লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতা | আলেহো কার্পেন্তিয়ের | পর্ব-৩

Send
তর্জমা : মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ০০:০১, জুন ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫২, জুন ১৯, ২০২০

পূর্ব প্রকাশের পর

৪.

আমি জানি পুরো ইউরোপে প্রাগ ছাড়া অন্য কোনো শহরে খ্রিস্টিয় রিফরমেশন ও কাউন্টার-রিফরমেশনের ঐতিহাসিক ঘটনাবলির দাগ ও ছাপ এত প্রকটভাবে আর নেই। একদিকে, পিনের মতো চোখা প্রচুর চূড়াবিশিষ্ট ভারী স্থাপত্যের টিন চার্চ (Tyn Church), এবং মধ্যযুগীয় পাথুরে টাইলসের খাড়া চালার বেথেলহেম চ্যাপেল যেখানে একসময় চেক ধর্মতাত্ত্বিক জন হাস (Jan Hus)-এর বক্তৃতার গমগমে শব্দ প্রতিধ্বনিত হতো; আর অন্য দিকে চার্লস ব্রিজের শেষ মাথায় ক্লেমেন্টাইন স্কুলে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বারোক স্থাপত্য ‘দি চার্চ অব আওয়ার সেভিয়ার’ (Kostel U Salvátora)। সে চার্চ তুলে ধরে সে সময়ের জেস্যুটদের এক ঐতিহাসিক চিত্র। চার্চ তো নয় যেন এক থিয়েটার। চতুর্দিকে যিশুর শিষ্য, সাধু-সন্ত, শহিদ-আত্মা, ধর্মতাত্ত্বিক, যেন সবাই মিলে এখনি এক ধর্মসঙ্গীতে যোগ দেবেন। সবাই সাদা পেডেস্টালের ওপর ব্রোঞ্জের শরীরে, স্বর্ণের আভা নিয়ে দাঁড়িয়ে। সবার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে তাঁরা র‌্যাডিকেল হুসাইটদের তাবোরাইট সঙ্গীতের চেয়ে এবং প্রাগের নিজেদের ভাষার চেয়ে লাতিন ভাষা ও স্তোত্রের মহিমা ঘোষণা করছেন। …রয়েছে সেই বিখ্যাত প্রাগ দুর্গ যেখান থেকে প্রোটেস্টান্টরা দুই গভর্নরকে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল ১৬১৮ সালে। নিচে মালা স্ত্রানা পাহাড় আর শহর যেখানে রয়েছে ওয়াল্ডস্টেইনের রাজপ্রাসাদ। রাজপ্রাসাদের অভ্যর্থনা কক্ষের সিলিং জুড়ে চিত্রিত ইতিহাসখ্যাত ‘ত্রিশ বর্ষীয় যুদ্ধ’ থেকে ভেসে আসছে যুদ্ধের কর্ণবিদারী সিম্ফনি। সে সিম্ফনিতে রয়েছে যুদ্ধের বিউগল, যুদ্ধের নাকাড়া এবং এমন আরো সব রণসঙ্গীতের যন্ত্রাদির দামামা। ঐখানে দাঁড়িয়ে আমি বুঝেছিলাম শিলারের নায়কবিহীন নাটকের অন্তস্থ কারিগরি। নাটকটিতে নামহীন চরিত্রগুলো এরকম : ‘কয়েকজন ক্রোয়েশিয়ান’, ‘কয়েকজন উহলাম’, ‘একজন বিউগল বাদক’, ‘একজন নব্যনিযুক্ত’, ‘একজন কাপুচিন’, ‘একজন ননকমিশনড অফিসার’ ইত্যাদি। এগুলোই প্রাগের সবকিছু নয়। এর ইটে-পাথরে শুধু রিফরমেশন আর কাউন্টার-রিফরমেশনের ইতিহাস ধৃত আছে তাই নয়, এর ভবন আর ভবনের ফাঁকা স্থান সবাই এক অতীতের কথা বলে যে অতীত ঝুলে আছে বাস্তব আর অবাস্তবের মাঝে, কল্পনা জগৎ আর প্রামাণ্য বস্তুজগতের মাঝে এবং কর্ম ও কল্পনার মাঝে। আমরা জানি পরশপাথর সন্ধানী সেই ক্লাসিকাল স্কলার ফাউস্টও এই প্রাগেই প্রথম আবির্ভূত হয়েছিলেন। এখানেই পরবর্তীকালে তাইকো ব্রাহে (Tycho Brahe) কাজ করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানের সেই সব যন্ত্রপাতি নিয়ে যা জোহানেস কেপলারের যন্ত্রপাতি থেকে খুব আলাদা ধরনের ছিল না। পরশপাথর সন্ধানী সেই বিজ্ঞানীরা এখানেই হার্মেটিক মার্কারি প্রস্তুত করেছিলেন এবং তাঁদের বাসস্থানের গলিটি তাঁদের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিসহ এখনো চার্লস দি গ্রেট শহরে চিহ্নিত ও সংরক্ষিত আছে। এখানকার অনেক কিছুই এখনো সেই হিব্রু পুরাণের গলেম নামক মানবযন্ত্রকে মনে করিয়ে দেয় যে মানবযন্ত্র ইহুদি ধর্মসাধকদের জন্য কাজ করে দিতো কবরস্থানে বা উপাসনালয়ে। এক অসাধারণ বস্তু এখানকার ইহুদি কবরস্থান। সেখানে মৃতের স্মরণে প্রোথিত শিলাখণ্ডগুলো ষোড়শ বা সপ্তদশ শতকীয় তারিখ বুকে নিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে আছে, মনে হচ্ছে এগুলো বিক্রির জন্য নিলামে তোলা হয়েছে। একই সাথে আছে প্রাগের স্তাভোভস্কে থিয়েটার যেখানে ১৭৮৭ সালে একদিন মোজার্টের বিখ্যাত অপেরা ‘ডন গিয়োভানি’র প্রথম যবনিকা উন্মোচিত হয়। ডন জুয়ান জাতীয় এক চরিত্রের ওপর  দাঁড়ানো ফাউস্টিয়ান এই অপেরাটি লেখা হয়েছিল এমন এক যুক্তি-ভিত্তিক বৈজ্ঞানিক যুগে যখন আর মানুষ বিশ্বাস করে না যে একজন অতিথিকে পাথরে রূপান্তর করে ফেলা যায়, যদিও পাশেই ক্লেমেন্টাইন চার্চে তখনো ব্রোঞ্জের বিশপ এবং ধর্মপণ্ডিতদেরকে জাঁকালো ধর্মযজ্ঞে অবলীলায় নাচতে আর গাইতে দেখা যেতো। কীভাবে শুনতে হয় তা যাঁরা জানেন তাঁদের কাছে প্রাগের প্রতিটি ইট-পাথর কথা বলে। এমন শ্রোতারা এখানে প্রতি কর্নারে, প্রতি চৌরাস্তায়, সাহিত্য থেকে রাজনীতি সব আলোচনার টেবিলে দেখতে পাবেন চামিসোর (Chamisso) চরিত্রের মতো সর্বত্র উপস্থিত কাফকার ছায়াহীন কায়াকে, যে কাফকা ‘একটি যুদ্ধক্ষেত্রের বর্ণনা’ দিতে গিয়ে যা বলেছেন সব রহস্যময়ভাবে হয়ে গেছে এই প্রাগের বর্ণনা। ১৯১১ সালে কাফকা তাঁর ডায়েরিতে একদিন লিখেছেন যে, তিনি চেক ব্রিজের ডানদিকে একটি সিঁড়ির দৃশ্য দেখে একবার আন্দোলিত হয়েছিলেন। তিনি ‘একটি ছোট তিনকোণা জানালা থেকে’ দেখছেন যে একটি সিঁড়ি তার সকল বারোক শৈল্পিকতা ও প্রাণবন্ততা নিয়ে উঠে আসছে সেই ঐতিহাসিক জানালার দিকে যেখান থেকে প্রোটেস্টান্টরা দুই গভর্নরকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল ১৬১৮ সালে। …কাফকা থেকে অতীতের দিকে লাফ দিয়ে কল্পনার জোরে আমরা পৌঁছে যাই জার্মানির লাইপজিগে (Leipzig)। সেখানে আমাদের জন্য বসে আছে একটি বাদ্যযন্ত্র যার পিছনে রয়েছেন স্বয়ং আনা ম্যাগদালেনা। আনা আবিষ্ট অনুভবের সাথে আবিষ্কার করছেন যে, তাঁর সামনে বসা আছেন স্বয়ং ভগবানের কাছে গান শেখা জোহান সেবাস্তিয়ান। আমাদের মনে আছে তারপর সেখানে সবচেয়ে কম স্বরে ও যান্ত্রিক ধ্বনিতে শুধু আবেগের মূর্ছনা গীত হলো। আমরা সেই গানের সাক্ষাৎ শ্রোতা। কারণ গত দুইশো বছর ধরে সেই গানই বাজছে। সেই গানই বেড়ে বেড়ে অনেক কণ্ঠের ঠাঁই ধরে পৌঁছেছে আটলান্টিকের ওপারে। এর ধীর লয় থেকে দ্রুত লয়ে চলার ছন্দ থেকে উদ্দীপিত হয়েই হয়তো ব্রাজিলিয়ান সঙ্গীতজ্ঞ হেক্টর ভিয়া-লাবোস তাঁর এক সৃষ্টির নামকরণ করেছিলেন বাখিয়ানাস (bacchianas) যে কম্পোজিশন ব্রাজিলকে শিখিয়েছে অ্যালেগ্রো (allegro) ছন্দ। …লাইপজিগ থেকে আমাদের কল্পনার ঘোড়া মোজার্টের ছন্দে এবার আমাদেরকে নিয়ে চলুক গ্যেটের উইমারের সেই ঘরে যেখানে গ্রিক ভাস্কর্যের নকল সংস্করণগুলো অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য। ভাস্কর্যগুলো বীরোচিত উচ্চতায় ও মাত্রায় যেভাবে নির্মিত তাতে সেগুলোর স্থান হওয়া উচিত ছিল কোনো রাজকীয় মন্দিরে। কিন্তু ফাউস্টের বিখ্যাত লেখক সেগুলো রেখেছেন গাদাগাদি করে উইমার এস্টেটের এমন ছোট কক্ষগুলোতে যে পাশ দিয়ে একজন দর্শক যেতে চাইলে তার শরীরটি বাঁকিয়ে জায়গা তৈরি করে তারপর যেতে হয়। উইমারের ছোট কক্ষগুলোতে বিক্ষিপ্তভাবে রেখে দেয়া এই গ্রিক দেবদেবীর মূর্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে আমার মনে পড়ে একই রকম ভাস্কর্যের সমারোহের দৃশ্য যা দেখা যায় লাতিন আমেরকিার বিভিন্ন সরকারি ভবনের প্রবেশদ্বারের পথে। এই ভবনগুলোর প্রবেশ পথে দেখেছি ভাস্কর্যগুলো যেন পাল্লা দিয়ে চেষ্টা করছে তাদের মূল মানুষটির চেয়ে দুইগুণ বা তিনগুণেরও বেশি বড় হয়ে উঠতে। এমনকি হাভানা ক্যাপিটাল বিল্ডিংটির সামনে রাখা একটি নারীমূর্তির স্তনের ওজনই দাঁড়িয়েছে একটনের উপরে। এক চোখা সাইক্লোপ দৈত্যের মতো হাবলু এই সকল ভাস্কর্যের পাশে বেচারা ক্ষুদে দৈত্য কাফকার মূর্তিটি এত ছোট যে কারো চোখে পড়ার আকারেই সে নেই।

৫.

ভ্রমণপিপাসু এই লাতিন আমেরিকার লোকটি সবশেষে ফিরে আসেন নিজ দেশে এবং বুঝতে শুরু করেন অনেক কিছু। তিনি বুঝতে পারেন দোন কিহোতে (Don Quixote) তাঁর লোক হলেও কিহোতের Speech to the Shepherds অংশে এমন কিছু আছে যা এসেছে মূলত গ্রিক কবি হেসিওদের ৮০০ লাইনের কবিতা Works and Days থেকে। লাতিন আমেরিকান লোকটি বেরনাল দিয়াজ দেল কাস্তিয়োর (Bernal Diaz del Castillo) বিখ্যাত বৃত্তান্তটি খুলে বসেন এবং দেখেন যে তিনি ঢুকে পড়েছেন একেবারে হরদম আজব অভিযাত্রার (Chivalric) এক গ্রন্থের মাঝে। এমন আজব বীরগাথার সে গ্রন্থ যে সেখানে শয়তানের কর্মীরা সবাই ঈশ্বর এবং তাদেরকে ছুঁয়ে-ছেনে দেখা যায়, সেখানে আজগুবি সব জন্তু-জানোয়ার দিনের আলোতে ঘুরে বেড়ায়, আছে আজগুবি সব শহর, নদীতে বাস করে ড্রাগন এবং পাহাড়গুলো ধোঁয়া আর বরফে ঢাকা। মূলত না বুঝেই, বেরনাল দিয়াজ বেচারা গাউল দেশের আমাদিসকে, গ্রিসের বেলিয়ানিসকে এবং পারস্য অঞ্চলের হিরকানিয়ার ফ্লোরিসমার্তেকে পিছনে ফেলে একটু সামনে এগিয়ে গিয়েছিলেন। বেরনাল আবিষ্কার করেছিলেন এমন এক দেশ যেখানে রাজকুমাররা পাখির পালকের মুকুট পরেন, যেখানে বনবনানী পৃথিবীর বয়সের সমান প্রাচীন, যেখানকার খাবারের মজা দুনিয়ার মানুষেরা এখনো পেয়ে দেখেনি, যেখানে পানীয় তৈরি হয় সরাসরি ক্যাকটাস আর পাম বৃক্ষ থেকে, কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি সেই দুনিয়ার ঘটনাগুলো ঘটার জন্য তাদের নিজস্ব নিয়ম আছে—নিজস্ব পথ পরিক্রমা রয়েছে। বেরনাল দিয়াজের বৃত্তান্তের এই লাতিন আমেরিকানদের রয়েছে তিন হাজার বছরের এক ইতিহাস (বেরনাল হয়তো তা জানতেন না)। সে ইতিহাসের রেকর্ডে অনেক পাপ ও অর্থহীন বিষয়াদি থাকলেও আমরা বলতে চাই যে, এ ইতিহাস আমাদের নিজস্ব স্টাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছে যদিও সে স্টাইল জন্ম দিয়ে থাকতে পারে একেবারে প্রামাণ্য কোনো দানবকে। সে দানবের ক্ষতিপূরণ লাতিন আমেরিকা অন্যভাবে দিয়েছে। বলিভিয়ার অত্যাচারী প্রেসিডেন্ট মেলগারেহো তার ঘোড়া হলোফেরনেসকে বালতি বালতি বিয়ার খাওয়াতো। আবার ক্যারিবীয় অঞ্চলে সেই দশকেই হোসে মার্তির (Jose Marti) আবির্ভাব ঘটে যিনি ফরাসি ইম্প্রেশনিস্টদের উপরে পৃথিবীর যেকোনো ভাষায় লিখিত এযাবৎ কালের শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধটি লিখেছেন। মধ্য আমেরিকা তার সমস্ত নিরক্ষর মানুষদের মধ্যে জন্ম দিলো একজন রুবেন দারিওকে যিনি পাল্টে দিলেন এযাবৎকালের সমগ্র স্প্যানিশ ভাষার কবিতা। লাতিন আমেরিকায় আরেকজন মানুষ আসলেন যিনি মাত্র দেড়শো বছর আগে কেবল তিন সপ্তাহ আগে মুক্তিপ্রাপ্ত ক্রীতদাসদেরকে বুঝিয়ে দিলেন নিঃসঙ্গতার সকল দার্শনিক তত্ত্ব। সেখানে আরো একজন মানুষ এলেন যিনি ‘এমিলি’ নামক প্রবন্ধে রুশোর প্রদত্ত শিক্ষাতত্ত্বকে কাজে প্রয়োগ করে দেখিয়ে দিলেন। এর আগে এখানে শিক্ষার অর্থ ছিল বই কিংবা কিছু ‘কোড’ বোঝার মাধ্যমে সমাজের সিঁড়িতে ঊর্ধারোহণের প্রয়াস। আরেকজন মানুষ এলেন যিনি চেয়েছিলেন জিন ও রেকাব ছাড়া ঘোড়ায় চড়া অশ্ববাহিনী দিয়ে নেপোলিয়নের কায়দায় এক যুদ্ধ ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। এছাড়াও রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনা ও স্থাপত্য গৌরবের নিদর্শন এই লাতিন আমেরিকায়। এখানে রয়েছে সান্তা মার্তা বন্দরে কিংবদন্তী নেতা সাইমন বলিভারের প্রমিথিউসের সমান নিঃসঙ্গতার ইতিহাস, আছে আন্দিজ পার্বত্য অঞ্চলের চাঁদের মতো পাথুরে জমিতে ব্লেডের মতো ধারালো অস্ত্রের বিরুদ্ধে ৯ ঘণ্টা যুদ্ধের ইতিহাস, আছে গুয়াতেমালার তিকাল প্রাচীন নগরীর অদ্ভুত ধ্বংসাবশেষ, আছে মেক্সিকোর চিয়াপাসে বোনামপাক জঙ্গলে মায়া সভ্যতার বিস্ময়কর সব দেয়ালচিত্র, আছে টিটিকাকা হ্রদের পাশে লাতিন আমেরিকার সর্ববৃহৎ পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনক্ষেত্র তিহুয়ানাকো, আছে মেক্সিকোর ওয়াহাকা রাজ্যে মন্টে আলবানে অবস্থিত দুনিয়াজোড়া কৌতূহলের নগরদুর্গের ধ্বংসাবশেষ, আছে বিমূর্ত শিল্পের দুনিয়াজোড়া বিস্ময় মিতলার মন্দির, যে শিল্প পৃথিবীর চিত্রধর্মী শিল্পাঙ্গনের কাছে চির অচেনা এক বিষয়। লাতিন আমেরিকার বিশাল বিস্তৃতি জুড়ে এমন উদাহরণ অফুরান।

আমি বলবো যে, জাদুবাস্তবতা সম্পর্কে আমার প্রথম ধারণাই জন্মেছে ১৯৪৩ সালের শেষ দিকে যখন আমার সৌভাগ্য হয়েছিল হাইতিতে হেনরি ক্রিস্তফের রাজ্যটি দেখার। পুরাকীর্তির সে এক কাব্যিক রূপ। অনেক ঝড়-বজ্র ও অগ্নি-বাত্যা পেরিয়ে হেনরি ক্রিস্তফের রাজপ্রাসাদ ‘সানসুসি’ আর দুর্গ ‘লা ফেরিয়েরে’ এখনো যেন অক্ষয় পড়ে আছে। দেখলাম এখনো নরমান সংস্কৃতির বাহক কেপ টাউন এবং তৎকালীন রাজধানী ক্যাপ ফ্রান্সিস। ক্যাপ ফ্রান্সিসে এক বিশাল ভবনের ব্যালকনি পৌঁছে গেছে পাথর কেটে বানানো সেই রাজ প্রাসাদে যেখানে এক সময় থাকতেন পলিন বোনাপার্ত। ইউরোপিয় দ্বীপ কর্সিকা থেকে এত দূরে নারী পলিন বোনাপার্তের সাথে আমার দেখা হওয়াটা মনে হয়েছিল জিব্রিলের আয়োজিত এক ঘটনা। হঠাৎই আমার মনে এক অসাধারণ সমতানের (synchronism) ভাবনা খেলে গেল। আমেরিকান, পৌনপুনিক, সময়ের বাঁধনমুক্ত, আজকের সাথে কালের মিশে যাওয়া এমন অনেকগুলো বিষয়ের সমতান আমার ভিতরে খেলে গেল। আমি দেখলাম আমার এই ভূগোলের অক্ষাংশে ধৃত হয়ে আছে অনেকগুলো ইউরোপিয় ভাবনার আসল সত্য। আমার এই ভাবনা তাঁদের বিপরীত যাঁরা সূর্যের উল্টোমুখো হয়ে দুনিয়া ঘোরেন এবং আমাদের সত্যকে তাদের বলে নিয়ে যান সেই দেশে বা ভূগোলের সেই প্রান্তে যেখানে ত্রিশ বছর আগেও সামর্থ্য ছিল না সত্যের এই রূপগুলোকে বোঝার বা মাপার। ইতালির কালজয়ী শিল্পী আন্তোনিয়ো কানোভার ভেনাস বলে কথিত পলিন বোনাপার্ত ক্লাসিক স্প্যানিশ সাহিত্যের চরিত্র লাজারিয়ো হয়ে আমার নিকট আবির্ভূত হলো। লাজারিয়োর মতো সে আমার কাছে উন্মুক্ত করতে লাগলো নতুন সব চরিত্র। আমি অনুসন্ধিৎসু হয়ে উঠলাম বিয়াউদ ভারেন্নে (Billaud-Varenne), কোলো দেরবোই (Collot d’Herbois), ভিক্তর হিউয়ে (Victor Hugues) এমন অনেক চরিত্র নিয়ে। শেষোক্ত চরিত্র পরবর্তীকালে প্রাণ জুগিয়েছে আমার Siglo de las luces নাটকে। হাইতির ভূমি ও ইতিহাস আমার উপর এক স্থায়ী জাদুর আছর হয়ে রয়ে গিয়েছে। হাইতির সেন্ট্রাল মেসেতার রাঙা রাস্তাগুলোর রহস্যময়ী সতর্কতার জাদুবার্তা দেখে, ভুদু সংস্কৃতির রাদা লোয়া (Rada loa) আর পেত্রো লোয়ার (Petro loa) ঢাকের ডাক শুনে আমার এই তাজা অভিজ্ঞতার জাদুবাস্তবকে আমি মেলাতে চেষ্টা করছিলাম ইউরোপিয় কতিপয় ভাষার সাহিত্যে ত্রিশ বছর ধরে চেষ্টা করে অর্জিত কৃত্রিম জাদুবাস্তবতার সাথে। ফ্রান্সের ব্রোসেলিয়ান্দা জঙ্গলে কিং আর্থার আর তাঁর দ্বাদশ নাইটের অন্যতম মারলিন যে জাদুবাস্তব অনুসন্ধান করেছেন তেমন কৃত্রিম জাদুবাস্তবের কথা বলছি। এখনো ইউরোপে এই জাদুবাস্তব আবাহন করা হচ্ছে কার্নিভালের বিকৃত ও অস্বাভাবিক চরিত্রের মাধ্যমে। র্যাঁবো সেই দূর অতীতে তাঁর Alchimie du verbe  কবিতায় যে চর্চাকে নির্বাসনে দিয়ে গেলেন, ফরাসি কবিরা জাদুবাস্তবের খোঁজে সেই ভাঁড় আর অস্বাভাবিক চর্চা কি ক্লান্তিহীনভাবে চালিয়েই যাবে? ভেলকিবাজির মাধ্যমে অবাস্তব বস্তু ও ঘটনাকে পাশাপাশি রেখে জাদুবাস্তব তৈরির খেলা ইউরোপে এখনো চলছে। ব্যবচ্ছেদ টেবিলে সেলাই মেশিন আর ছাতার হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়ার অসম্ভব ঘটনা থেকে এই ভেলকিবাজি যাত্রা শুরু করেছিল এবং চলার পথে সে আরো জন্ম দিয়েছে বেজি চামচ, বৃষ্টির ট্যাক্সিতে নকল মানুষ আর গেঁড়ি শামুক (সালভাদর দালির শিল্পকর্ম), বিধবা নারীর নাভির নিচে সিংহের মাথা—এমন আরো অনেক অতিবাস্তবের বস্তু ও ঘটনা। তাদের সাহিত্যে সেই জাদুবাস্তব চলছে এখনো।
মারকুইস দে সাদের (Marquis de Sade) জুলিয়েটা, আলফ্রেড জেরির (Alfred Jarry) এল সুপেরমাচো, গ্রেগরি লুইসের (Gregory Lewis) দি মংক এবং এছাড়াও ইংরেজি গথিক উপন্যাসগুলোর ভীতিকর ভূত, জ্যান্ত সমাহিত পাদ্রী, মনুষ্যনেকড়ে, দুর্গতোরণে পেরেকবিদ্ধ হাত—এসবই তাদের সাহিত্যে জাদুবাস্তবের অনুসন্ধিৎসার উদাহরণ। চলবে

আরও পড়ুন : লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতা | আলেহো কার্পেন্তিয়ের | পর্ব-২

 
/জেড-এস/

লাইভ

টপ