বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

Send
কামাল লোহানী
প্রকাশিত : ১১:১৮, আগস্ট ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৩৭, আগস্ট ১৫, ২০২০

[২০১৭ সালের আগস্ট মাসে এক আলাপে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন কামাল লোহানী। আলাপের চুম্বক অংশ বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।]বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলো, এর পেছনে বঙ্গবন্ধুর কোনো ত্রুটি ছিল কিনা, একথার উত্তরে বলবো, ওনার ত্রুটি একটাই। উনি বাংলাদেশের মানুষকে বিশ্বাস করেছিলেন। তাদের উপর যে তার আত্মবিশ্বাস এবং আস্থা ছিল প্রবলভাবে, সেটিই ত্রুটি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, তাকে কেউ হত্যা করতে পারে না। ৭৩-এর দিকে একবার বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা নিয়ে তার সামনেই কথা হচ্ছিল, আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘নারে। আমাকে হত্যা করতে আসলে তো সালামটা দেবে, সালাম দিলে আর মারতে পারবে না।’ কিন্তু দুর্ভাগ্য, সালাম হয়তো দিয়েছিল, জানি না, কিন্তু সবার মাঝ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে চলে যেতেই হল। আমার মনে হয়েছে, জীবনে একটা ভুল বোধহয় তিনি করেছিলেন। সেটি হল রাষ্ট্রপতি এবং পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৩২ নম্বরে বাস করা। কারণ ৩২ নম্বরের বাড়িটা একদম প্রধান রাস্তার সঙ্গেই। এবং ঘর তো রাস্তা থেকে অল্প কিছু দূরে। এরকম জায়গায় দেশের প্রধানমন্ত্রীর বাস করা রিস্কি। কিন্তু ঐ যে আত্মবিশ্বাস—আমাকে কেউ মারতে পারবে না। এই আত্মবিশ্বাসে তিনি এতো অটল ছিলেন যে ঐ বাসাতে থাকতে তিনি বিন্দুমাত্র শঙ্কা বোধ করেননি। আর তার বিরুদ্ধে যে কেউ ষড়যন্ত্র করতে পারে এটা ছিল তার বিশ্বাসের বাইরে। তিনি সকলকেই আপন ভাবতেন। যে কারণে নিরাপত্তা নিয়ে তার এতো ভাবনা-চিন্তা ছিল না, মানুষের প্রতি এই আস্থা এই ভালোবাসার কারণেই তো তাকে প্রাণটা দিতে হলো।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার প্রথম সরাসরি দেখা হয়েছিল, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টে যখন নির্বাচন হয় তখন তার প্রচার অভিযানের সময়।

এর বেশ কয়েক বছর পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একবার একসাথে মাস তিনেক জেলও খেটেছিলাম। তখন ১৯৬২ সাল। সে বছর আমাদের তিনজন সাংবাদিকের নামে হুলিয়া জারি হল। ১৯৬২ সালে ছাত্র আন্দোলন হল। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্ররা যে আন্দোলন করেছিল তার ফলে ব্যাপক গ্রেফতার করা শুরু হল। সেখানে সাংবাদিকদের মধ্যে আমি, মাইদুল হাসান, আর দৈনিক ইত্তেফাকের নুরুল ইসলাম, এই তিনজনের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হল। হুলিয়া তো গোপন থাকে, আমরা ডিটেইলস কিছু জানতে পারলাম না। আমি তখন দৈনিক আজাদে চাকুরী করি। দৈনিক আজাদ থেকে অফিস করে রাত আড়াইটার সময় যখন বের হলাম তখন চারপাশ থেকে মিলিটারির লোক এসে আমাকে ঘিরে ফেললো। ফিরে ফেলে আমাকে বলল যে, তুমি এরেস্ট, তোমার নামে হুলিয়া আছে। তো এরপর সারারাত লালবাগ থানায় রাখার পর সকালে আমাকে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে নিয়ে যাওয়া হল। ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে যাওয়ার পর ২৬ নম্বর সেলে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল। ২৬ নম্বর সেলে গিয়ে দেখি শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, রণেশ দাশগুপ্ত, বরিশালের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বাবা কফিলউদ্দিন আহমদ চৌধুরী, আবুল মুনসুর আহমদ, তিনি একসময় পাকিস্থানের অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, এঁরা সবাই সেখানে। এনাদের দেখে তো আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। বঙ্গবন্ধু আমাকে দেখে স্বাগত জানালেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রায় সাড়ে তিন মাস ছিলাম কারাগারে।

পরে তো বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। স্বাধীনতার ঘোষণা তিনিই করেছিলেন। আমি দীর্ঘদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। এই বেতার কেন্দ্রের নাম প্রথমে রাখা হয়েছিল ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’। কিন্তু পরে বিপ্লবী শব্দটি ফেলে দেওয়া হয়।

মেজর জিয়াউর রহমান যখন বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা পাঠ করেন, তখন তিনি বলেছিলেন বিপ্লবী শব্দটি থাকলে তিনি পাঠ করবেন না। সেনাবাহিনীর লোক হওয়ার কারণে বিপ্লব শব্দটি তিনি মেনে নিতে পারেননি। তখন বেতারের সাথে যারা যুক্ত ছিলেন তারা সিদ্ধান্ত নিলেন স্বাধীন বাংলা কথাটা তো আছেই, সুতরাং বিপ্লবী না থাকলেও চলতে পারে। তাই বাদ দেওয়া হল বিপ্লবী শব্দটি, আর সেকারণেই সে সময় থেকে নাম হল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। এই নাম পরিবর্তন ছিল খুব সম্ভবত ২৮ শে মার্চ।

কিন্তু পরবর্তীকালে এই বেতারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবং মাত্র এক কিলোওয়াটের একটি ট্রান্সমিশন সরিয়ে নিয়ে অনেক দূরে গিয়ে বাজানো হয়।

৩০ মার্চ দুপুরের অধিবেশন শেষ হবার পর প্রায় ২টা ১০ মিনিটের দিকে বেতার কেন্দ্রে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বিমান হামলা করে। যার ফলে বেতার কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এই বিমান হামলায় কেউ হতাহত না হলেও বেতার কেন্দ্র এবং সম্প্রচার যন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে সেখান থেকে সম্প্রচার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠাতা দশজন সদস্য দুটি দলে বিভক্ত হয়ে আগরতলা ও ত্রিপুরার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন।৩১ মার্চ সকালে কয়েকজন বেতারকর্মী বেতার কেন্দ্রে অবস্থিত একটি এক কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ছোট সম্প্রচার যন্ত্র উদ্ধার করেন। এই সম্প্রচার যন্ত্র সাথে করে নিয়ে তারা ঐদিনই পটিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং ১ এপ্রিল পটিয়ায় পৌঁছেন। এরপর মূল দলটি ৩ এপ্রিল সম্প্রচার যন্ত্রটি পটিয়ায় রেখে তারা রামগড়ের দিকে রওনা হয়। রামগড়ে পৌঁছে তারা ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের তত্ত্বাবধানে ভারতীয় সীমান্তে অবস্থিত ভারত প্রদত্ত একটি শর্ট ওয়েভ(২০০ ওয়াট শর্টওয়েভ) ট্রান্সমিটার থেকে আবার অনুষ্ঠান সম্প্রচার করেন। তারপর ৪ এপ্রিল তাদের একটি দল এক কিলোওয়াট সম্প্রচার যন্ত্রটি আনার জন্য পটিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং অপর দল বাগফায় চলে যান। তারা বাগফা হতে ৪-৮ এপ্রিল পর্যন্ত একটি ৪০০ ওয়াট সম্প্রচার যন্ত্র দিয়ে সম্প্রচার চালাতে থাকেন। এরপর ৮ এপ্রিল আবার তারা আগরতলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং বিভিন্ন স্থান হয়ে ১১ এপ্রিল আগরতলায় পৌঁছান। অন্যদিকে দ্বিতীয় দলটি তখন ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারটি নিয়ে ১০ এপ্রিলে বাগফা-বেলোনিয়া সড়কের পাশে বাংলাদেশ সীমান্ত হতে ১০ মাইল দূরে স্থাপন করেন এবং ১২ এপ্রিল তারা সেখান থেকে অনুষ্ঠানও সম্প্রচার করেছিলেন। এ সময় অনুষ্ঠান রেকর্ড করে সম্প্রচার কেন্দ্র থেকে শর্ট ওয়েভে প্রচার করা হতো।

এর মধ্যে ১০ এপ্রিল অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১১ এপ্রিল অল ইন্ডিয়া রেডিও'র শিলিগুড়ি কেন্দ্রকে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ হিসেবে উল্লেখ করে সেখান থেকে ভাষণ প্রদান করেন এবং এরপরেও বেশ কিছুদিন ঐ কেন্দ্র হতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণসহ আরও নানাবিধ অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়।

তাজউদ্দীন আহমদ ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা হওয়ার সময় সব সহায়তার সঙ্গে একটি জিনিস চেয়েছিলেন। উনি চেয়েছিলেন একটি শক্তিশালী প্রচারযন্ত্র। যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তীকালে এই মুজিবনগর সরকারের পরিচালনাধীন একটি বেতার চালু করা হল সেটিও ঐ একই নামে—‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের পর মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ সরকার ও বেতারকেন্দ্রের কর্মীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারকে একটি শক্তিশালী ট্রান্সমিটার দেয়, এটি পঞ্চাশ কিলোওয়াট ছিল যতদূর জানি। কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ৫৭/৮নং দোতলা বাড়িটিতে রাষ্ট্রপতি ও অন্যান্য মন্ত্রীদের আবাসের কক্ষের সাথের একটি কক্ষে উক্ত ট্রান্সমিটার দিয়ে সম্প্রচার শুরু হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীরা অন্য বাড়িতে উঠে যাওয়ার পর সেই ৫৭/৮ নম্বর বাড়িটিই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্থায়ী কার্যালয়রূপে গড়ে ওঠে। এরপর থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে সম্প্রচারিত হতে থাকে। এই কেন্দ্র দুটি ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে পরিচালিত হতো।

বেতারের প্রসঙ্গ যখন এলো তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে পড়ছে। বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণ সেদিন বেতারে সরাসরি প্রচার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হয়নি, এবং এই তথ্যটি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ চলাকালীন সময়েই তাকে দেওয়া হয়। এর পরপরই তিনি রেডিও এবং টেলিভিশন নিয়ে দুইটি উক্তি করেন।

তার কারণটি হচ্ছে যে এখানে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের যে জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলেন জহুরুল হক। উনি আবার বঙ্গবন্ধুর ক্লাসমেট ছিলেন সম্ভবত। উনি বেশ দুর্বল ছিলেন স্বাভাবিকভাবেই। একেতো বাঙালি, তারপর বন্ধু, আর সবচেয়ে বড় কথা যে ঐ যে টেলিফোন ধরা হচ্ছিল না, এর কারণটি হচ্ছে, ঐ ডিউটি রুমে এবং ডাইরেক্টরের রুমে টেলিফোনটি উঠিয়ে রেখে দেওয়া হয়েছিল, যাতে করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কোন টেলিফোন আসলে ধরতে না হয়। আর রেডিওর যিনি আঞ্চলিক পরিচালক ছিলেন ঢাকায়, আশরাফুজ্জামান খান, উনি আউটসাইড ব্রডকাস্টিং-এর লোক নিয়ে, যন্ত্র নিয়ে মঞ্চে গিয়ে বসে ছিলেন যে বক্তৃতা ওখান থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। কিন্তু হটাৎ করে, কেউ একজন এসে ভুল করে টেলিফোন যথাস্থানে রেখে দেয়। দেখে যে রিসিভার তুলে রাখা সেটা দেখেই একাজ করেছিল। রাখার একটু পরেই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ফোন আসে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারে নিষেধ করা হয়। এই আদেশ সরাসরি পাকিস্তান থেকে জহুরুল হকের কাছে এসেছিল, জহুরুল হক জানিয়েছিলেন। তো এই ঘটনা আশরাফুজ্জামান খানের কাছে তড়িঘড়ি করে খবর পাঠানো হয়। এবং এরপর সেটি বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা চলাকালীন সময়ে তাকে জানানো হলে তৎক্ষণাৎ বলেন, ‘রেডিও-টেলিভিশনের কর্মচারীরা, যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শোনে তাহলে কোনো বাঙালী রেডিও স্টেশনে যাবে না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, কোন বাঙালী টেলিভিশনে যাবেন না।’ এবং পরবর্তীতে তাই হয়েছিল। যখন অসহযোগ আন্দোলন চলছিল, তখন যারা বেতারে কাজ করতো তখন সেটাকে ঢাকা বেতার কেন্দ্র বলে অভিহিত করতো। পাকিস্তানীরা তো তাতেই বুঝে গিয়েছিল যে পরিণতি কোনদিকে যাচ্ছে। সেজন্য তারা বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা প্রচার করতে দিলো না। এবং এরপর থেকে বাঙালি কর্মচারী যারা ছিল তারা রেডিও টেলিভিশন বয়কট করলো। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন যেমন আশফাকুর রহমান খান, শহিদুল ইসলাম, আশরাফুল আলম এই জাতীয় অনেক প্রযোজক উপস্থাপক পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগদান করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু যে রাজনৈতিক আদর্শের লোক ছিলেন আমি ছিলাম তা থেকে ভিন্ন। সে সময় থেকেই আমি বাম দল করতেন। বঙ্গবন্ধুও তা জানতেন। তারপরও আমি তাকে লিডার বলতাম। তিনি এই ডাকের যোগ্য ছিলেন। আমি যে তার দলের না সেটা তিনি ভালো করেই জানতেন। কিন্তু কখনোই জোর করে তার দলে যেতে বলেননি, আমি যে অন্য দল করি সেজন্য তিনি যে আমার প্রতি স্নেহের ত্রুটি করেছেন সেটাও নয়। তিনি সব দলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, যে কারণে সবাই তাকে শ্রদ্ধা করতো, প্রচণ্ড সম্মানও করতো। অনেক ঘটনা আছে, এসব বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে। আর্কাইভ থেকে

শ্রুতিলিখন : অহ নওরোজ

//জেডএস//

লাইভ

টপ