রাহাত খান : বাংলা ছোটগল্পের আধুনিক অবতার

Send
মনি হায়দার
প্রকাশিত : ১০:৪৭, আগস্ট ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৬, সেপ্টেম্বর ০১, ২০২০

রাহাত খানের গল্পের সঙ্গে কীভাবে, কবে পরিচয় ঘটেছিল, মনে নেই। কিন্তু রাহাত খানের ‘মানুষ’ গল্প পাঠ করে অনেক বছর আগে চমকে উঠেছিলাম।  এবং সেই চমক এখনও আমার মধ্যে ক্রীড়াশীল। গল্প যিনি লেখেন, তিনি মানুষ। আবার যাকে বা যাদের নিয়ে লেখেন, তারাও মানুষ। মানুষ গল্প লেখে মানুষ নিয়ে, মানুষ বিষয়ে, মানুষকে তৈরী করে মহানায়ক আবার খলনায়ক। মূলত, মানুষের ভেতরেই বসবাস মানুষের। তার লেখা পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, কথাশিল্পী রাহাত খান মানুষের র্মমরে প্রবেশ করে মানুষের ভেতরের কুসুমকলি খুঁজে চলেছেন।

গল্পকার বা কথাকার রাহাত খান এখন গভীর বিশ্রামে আছেন। হয়তো লিখতে লিখতে এখন ক্লান্তি ভর করেছে। আর কতো লেখা যায়? অনেকতো লিখেছি। হ্যাঁ, রাহাত খান কম লেখেননি। কিন্তু আমাদের লেখার জগতে তার যে প্রভাব থাকার কথা ছিল, সেটা নেই। কেন নেই? দায়ী কে? অনেকের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছি। কথা বলতে বলতে জেনেছি, রাহাত খানের ভেতরে এক ধরনের অন্যকে স্বীকার করে নেয়ার অনিহা বা অনুসয়া আছে। যে কারণে তিনি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন।

রাহাত খানের গল্প বা উপন্যাস ছাড়া ঈদ সংখ্যা আমরা ভাবতেই পারতাম না। ‘হে অনন্তের পাখি’, ‘অমল ধবল চাকরি’ রাহাত খানের বিখ্যাত উপন্যাস। ‘দিলুর গল্প’ কিশোর বয়সের থ্রিল আর দুষ্টামি নিয়ে অনবদ্য কিশোর উপন্যাস। লুৎফর রহমান রিটন ভাইয়ের চিত্রনাট্যে বিটিভিতে প্রায় বিশ বছর আগে ধারাবাহিক নাটক হয়েছিল। আমরা মুগ্ধ হয়ে সেই নাটক দেখেছিলাম। আর ছোট গল্পের ভেতরে রাহাত খান একটু গোটা সমুদ্রকে ঠেসে দিতে পারেন লেখার কৌশলে, অনায়াস দক্ষতায়। কেন আমরা হারিয়ে ফেললাম সেই অনন্ত অসীম রাহাত খানকে? এই হারিয়ে যাওয়ার পেছনে রাহাত খানের নিজের ভূমিকা কতখানি? তিনি কি এখন লিখতে ক্লান্ত বোধ করছেন? নাকি তিনি ফুরিয়ে গেছেন? না, রাহাত খান হারিয়ে যাবার মতো গদ্যশিল্পী নন। রাহাত খান লড়াকু শিল্পী। যে কারণেই হোক এখন তিনি ঝিম মেরে আছেন কিন্তু ফিরে আসবেন আবার।

এই লেখার শুরুতে ‘মানুষ’ গল্প বিষয়ে লিখছিলাম। সেই গল্পের জমিনে ফিরে যাই। পাঠকদের বোঝানোর চেষ্টা করি, রাহাত খান কেন ছোটগল্পের অবতার! মানুষ গল্পের প্রধান চরিত্র চারটি। বেশ টাকা পয়সার মালিক আজিজুর রহমান বোগদাদী। বোগদাদীর কম বয়সী স্ত্রী আমেনা বেগম। বাসার কাজের মহিলা আলেফজান বেওয়া আর বোগদাদীর পরিচিত মানুষ ফরিদউদ্দিন। গল্পের মোচড়ে আমরা বুঝতে পারি, বোগদাদীর সন্তান হয় না। সেই কারণে সুন্দরী আমেনাকে বিয়ে করেছে। আরও জানতে পারি কল্যাণপুরে বোগদাদীর আরও বালাখানা আছে। সেই বালাখানায় অনেক মেয়ে মানুষের আনাগোনাও আছে। আজকে, যে রাতের ঘটনা গল্পের আখ্যানে নিয়ে এসেছেন রাহাত খান সেই রাতে বোগদাদী বাসায় নেই। ফরিদউদ্দিন সেই সুযোগটাই নিয়েছে এবং আমেনার কাছে অফিসের একটা গল্প ফাঁদে। যে পুলিশ তাকে খুঁজছে। একটা রাত কোনো প্রকারে থাকতে চায়, সামনের রুমে। যেহেতু পরিচিত আর সর্ম্পকে দেবর... রাহাত খান বাধ্য করেন আমেনাকে রাজি হতে। ‘মানুষ’ গল্পের কাঠামোটাই এমন যে, ফরিদউদ্দিনকে থাকতেই হবে ওই রাতে, আমেনার বাসায়। না থাকলে, ‘মানুষ’—মানুষের ভেতরে লুক্কায়িত রোপিত বাসনার বিষেরবাঁশি কেমন বেজে ওঠে, তারই নিঃশব্দ নিনাদ শোনান লেখক। আমেনাকে কি মন্ত্রে রাজি  করান রাহাত খান?

চলুন, প্রবেশ করা যাক ‘মানুষ’ গল্পের আর একটু অন্তজমিনে। কায়দা করে টাকা দিয়ে বশ করেছে আলেফজান বেওয়াকে। আলেফজান বেওয়া চুপ। রাতের অন্ধকারে ফরিদউদ্দিন বসার ঘর থেকে ঢোকে আমেনার ঘরে। ‘প্রথম ধাক্কাটা আসে আমেনার ভয়ার্ত কণ্ঠ থেকে, কে?

ফরিদউদ্দীন ফিসফিস করে বলে, দোহাই আল্লার, চিল্লান দিবেন না। একখান কথা কইতে আসিছি, কইতে দেন, পছন্দ হয় থাকব, না হয় চলি যাব।... ফরিদউদ্দীন হাত ধরে চুমু খেতে যায়। আমেনা ফোস করে সাপের মতো। ফরিদউদ্দীন পুরুষের কাম আবেগে কাঁপছে, অথচ আমেনা স্বামীর ধর্মীয় অনুশাসন মনে রেখে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। যখন কোনাভাবেই আমানাকে আপন শরীরের নিচে আনতে পারছে না, তখন ফরিদউদ্দীনের মর্মযাতনার প্রতিক্রিয়া জানান গল্পকার লেখক—‘আমেনার না শুনতে শুনতে ফরিদউদ্দীন রেগে যায়। সে ভাবে, মেয়ে লোকটাকে গলা টিপে খুন করলে কেমন হয়? কিন্তু ঠিক পর মুহুর্তেই সে বুঝতে পারে খুন খারাপির মধ্যে যাওয়ার মতো সাহস মনোবল তার নেই।’

অল্পপ্রাণ মানুষের সাহসের অধিবাস ওই পযন্তই। সে মরতে পারে কিন্তু অন্যকে মারতে পারে না। কাম ক্রোধে উন্মত্ত ফরিদউদ্দীন কি ব্যর্থ হবে? গল্পতো প্রায় শেষের দিকে। তাহলে কী হতে যাচ্ছে ‘মানুষ’ গল্পের পরিণতি? জগৎ-সংসার তো কামের সংসার। প্রেম ভালোবাসা যাই বলি না কেন, সর্বশেষ গোল্লাটাতে কাম! কিন্তু এই কামেরও রকমফের আছে। রাহাত খান ‘মানুষ’ গল্পে কাম প্রেম ভালোবাসার এক অবাক রসায়ন ঘটিয়েছেন। আমরা যখন গল্পটি পাঠ করতে করতে ফরিদউদ্দীনের পরাজয়ের জন্য প্রস্তত হই, ঠিক সেই মুহুর্তে রাহাত খান গল্পের গালে মারেন কষে এক থাপ্পড়। গল্প বিকল্প টার্ন নিয়ে তিনশো ষাট ডিগ্রীতে ঘুরে যায় এবং পাঠকের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। হায়, রাহাত খান আমাদের কোন বধ্যভূমিতে নিয়ে এলেন?

প্রিয় পাঠক, আমরা গল্পটার শেষ অংশ পাঠ করতে চাই।

‘সে এখন উঠে পড়বে বলে ভাবছে ঠিক এ সময় আশপাশের কোন বাড়ি থেকে শিশু কণ্ঠের তীব্র কান্না আচমকা চিরে দেয় বাতাসের পর্দা। উঠে আসার আগে শেষ চেষ্টা হিসেবে চুমু খেতে যায় ফরিদউদ্দীন, আশ্চর্য, আমেনা একটু নিথর হয়ে আছে, থমকে আছে, কিন্তু বাধা দিল না। ফরিদউদ্দীন এরপর পাগলের মতো হয়ে ওঠে। শিশু কণ্ঠের কান্না তেমনি বাজতে থাকে, ফরিদউদ্দীনের হাতটা এবার ঠেলে না দিয়ে আমেনা বলে, আচ্ছা।’

রাহাত খান গল্পটা শেষ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, গল্পটা শেষ হয়েছে? না, গল্পটা নতুন করে বিচিত্র ডাইমেনশনে ডালাপালা রেখে এগিয়ে চলছে, প্রচলিত ফর্ম বা সমাজের যাবতীয় রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, মহান মাতৃত্বের সাধ ও স্বাদ নিতে। টাকাওয়ালা বৃদ্ধ লোকদের কাছে আমেনারা বিক্রি হয়ে, যায়, থাকে সুরম্য অট্টালিকায়, খায় ভালো, জীবনের পুকুরে আসে স্বাচ্ছন্দ্য। কিন্ত মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা যখন পূরণ করতে পারে না, তখন সামনে নিয়ে আসে ধর্ম। ধর্মের বর্ম পরিয়ে আমাদের করে রাখে এক ধরনের কারাগারে। কিন্ত শরীরের ভেতরে, মননে থাকে কামনার লেলিহান সাধ। কামনার সিন্ধু পার হয়ে নারী অর্জন করে মাতৃত্ব। ‘মানুষ’ গল্পে কথাশিল্পী রাহাত খান  নারীর চিরকালীন শ্বাশতকালের আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এই গল্পের দুই চরিত্র ফরিদউদ্দীন এবং আমেনা নিশ্চিভাবে কোনো পাপ বা অন্যায় করেনি। রাহাত খানের গল্প ‘মানুষ’—মানুষের সুমহান মর্যাদা দিয়েছে। আদিকাল থেকে মানুষ এই মহান মর্যাদার জন্য লড়াই করে আসছে।

মানুষ মূলত দাঁড়িয়ে আছে শরীরের ওপর। এই যে শরীর—আশ্চর্য এক রঙমহল। শরীরের ভেতরের প্রকৃতির নিপুণ নির্মাণ শৈলী সব মানুষকেই মুগ্ধ করে, অবাক করে। বেঁচে থাকার লড়াই, দাঁড়িয়ে থাকবার লড়াই, প্রেমের লড়াই, সংসারের লড়াই—সবই নির্ভর করে নির্ভার শরীরের ওপর। আবার এই শরীর কীভাবে প্রতরণা করে, ফিরিয়ে দেয়, তারই অনন্য গাথা নির্মাণ করেছেন রাহাত খান ‘শরীরের পক্ষে বিপক্ষে’ গল্পে।

ঢাকায় থাকে আবুল হাসান। অনেক দিন পরে একটা চিঠি পায় আবুল হাসান। কার চিঠি? জরিনা আখতারের চিঠি। কে এই জরিনা আখতার? আমরা গল্প ক্ষেতের ভেতরে প্রবেশ করি।

এইতো কয়েক বছর আগের ঘটনা। সেদিন বৃষ্টি নেমেছে তুমুল। ময়মনসিংহ শহর ভেসে যাচ্ছে। জানালার বাইরে বৃষ্টি। উঠোনে বৃষ্টি। ছাদে ঝুম ঝুম শব্দ, বাতাসে সাপের শিস। আয়শা আখতারের বাসায় কেউ ছিল না। শুধু শিউলি ফুলের মতো তাজা প্রফুল্ল আখতার ছিল, আর আমি ছিলাম। বৃষ্টি হচ্ছিল ঝুম ঝুম, আর বাসায় একেবারে কেউ না থাকলে যা হয়, মন বলছিল সুযোগটা যায়। হ্যাঁ, জীর্ণ শীর্ণ ছিলাম কিন্ত যুবকতো। এক কাণ্ড করে বসলাম সেই সাহসে। আয়শা আখতার একেবারে থ। চুপ করে দাঁড়িয়ে মহিলা দেখছিল আবুল হাসানকে। ঠোঁটের কোলে সামান্য ঠাট্টা বা কৌতুকের হাসি ফুটেছিল কি না, আজ এতোদিন পরে মনে পড়ে না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আয়শা আখতার বলেছিল, ছি! হাসান, এসব কী? সব কিছুর একটা সীমা থাকা উচিৎ।’

আবুল হাসান চুপসে গিয়েছিল। না গিয়ে উপায় ছিল? আবুল হাসান সহ্য করতে বাধ্য হয়েছিল শরীরে বিচ্ছুরিত সুন্দরী আয়শা আখতারের তীক্ষ্ণ উপহাস। আর আমরাতো জানিই, আবুল হাসান সামান্য স্কুল শিক্ষক, শরীরে লিকলিকে। আয়শা আখতার ঠাহর করেছিলো, ফালতু ছেলে। সেই থকে আবুল হাসান ময়মনসিংহ ছেড়ে ঢাকায়। আছে ভালোই। পাকিস্তানে আটকে পড়া প্রবাসী বন্ধু তৈমুরের বাসায় দারুণ আছে। আয়শা আখতারের সঙ্গে সর্ম্পকের খুনসুটি আমরা জেনে যাই রাহাত খানের নিপুণ বর্ণনায়। আবুল হাসানের প্রলয় কাঙ্ক্ষিত থাকলেই আয়শা ছিল অন্যের জন্য প্রস্তুত আইসক্রিম, আবুল হাসানের নয়। আমরা আয়শা আখতারের শরীর মনস্তত আরও জেনেই যাই, গল্পের মধ্যে রাহাত খানের অনন্য বর্ণনাশৈলীর ব্যাকরণে—‘একদিনের একটা ছোট্ট ঘটনা বলি। আবার বলছি, ময়মনসিংহের ঘটনা, পাঁচ ছয় বছর আগের। আয়শা আখতারের ছিল এক পুরুষ। আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল আয়শা আখতারের। স্ত্রী পুরুষের সর্ম্পকের গল্প চলত স্বাচ্ছন্দ্যে। একদিন হাত ধরেছিলাম। একদিন চুমু খেতে গিয়েছিলাম। এমন হয়েছে, অর্ধেক রাত ছাদে বসে চাঁদের দিকে তাকিয়ে গল্প করেছি আমরা। কিন্তু আমি, এখন সন্দেহ হয়, তার আকাঙ্ক্ষিত ছিলাম না। হয়ত স্বাস্থ্যগত কারণে, হয়ত মেয়েলী মনের যে আড়াল ও জটিলতা আছে সেই সংবর্তের দরুন। আমি ছিলাম এক চেনা মানুষ, খুব অন্তরঙ্গ, গল্পকরার জন্য চমৎকার সঙ্গী, হয়তো এইটুকু। যে ছিল আয়শা আখতারের আকাঙ্ক্ষিত পুরুষ সে ছিল চাল্লু দ্য গ্রেট।’ আমরা গল্পটার সুলক পেয়ে যাই, এইখানে এসে।

‘শরীরের পক্ষে বিপক্ষে’ গল্পে  রাহাত খান জীবনের গূঢ়সত্যকে  গভীর মর্মরে প্রকাশ করেছেন। প্রেম বা নারী পুরুষের সম্পর্ক মূলত দাঁড়িয়ে থাকে শরীরের উপর. কিংবা শরীরকে কেন্দ্র করে। শরীরহীন প্রেম? প্রেমই না।

‘আমাদের বিষবৃক্ষ’ রাহাত খানের আত্মবোধনের গল্প। গল্পের পুরো আখ্যান জুড়ে বাংলার মানবিক সর্ম্পকের ক্যানভাস। রাহার খানের গল্প পাড়তে পড়তে আমরা আবিষ্কার করি, তিনি গল্পের সঙ্গে ইতিহাসকেও মুদ্রিত করেন অনায়াসে। ‘আমাদের বিষবৃক্ষ’ শুরুই হয় ১৯৫০ সাল দিয়ে। এবং আমরা বুঝতে পারি, গল্পটা সময়ের স্রোতে বেয়ে এগিয়ে যাবে। যায় ও। গল্পে আমরা একটা গ্রাম পাই। গ্রাম প্রান্তর জুড়ে হিন্দু মুসলামানের অধিবাস।

চরিত্র মাখনলাল, রায়হান, আতাউর। এই তিন চরিত্র ঘিরে অর্চনা দি। আরও চরিত্র আছে। কিন্তু এই আখ্যানের জন্য আমরা সেই চরিত্রদের এড়িয়ে যাবো। কারণ, সময় এবং পরিধি খুব কম। কেমন চিল অর্চনাদির বাড়ি?  অনন্য বর্ণনা দিয়েছেন রাহাত খান। তিনি লিখেছেন—‘অচর্নাদির বাসা জেলখানা রোডের শেষ মাথায়। উঁচু প্রাচীর দেওয়া বাড়ি। বাড়ি মানে ছোট, নিচু ছাতওয়ালা একটা দালান, তিনখানা মাত্র ঘর। বাড়ির বাদবাকি অংশে গোলাপের ঝাড়। নানা জাতের রানা রঙের গোলাপ গাছ। যে দিকে তাকানো যায় গলা সমান উচু ঝাড়, গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল, সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে মসৃণ বেগুনি রঙের ছোপ, দু’চার-পাঁচটা মরা বিবর্ণ পাতা আর নিচে মাটিতে উইয়ের রঙিন পাখনার মতো অজস্র পাঁপড়ি। গোটা বাড়িটাই গোলাপ বাগান।  ছোট একটুখানি দালান একপাশে সঙ্কুচিত হয়ে আছে। গেট খুলে ঢুকলেই থমকে দাঁড়াতে হয়। এ যেন একটি উৎসবের মেলা বসানো হয়েছে। সেখানে পুল, সবুজ পাতা ও উড়ন্ত প্রজাপতির প্রদর্শনী! অর্চনা দি এ বাড়িতেই থাকে।’

গল্পের শুরুটা গত শতকের পঞ্চাশ দশকের সময়ের। জায়গাটা ময়মনসিংহ। ময়মনসিংহ হিন্দু অভিজাত শ্রেণির একটা প্রবল প্রভাব ছিল। ছিল অনেক জমিদাদের আনাগোনা আর ছিল আভিজাত্যেও প্রকাশ। সঙ্গে ছিল পূজা অর্চনার অনন্য সংস্কৃতি। সেই সময় ও সঙস্কৃতির অনন্য বিবরণ দেন রাহাত খান।

‘আমাদের বিষবৃক্ষ’ গল্পে লেখক যেন মানুষের মানুষ হওয়ার সংগ্রাম পুনর্বার লিখলেন। এ লড়াই বাংলাদেশ ভারতের সীমান্তে যেমন, পৃথিবীর বড় বড় আধুনিক দেশের সীমান্তেও আজকাল ছড়িয়ে পড়েছে। সুতরাং মানুষ এখনও মানুষ হওয়ার লড়াই করছে।

কথাশিল্পী রাহাত খান অনেক বড় বড় গল্প লেখেন। ছোট গল্প বলতে যা বোঝায়, তিনি লেখেন না। তিনি লেখেন বড় গল্প। কিন্তু ‘নির্বাচিত গল্প’ বইয়ে রাহাত খানের একটা ছোট গল্প আছে। মাত্র দুই পৃষ্ঠার। নাম ‘দীর্ঘ অশ্রুপাত’। গল্পটি মুক্তিযুদ্ধের কিন্তু আখ্যান চলে যায় ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল পার হয়ে বঙ্গোপসাগরে, বঙ্গোপসাগর পার হয়ে, মহাসাগরে..।

গল্পটা শুরু করেন রাহাতখান ভয়াল পচিশে মার্চ রাতকে ধারণ করে। উত্তম পুরুষে লেখা গল্পটা শুরু হয়, বাড়িঅলাকে কেন্দ্র করে। বর্বর পাকিস্তানী বাহিনী গোটা দেশের উপর হামলে পড়েছে আধুনিক অস্ত্র নিয়ে। চারদিকে জ্বলছে আগুন, দাউ দাউ। সবাই সমবেত হয়েছে বাড়িঅলার ঘরে। বাড়িঅলা বিরক্ত ভাড়াটেদের ওপর। ইসলাম ও পাকিস্তান সর্ম্পকে নসিহত করে গেলো ছাদে, চাঁদ তারা খচিত পতাকা টাঙ্গাতে। যাকে পেয়ারা পাকিস্তানের হার্মাদ সৈন্যরা বুঝতে পারে, এই বাড়ি পাকিস্তানের ঘাটি। কিন্তু বৈঠকখানায় সমবেত সকলে শুনলো চিৎকার। কী খবর? সবাই দৌড়ে সিঁড়ির কাছে যায়। দেখতে পায়, বাড়িঅলার সামনে দু’জন পাকিস্তানী আর্মী। 

‘বাড়িঅলা বলছে, আমি মুসলমান, আল্লার কসম মুসলমান। এই দ্যাখেন না আমার হাতে পাকিস্তানের পতাকা।

এক সৈনিক বললো, শুয়োরের বাচ্চা তুমিতো হিন্দু। তোমার বাপ হিন্দু। চৌদ্দ পুরুষ হিন্দু।

বাড়িঅলা বললো: জি না, আমি মুসলমান, আমার বাপ মুসলমান তার বাপ মুসলমান।

এই স্বীকারোক্তির পর দ্বিতীয় সৈনিকটি বাড়িঅলাকে কলেমা পড়তে বলল। কলেমা বাড়িঅলা পড়লেন অত্যন্ত মর্মস্পর্শী গলায় এবং কলেমা পড়া শেষ হতেই পেটের দিকে সঙ্গীনের একটি খোঁচা খেলেন।’

পাকিস্তানের আর্মী দু’জন বাড়িঅলার উপর শুরু করলো পাশবিক নির্যাতন আর বাড়িঅলা যন্ত্রনায় চিৎকার করছে। বাড়িঅলা চার বছরের পুতুলের মতো মেয়েটির নাম ধরে চিৎকার করছে। মার খেতে খেতে বাড়িঅলা গোঙ্গাচ্ছে আর বলছে, ‘আমার একটি মেয়ে আছে গো। হায় আল্লা, আমার মেয়ের কী হবে!’

পাকিস্তানী আর্মী দুজন, সেই রাতে লাখ লাখ বাঙালি হত্যার উৎসবে, রাহাত খানের ‘দীর্ঘ অশ্রুপাত’গল্পের বাড়িঅলাকেও সিঁড়ির উপর হত্যা করে চলে যায় বীরদর্পে। গল্পটা যদি এখানে শেষ হতো, এটা কোনো গল্পই হতো না। একাত্তরে, এই বাংলায় পাকিস্তান বাহিনী ও হার্মাদ রাজাকারেরা ত্রিশ লাখ বাঙালি হত্যা করেছে। সেই হত্যার একটা হত্যাকাণ্ডের মামুলি বিবরণ হতো। কিন্তু রাহাত খান গল্পকার। জাত গল্পকার। তিনি জানেন একটি বিন্দু থেকে কী কৌশলে ও প্রয়োগে একটি সফল গল্পের আখ্যান বের করা যায়। সেই অস্ত্রই প্রয়োগ করলেন তিনি। 

আসুন, আমরা গল্পের শেষ পাদটিকায় চলে যাই।

রাহাত খান লিখছেন—‘এই ঘটনার দশ মাস পরের কথা। ১০ জানুযারী ১৯৭২ সাল। ঢাকা বিমানবন্দর লোকে লোকারণ্য। শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরে আসছেন স্বাধীন বাংলাদেশে। ঢাকা বিমানবন্দরের ফাঁকা নীল আকাশের দিকে ছিল সবার চোখ, কখন রাজহংসের মতন একটি বিমানের দেখা মেলে আকাশে, এই আবেগনিবিড় অপেক্ষা চলছে। বছর পাঁচেকের একটি ছোট্ট একরত্তি মেয়েও ছিল সেই ভিড়ের ভেতরে। সবাই চিল আবেগতপ্ত ও উত্তেজিত। কিন্তু মেয়েটি ছিল চুপচাপ। এমন সময়ে মাইকে ঘোষণা করা হল, আর কয়েক মিনিট, তারপরই তিনি আসছেন। ছোট মেয়েটি এই ঘোষনা শুনে আমার হাত ধরল, মুখ ওপরে তুলে করুণকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলে: আমার আব্বু আসবে না?’

মুহুর্ত মাত্র, দুই পৃষ্ঠার ছোটগল্পটি সারা বাংলায়, কোটি-কোটি স্বজন হারানো সন্তানদের কাছে পৌঁছে যায়। এই গল্পের গল্পকার রাহাত খান। যেন তিনি আমাদের বাংলা ছোট গল্পের আধুনিক অবতার। তার বাংলাদেশের গল্প নতুন মাত্রা পেয়েছে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ