হাসনাত আবদুল হাই : বাংলা কথাসাহিত্যের মহাজন

Send
মনি হায়দার
প্রকাশিত : ০৬:০০, মে ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৩, মে ১৯, ২০২০

উজানে দাঁড় টেনে বিরামহীন গতির সঙ্গে বিচিত্র প্রকরণে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমনকাহিনিতে নিজেকে প্রকাশ করে চলেছেন হাসনাত আবদুল হাই। দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকায় তার প্রথম গল্প প্রকাশ হয় ১৯৫৮ সালে। ১৯৫৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত—হাসনাত আবদুল হাইয়ের যাত্রাপথ নির্ণয় করলে পাওয়া যায় দীর্ঘ বাষট্টি বছরের নিরন্তর সৃজনের যাত্রাকাল। এই যাত্রায় তিনি গল্পে, উপন্যাসে, বর্ণিল মানচিত্র একেঁছেন, ক্রমশ নিজেকে এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে, এক তরী থেকে ভিন্ন তরীতে নিয়ে গেছেন, অভিজ্ঞতার সফেন সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন।

আমাদের বঙ্গীয় ব-দ্বীপের কৃতিমান বহুমাত্রিক লেখক হাসনাত আবদুল হাইয়ের ২০১৭ সালে, আশি বছর পূর্ণ হওয়ায়, বাংলাদেশের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পাঠক সমাবেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো হাসনাত আবদুল হাইয়ের আশিটি গল্প নিয়ে একটি গ্রন্থ। বইটির নামও প্রচলিত ধারার বাইরে, ‘একা এবং একসঙ্গে নির্বাচিত আশি’।

এই বিবরণ থেকেই বোঝা যায়, বইটিতে আশিটি গল্প জায়গা নিয়েছে। সম্ভবত বাংলাদেশে কোনো কথাকারকে ধারণ করে, আশি বছরে এমন সৌকর্যমণ্ডিত প্রকাশনা প্রথম। সেদিক থেকে হাসনাত আবদুল হাই এগিয়ে। এবং প্রকাশনা সংস্থাকেও ধন্যবাদ। এখন প্রবেশ করা যাক, ‘একা এবং একসঙ্গে নির্বাচিত আশি’ গল্পগ্রন্থের অভ্যন্তরে। কীভাবে সাজিয়েছেন তিনি নিজের গল্পের যাত্রার সময় ও নির্মাণ-কলার সৌধ। যদিও প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৮ সালে কিন্তু বইয়ের কভারে ও ভেতরে সময় লিখেছেন ১৯৬০-২০১৭। কেন দুই বছর এগিয়ে গেলেন, বুঝতে পারলাম না।

হাসনাত আবদুল হাইয়ের গল্পের বিস্তারে যাবার আগে অন্য একটি দিকের প্রতি দৃষ্টি ফেরানো যাক। ব্যক্তি-মানুষের জীবন নিয়ে উপন্যাস রচনা করা যেতে পারে, এই বাংলাদেশে, প্রতিষ্ঠিত করলেন তিনি। লিখলেন অমর চিত্রশিল্পী সুলতানকে নিয়ে ‘সুলতান’। লিখলেন আর এক চির অভিমানী শিল্পী নভেরাকে কেন্দ্র করে, ‘নভেরা’। বরিশাল শহরের ছয় কিলোমিটার দূরের এক গ্রামের দরিদ্র কিন্তু লড়াকু মানুষ, যার বিদ্যার দৌড় আদর্শলিপি পাঠ পর্যন্ত, সেই স্বনির্মিত মানুষ আরজ আলী মাতুব্বরকে নিয়ে লিখলেন, ‘একজন আরজ আলী’। আমাদের থমকে যাওয়া উপন্যাসের জগতে আনলেন নতুন জোয়ার, বুনলেন সোনালী ফসল—জীবনী উপন্যাসের আলোয়। হাসনাত আবদুল হাইয়ের বয়স এখন তিরাশি বছর চলছে। এই তিরাশি বছরেও তিনি নিরলস লিখে যাচ্ছেন দুর্বার। আবার তিনি জীবনের গথিক রচনা করলেন আমাদের বাংলা সাহিত্য’র কালপুরুষ, সৈয়দ শামসুল হককে নিয়ে, গত বছরের বইমেলায়। সৈয়দ শামসুল হক বাংলাদেশের কেবল নয়, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম উজ্জ্বল জোতিস্ক। প্রথমা থেকে প্রকাশিত বিশাল আকারের বইটির নাম, ‘হেমিংওয়ের সঙ্গে’। বইটির পৃষ্ঠা চারশত বত্রিশ।

বইটির ভূমিকায় তিনি লিখলেন, ‘চারটি জীবনভিত্তিক উপন্যাস লেখার পর ঠিক করেছিলাম, এই ধারার আর কোনো বই লিখবো না। মৃত্যুর পূর্ব-মুহূর্ত পর্যন্ত সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক যেভাবে একের পর এক কবিতা ও গল্প লিখে গেলেন, সেই দৃষ্টান্ত এতোই অতুলনীয় অভিভূত করার মতো যে, তাকে নিয়ে উপন্যাস না লিখে পারা গেল না। লিখতে গিয়ে দেখলাম, শুধু তিনি নন, তাঁর সঙ্গে আনোয়ারা সৈয়দ হকের জীবনের যতটুকু জানতে পেরেছি, সেটাও এই উপন্যাসের বিষয় হয় অনিবার্যভাবে।

শুরুতেই জানিয়েছি, হাসনাত আবদুল হাই বিচিত্র ধারার লেখক। লিখে চলেছেন নিরন্তর। সৈয়দ শামসুল হকও বিচিত্র ধারায় নিজেকে প্রকাশ করেছেন। সৈয়দের লেখার বিস্তৃত-ভঙ্গি দেখে মাঝে মাঝে বিষম জাগে, একজন সৈয়দ কবে এতো লেখার সম্ভার সাজিয়ে রেখেছেন? সেই একই প্রশ্ন জাগে, হাসনাত আবদুল হাইকে নিয়েও। এই বাংলার লেখক ও মানুষ হিসেবে অপার আনন্দ ও সুখ অুনভব করি, একজন লেখককে আর একজন লেখকের অনুভবের সোপানে দাঁড়িয়ে এমন প্রজ্ঞা-মিশ্রিত অভাবনীয় সম্মানে একটা মোটা উপন্যাস লিখেছেন! বাংলার পরশ্রীকাতরতায় মগ্ন একজন বাঙালি হিসেবে, হাসনাত আবদুল হাইকে অভিবাদন জানাই।

হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘একা এবং একসঙ্গে নির্বাচিত আশি’ বইয়ের আশিটি গল্পের নামের তালিকা দিয়ে লেখাটা ভরিয়ে  দিয়ে ফাঁকিবাজি না করার চেয়ে, আমার পাঠ করা কয়েকটি গল্পের ভেতরের চালচিত্র অনুসন্ধান করা যাক। এবং এই অনুসন্ধানের ভেতর দিয়ে গল্পকার হাসনাতকে অনুধাবনের চেষ্টা করা যেতে পারে। যদিও কেনো লেখকের ভেতরের ঠিকুঁজি অুনভব করা যায় না শেষ পর্যন্ত।

বইয়ের প্রথম গল্প ‘কার্নিভাল’। লিখেছিলেন ১৯৬০ সালে। গল্পকার গল্পে বুনে দেন জীবনের রঙ্গ রস সুখ দুঃখ আর অনুভবের  পেরেক। ‘কার্নিভাল’ গল্পে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। একজন আন্দু শেখ অন্যজন রহিম বক্স। উৎসব অনুষ্ঠানে কত প্রতিযোগিতা থাকে, এই গল্পের আখ্যানে দারুণ দক্ষতায় সামনে এনেছেন গল্পকার হাসনাত আবদুল হাই। গল্পের শুরুটাই চমকে দেয় পাঠককে। কার্নিভাল গল্পের শুরুটা : ‘কার্বাইটের ছাইরঙা আলো। ধূসর চাঁদনীরাতের আলোর মতো জেগে আছে সেই কখন থেকে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ওরা, শেখ আন্দু আর রহিম বক্স। মানুষ তো নয়, যেন বুনো জানোয়ার। বন বিড়ালের সবুজ চোখের মতো জ্বলছে মণি দুটো হিংস্র হয়ে। কার্বাইটের ছাইরঙা আলোতেও স্পষ্ট চোখে পড়ে।’

কেন দুই জনেই পরস্পরের মুখোমুখি? মানব সভ্যতায় চিরকালের মানুষের সঙ্গে মানুষের মরণ-পণ যে প্রতিযোগিতা, সেই প্রতিযোগিতারই যোগফল আন্দু শেখ ও রহিম বক্স। যুদ্ধ কেবল রাজায় রাজায় হয় না, যুদ্ধ হয় প্রজার সঙ্গে প্রজারও। যতই ক্ষুদ্র হোক ক্ষমতার পরিধি, সেই সোপান অনুসারে যুদ্ধ, প্রতিযোগিতা। মহকুমা শহর থেকে দূরের গঞ্জ রূপগঞ্জে মেলা বসে। সেই মেলায় অনেক বছর ধরে আসে আন্দু শেখ। কিন্তু এইবার এসে ধাক্কা খায়। মেলার আয়োজকরা আগের মতো তোয়াজ করে না। কারণ, মেলায় এসেছে রহিম বক্স। নিয়ে এসেছে—দ্য ইস্টার্ন ম্যাজিক অ্যান্ড কমিক পার্টি। আরও আছে লখনৌর ম্যাজিসিয়ান। সুতরাং লোকজন রহিম বক্সের প্যান্ডেলেই ঢোকে বেশী।

আন্দু শেখ কী দেখায়? মাত্র দুই আনায় আজব চিজ দেখায় সে। গল্পকার গল্পের জমিনে আনেন আন্দু শেখের দুনিয়ার মানচিত্র, ‘এই বাবা, কি মস্ত ব্যাঙ? নাম কী এর? ওটা কী? বেজির মাতন নাগে যে? কীসের দাঁত বলবো? হাঙ্গর মাছ?

আজব দুনিয়ার কতটুকুই বা জানে এরা। দুইবেলা ভাত আর সকাল বিকাল খেত খামারের কাজ করতেই বুকের ঘুড়ি অচল হয়ে আসে। সময় কই তাদের আজব দুনিয়ার আজব চিজ দেখার। তাই শেখ আন্দুকেই নেমে আসতে হয় মহকুমা থেকে রুপগনজের মেলায় ফি বছর। দেখুক ব্যাটারা দুনিয়ার কত আজব চিজ পয়দা করেছে খোদা। হ্যাঁ, তবে মবলক দু’আনা ফেলে দিয়ে।’

সেই দুই আনার আয় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। রহিম বক্সের ডেরায় যাচ্ছে সবাই। কী করে আন্দু শেখ? যখন কাজ থাকে না, আন্দু শেখ আর রহিম বক্স চা খেতে খেতে গল্পও করে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রতিযোগিতার জয়-পরাজয়ের হিসেব নিকেশটাও জ্বলতে থাকে। এই হিসেবে আন্দু শেখ নতুন পরিকল্পনা করে ছুটে চলে মহকুমা শহরে।

বছর দুয়েক আগে স্ত্রী মরিয়ম হাসপাতালে সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায়। সেই স্মৃতির ভেতর দিয়ে মহকুমা শহরে পৌঁছে আন্দু শেখ হাসপাতাল থেকে একটা বৈয়াম নিয়ে আসে। বৈয়াম আনার পরই মেলার চাকা ঘুরে যায় আন্দু শেখের দিকে। কারণ, সবাই বৈয়ামের অদ্ভুত চিজ দেখার জন্য লোকের ভিড় ভাড়ে। কী আছে বৈয়ামের ভেতরে? গল্পের আখ্যানে আমরা জেনে নিই বৈয়ামের রহস্য। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মরিয়াম মারা গেছে। প্রসব করেছে সন্তান। সেই সন্তানের মুখ দেখতে চাইলে ডাক্তার প্রথমে না দেখার জন্য বলেছিল। কিন্তু সন্তানের মুখ দেখার আকুল আগ্রহে ডাক্তার দেখায় আন্দু শেখের সন্তানকে।

‘ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল গোলাকার ছোট্ট সেই মাংস পিণ্ডটার দিকে। কী বীভৎস, ভয়ঙ্কর। এটা কি মানুষের বাচ্চা না অদ্ভুত কোনো জানোয়ারের!’

সেই আজব চিজ দেখছে মানুষ উৎসুক হয়ে। রহিম বক্স হতবাক। ব্যবসার মোড় ঘুরে গেছে। কিন্তু বুদ্ধিমান রহিম ছাড়বে কেন যুদ্ধের মাঠ? শয়তানি প্যাচ খেলে রহিম। প্যান্ডেলের মুখে দাঁড়িয়ে রহিম চিৎকার করে সকলের উদ্দেশে, বৈয়ামের ভেতরের চিজ আসল না, নকল।

আন্দু শেখ বিভ্রান্ত। ক্রোধে জ্বলছে। এই বাস্তবতায় রহিম আরও উসকে দেয় সমবেতজনদের, ‘যদি আসল জিনিসই হয় বৈয়াম খুইলা দেখাক শেখের পো। একটা কাঠি দিয়া তুইলা দেখি আমরা’।

সমবতেরা সঙ্গে সঙ্গে রাজি। রহিম বক্স এগিয়ে যায় কাঠি নিয়ে। কিন্তু আন্দু শেখ মুহুর্তের মধ্যে বৈয়ামটা নিয়ে দৌড়ে বাইরে চলে যায়। গল্পকার হাসনাত আবদুল হাই ভিন্ন সত্তার এক অনুভবের জানালায় দাঁড়িয়ে প্রতীকায়িত চিত্রকল্প টানলেন, ‘আন্দু শেখের সমস্ত দেহ কাঁপছে উত্তেজনায়। পেছনে হৈ-হল্লা, হাসি ঠাট্টা কোনোকিছুই পৌঁছালো না তার কাছে। তখন আকাশ থেকে ঝাঁপ দিয়েছে একটা চিল তীক্ষ্ণ ধার ঠোঁট বেঁকিয়ে। যে মুরগীটা নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছিল ছোট্ট বাচ্চাগুলোর চারদিকে, সে এক লহমায় বাচ্চাগুলো আড়াল করে দাঁড়ালো নিজের ডানা দিয়ে।’

হোক না বিকৃত, কদাকার, কুৎসিত সন্তান আন্দু শেখের, সেই সন্তানের সম্মান তো রাখার দায়ও পিতার। কার্নিভাল বা উৎসবে কত অবাক ঘটনাই ঘটে, আবার হাসনাত আবদুল হাইয়ের গল্পের আখ্যানে আমরা ভিন্ন লড়াইয়ের গল্পও পাঠ করে অবিভূত হই, মানুষের সঙ্গে মানুষের লড়াই বা প্রতিযোগিতা বা আত্মমর্যাদার দৌড় কখনো কেনোদিন থামবে না।

হাসনাত আবদুল হাইয়ের আশিটি গল্পের অন্য একটি গল্প ‘বাবরের প্রার্থনা’। গল্পটা লিখেছেন ১৯৯৪ সালে। গল্পের সময়কাল ক্যাসেট সময়ের, যখন বড় বড় টেপরেকডারে টেপ ঢুকিয়ে যখন গান শুনতেন পৃথিবীর মানুষ। বিয়ে বাড়িতে ক্যাসেটে গান বাজছে। বিয়ে হচ্ছে হেড মাস্টারের মেয়ের। দীর্ঘদিন তিনি স্কুলের হেড মাস্টারের দ্বায়িত্ব পালনের কারণে এলাকায় ইমেজ গড়ে উঠেছে।

হাসনাত আবদুল হাই পরিস্থিতির পটভূমি উঠিয়ে আনেন কয়েকটি লাইনে, ‘সানাই বাজছে এখন, তাই মনটা ভারী হয়ে আসে। প্রতিবেশী চায়ের পেয়ালা নামিয়ে রেখে বলে, মেয়ে খুব ভাগ্যবতী। জামাই তো নয় যেন হিরের টুকরো। দেখতেও যেমন গুনেও তেমনি। মেয়ে তোমার কুব সুখে থাকবে কয়া দিলাম হেড মাস্টার।

হেড মাস্টার ওপরে হাত তুলে বলেন, সবই তার ইচ্ছা আর কৃপা। আমরা পাপী-তাপী মানুষ তার লীলাখেলা কতটুকু বুঝি। আর্শীবাদ করো মেয়ে যেন সুখী হয়।’

মেয়ের বিয়ে দিতে হলে পিতার কাজের শেষ থাকে না। থানার ছোট দারোগাকে কার্ড দেয়া হয়নি। মাত্র দুটো দিন বাকী। হেড মাস্টার ছুটলেন র্কাড দিতে। গ্রামের কাঁচা রাস্তা পার হয়ে ইউনিয় বোর্ডের রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন। রিকশায় উঠবেন। পাশের রেস্টুরেন্টে কয়েকজন আড্ডা দিচ্ছে। তারা কেন মেয়ের বিয়ের কার্ড পায়নি প্রশ্ন তুললে হেড মাস্টার বলেন,  ‘আপনজনদের কেউ কার্ড দিয়ে নিমন্ত্রণ করে? তোমারা অবশ্যই আসবে। বলতে পারো তোমাদের কনেরই তো বিয়ে হচ্ছে। বোনের বিয়েতে কি ভাইদের নেমন্তন্ন করতে হয়?

হ্যাঁ হ্যাঁ। বোন। জবর বোন আমাদের। এমন খাসা মালকে বোন বলে চালিয়ে দিলেই হবে? খুব চালাকি স্যারের। ভেতরে থেকে জড়ানো গলায় কেউ বলে। কথা শেষ করে হেঁচকি দেয়, তাকে দেখা যায় না। জড়িত-কণ্ঠের কথায় অন্যরা হাসে। হেড মাস্টার রিকশায় উঠে ত্রস্তে বলেন, চালা দেখি বাবু। বড্ড তাড়া আজকে। কথাগুলি তার কানের ভেতরে গরম শিষে ঢেলে দেয়।’

গল্প মোড় নেয় রাতের অন্ধকারে, যখন মেয়েটি নতুন স্বপ্নে বিভোর, সেই রাতে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে যায়। কারা নিয়ে যায়? সবকিছু ভেঙ্গে পড়ে হেডমাস্টারের, সামনে পিছনে কিছুই দেখতে পান না। থানার  অফিসার  জিজ্ঞেস করে, এমন তো হতে পারে যে আপনার মেয়েকে তার কোনো লাভার দলবলসহ এসে নিয়ে গেছে। মেয়ের সম্মতিক্রমেই এটা ঘটেছে।... হেড মাস্টার এবার মাথা তুলে স্তম্ভিত হয়ে ইউনিফর্ম পরা লোকটির দিকে তাকান। লোকটি অসহিষ্ণু হয়ে বলে, আপনি মোটেও কো অপারেট করছে না।’

এতক্ষণে গল্পের মানচিত্র আমাদের সামনে খুলে যাচ্ছে। আরও একটু বোঝা যাবে যদি গল্পের আরও কয়েকটি লাইন আমরা পাঠ করি। গল্পকার হাসনাত আবদুল হাই গল্পের মধ্যে বুনে দিয়েছেন বিষলক্ষ্যার ছুরি, যে ছুড়িতে মানুষের অস্তিত্ব কেটে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। হেড মাস্টার বলেন, ‘আমার মা-মণির জন্য সাধ্যমত যা করার সব কিছু করবো আমি। এই সময়ে হাজার হাজার মাইল দূরে বিদেশে কোথায় কী ঘটেছে সেই কথা শুনাতে তোমার আসা ঠিক হয়নি। বিদেশে অমন কত কিছু হয়। আমাদের সেসব স্পর্শ করে না।... হ্যাঁ বাবরের কথা মনে থাকবে না কেন। তার সেই বিখ্যাত প্রার্থনার কথা প্রায়ই মনে পড়ে আমার। তারই তৈরী মসজিদ। না না ভাঙ্গা ঠিক হয়নি।

আমরা এখন গল্পের নাম ‘বাবরের প্রার্থনা’র সারবত্তা আবিস্কার করতে পারছি। খুব কৌশলে গল্পকার গল্পের জমিনে পুতে দিয়েছেন সেই সময়ের রক্তঅগ্নির নৃত্যর মায়াজাল। যে মায়াজালে ধর্মের নামে মানুষ করে বলাৎকার, করে পাশবিক উল্লাসে জবাই, সেই জবাইকালের গল্প আখ্যানে একজন হেড মাস্টার পিতা আর সম্রাট পিতার মহত্ত উপস্থাপন করার পাশাপাশি, দেখিয়েছেন সময়ের চক্র কত নির্মম। নৃশংস মানুষের ধর্মীয় আলখেল্লার আক্রমণ। বাবর প্রার্থনা করেছিলেন প্রিয় পুত্র অসুস্থ হুমায়ুনের জন্য, সম্রাটের নিজের জীবনের বিনিময়ে যেন পুত্র বেঁচে থাকে। ইতিহাসের গল্পে জানা যায়, পুত্র সুস্থ হয়ে উঠলো আর সম্রাট অসুস্থ হয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নিলেন। শত শত বছর পর বাবরের তৈরী মসজিদ ভাঙ্গার পটভূমিতে বাংলার আর পিতার কন্যা অপহরণের তিন দিন পর মেয়েকে ফিরে পান কিন্তু কী অবস্থায়?

গল্পকার হাসনাত আবদুল হাই ফিরে আসা কন্যার বর্ণনা দেন, ‘তাকে যখন ঘরের ভেতরের চৌকিতে হলুদের ছাপ লাগা চাদরের ওপর শোয়ানো হলো, তখন হেরিকেনের আলোতে মুখ গ্রীবা বাহুমূল চোখে পড়ে। হলুদ লাগানো শরীরে, মুখে নতুন সব দাগ। তাকে এখন চেনাই যায় না। মা চিৎকার দিয়ে মুর্চ্ছা যান। হেড মাস্টার মুখ ফিরিয়ে মাটিতে স্থানুর মতো বসে থাকেন।’

গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারতো কিন্তু গল্পকার হাসনাত আবদুল হাই শিল্পীত চেতনার দুয়ারের শেষ বিন্দুতে নিয়ে যেতে চান আমাদের। তিনি দেখান ইতিহাস কতো ভুল পাথরের থালাবাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকে। আজকে যেটা দুর্দমনীয়, অসীম শক্তির আধার মনে হয়, কাল প্রবাহে সেই শক্তি কীভাবে অন্যর উপর প্রভাব রাখে ধ্বংসের ও সর্বনাশের শব্দের কারুকাজে সেই তিক্ত সৌধ উপস্থাপনা করেছেন গল্পকার অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে।

সম্রাট বাবর নিজের প্রাণের বিনিময়ে সন্তানের জীবনের পরমায়ু চেয়েছিলেন, সেই সম্রাটের তৈরী মসজিদ ভাঙ্গার প্রতিফলনে যখন ধর্ষিত সন্তান ফিরে আসে, পিতার প্রতিক্রিয়া, তুই কেন ফিরে এলি?

দুই পিতার বিপরীত প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে গল্পকার হাসনাত আবদুল হাই, গোটা মানবসভ্যতাকে দাঁড় করিয়ে দিলেন  গিলোটিনের সামনে। কোথায় মুক্তি মানুষের? প্রকৃতপক্ষে, মানুষের জমিনে মানুষের কোনো মুক্তি নেই। মানুষ রচনা করছে মানুষের জন্য নিঃশব্দ ফাঁদ। সেই ফাঁদে আটকা পড়ে আমরাই গান রচনা করি, সুর দিয়ে গাই, ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে...।

কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘একা এবং একসঙ্গে নির্বাচিত আশি’ বইয়ের শেষ গল্প ‘তোমার ঘরে বসত করে ক’জনা, তুমি জানো না’। নাম পাঠ করে মনে হতে পারে, গল্পটির ক্ষেত্রফল পারলৌকিক প্রসঙ্গ নিয়ে লিখেছেন তিনি। না, গল্পের আখ্যান একেবারে সমকালীন, ঢাকা শহরের দুই অবসরপ্রাপ্ত মানুষের দিনরাত্রির ঘটনায় নির্মিত। আনিসুর রহমান এবং হাবিবুল্লাহ খান। আনিসুর রহমান সমাজতত্বের অধ্যাপক। হাবিবুল্লাহ খান ব্যাংকের কর্মকতা ছিলেন। দুজনেই ধানমন্ডির একই বাড়িতে থাকেন। দুজনের ছেলেমেয়েরা বিদেশে। দুই বাসায় স্ত্রী নিয়ে চারজন। দুই পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ নিবিড়। দুই জনে প্রতি সকালে হাঁটতে বের হন।

মানুষ যদি দেখতে চায় নিজেকে, দেখা শেষ হবে না কখনো। প্রতিজন মানুষ, দিনে দিনে, ঘণ্টায় ঘণ্টায়, ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হয় মনের জগতের সঙ্গে বাহ্যিক জগতেও। একজন মানুষ পরিণত বয়সে অন্ধ হওয়া আর জন্ম থেকে অন্ধ হওয়া, কখনো এক নয়, হতে পারে না। একটি দৃশ্য শত শত হাজার হাজার চোখে দেখলেও প্রতিটি চোখে দেখার আলোকবিন্দু অবশ্যই আলাদা, ভিন্ন সৌরভে প্রতিভাত। গল্পকার হাসনাত আবদুল হাই মানুষের সৌরভের ভিন্ন ভিন্ন আলোকায়ন দেখিয়েছেন, ‘তোমার ঘরে বসত করে ক’জনা, তুমি জানো না’ গল্পের আখ্যান জুড়ে।

দুইজন মানুষ, একজন আনিসুর রহমান। অন্যজন হাবিবুল্লাহ খান। প্রায় সব বয়সী দুজন মানুষ। একসঙ্গে চলেন, আড্ডা দেন, গল্প করেন কিন্তু অন্তপ্রবাহের জলে ছবি আঁকেন অন্যদৃষ্টিতে। এই অন্যদৃষ্টির জন্যই পৃথিবী জুড়ে এতো বৈচিত্র, এতো বৈষম্য, এতো সৌন্দর্য, এতো ঘৃণার পেরেক।

আনিসুর রহমান ফেসবুকে বসেন নিয়মিত, পথে পথে মানুষের সঙ্গে যেতে কথা বলেন, মানুষের ভেতরের বোধ ও বোধনকে বোঝার চেষ্টা করেন। বিপরীতে হাবিবুল্লাহ খান। তিনি নিজেকে গুটিয়ে রাখেন। চলমান সময় ও প্রযুক্তি থেকে নিজেকে বিযুক্ত রাখেন। হাসনাত দুজনের চরিত্র এঁকেছেন নিঁখুত মন্ত্রনায় : ‘হাবিবুল্লাহ খানের ফেসবুক আ্যাকাউন্ট নেই। তিনি এর প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন না। অধ্যাপক আনুসর রহমান অবাক হয়ে বলেন, টেকনোলজি ইজ নিউট্রাল’।

তিনটি শব্দ, ‘টেকনোলজি ইজ নিউট্রাল’। কিন্তু এই নিউট্রাল টেকনোলজিকে নিউট্রালের বাইরে আনছে কারা? মানুষ। মানুষই সকল সর্বনাশের আকর, অবশ্যই মানুষের। ‘তোমার ঘরে বসত করে ক’জনা, তুমি জানো না’ গল্পের চরিত্র দু’জনে একটা রেস্টুরেন্টে বসেন। রেস্টুরেন্টের নাম ‘টি হাউস অব আগস্ট মুন’। রেস্টুরেন্টে ঢুকে বসলেন দুজনে। ওয়েটার মেয়েটার সঙ্গে পরিচয় হলো। মেয়েটা রেস্টুরেন্টে চাকরি করছে কয়েক বান্ধবী মিলে একটা মিউজিক ব্যান্ড গঠনের টাকার জন্য। মেয়েটির সঙ্গে রেস্টুরেন্টের ছেলে ওয়েটারদের আচরণের মধ্যে  দিয়ে নতুন একটা দিক খুলে যায় আনিসুর রহমানের সামনে। মেয়েটির নাম রিফাত। রিফাতের ব্যান্ডের গান শোনার আগ্রহ প্রকাশ করেন আনিসুর রহমান। সিনেমার সিডি রিফাতের হাতে ‘ব্লু ইজ দা ওয়ার্মেস্ট কালার’। রিফাত বলে, এটা আপনাদের জন্য না। 

রিফাতের নিষিদ্ধ ঘোষনায় প্রলুব্ধ হলেন আনিসুর রহমান। তিনি বাসায় ফেরার পথে সিডির দোকান থেকে নিয়ে এলেন বাসায়। দেখতে শুরু করলেন, কিছুক্ষণ দেখার পরই বুঝলেন, রিফাত লেসবিয়ান। কিন্তু তিনি মেয়েটিকে ঘৃণা করতে পারলেন না। জনম জনমের সংস্কারের বাইরের জীবনের প্রতি বিবমিষা নয়, তিনি জানেন মানুষের নিবিড় পার্থক্য। ‘আমরা’ ব্যান্ড গঠন করেছে রিফাত। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রিফাত নিমন্ত্রণ করে দুজনকে। সেখানে রিফাত লালনের গানই বেশী গায়। তিনবার গায়—‘তোমার ঘরে বসত করে ক’জনা মন, তুমি জানো না...’। বোঝা যায় এই গানটি রিফাতের খুব পছন্দ। কিন্ত কেনো? প্রকৃতঅর্থে, কার ঘরে কে বসত করে, কেউ কি জানে? জানে না। যারা বলে জানি, ওরা ভান করে। নিজেই শূন্যে বাস করে ওড়ায় বেলুন। 

হাসনাত আবদুল হাই এই গল্পের আখ্যানে বদ্ধঘরের দরজা জানালা খুলে দিয়ে ঘন ঘনায়মান অন্ধকার ও আলোর মিছিল  তৈরী করেছেন। মানুষের সঙ্গে মানুষের সর্ম্পকের সেতু তৈরী হয়, সেই সেতুটি ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা সামনে রেখেই। আবার ভেঙ্গে যাওয়া সম্পর্ক নবায়নও করে মানুষ। সর্ম্পকের নির্নিত সেতুর উপর কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই  চলমান সময়ের বিড়ম্বিত কিংবা তড়িতাহত যোজনাকে ধারণ করে ভিন্ন ধারার গল্পের আখ্যানে দেখিয়েছেন, মানুষের সঙ্গে মানুষের সর্ম্পক কোনো শেষ হওয়ার নয়।

//জেডএস//

লাইভ

টপ