ধা আমি এভাবেই নিবেদন করতে চেয়েছি।

আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা—এই টার্মগুলো ব্যবহার করি বিভিন্ন কথা প্রসঙ্গে। তখন অনেকেই বুঝতে চায়—বিশেষত নতুন প্রজন্ম—বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আসলে কী? সেটার উত্তর দিতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্তম্ভ যেগুলো, সেগুলোকে আমরা ব্যাখ্যা করি, কিন্তু আমরা কি এখনো এমন কোনো টেক্সট দাঁড় করাতে পেরেছি যেটার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ঠিক কোনগুলো, সেগুলো জানা বা বোঝা যায়?
এই কথার উত্তর দিতে গেলে একটু অন্যভাবে আমাদের চিন্তা করতে হবে। আমাদের স্কুলে ইতিহাস পড়ানো হয় না। পাকিস্তান ইতিহাস পড়ানো বন্ধ করে দিয়েছিলো। ’৭১-এর পর ইতিহাস এমন একটা বিষয় যাকে অস্বীকার করা যায় না। এখন সর্বত্রই কোনো দেশের নাগরিক হতে গেলে ওই দেশের ইতিহাস জানতে হয়। আমি বঙ্গবন্ধুর চেতনার কথা বলবো, বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে বলবো, আবেগের কথা বলবো, কিন্তু ইতিহাস পড়াবো না, সেটা হয়? আমরা বড় বড় নির্দেশ দিচ্ছি, বড় বড় মন্ত্রীরা বড় বড় কথা বলছেন, টকশো আবেগে ভরপুর—আমার কথা হচ্ছে বেসিক কাজটা না করলে কিছুই হবে না। আর এই বেসিক কাজটা হচ্ছে, ইতিহাস পড়াতে হবে। আমি এই নিয়ে বিশ বছর ধরে আন্দোলন করেছি। বলেছি, পুরো ইতিহাস না পড়ান, অন্তত ইমারজেন্স অব বাংলাদেশটা পড়ান। সেটাও না-পড়িয়ে শুধু বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা বলতে থাকবেন, তাহলে আজকালকার বাচ্চারা পুরো ব্যাপারকে কীভাবে জানতে পারবে? আমি বোধহয় একমাত্র ব্যক্তি যে পার্লামেন্টের কমিটিতে গিয়েছি ইতিহাস পড়ানোর আবেদন নিয়ে। সেখানে প্রফেসর হারুন-অর-রশিদ ছিলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, উনিও আমার সঙ্গে সহমত পোষণ করেন। আমি বলেছিলাম প্রত্যেকটি জায়গায়, অন্তত নাইন-টেন, ইন্টারমিডিয়েটের প্রত্যেকটি শাখাতেই ইতিহাস পড়তে হবে, মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং হোক, একটা কোর্স থাকতেই হবে। এই আন্দোলনের একটা পর্যায়ে অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সবকয়টি কলেজে অন্তত একটি ইতিহাসের কোর্স পড়ানোর ব্যবস্থা করলেন। এটার নকশা আমি করে দিয়েছিলাম, বই লিখে দিয়েছি এবং এটা গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে পড়ানো হচ্ছে। প্রায় কয়েক লক্ষ ছেলে-মেয়ে এটা পড়ে আসছে। ১৯৪৯ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত যে সময়টা, যার পুরোটাই বঙ্গবন্ধুর সময়কাল। ফলে আগে যারা কিছুই জানত না, তারা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কিছুটা জানছে।
তারপরে আমি গ্রান্টস কমিশনের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান সাহেবকে বললাম, দ্যাখেন, বাংলাদেশে ১০৫টা বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে, সবখানেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্য থাকবে, কিন্তু ইতিহাসের কোনো বিভাগ থাকবে না, এটা আমি দেশদ্রোহিতা মনে করি। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, প্রথম কিন্তু বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, ফিজিক্স, কেমেস্ট্রি, অর্থাৎ মৌলিক বিষয়গুলো দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। অমর্ত্য সেন যখন নবনির্মিত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে দায়িত্ব হাতে নিলেন, তিনি অর্থনীতির লোক হয়েও প্রথম কিন্তু ইতিহাস বিভাগ খুলেছিলেন।
মান্নান সাহেব প্রধানমন্ত্রীর সামনেই বোধহয় একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন, এবং নির্দেশও জারি করেছিলেন সবখানে ইতিহাস পড়ানোর জন্য, কিন্তু কেউ মানেনি।

এই প্রসঙ্গে থেকেই জানতে চাই, কেউ মানলো না, বা পড়ানো হয় না—এসব নিয়ে কেন আপনাকেই দৌড়াতে হবে এই বয়সে এসে?
এখনকার গ্রান্টস কমিশনের চেয়ারম্যান বলছেন, গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগ খুলেছিলো—শিক্ষার্থী ভর্তির তিন বছর হয়ে গেছে—এখন বন্ধ করে দিতে হবে, কারণ তারা অনুমোদন নেয়নি। অনুমোদন নেয়নি সেটা তুমি ভিসিকে বলো, এই তিন বছরে শিক্ষার্থীদের কেন কষ্ট দিচ্ছ? উনি ইতিহাসের ছাত্র, তো এই হচ্ছে ইতিহাসের প্রতি মনভঙ্গি, আমি বলেছি, এটা কারো পৈতৃক সম্পত্তি নয়। গ্রান্টস কমিশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনো কথা বলে মানাতে পারে? কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে মানাতে পারে? একটা ইতিহাস বিভাগ খুলেছে সেটা বন্ধ করে দিতে হবে অনিয়ম হয়েছে বলে? ভিসিকে ধরুক তারা। অ্যাটিচিউডটা এমন হয়ে গেছে যে, কারো মধ্যে সামগ্রিকভাবে শিক্ষাকে দেখার কোনো বিষয় নেই। আমার কথা হচ্ছে, ইতিহাস এমন একটি ব্যাপার যেটা বিজ্ঞান বিভাগকে জানতে হবে, কমার্সকেও জানতে হবে, আর্টসকেও জানতে হবে।
এখন আমরা এগুলো যদি না করি, আর শুধু শুধু বলি, কেন বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানছ না? কীভাবে তাদের মধ্যে আবেগের সৃষ্টি হবে? একটি ছেলে বা মেয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস না করলে পরিবার সম্পর্কে তার আবেগ কীভাবে হবে? এই বিষয়গুলো আমাদের শিক্ষাবিদরা বুঝতে চান না।
আমি নুরুল ইসলাম নাহিদের কাছে বিষয়টা নিয়ে অনেকবার গিয়েছি। তিনি এই বিষয়ে আমাকে কোনো ইতিবাচক কথা বলেননি। আমি শুনেছি একজন সচিব ছিলেন, তিনি বলেছিলেন, অনলাইনেই তো ইতিহাস পড়লে হয়। একজন সচিব এই কথা বলছেন, মন্ত্রী নিশ্চুপ থাকছেন।

তাহলে আমাদের সরকারের চারপাশে কারা আছেন?
সরকারের চারপাশে বলতে আমি কিছু বুঝি না।

মানে প্রশাসন, রাজনীতিক...
সরকার যারা চালান—শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে বলছি, কারণ তিনি তো নীতি নির্ধারণ করে দেন, তিনি তো আর ইতিহাস পড়াতে মানা করেননি—তাদের ভিশন নেই, তারা রুটিনকাজ, বক্তৃতা করা, উদ্বোধন করা নিয়েই ব্যস্ত।
আমি এতো বছর ধরে মন্ত্রীদের দেখছি, সচিবদের দেখছি, নতুন ভিশন নিয়ে কেউ কোনোভাবে চিন্তা করছেন না। সৃজনশীল ব্যাপারটা তাদের মধ্যে নেই। শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সৃজনশীল লোক থাকতে হবে।
একজন উপাচার্য এটা বলতে পারেন যে, প্রত্যেক বিভাগে ইতিহাস পড়তে হবে। কিন্তু কথা হচ্ছে, কাদেরকে উপাচার্য নিয়োগ করা হচ্ছে? আগে রাজনীতিবিদরা পরামর্শের জন্য আমাদের কাছে আসতেন, এখন তারা (শিক্ষক) রাজনীতিবিদদের কাছেও না, তাদের চামচাদের কাছে গিয়ে বসে থাকে। আমি শিক্ষক হয়ে এই কথা বলছি।

শিক্ষকরা তাদের মেরুদণ্ড রক্ষা করতে পারছেন না?
আমি সেটা বলবো না, আমি বলবো, তারা তাদের সৃজনশীল দায়িত্ব পালন করছেন না।

এর সঙ্গে কি রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের প্রশ্ন আছে না?
আমি রাজনীতিবিদদের পক্ষে একটা কথা বলতে চাই। তাদের কেউ কি বলেছে ইতিহাস না খুলতে? যিনি মন্ত্রী আছেন তার দায়িত্ব, ইউজিসির দায়িত্ব, তারাও তা পালন করেনি। শুধু একতরফাভাবে আমাদের (শিক্ষক) ওপর চাপানো হবে কেন?

সবকিছুতেই কেন প্রধানমন্ত্রীকে নির্দেশ দিতে হবে? একজন প্রধানমন্ত্রীর তো সব জায়গায় হস্তক্ষেপ করা সম্ভব না। সবাই কেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাচ্ছে না?
করবেন কেন? ঘটনাটা হচ্ছে, কেউ দায় নিতে চাচ্ছেন না। সব একতরফা দোষ চাপিয়ে লাভ নেই। আমি বলছি আমাদের দায়টা কী? ডাকসু কী এই কথা বলেছে? ছাত্রসংগঠনগুলো কি এই কথা বলেছে? ইতিহাসবিদরা কি এই কথা বলেছে? তারা বেতন পাচ্ছে মাস শেষ হলে, তাদের এতো ঝামেলা করে কী দরকার? শেখ হাসিনা করলে করবে, না করলে না-করবে, আমার কী দায়—এরকম মনোভাব সবার। এটার জন্য রাজনীতিবিদরা দায়ি একটা কারণে, তারা তো এটাকে কন্ট্রোল করবেন, তারা তা করেননি। তারাও প্রধানমন্ত্রীর ওপর দায়িত্ব দিয়ে মন্ত্রীত্ব উপভোগ করতে চান।

সবাই যেন প্রধানমন্ত্রীর ওপর সবকিছু চাপিয়ে দিচ্ছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শেখ হাসিনা ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন? তিনিই যদি সবকিছু করেন তাহলে পুরো মন্ত্রীসভা বাতিল করতে হবে। কিন্তু তিনি তো সেটা করতে পারেন না। আমি মনে করি, নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা করা যায়। তিনি যদি নিজের টাকায় পদ্মা সেতু বানাতে পারেন, এগুলোও নিশ্চয়ই করবেন। আমার ধারণা এটা তার নজরে পড়ছে না। আমি একটা কথা সবখানেই বলছি, উন্নয়নের জিডিপির সঙ্গে সঙ্গে সাংস্কৃতিক জিডিপি সমান্তরালভাবে বৃদ্ধি না পেলে উন্নয়ন টেকসই হবে না।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কোন দিকে যাচ্ছে, সেটা বুঝতে পারছি না।
শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আমি আর কিছু বলতে চাই না। শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমরাই নষ্ট করেছি। কথা হচ্ছে যে, শিক্ষার ব্যাপারটা যাদেরকে নিয়ন্ত্রণের ভার দেওয়া হয়, শিক্ষা সম্পর্কে তাদের কোনো জ্ঞান নেই। আবার আমি এই কথাও বলছি না, যার জ্ঞান সেখানে আছে, তিনি সেখানে থাকলেই সবকিছু পরিবর্তন হবে। অনেকগুলো বিষয় বদলাতে হবে। এই বদলানোর বিষয়টা কেউ নিতে রাজি নন।
আমি বলে কী করতে পারি? আমি অনেক কথা বলেছি। আমি বলেছি যে, শিক্ষার মান নিম্নমুখী, মন্ত্রীরা চটে যান। একজন একদিন আমাকে বললেন, আপনারা জানেন না। আমি বললাম, কী জানি না? মন্ত্রী হলেই সবাই সব জানে? একটা দেশে এগারোটা শিক্ষাব্যবস্থা চলতে পারে নাকি? এখন যত কথাই আমরা বলি, একটা জিনিস বুঝেছি, আমলারা যদি না বলেন, তাহলে কোনোকিছুই গৃহীত হবে না। দেশে এখন আমলায়ন চলছে, নাগরিকায়ন হচ্ছে না।
এই দাবিগুলো নতুনরা তুলতে পারে না? ছাত্রসংগঠনগুলো করতে পারে না? ছাত্রসংগঠনের প্রথম কাজই তো হচ্ছে শিক্ষা নিয়ে কথা বলা।

ক্যাম্পাসে দখলদারিত্ব করা ছাড়া আর কোনো কিছু চোখে পড়ে না তাদের।
আমরাও তো ছাত্র ছিলাম। আমাদের সময় কি মার্শাল ল’ ছিলো না? ওয়ান ইলেভেনের সময় তোমাদের খেয়াল আছে কিনা জানি না, আমরা পাঁচ-ছয়জন শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, এম. এম. আকাশ, আরেফিন সিদ্দিক, আমি, হারুন-অর-রশিদ, আমরাই তো বটতলায় দাঁড়িয়ে কথা বলেছি। তখন মার খাওয়ার ভয় আমাদের ছিলো না? মৃত্যুর ভয় ছিলো না? আমাকে তো জেলেও নিয়েছে, কথা কি বলিনি?। কিন্তু কথা হচ্ছে, আমাদেরই কেন সবসময় কথা বলতে হবে?

বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার কথা উঠছে, সেটা নিয়ে পরিকল্পনার কথা জানতে চাই।
আমি এবং শাহরিয়ার কবির বারবার বলছি, বঙ্গবন্ধুর একটা অফিসিয়াল বায়োগ্রাফি থাকা দরকার। একটি একশ পাতার, আরেকটি তিনশ পাতার, কয়েকটা ভাষায়। বাইরে থেকে কেউ এলে তাদের দেওয়া হবে। আমি ইস্তাম্বুলে গিয়ে কামাল আতাতুর্কের অফিসিয়াল বায়োগ্রাফি দেখলাম।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে সরকার কী কী গুনগত পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে?
আমি এর উত্তর দিতে পারবো না, কারণ জাতীয় কমিটিতে আমি আছি। আরেকটা আছে বাস্তবায়ন কমিটি। যেটার সমন্বয়ক হচ্ছেন কামাল চৌধুরী। সেখানে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে সেটা আমি বলতে পারবো না। আমরা বলেছিলাম যে, ম্যুরাল করতে বলছেন, কেন? ম্যুরাল না করলে বঙ্গবন্ধু হারিয়ে যাবেন? আর ম্যুরাল করলেই বঙ্গবন্ধু টিকে যাবেন? আমি কাউকে অসম্মান করছি না, আমি ফ্যাক্টগুলো বলছি। আমি গেলাম আমাদের গ্রামের কলেজে, আমাকে বলল, স্যার শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সার্কুলার এসেছে, তারা ম্যুরালের নকশা পাঠিয়ে দিয়েছে, এবং জায়গা দিতে বলেছে এবং এটা করতে বলেছে। আমি বললাম, টাকাটা কি তারা দিয়েছে? স্কুল থেকে বলল, সেটা আমাদেরকেই দিতে হবে। অনেকখানে তো এই টাকাও নেই।
কিন্তু এগুলো না করে যদি চৌষট্টিটি জেলায় চৌষট্টিটি মডেল মুজিব স্কুল হতো, তাহলে কী কী হতো? কর্মসংস্থান হতো, শিক্ষার কাজে লাগতো। যে টাকা অন্য খাতে ব্যয় করছে, সেই টাকা থেকে একটা ফান্ড দিলেই তো হয়ে যেত। কত টাকাই বা লাগে! সিক্স টু টেন বা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ। আমি বললাম, এতো টাকা খরচ হচ্ছে, এককোটি টাকা দিয়ে বঙ্গবন্ধু ইন্টারন্যাশনাল পিস প্রাইজ করা হোক। কারণ বঙ্গবন্ধু আজীবন শান্তির কথা বলে গেছেন। ওনাকে পিস প্রাইজ দেওয়া হয়েছে, সেটা জুলি ও কুরির নামে। ইন্দিরা গান্ধীর নামেও আছে। তো বঙ্গবন্ধুর নামে এই প্রাইজটা যদি হতো, তাহলে আমরা বছরে একজনকে দিতাম, তাহলে বিশ্বব্যাপী বঙ্গবন্ধুর নাম একটু অন্যভাবেও মানুষের মুখে থাকতো। এককোটি টাকা অনেক টাকা। অনেক বড় একটা পুরস্কার হতো। সেটাই হলো না। তাহলে আমরা কী করতে চাচ্ছি? চলবে

//জেডএস//

লাইভ

টপ